Home » আন্তর্জাতিক » চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ২১)

চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ২১)

নারী প্রশ্ন

আনু মুহাম্মদ

LAST 3এই সময়কালে সামাজিক আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে পরিবর্তনের আইন প্রণয়ন ও তার পক্ষে আন্দোলন গড়ে তোলা ছিলো অত্যাবশ্যক। এর মধ্যে নারী প্রশ্ন ছিলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। সমাজে যেকোনো শৃঙ্খলমুক্তির আন্দোলন নারীর শৃঙ্খলকে আঘাত করে। নারীর জন্য পরিসর তৈরি হয়। আবার নারীর শৃঙ্খলমুক্তির বিষয়টি যথাযথভাবে অন্তর্ভূক্ত না হলে অন্য কোনো শৃঙ্খলমুক্তির আন্দোলনও সফল হতে পারে না, মুখ থুবড়ে পড়ে। বস্তুত চীনে ১৯১১ সাল থেকে সংঘটিত বিভিন্ন আন্দোলনে ধীরে ধীরে নারীর অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। সেবছরই কিউ জিন নামে এক নারী শহীদ হয়েছিলেন। পরে তিনি চীনের বিদ্রোহী বিপ্লবী নারীর প্রতীকে পরিণত হন।

বিপ্লব পূর্বকালে চীনে প্রচলিত বচন থেকে সমাজে নারীর অবস্থান আন্দাজ করা যায়। এলিজাবেথ ক্রল তাঁর গবেষণাকালে এসব বচনের একটি তালিকা তৈরি করেছিলেন যেমন – ‘নুডলস যেমন ভাত নয়, নারীও তেমনি মানুষ নয়’, ‘স্ত্রী হলো কেনা ঘোড়ার মতো, আমি তাকে চালাবো এবং যখন খুশি চাবুক মারবো’, ‘স্বামীর মৃত্যুর পর সতী স্ত্রীর কর্তব্য হচ্ছে মৃত স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকা এবং আর বিয়ে না করা’, ‘পুরুষের স্থান সর্বত্র, নারীর স্থান শুধুমাত্র রান্নাঘরে’, ‘নারী যে কুয়া খুঁড়বে তাতে পানি উঠবে না, যে নৌকা মেয়েরা চালাবে তা পানিতে ডুববে’।()

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই চীনা কমিউনিস্ট পার্টিতে নারী প্রশ্ন গুরুত্ব পেয়েছে, এই বিষয় নিয়ে নারী কমরেডদের অবিরাম লড়াইও জারি ছিলো। দীর্ঘপথ দীর্ঘসময়ে চলা লং মার্চ পার্টির ভেতর নেতাকর্মীদের মতাদর্শিক সাংস্কৃতিক অনেক কিছুই নতুন করে চিন্তা ও বিন্যস্ত করবার মুখোমুখি করে। লংমার্চ চীনের বিভিন্ন লোকালয়, বিভিন্ন জাতিকে যেমন অভিন্ন লক্ষ্যে যুক্ত করে তেমনি নারীকে প্রত্যক্ষ প্রকাশ্য এবং পুরুষের সঙ্গে যৌথ লড়াইএ যুক্ত করে। তার শারীরিক উপস্থিতি বিভিন্ন কর্মসূচি ও নীতিগত অবস্থানগুলোকে ঠিকঠাক মতো এগিয়ে নেবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।()

১৯৫০ সালের মে মাসে বিবাহ সংস্কার আইন প্রবর্তন করা হয় যা হাজার বছরে নারীর অধস্তনতার আইনগত ভিত্তি ভেঙে দেয়। এই আইনে জোরপূর্বক বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়। এই আইনে চীনের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিবাহকে সাবালক নারী ও পুরুষের স্বেচ্ছাচুক্তি হিসেবে অভিহিত করা হয়। সম্পত্তি, বিবাহ বিচ্ছেদ ও সন্তানের ওপর নারী সমান অধিকার লাভ করে। এই আইনে একইসঙ্গে পরিবারে দুজনের সমান দায়িত্বও নির্ধারিত হয়। বিবাহ বিচ্ছেদ অনেক সহজ করা হয়। বহুবিবাহ, পতিতাবৃত্তি, অবাঞ্চিত মেয়েশিশু হত্যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।

