Home » শিল্প-সংস্কৃতি » বিপ্লব আর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার কবি – নাজিম হিকমত

বিপ্লব আর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার কবি – নাজিম হিকমত

LAST 5(নাজিম হিকমত, বিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতে প্রধানতম কবিদের একজন। তুরস্কে জন্মগ্রহণকারী এই মহান বিপ্লবী সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা এবং সামগ্রিক অর্থে শ্রমিককৃষকসহ সাধারণ মানুষের প্রতি তার ভালোবাসার কারণে পরিণত হয়েছেন আন্তর্জাতিক এক নাগরিকে। বিপ্লবের আকাঙ্খা এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার কারণে জীবনের কমপক্ষে ২০ বছর তিনি কাটিয়েছেন জেলখানায়। বিপ্লব আর মুক্তির কথা বললেও তার কবিতা গীতিময়তায় ঋদ্ধ, রোমান্টিকতায় পরিপূর্ণ। নাজিম হিকমত তার কবিতায় ভালোবাসার কথা যেমন বলেছেন, তেমনি জীবনের প্রতি তার তীব্র আকাঙ্খাও প্রতিফলিত হয়েছে। তবে সব কিছুর উপরে তার অনন্যতা এখানে যে, ভালোবাসা, রোমান্টিকতা, জীবন সব কিছুর ভেতর দিয়েই বিপ্লবের জয়গান গেয়েছেন। বিপ্লবী এই কবির জন্ম ১৫ জানুয়ারি, ১৯০২ এবং মৃত্যু ৩ জুন, ১৯৬৩। এই মহান বিপ্লবীর প্রতি আমাদের বুধবারএর পক্ষ থেকে অসীম শ্রদ্ধা।)

ফ্লোরা সরকার

শিল্প যখন মনের গহীন থেকে উঠে আসে তখন তা হয় সৃষ্টি আর যখন হৃদয়ের রক্তক্ষরণ থেকে উঠে আসে তখন ঘটায় বিপ্লব। যে বিপ্লব শিল্পী শুধু নিজের দেশেই নয়, ছড়িয়ে দেয় পৃথিবীর নানা দেশে, নানা প্রান্তে। মৃত্যুর পরেও যে শিল্প থাকে অপরাজেয়। নাজিম হিকমত তুরস্কের এমনই এক আন্তর্জাতিক বিপ্লবী কবির নাম। নাজিম হিকমত এক শাশ্বত দ্রোহ, সংগ্রাম আর সাধারন মানুষকে অকৃপন ভালোবেসে যুদ্ধে যাবার নাম। কিংবদন্তীর জীবন তার লেখনীকে বিপ্লব ঘটাতে বাধ্য করে। পাবলো নেরুদা লিখেছিলেন, ‘সদ্য মুক্তি পাওয়া/বন্দীদের একজন নাজিম হিকমত/তার কবিতার মতো/লাল রং সোনার সুতায়/বোনা জামা উপহার দিয়েছে আমায়’।

