Home » শিল্প-সংস্কৃতি » চলচ্চিত্রের সীমান্ত পারাপার (প্রথম পর্ব)

চলচ্চিত্রের সীমান্ত পারাপার (প্রথম পর্ব)

মিহির ভট্টাচার্য

LAST 6বিশ্বায়নের এই মহালগ্নের মধ্যগগনে সুঁচ থেকে শুরু করে উড়োজাহাজ পর্যন্ত যেখানে দেশ থেকে দেশান্তরিত হয়, সেখানে চলচ্চিত্রের মতো একটা শিল্পমাধ্যমের সীমান্ত পাড়ি দেয়া কোনো বিষয় নয়। একটা পণ্য যখন সীমান্ত অতিক্রম করে তার সঙ্গে শুধু সেই পণ্যই অতিক্রম করেনা তার সঙ্গে সেই পণ্যের সমাজ, সংস্কৃতি, রুচি, কৃষ্টি সবই একযোগে পার হয়। ভাতেমাছে বাঙালি এখন অনায়াসে বার্গার, চিকেনফ্রাই, পিৎজা সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। আধুনিক এলিট শ্রেণীর যুবকযুবতীদের দেখে বোঝার উপায় নেই তারা ‘ইস্টার্ন নাকি ওয়েস্টার্ন’। তাদের আধো আধো বাংলাইংরেজি মিশেলের কথাবার্তা আমাদের বিড়ম্বনায় ফেলে দেয় তারা কোন ভাষাভাষির মানুষ। সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান অবশ্যই একটা ভালো বিনিময়। কিন্তু একতরফা আদান বা প্রদান কখনোই গ্রহণয্যো হতে পারেনা। একতরফা গ্রহণ নিজের সাংস্কৃতিক, অভ্যাস, রুচি, ঐতিহ্য ইত্যাদিকে শুধু ভুলিয়ে দেয়না, সেই সঙ্গে বাজারের মতো বৃহৎ আর্থিক আয়ের পথও রুদ্ধ করে দেয়। চলচ্চিত্রের মতো বৃহৎ শিল্পের ক্ষেত্রে তা আরো ভয়াবহ রূপ নেয়। ‘বিশ্বায়ন ভাবনাদুর্ভাবনা’ নামে প্রকাশিত বিশ্বায়নের উপর ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও চলচ্চিত্র বিশ্লেষক মিহির ভট্টাচার্য বেশকিছু প্রবন্ধগুচ্ছ ছাপা হয়। চলচ্চিত্রের সীমান্ত পারাপারারের উপরও বিশ্লেষণী একটি প্রবন্ধ তিনি লিখেছেন। সেই দীর্ঘ প্রবন্ধের বিশেষ বিশেষ উল্লেখযোগ্য অংশ ধারাবাহিকভাবে পুনঃপ্রকাশিত হলো