তবে অর্থনৈতিক রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন ছাড়া এই আইন বাস্তবায়ন সম্ভব ছিলো না। সেজন্য যতো ভূমিসংস্কারসহ বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে জোতদার, সমরপ্রভু, বড় আমলাসহ সম্পত্তিশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য শৃঙ্খল থেকে যতো মানুষ মুক্ত হতে থাকে ততই নারীর জন্য মুক্তির পথও প্রশস্ত হয়। কমিউন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর নারীর পক্ষে লড়াই আরও সহজ হয়। সারাদেশ জুড়ে শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করা, সর্বত্র শিশুযত্ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, প্রসূতিকালীন ছুটি, সমান মজুরি সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন চেষ্টার পাশাপাশি চীনা নারী ফেডারেশনের অব্যাহত নজরদারি এবং মতাদর্শিক সংগ্রাম সমাজে নারীর অবস্থা ও অবস্থান পরিবর্তনকে অনেক স্পষ্ট করে তোলে।

কিন্তু হাজার বছরের প্রথা, চর্চা, বিশ্বাস, চিন্তার আধিপত্য দূর করা সহজ ছিলো না। তাই ১৯৫৬ সালে নারী ফেডারেশন পার্টি কংগ্রেসে যে রিপোর্ট প্রদান করে তাতে বলা হয়: ‘বর্তমান সময়ে তিনটি সমস্যা বিবেচনা করতে হবে . যদিও নারী ক্যাডারদের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু অনুপাত অনুযায়ী তাদের সংখ্যা খুবই কম; . যদিও মেয়েদের ক্ষমতা এখন আগের তুলনায় বেশি, তবুও তাদের সাংস্কৃতিক, বৈজ্ঞানিক এবং তাত্ত্বিক চেতনার মান অনেক নিচু; এবং ৩. নারী ক্যাডারদের বিপুল, অধিকাংশ সন্তান লালন ও গার্হস্থ্য কাজেই বেশি সময় ব্যয় করেন। আমরা দেখেছি যে, কিছু প্রতিষ্ঠান ও নেতৃস্থানীয় ক্যাডাররা পুরনো ভাবধারা, চিন্তা ও প্রথা প্রশ্রয় দেন যেগুলো নারী বৈষম্যবাদী। তাঁরা মনে করেন “তিনজন নারীও একজন পুরুষের সমান নন।” নারী ক্যাডারদের পদোন্নতির প্রশ্ন যখন ওঠে তখন নানারকম সংশয় সৃষ্টি করা হয়। তাঁরা মনে করেন, মেয়েদের যদি পদোন্নতি দেয়া হয় তাহলে তাঁরা সে কাজের জন্য নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারবেন না, সন্তান প্রতিপালন নিয়ে নিজেরা ব্যস্ত থাকবেন এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য বোঝা হয়ে ওঠবেন। সমান দক্ষ নারী ও পুরুষ উপস্থিত থাকলেও পুরুষকেই পদোন্নতির জন্য অগ্রাধিকার দেয়া হয়।’()

অর্থাৎ আত্মসন্তুষ্টির ঘোরে আটকে পড়েননি বিপ্লবীরা। বরং নারী প্রশ্নসহ নানা বিষয়ে পার্টির ভেতরে, এবং বিভিন্ন সংগঠনে লড়াই অব্যাহত থাকে। এর মধ্যে গ্রাম ও শহরের চেহারা দ্রুত পাল্টে যেতে থাকে। নারীর আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি বাড়তে থাকে সর্বত্র। দামি গাড়ী, দেশি, বিদেশি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান কমে যায় অনেক। কমে যায় বিত্তশালীদের শানশওকত। ভিখিরী উধাও হয়ে যায়। শহরে যানবাহনের মধ্যে দ্রুত বাড়তে থাকে সাইকেল।।

(চলবে…)

তথ্যসূত্র

১। Elizabeth Croll: The Women’s Movement in China 1949-1973, London, 1974.

২। আমার নারী, পুরুষ ও সমাজ গ্রন্থের একটি অধ্যায় “বিপ্লব উত্তর সমাজে নারীর অগ্রগতি ও পশ্চাদপসরণ”এ অন্যদেশগুলোর সাথে চীনের অভিজ্ঞতাও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সর্বশেষ সংস্করণ, সংহতি প্রকাশন, ২০১০।

৩। পূর্বোক্ত