প্রখ্যাত দার্শনিক জ্যঁ পল সার্ত্র নাজিম হিকমত সম্পর্কে বলেছিলেন – ‘তিনি এমনি একজন কবিযার কাব্য আর জীবনের মাঝে কোন ভেদরেখা টানা যায় না’। আর তাই হিকমতের কাব্যের পাশাপাশি তার জীবনীও অত্যন্ত আগ্রহী করে তোলে পাঠককে। তার সংক্ষিপ্ত জীবনী আলোচনার পাশাপাশি আমরা তার কাব্যেরও কিছু কিছু আলোচনা করবো। নাজিম হিকমতকে বিশ শতকের আধুনিক কবি হিসেবে পরিগণিত করা হয়ে থাকে। যার কবিতা পৃথিবীর প্রায় পঞ্চাশটি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। জন্ম ১৯০২ সালে তুরস্কের সোলানিকায়, যেখানে তার বাবা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। হিকমত বেড়ে উঠেছেন ইস্তাম্বুলে। তার মা একজন শিল্পী ছিলেন, দাদা ছিলেন কবি। মাত্র সতর বছর বয়স থেকেই হিকমতের কবিতার স্ফুরণ ঘটতে থাকে এবং প্রকাশিত হতে থাকে তার কবিতা। তুরস্কের নেভাল একাডেমিতে কিছুদিন কাজ করার পর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে পশ্চিম তুরস্কে মিলিটারি একাডেমিতে পড়াবার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯২২ সালে বিয়ের পর প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মস্কো চলে যান। রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব তাকে ভীষণ ভাবে আলোড়িত করে। মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে তৎকালীন শিল্পাঙ্গনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবিসাহিত্যিকদের সংস্পর্শে আসেন। ১৯২৪ সালে আবার তুরস্কে ফিরে যান, যে সময়ে তুরস্কের স্বাধীনতা আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু বামপন্থী পত্রিকা প্রচারের অভিযোগে কিছুদিনের মধ্যেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯২৬ এ আবার তিনি মস্কো পালিয়ে যেতে সক্ষম হন, যেখানে রাশিয়ার আরেক বিখ্যাত কবি মায়াকভস্কির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ ঘটে। সেই সময়ের নাট্যমঞ্চের আরেক দিকপাল মায়ারহোল্ডের সঙ্গে তিনি কাজে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯২৮ এ সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার মাধ্যমে তাকে আবার তুরস্কে ফিরে যাবার অনুমতি দেয়া হলে হিকমত দেশে ফিরে যান। যেহেতু কমিউনিস্ট পার্টি তখন নিষিদ্ধ ঘোষিত, তাই হিকমত অনেকটা তুরুপের তাসের মতো কর্তৃপক্ষের দ্বারা ব্যবহৃত হন। অকারণ সন্দেহ আর পর্যবেক্ষনের মাঝে তাকে রাখা হতো। ১৯৩৩ এ পোস্টার লাগাবার অপরাধে তাকে জেলে প্রেরণ করা হয়। কিন্তু বিচারের পর প্রমাণ পাওয়া যায় যে হিকমত সেই অপরাধে আদৌ অপরাধী ছিলেন না। ১৯২৯ থেকে ১৯৩৩ এর মধ্যে তার নয়টি বই প্রকাশিত হয়ে যায়। যার মধ্যে চারটি দীর্ঘ বিপ্লবী কবিতা ছিলো। কবিতা ছাড়াও বেশকিছু নাটক, উপন্যাস, চিত্রনাট্য, শিশুতোষ গল্প াতান লিখেছেন। আর জীবিকার তাগিদে প্রুফরিডার, অনুবাদক আর সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন। দুই সন্তান, দ্বিতীয় স্ত্রী আর বিধবা মা নিয়ে তখন তার সংসার।

১৯৩৮ এ ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হন। গ্রেপ্তার এবং সাজাপ্রাপ্ত হয়ে আঠাশ বছরের কারাজীবনে তাকে প্রেরণ করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ – ‘তার কবিতা তুর্কি সেনাবাহিনীকে উত্তেজিত আর বিদ্রোহী করে তুলছে’। বিশেষত, ১৯৩৬ এ প্রকাশিত, ১৫’শ শতাব্দীর অটোমান সাম্রাজ্যের সময়ে সংঘঠিক কৃষক বিদ্রোহের ওপর ভিত্তি করে রচিত একটি দীর্ঘ কবিতা। হিকমতের খুব কাছের বন্ধু আরেক দিকপাল, কবি পাবলো নেরুদার বর্ণনায় পাওয়া যায় তার নিদারুণ কারাভোগের কাহিনীর কথা – ‘যতক্ষণ না পর্যন্ত হিকমত ক্লান্ত হয়ে পড়তো ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে দীর্ঘ সময় ধরে হেঁটে যেতে বলা হতো। তারপর তাকে বিষ্ঠাপূর্ণ টয়লেটে ঘন্টার পর ঘন্টা আটকে রাখা হতো।’ কিন্তু হিকমত এতে দমে যেতেন না। এই জেলেই তিনি অনেক গান আর কবিতা রচনা করেন, যেগুলো তার বন্ধুদের দিয়ে বাইরে সরবরাহ করাতেন। ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ এর মধ্যে তিনি অনেক গান আর কবিতা রচনা করেন, ‘ঐঁসধহ খধহফংপধঢ়ব’ যার মধ্যে অন্যতম একটি মহাকাব্য। এখানে একটি কৈফিয়ত দেয়া বাঞ্ছনীয়। নাজিম হিকমত তার সাহিত্য কর্ম করেছেন তার স্বদেশী অর্থাৎ তুর্কি ভাষায় এবং তার পরবর্তীতে ডেভিড কোহেনসহ অন্যান্য ইংরেজি অনুবাদকদের অনুবাদ থেকে বাংলায় অনূদিত হয়েছে। সরাসরি তুর্কি থেকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করলে নাজিম হিকমতকে যতোটা কাছে পাওয়া যেতো তা বন্ধই থেকেছে। নির্ভর করতে হয়েছে ইংরেজি অনুবাদের উপরেই। জেলে থাকা অবস্থাতেই দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে তার বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে এবং তৃতীয়বারের মতো আবার বিয়ে করেন। ১৯৪৯ সালে একটি আন্তর্জাতিক কমিটি, যার সদস্যদের মাঝে ছিলেন পাবলো পিকাসো, পল রবিনসন এবং জ্যঁ পল সার্ত্র এর মতো দিকপালেরা, তারা হিকমতের মুক্তির জন্যে প্যারিসে প্রচারণা শুরু করেন এবং অবশেষে হিকমত কারামুক্ত হন। তবে এই সময়েই তার প্রথম হার্ট অ্যাটাক হয়। ১৯৫০ এ তাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। তার ‘অটোবায়োগ্রাফি’ নামক কবিতায় লেখেন

