Home » আন্তর্জাতিক » তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (সপ্তম পর্ব)

তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (সপ্তম পর্ব)

সৌদি আরবের সাথে অস্ত্র চুক্তি

LAST 4আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার সাথে তেল সম্পদের অর্থের একটি গভীর সখ্যতা রয়েছে। একটি অপরটিকে টিকিয়ে রাখে। আর পরস্পরের ঘনিষ্ঠ দুই ব্যবসার কুশীলবরা। এই ব্যবসার নেপথ্যে রয়েছে ঘুষ, অর্থ কেলেঙ্কারিসহ নানা ভয়ঙ্কর সব ঘটনাবলী। এরই একটি খন্ডচিত্র প্রকাশ করা হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। প্রভাবশালী দ্য গার্ডিয়ানএর প্রখ্যাত দুই সাংবাদিক ডেভিড লে এবং রাব ইভানসএর প্রতিবেদন প্রকাশের পরে এ নিয়ে বিস্তর আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। এ সংখ্যায় ওই প্রতিবেদনের বাংলা অনুবাদের (সপ্তম পর্ব) প্রকাশিত হলো। অনুবাদ: জগলুল ফারুক

১৯৬৮ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত উইলি মরিস সৌদিদের একদমই সহ্য করতে পারতেন না। তার ভাষায়, অন্য যে কোনো দেশের নাগরিকদের চেয়ে এরা অনেক বেশি বিরক্তিকর। সীমান্তরক্ষীরা ছিল খুবই বাজে ধরনের। অফুরন্ত তেল সম্পদ সৌদিদের চারিত্রিক স্ফলন ঘটিয়েছিল। ফলে তারা ভাবতো বাদ বাকি পুরো পৃথিবীটাই হচ্ছে তাদের আনন্দফূর্তির যোগানদার। মরিস তার বিদায়ী নথিতে আরও লেখেন, সউদ পরিবার সৌদি আরবকে নিজেদের পারিবারিক ব্যবসা হিসেবে বিবেচনা করতো। তবে আপনার বিস্ময়ের ঘোরটি কাটতে চাইবে না, যখন আপনি দেখবেন যেই যুবরাজটি সারাক্ষণই ন্যায়অন্যায় বিষয়ে আপনাকে ছবক দিচ্ছেন রাষ্ট্রীয় একটি ক্রয়বিক্রয় চুক্তিতে তার কমিশনের পরিমাণটিই (ব্যাপারটা যে আপনি জানেন, সেটি তিনিও অবগত আছেন) হয়তো ২০ শতাংশ।

তিনি বলেন, সৌদি আরবে অস্ত্র বিক্রয়ের ব্যাপারটি সব সময়ই বাকা পথে নিষ্পন্ন হতো। দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতা এখানে অবধারিত এবং বিরক্তিকরভাবেই নরকতুল্য। যেন একটি সরকারের নিচে পুঁতে রাখা আছে বিস্ফোরণন্মুখ এক টাইম বোমা। শিকারযোগ্য প্রাণীতে ভরপুর এক অরণ্য এটি। এখানে পা ফেলতে হয় খুব সাবধানে ঝুকি নিয়ে। এখানকার ধনকুবেররা পরস্পরের ব্যাপারে এবং তাদের দালালদের ব্যাপারেও সন্দেহপ্রবণ।

মরিস লিখছেন, সব ধরনের চুক্তিতেই যুবরাজ সুলতান অন্যায়ভাবে ভাগ বসাতেন। এতদসত্ত্বেও ব্রিটেন মধ্যযুগীয় এসব শাসকের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চলতো। আর্কাইভে সংরক্ষিত দলিলাদি থেকে জানা যায়, গত শতকের ষাটের দশকের শেষ দিক থেকে শুরু করে পরবর্তী এক দশকেরও বেশি সময়কালে ব্রিটেন সরকারের অস্ত্র বিক্রেতারা মোট ১০ কোটি পাউন্ডেরও বেশি পরিমাণ ঘুষ লেনদেনের অনুমতি দিয়েছিল। বর্তমান হিসাবে এর পরিমাণ হবে কমপক্ষে ৫০ কোটি পাউন্ড। এর অধিকাংশই লেনদেন করেছে বিএই নামক কোম্পানিটি। বহু বছর পর রক্ষণশীল দলীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়ান গিলমার এর সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, আপনি যদি ব্যবসাটি পেতে চান তবে আপনাকে ঘুষের টাকা গুনতে হবে। আর যদি ঘুষ দিতে না পারেন তবে ব্যবসাটিও আপনি পাবেন না।

লেস্টার সাফিল্ডের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামাদি বিক্রয় প্রতিষ্ঠানটি গোপন এজেন্টদের ব্যাপারে যে ধরনের বালখিল্যতার পরিচয় দিয়েছে তাতে মরিসের মতো কূটনীতিকরা খুবই বিরক্ত হয়েছেন। তবে সৌদি আরবে ব্রিটিশদের ঘুষ প্রদানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুকি এবং ঝামেলার দিকটি ছিল সৌদি সরকারের ক্ষমতার বলয়গুলোর চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা। অনেকটা হতাশার সুরই মরিস বলেছেন, অস্ত্র বিক্রির পথটি সেখানে খুবই সর্পিল। এ পথের দরজাটি খোলার জন্য সোনার তৈরি একক কোনো চাবিও (স্বর্ণালী দালান) নেই।