ঐতিহাসিক নানা প্রক্রিয়ায় মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ ঘটে: বাণিজ্য, ধর্মবিস্তার, যুদ্ধ, অধিকার, পরিযান, জ্ঞান বিনিময়, কুটনৈতিক ও বৈবাহিক সম্পর্ক ইত্যাদি। ধরে নেয়া হয় যে প্রাকআধুনিক এবং আধুনিক যুগে মানুষের সঙ্গে মানুষের পরিচয় হলে তারা পরস্পরকে গল্প শোনাবে, লিখিত পাঠ এবং ছবি বিনিময় করবে, আবার একে অন্যকে এনে দেবে নাচ গান নাটক ক্রিয়াকর্ম শিল্পকলা যাদু চিকিৎসা বিজ্ঞান শাস্ত্র ইত্যাদির সম্ভার। এইসব জাগতিক এবং প্রতীকী বিনিময়ের জন্য দরকার নানা প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন। যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে, গরীব শ্রমজীবী বা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে, এরকম আদানপ্রদান হতে পারে। ঐতিহ্য এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘস্থায়ী পরস্পরায় কল্পনা করা যায় সাধারণ মানুষের নিরন্তর অংশগ্রহণ, সেখানে তারা একাধারে কথক, শ্রোতা, শিল্পী, দর্শক, বার্তাবহ, বিশেষজ্ঞ, পাঠক, প্রহরী, দোভাষী, সমালোচক ইত্যাদি। এই সব ভূমিকা সর্বদা বিভাজিত বা পেশাদারী হচ্ছে না, নিরন্তর বদল হচ্ছে। যিনি গল্প বলেন, পরের বারে তিনি শ্রোতা,কখনো বা সমালোচক। একজন গরীব চাষী তীর্থযাত্রায় গিয়ে যেসব গল্প শুনে এসেছে সেগুলো নিজের মত করে সে তার ঝুলিতে ভরে নিয়েছে, পরে গ্রামের লোককে সেই সব গল্প শুনিয়েছে। যে তরুণীর বিয়ে হয়েছে দূরের জনপদে, সে তার সঙ্গে নিয়ে গেছে গান, গল্প, খেলাধূলা আর রসিকতা, সেগুলি প্রসারিত হয়েছে তার প্রতিবেশী আর সন্তানদের মধ্যে। এই অভিজ্ঞতা কোন গ্রামীণ স্বর্গরাজ্যের অন্তর্গত নয়, ‘অর্গানিক কমুনিটি’ বা ‘মির’ এখানে কল্পিত হয়নি। গরীব মানুষের মধ্যে যে সাংস্কৃতিক প্রসারণ চলে সেখানে লেখকের স্বাক্ষর ব্যতিরেকেই ঘটে পাঠ্যের নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ, সঞ্চয় এবং চলন। এক সংস্কৃতি থেকে অন্য সংস্কৃতিতে এই পরিচয়হীন পরিগমনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো লোককথা। রামের গল্প সীমান্ত পেরিয়ে চলে কারণ মানুষ এই গল্প ভালোবেসেছে, সংগ্রহ করেছে, নতুন করে বলেছে ; প্রজন্ম পরস্পরায় তৈরি হয়েছে নতুন পাঠ, ভিন্ন গড়ন। কোন গল্প বা গান বা নাটক যে পথ বেয়ে চলে এসেছে সেগুলো হয়তো পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আর লভ্য নয়, কারণ প্রসারণের পদ্ধতি নিয়ে সমষ্টির কোন মাথাব্যথা নেই; এই প্রবাহ চলে প্রকাশ্য প্রত্যক্ষতায়, মানুষ থেকে মানুষের কাছে। জনগণই ঠিক করে নেয় কেন কীভাবে কোন্ গল্প বা গান বা নাটক কোন গন্তব্যে কত দিন পৌঁছবে। এই যাতায়াতের আমি নাম দিয়েছি অধিসাংস্কৃতিক।

বিপরীত এক দুর্বোধ্য পরিবহন আছে, যার কলকব্জা আমাদের নজরের বাইরে, এবং যার বৃহৎ ও জটিল কর্মকান্ড মানুষের সঙ্গে মানুষের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক এড়িয়ে চলে। ‘টাইটানিক’ নামে যে কাহিনী চিত্রটি ১৯৯৭ সালে মুক্তি পায় তার পিছনে ছিল পুঁজি, মানবসম্পদ, প্রযুক্তি এবং সংগঠনের এক বিপুল সমাবেশ; শয়ে শয়ে সিনেমাহলে এর মুক্তি হয় যুক্তরাষ্ট্রে এবং হাজার হাজার প্রিন্ট বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়া হয় অনতিবিলম্বে। ছবি তৈরি হবার আগেই এর প্রচারযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। বড় বাজেটের ছবির ক্ষেত্রে আজকাল এভাবেই বিজ্ঞাপন এবং প্রচারে টাকা ঢালা হয়। টিশার্ট, খেলনা, স্মরণিকা ইত্যাদি সম্পর্কিত জিনিস তৎক্ষণাৎ বিকোতে শুরু করে। ছাপা এবং বৈদ্যুতিন মাধ্যমে তারকাদের প্রতিমা নির্মাণ বিবর্ধিত হয়। বাজারে পৌঁছবার অনেক আগেই স্থিরচিত্র, প্রাক দৃশ্য, গুজব ইত্যাদির মাধ্যমে বিক্রয়যোগ্য পণ্যটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় মানুষের মাঝে। এভাবেই তৈরি করা হয় অভাব, সূত্রপাত ঘটে আকাঙ্খার, নির্মিত চাহিদাকে বানিয়ে দেওয়া হয় উন্মত্ততা। দর্শকপূর্ণ প্রেক্ষাগৃহ এবং ডিস্ক্ ও ক্যাসেটের বিপুল বিক্রি থেকে বোঝা যায় যে দর্শকের কাছে একটি পাঠ্যকে পৌঁছে দেবার জন্যে এই বিশাল যন্ত্রজাল কতখানি কার্যকর। সিনেমা, টেলিভিশন অনুষ্ঠান, উপন্যাস ও তাৎক্ষনিক বিষয়ের ছাপা বই, পত্রিকা, জনপ্রিয় সংগীত ইত্যাদি পণ্যের বিস্তার এই নিয়মেই ব্যাখ্যা করতে হয়। বিশ্বব্যাপী এই বাজারের কেনাবেচায় রাষ্ট্রীয় সীমান্ত বা প্রাকৃতিক বিঘ্ন পাঠ্যের প্রসারণে গুরুত্বহীন। বাজারি ব্যবস্থার শক্তি এতটাই যে বলিষ্ঠ খেলোয়াড়েরা সব সময় দর্শকদের কাছে তাদের প্রদর্শন পৌঁছে দেবে। এই যাতায়াতের আমি নাম দিয়েছি ‘অধিজাতিক’।