কিছু মানুষ জানে সব গাছপালা আর মাছের নাম

আমি জানি বিচ্ছেদ

কিছু মানুষ হৃদয়ে রাখে তারাদের নাম

আমি আবৃত্তি করে যাই নীরবতা

আমি শুয়েছি জেলখানায়, শুয়েছি শ্রেষ্ঠ হোটেলে

আমি চিনেছি ক্ষুধাকে, চিনেছি অনশনধর্মঘটকে, যেখানে খাবার প্রায় থাকে না

তিরিশে আমাকে ফাঁসিতে ঝোলাতে চাইলো

পঞ্চাশে দিলো নোবেল —-’

জেল থেকে মুক্তির পরেও তাকে দুই দুইবার হত্যা করার প্রচেষ্টা চলে। দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় তার জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়লে তাকে মস্কোয় নিয়ে যাওয়া হয়। মস্কোয় রাইটার্স কলোনীতে তাকে একটি বাড়ি বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু তার স্ত্রী আর সন্তানদের মস্কোতে যাবার অনুমতি দেয়া হয়নি। ১৯৫২ সালে তার আবার দ্বিতীয় হার্ট অ্যাটাক হয়। সুস্থ্য হবার পর তিনি ইউরোপের নানান দেশসহ এশিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেন। শুধু আমেরিকা প্রবেশের কোন অনুমতি না দেয়ায় সেখানে তার যাওয়া হয়ে ওঠেনি। ১৯৫৯এ তিনি পোল্যান্ডের নাগরিকত্বের জন্যে আবেদন করেন। ইতিমধ্যে জার্মান, ফরাসি এবং অন্যান্য ভাষায় তার কবিতা অনুদিত হতে শুরু হয়ে যায়। ১৯৬৩ তে তৃতীয়বারের হার্ট অ্যাটাকে তার মৃত্যু ঘটে। তার মৃত্যুর এক বছরের মধ্যেই অর্থাৎ ১৯৬৫৬৬র মধ্যেই তুরস্কে তার কবিতার ভলিয়্যুম সহ পুনর্মুদ্রণ শুরু হয়ে যায়। এবং পরবর্তী পনর বছর ক্রমে ক্রমে তার আটটি ভলিয়্যুম সহ সব লেখা তুর্কী ভাষায় প্রকাশিত হয়। সঙ্গে পৃথিবীর আরো অধিকতর ভাষায় অনুদিত হয় তার লেখা।