শীর্ষ পর্যায়ে বহু সৌদিকেই ঘুষের অংশ দিতে হতো। লেবার সরকারের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডেভিড ওয়েন সরকারি এক খোলামেলা নথি থেকে এ বিষয়ে একটি ছবক পেয়েছিলেন। নথিতে বলা হয়, সৌদি আরবে অস্ত্র বিক্রির কোনো ব্যবসা পেতে গেলে নির্ধারিত দালালের মাধ্যমে শীর্ষ পর্যায়ের কোনো যুবরাজকে বড় অংকের একটি কমিশন দিতে পারলেই কেল্লা ফতেহ, এমনটা ভাববার কোনো কারণ নেই। কাজটি পেতে গেলে ওই কোম্পানিকে একেবারে মন্ত্রী থেকে শুরু করে নিচের দিকের কর্মকর্তা পর্যন্ত ঘুষ প্রদান করতে হবে।

উচ্চপদস্থ সৌদিরা ঘুষের এই অর্থ লেনদেনের বিষয়টি তাদের জনগণের কাছ থেকে আড়াল করে রাখার ব্যাপারে যথেষ্টই যত্নবান। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত মধ্যস্থতাকারী কিংবা আত্মীয়স্বজনদের ব্যবহার করা হয়। দূতাবাস সূত্রের মতে, সুলতানের সর্বকনিষ্ঠ ভাই যুবরাজ আহমদ বিএই’র একজন দালাল।

তবে গোফধারী বিপুল বপুর আদনান খাসোগির মতো সাধারণ মানুষও এসব কাজ করে থাকেন। খাসোগির দাবি অস্ত্রের দালালি করেই তিনি বিশ্বের ধনীতম ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। সৌদি আরবের গোয়েন্দা প্রধান কামাল আঠাম বলেন, যুবরাজদের কাছ খাসোগির মতো লোকেরই কদর বেশি ছিল। কারণ যে কোনো সময় তার সাথে সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করা যায় এবং তাতে কোনো পারিবারিক কেলেঙ্কারিরও জন্ম নেয় না। কিন্তু যুবরাজ আহমেদের বেলায় তেমনটি করার সুযোগ নেই। যখন ধূর্ত একজন লেবাসী ব্যবসায় নিজেকে জনৈক যুবরাজের গোপন প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করে বসেন তখন ব্যাপারটি কেমন দাঁড়ায়? তিনি কি সত্যি সত্যি তাই ছিলেন? এর সত্যাসত্য যাচাইয়ের জন্য লন্ডনের একজন সরকারি কর্মকর্তা দমবন্ধ করা হোটেল রুমে বসে কেবল তার ব্রিফকেসটি সবলে আকড়ে ধরে উদ্বিগ্নই হতে পারেন, সংশ্লিষ্ট যুবরাজকে টেলিফোন করার সাহস সঞ্চয় করতে পারেন না।

একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তা বিষয়টিকে অতিমাত্রায় গোপনীয় এবং অস্পষ্ট বলে অভিহিত করেছেন। এটি ছিল একটি জঙ্গলি অবস্থা। এ জঙ্গলের মধ্যেই সাফিল্ড খুব বড় ধরনের একটি ব্যবসা ধরতে ব্যর্থ হন। ব্যবসাটি ছিল ন্যাশনাল গার্ড বাহিনীর জন্য ১১ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড মূল্যের সামরিক যান সরবরাহ। বাহিনীটি সৌদি সামরিক বাহিনীর একটি প্রতিপক্ষ।

যুক্তরাজ্য সরকারের পক্ষে তিনি মিলব্যাংক টেকনিক্যাল সার্ভিসেসকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সংস্থাটি লেবাননের নাগরিক মাহমাউদ ফাসতাককে দালাল হিসেবে নিয়োগ দেয়। ন্যাশনাল গার্ড বাহিনী প্রধানের শ্যালকের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। সাফিল্ডের লোকজন পরবর্তীতে ফাসতাককে সরিয়ে দিয়ে তার জায়গায় খাসোগিকে দায়িত্ব দেয়ার চেষ্টা চালায়। এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য হ্যারল্ড হিউবার্ট উড়ে আসেন। তিনি বলেন, মিলব্যাংক টেকনিক্যাল সার্ভিসেস খাসোগির সাথে একটি চুক্তি করতে পারে। তার ব্যক্তিগত চাহিদা হয়তো একটু বেশিই হবে। তবে সৌদি আরবে ব্যবসা করতে গেলে এভাবেই করতে হয়।

সাফিল্ড এ সময় চুক্তিটি নিষ্পন্ন করতে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী লর্ড ক্যারিংটনকে সৌদি আরবে আসার জন্য অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, প্রচলিত রীতি অনুযায়ী সৌদি আরবে ব্যবসায় কমিশন প্রদান করতে হয়। তাছাড়া আবদুল্লাহ (ন্যাশনাল গার্ড প্রধান এবং বর্তমানের বাদশাহ) যে কোনো ধরনের কেনাকাটাকে সরকারের সাথে সরকারের কেনাকাটা হিসাবে দেখাতে চান। এ কারণেই আমরা মিলব্যাংক টেকনিক্যাল সার্ভিসেসের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য সরকারের একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করতে চাচ্ছি।।

(চলবে…)