এখানে যে প্রথিত মূল্যায়ন আছে সেটি পরিষ্কার করে স্বীকার করা উচিত। প্রস্তাব করা হচ্ছে যে অধিজাতিকের উপরে থাকবে অধিসাংস্কৃতিক। অবশ্য প্রথমেই সতর্কবাণী উচ্চারণ করা উচিত দুটি বিষয়ে। একটি হচ্ছে অতীত বিষয়ে অসহ্য রকম যান্ত্রিক স্মৃতিমেদূরতা, যার সঙ্গে তুলনীয় প্রাচীন বনাম নবীনের অন্তহীন নাটকে বয়স্কের ভঙ্গুর বড়াই। অন্যটি হল বিপরীতের প্রতি তুমুল আকর্ষণ গ্রামের জন্য শহরের আকাঙ্খা, দূরাঞ্চলের জন্য রাজধানীর, আধ্যাত্মিকের জন্য জাগতিকের, সমষ্টিকের জন্য ব্যক্তিকের, জনতার জন্য বিশিষ্টের। মনে রাখতে হয় যে আজকের দিনে বাণিজ্যের বিরুদ্ধে সৃজনশীলতাকে পবিত্র আখ্যা দিয়ে দাঁড় করিয়ে দেওয়াটা আর চলেনা, বিশেষ করে যখন বেনজামিন বহুদিন আগেই ‘ অনন্য’ শিল্পকর্মের ‘দ্যুতি’ যে আসলে ফাঁকি সেটা প্রমাণ করে দিয়েছেন (Walter Benjamin, ` The work of Art in The Age of Mechanical Reproduction’, Illuminations, 1973)। কাজেই বাণিজ্যিক অধিজাতকের উপরে জনজাত অধিসাংস্কৃতিকের স্থান নির্দিষ্ট করে দেওয়াটা গ্রাম্য রোমান্টিকতা বা একনিষ্ঠ সৃজনের যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা যাবেনা। মার্কস অতিরিক্ত মূল্যের আলোচনায় যখন সৃজক শ্রম এবং অসৃজক শ্রমের তফাৎ করতে গিয়ে জন মিলটনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’ নিয়ে সকৌতূক মন্তব্য করেন যে, পান্ডলিপি শেষ হবার পর সেটি ছিল অসৃকজ শ্রমের উদাহরণ। কিন্তু যেমনি সেটি প্রকাশকের কাছে পাঁচ পাউন্ডে বিক্র করা হল তেমনই সেটি হয়ে গেল সৃকজ শ্রমের প্রতিস্থাপক, ব্যবহারিক মূল্য রূপান্তরিত হল বিনিময় মূল্যে, তখন আমরা সাংস্কৃতিক পাঠ বিষয়ে অতিরিক্ত তত্ত্বের একটি সূত্র পেয়ে যাই, যা হল মার্কসীয় অর্থনীতির গূঢ় তাৎপর্যের উপরি পাওনা (Karl Marx, Theories of Surplus Value, Part-1, Progress Publishers, 1963, p.401)। যে পাঠক বাণিজ্যিক নিয়মে মুদ্রিত এবং বিতরণ কবিতা পড়বে তার পাঠ্য কম ‘পবিত্র’ বা ‘খাঁটি’ কেন হবে অমুদ্রিত পান্ডুলিপির তুলনায় ?

(চলবে…)