কবি হুইটম্যানের মতো নাজিম হিকমত তার কবিতায় যেভাবে বলেছেন তার নিজের কথা, দেশের কথা সেই একই ভাবে বলে গেছেন বিশ্বের কথা। আত্মকেন্দ্রিকতার ঊর্ধ্বে গিয়ে তিনি একাধারে ছিলেন ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগত। তার কবিতা একাধারে বাস্তব এবং আবেগ প্রবণতায় পূর্ণ। মানবিকতার স্পর্শে তার কবিতাগুলো যেন নাটকীয়, আশাবাদি এবং শিশুসুলভ আনন্দে পূর্ণ যা তাকে করেছে উন্মুক্ত, গণমুখী এবং সামাজিক ও শৈল্পিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নিবেদিত। তার জীবন এবং কর্মের এই একত্ব তাকে তার সময়ের নায়ক করে তুলেছে। তিনি বিশ্বাস করতেন তার কবিতা এবং জীবন আলাদা কোন ঘটনা ছিলো না। আমেরিকান লেখক টেরেন্স দে প্রেস, যিনি ‘হলোকাস্ট রাইটার’ হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন, তিনি বলেন ‘হিকমতের দৃষ্টান্তমূলক জীবন এবং দূরদৃষ্টিতা তাকে করে তুলেছে ঐতিহাসিক এবং সময়োত্তীর্ণ, মার্ক্সিস্ট এবং মিস্টিক। কারণ শিল্পী হিকমত এবং ব্যক্তি হিকমত প্রকৃতি ও মানব উদ্দীপনার ঐকতান বিরোধীদের শত্রু মনে করতেন। সহজ সরল ভাষায় গুরুগম্ভীর উপস্থাপন হিকমতের মতো কোন আধুনিক আমেরিকান কবিদের মাঝেও দেখা যায়নি’। তার অন্যতম একটি কবিতা – ‘বেঁচে থাকা’য় তিনি লেখেন

বেঁচে থাকা কোন কৌতুক নয়

বেঁচে থাকবে ঐকিকান্তিকতায়, যেমন থাকে কাঠবিড়ালিরা

অর্থাৎ সবকিছুর উর্ধ্বে যেয়ে বেঁচে থাকো

অর্থাৎ বেঁচে থাকা হচ্ছে বৃত্তিমূলক জীবন’ —-

তার অভিশংসনককারীরাও তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখেছে যখন তারা দেখলো কারোর কবিতা সেনাবাহিনীর মতো মানুষকেও উদ্বেলিত করতে পারে। জীবনভর শত কষ্টের মাঝেও কখনোই তার জীবন বা শিল্পের সঙ্গে তিনি কোন আপস করেননি। আর তাই ‘বিষন্নতার স্বাধীনতা’ কবিতায় স্বাধীনতার অসাধারণ বিষন্নতাকে আমরা খুঁজে পাই। তার এই কবিতাটি পাঠকদের উদ্দেশ্যে ইংরেজি থেকে অনুবাদ করে দেয়া হলো।

তুমি তোমার চোখ দুটোকে নষ্ট করেছো

নষ্ট করেছো তোমার লাবণ্যময় হাত দুটো

হাজার রুটির জন্যে ময়দার ময়ান করেছো

যার একটুকরো তোমার মুখে জোটেনি

তুমি স্বাধীন অন্যের দাসত্ব করার জন্যে

তুমি স্বাধীন অন্যকে বিত্তবান থেকে আরও বিত্তশালী করার জন্যে

যে মুহূর্ত্তে তুমি জন্ম নিয়েছো

তারা তোমার চারপাশে রোপণ করেছে

জীবনভর মিথ্যার জাল

যে মিথ্যা উৎপাদিত হয় কারখানাগুলোতে

তুমি জীবনভর স্বাধীনতার বাসনা করে চলেছো

মন্দিরে প্রার্থনা করেছো

স্বাধীন ভাবে ভাবতে চেয়েছো

তুমি ঘাড় নুয়ে থেকেছো

হাতদুটো ঝুলিয়ে

অলসভঙ্গীতে ঘুরেছো মুক্তির আশায়

তুমি মুক্ত

মুক্ত তুমি বেকারত্বের জালে

তুমি তোমার দেশকে ভালোবেসেছো

পৃথিবীর সব থেকে মূল্যবান রত্নটির মতো

কিন্তু হঠাৎ একদিন (উদাহরন স্বরূপ)

দেশটিকে তারা আমেরিকার কাছে সত্ত্বপ্রদান করে দিলো

এবং সেই সঙ্গে তুমি এবং তোমার স্বাধীনতাকেও

স্বাধীনতা পেলে বিমানঘাঁটি হবার

তুমি প্রচার করলে মানুষ বেঁচে থাকবে

যন্ত্রবত নয়, নয় কোন সংখ্যা বা সংযুক্তি হিসেবে

থাকবে বেঁচে মানুষ হিসেবে

ঠিক তখন তোমাকে হাতকড়া পরিয়ে দেবে ওরা

তুমি বন্দিত্বের জন্যে মুক্ত হয়ে গেলে

মুক্ত হলে কারাগারে বা এমনকি মৃত্যুদণ্ডে দন্ডিত হয়ে

মানুষের জীবনে নেই কোন লোহা বা কাষ্ঠবত

এমনকি সূক্ষ কারুকাজপূর্ণ পর্দা

জীবনে স্বাধীনতা চাইবার কোন প্রয়োজন নেই

তুমি মুক্ত

আকাশের তারার নিচে বিষন্ন স্বাধীনতার মতো মুক্ত।

নাজিম হিকমত দ্রোহ, স্বপ্ন, ভালোবাসা, জীবন সবকিছুর ভেতরেই যে এক বৈষম্যহীন সমাজ, সাধারণ মানুষের অধিকার অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে একটি বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতেন, তার অতি পরিচিত একটি কবিতায় সে বিষয়টি উঠে এসেছে। তুর্কি থেকে ইংরেজি এবং তা থেকে বাংলায় অনুবাদ করা দু’টি কবিতা দিয়েই লেখাটি শেষ করছি।

————————-

জেলখানার চিঠি

অনুবাদ : সুভাষ মুখোপাধ্যায়

প্রিয়তমা আমার

তেমার শেষ চিঠিতে

তুমি লিখেছ ;

মাথা আমার ব্যথায় টন্ টন্ করছে

দিশেহারা আমার হৃদয়।

তুমি লিখেছ ;

যদি ওরা তেমাকে ফাঁসী দেয়

তোমাকে যদি হারাই

আমি বাঁচব না।

তুমি বেঁচে থাকবে প্রিয়তমা বধু আমার

আমার স্মৃতি কালো ধোঁয়ার মত হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে

তুমি বেঁচে থাকবে, আমার হৃদয়ের রক্তকেশী ভগিনী,

বিংশ শতাব্দীতে

মানুষের শোকের আয়ূ

বড় জোর এক বছর।

মৃত্যু

দড়ির এক প্রান্তে দোদুল্যমান শবদেহ

আমার কাম্য নয় সেই মৃত্যু ।

কিন্তু প্রিয়তমা আমার, তুমি জেনো

জল্লাদের লোমশ হাত

যদি আমার গলায়

ফাসীর দড়ি পরায়

নাজিমের নীল চোখে

ওরা বৃথাই খুঁজে ফিরবে

ভয়।

অন্তিম ঊষার অস্ফুট আলোয়

আমি দেখব আমার বন্ধুদের, তোমাকে দেখব

আমার সঙ্গে কবরে যাবে

শুধু আমার

এক অসমাপ্ত গানের বেদনা।

বধু আমার

তুমি আমার কোমলপ্রাণ মৌমাছি

চোখ তোমার মধুর চেয়েও মিষ্টি।

কেন তোমাকে আমি লিখতে গেলাম

ওরা আমাকে ফাঁসী দিতে চায়

বিচার সবে মাত্র শুরু হয়েছে

আর মানুষের মুন্ডুটা তো বোঁটার ফুল নয়

ইচ্ছে করলেই ছিঁড়ে নেবে ।

ও নিয়ে ভেবনা

ওসব বহু দূরের ভাবনা

হাতে যদি টাকা থাকে

আমার জন্যে কিনে পাঠিও গরম একটা পাজামা

পায়ে আমার বাত ধরেছে।

ভুলে যেও না

স্বামী যার জেলখানায়

তার মনে যেন সব সময় ফুর্তি থাকে।

বাতাস আসে, বাতাস যায়

চেরির একই ডাল একই ঝড়ে

দুবার দোলে না।

গাছে গাছে পাখির কাকলি

পাখাগুলো উড়তে চায়।

জানলা বন্ধ:

টান মেরে খুলতে হবে।

আমি তোমাকে চাই; তোমার মত রমনীয় হোক জীবন

আমার বন্ধু, আমার প্রিয়তমার মৃত্যু।।

আমি জানি, দুঃখের ডালি

আজও উজাড় হয়নি

কিন্তু একদিন হবে।

নতজানু হয়ে আমি চেয়ে আছি মাটির দিকে

উজ্জল নীল ফুলের মঞ্জরিত শাখার দিকে আমি তাকিয়ে

তুমি যেন মৃন্ময়ী বসন্ত, আমার প্রিয়তমা

আমি তোমার দিকে তাকিয়ে।

মাটিতে পিঠ রেখে আমি দেখি আকাশকে

তুমি যেন মধুমাস, তুমি আকাশ

আমি তোমাকে দেখছি প্রিয়তমা।

রাত্রির অন্ধকারে, গ্রামদেশে শুকনো পাতায় আমি জ্বালিয়েছিলাম আগুন

আমি স্পর্শ করছি সেই আগুন

নক্ষত্রের নিচে জ্বালা অগ্নিকুন্ডের মত তুমি

আমার প্রিয়তমা, তোমাকে স্পর্শ করছি।

আমি আছি মানুষের মাঝখানে,ভালবাসি আমি মানুষকে

ভালবাসি আন্দোলন,

ভালবাসি চিন্তা করতে,

আমার সংগ্রামকে আমি ভালবাসি

আমার সংগ্রামের অন্তস্থলে মানুষের আসনে তুমি আসীন

প্রিয়তমা আমার আমি তোমাকে ভালবাসি।

রাত এখন ন’টা

ঘন্টা বেজে গেছে গুমটিতে

সেলের দরোজা তালা বন্ধ হবে এক্ষুনি।

এবার জেলখানায় একটু বেশি দিন কাঁটল

আটটা বছর।

বেঁচে থাকায় অনেক আশা,প্রিয়তমা

তোমাকে ভালবাসার মতই একাগ্র বেঁচে থাকা।

কী মধুর কী আশায় রঙ্গীন তোমার স্মৃতি।

কিন্তু আর আমি আশায় তুষ্ট নই,

আমি আর শুনতে চাই না গান।

আমার নিজের গান এবার আমি গাইব।

আমাদের ছেলেটা বিছানায় শয্যাগত

বাপ তার জেলখানায়

তোমার ভারাক্রান্ত মাথাটা ক্লান্ত হাতের ওপর এলানো

আমরা আর আমাদের এই পৃথিবী একই সুচ্যগ্রে দাঁড়িয়ে।

দুঃসময় থেকে সুসময়ে

মানুষ পৌঁছে দেবে মানুষকে

আমাদের ছেলেটা নিরাময় হয়ে উঠবে

তার বাপ খালাস পাবে জেল থেকে

তোমার সোনালী চোখে উপচে পড়বে হাসি

আমার আর আমাদের এই পৃথিবী একই সুচ্যগ্রে দাঁড়িয়ে !

যে সমুদ্র সব থেকে সুন্দর

তা আজও আমরা দেখিনি।

সব থেকে সুন্দর শিশু

আজও বেড়ে ওঠে নি

আমাদের সব থেকে সুন্দর দিনগুলো

আজও আমরা পাইনি।

মধুরতম যেকথা আমি বলতে চাই।

সে কথা আজও আমি বলি নি।

কাল রাতে তোমাকে আমি স্বপ্ন দেখলাম

মাথা উঁচু করে

ধুসর চোখে তুমি আছো আমার দিকে তাকিয়ে

তোমার আদ্র ওষ্ঠাধর কম্পমান

কিন্তু তোমার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম না।

কৃষ্ণপক্ষ রাত্রে কোথাও আনন্দ সংবাদের মত ঘড়ির টিক্ টিক্ আওয়াজ

বাতাসে গুন্ গুন্ করছে মহাকাল

আমার ক্যানারীর লাল খাঁচায়

গানের একটি কলি,

লাঙ্গলচষা ভূঁইতে

মাটির বুক ফুঁড়ে উদগত অঙ্কুরের দুরন্ত কলরব

আর এক মহিমান্বিত জনতার বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত ন্যায্য অধিকার

তোমার আদ্র ওষ্ঠোধর কম্পমান

কিন্তু তোমার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম না।

আশাভঙ্গে অভিশাপ নিয়ে জেগে উঠলাম।

ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বইতে মুখ রেখে।

অতগুলো কণ্ঠস্বরের মধ্যে

তোমার স্বরও কি আমি শুনতে পাই নি ?

——————————

আমি জেলে যাবার পর

অনুবাদ : সুভাষ মুখোপাধ্যায়

জেলে এলাম সেই কবে

তার পর গুণে গুণে দশবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করেছে পৃথিবী।

পৃথিবীকে যদি বলো, বলবে

কিছুই নয়,

অণুমাত্র কাল।’

আমি বলব

না , আমার জীবনের দশটা বছর।’

যে বছর জেলে এলাম

একটা পেন্সিল ছিল

লিখে লিখে ক্ষইয়ে ফেলতে এক হাপ্তাও লাগেনি।

পেন্সিলকে জিজ্ঞেস করলে বলবে :

একটা গোটা জীবন।’

আমি বলব :

এমন আর কী, মোটে তো একটি সপ্তাহ।’

যখন জেলে এলাম

খুনের আসামী ওসমান

কিছুকাল যেতেই ছাড়া পেল

তারপর চোরাই চালানের দায়ে

ঘুরে এসে ছমাস কয়েদ খাটল

আবার খালাস হল।

কাল তার চিঠি পেলাম বিয়ে হয়েছে তার

এই বসন্তেই ছেলের মুখ দেখবে।

আমি জেলে আসবার সময়

যে সন্তানেরা জননীর গর্ভে ছিল

আজ তারা দশ বছরের বালক।

সেদিনকার রোগা ল্যাংপেঙে ঘোড়ার বাচ্চাগুলো

এখন রীতিমত নিতম্বিনী।

কিন্তু জলপাইয়ের জঙ্গল আজও সেই জঙ্গল

আজও তারা তেমনি শিশু।

আমি জেলে যাবার পর

দূরবর্তী আমার শহরে জেগেছে নতুন নতুন পার্ক

আর আমার বাড়ির লোকে

এখন উঠে গেছে অচেনা রাস্তায়

সে বাড়ি আমি চোখেও দেখিনি।

যে বছর আমি জেলে এসেছিলাম

রুটি ছিল তুলোর মত সাদা

তারপর মাথাপিছু বরাদ্দের যুগ

এখানে এই জেলখানায়

লোকগুলো মুঠিভর রুটির জন্যে হন্যে হল

আজ আবার অবাধে কিনতে পারো।

কিন্তু কালো বিস্বাদ সেই রুটি।

যে বছর আমি জেলে এলাম

দ্বিতীয় যুদ্ধের সবে শুরু

দাচাউএর শ্মশানচুল্লী তখনও জ্বলেনি

তখনও পারমাণবিক বোমা পড়েনি হিরোশিমায়।

টুঁটিটিপেধরা শিশুর রক্তের মত সময় বয়ে গেল

তারপর সমাপ্ত সেই অধ্যায়।

আজ মার্কিন ডলারে শোনো তৃতীয় মহাযুদ্ধের বোল।

কিন্তু আমি জেলে যাবার পর

আগের চেয়ে ঢের উজ্জ্বল হয়েছে দিন।

আর অন্ধকারের কিনার থেকে

ফুটপাথে ভারী ভারী হাতের ভর দিয়ে

অর্ধেক উঠে দাঁড়িয়েছে মানুষ।

আমি জেলে যাবার পর

সূর্যকে গুণে গুণে দশবার প্রদক্ষিণ করেছে পৃথিবী

আর আমি বারংবার সেই একই কথা বলছি

জেলখানায় কাটানো দশটা বছরে

যা লিখেছি

সব তাদেরই জন্যে

যারা মাটির পিঁপড়ের মত

সমুদ্রের মাছের মত

আকাশের পাখির মত

অগণন,

যারা ভীরু, যারা বীর

যারা নিরক্ষর,

যারা শিক্ষিত

যারা শিশুর মত সরল

যারা ধবংস করে

যারা সৃষ্টি করে

কেবল তাদেরই জীবনকথা মুখর আমার গানে।

আর যা কিছু

ধরো, আমার জেলের দশটা বছর

ওসব তো কথার কথা ।।