Home » অর্থনীতি » তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (অষ্টম পর্ব)

তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (অষ্টম পর্ব)

সৌদি আরবের অস্ত্র আমদানির আরও খবর

LAST 5আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার সাথে তেল সম্পদের অর্থের একটি গভীর সখ্যতা রয়েছে। একটি অপরটিকে টিকিয়ে রাখে। আর পরস্পরের ঘনিষ্ঠ দুই ব্যবসার কুশীলবরা। এই ব্যবসার নেপথ্যে রয়েছে ঘুষ, অর্থ কেলেঙ্কারিসহ নানা ভয়ঙ্কর সব ঘটনাবলী। এরই একটি খন্ডচিত্র প্রকাশ করা হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। প্রভাবশালী দ্য গার্ডিয়ানএর প্রখ্যাত দুই সাংবাদিক ডেভিড লে এবং রাব ইভানসএর প্রতিবেদন প্রকাশের পরে এ নিয়ে বিস্তর আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। এ সংখ্যায় ওই প্রতিবেদনের বাংলা অনুবাদের (অষ্টম পর্ব) প্রকাশিত হলো। অনুবাদ: জগলুল ফারুক

অন্যান্য সময়েও আমরা বিভিন্ন দালালের মাধ্যমে এসব কাজ করেছি এবং যুবরাজ আবদুল্লাহ যেভাবে চেয়েছেন সেগুলোও সেভাবেই নিষ্পন্ন হয়েছে। যাই হোক, বিপুল অংকের এ ব্যবসাটি রাজ পরিবারের অন্যান্য সদস্যকেও লোভাতুর করে তোলে। তারা এটিতে তাদের নিজেদের পছন্দের দেশ, যেমন যুক্তরাষ্ট্র এবং ফ্রান্সকেও অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়ার আহ্বান জানান। শেষ পর্যন্ত অবশ্য কাজটি যুক্তরাষ্ট্রই পায়। তবে সাফিল্ড পার্শ্ববর্তী কুয়েতে একটি ব্যবসা বাগাতে পেরেছিল। ঘুষের বিরুদ্ধে কুয়েতে একটি জংলি আইন বলবত ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতও জানতেন সেই আইনকে কীভাবে বুড়ো আঙ্গুল দেখাতে হয়। তিনি জানতেন, ভিকারস কোম্পানী তাদের প্রতিটি ব্যবসার জন্য ঘুষ প্রদান করত এবং সে ঘুষের টাকা ভাগ হতো জেনারেল মুবারক, আবদুল্লাহ আলি রেজা এবং খালাফের মধ্যে। মোহাম্মদ খালাফ লন্ডনের কুয়েতি সামরিক বাহিনী বিষয়ক অফিসের দায়িত্বে ছিলেন। জেনারেল মুবারক ছিলেন কুয়েতি সেনাবাহিনী প্রধান। আর আবদুল্লাহ আলি রেজা ছিলেন সৌদি কুয়েতি ব্যবসায়ী। দালাল হিসেবে তার বেশ নামডাক ছিল।

আলি রেজা এবং মিলব্যাংক টেকনিক্যাল সার্ভিসেসকে কাজে লাগিয়ে সাফিল্ড পরবর্তীতে ১০ কোটি পাউন্ড মূল্যের একটি শিফটেইন ট্যাংক বহর বেচেছিলেন। এর জন্য তাকে ৩৫ লাখ পাউন্ড ঘুষ প্রদান করতে হয়েছিল।

তবে সাফিল্ড সৌদি আরবেই তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যবসাটি করতে পেরেছে। বিএই’র সাথে সৌদি আরব যুদ্ধবিমান ক্রয়ের যে চুক্তিটি করেছিল সেটি তার তত্ত্বাবধানেই সম্পন্ন হয়। চুক্তিটির মেয়াদ ইতোমধ্যেই এক প্রজন্মকাল পার হয়ে এসেছে এবং এ চুক্তির আওতায় সৌদি আরবকে যুদ্ধ বিমান বহর সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে।

সৌদি আরবে বিএই’র কর্মকাণ্ড

বিএই সৌদি রাজপরিবারের সাথে বড় আকারের তিনটি চুক্তি করেছিল। এ চুক্তি তিনটির কারণেই ব্রিটেনের একমাত্র যুদ্ধ বিমান প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানটি ষাট ও সত্তরের দশকজুড়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকে থাকতে পেরেছিল। প্রাপ্ত নথি থেকে বোঝা যায়, সব চুক্তিতেই দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হয়েছিল। মার্কিনিরা এ ব্যাপারে শুরুতেই সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিল। তাদের মতে, অস্ত্রের জন্য সৌদিদের অনুরোধ তাদের জাতীয় স্বার্থের বিবেচনায় ছিল না। বরং এক্ষেত্রে ব্যক্তিগত চাপই প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে এবং যারা এ চাপ সৃষ্টি করেছে তারা অস্ত্র ক্রয় থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে। মার্কিন এবং ব্রিটিশ উভয়েরই উচিত সৌদিদের মধ্যে ক্ষুধা জন্ম দেয়ার এ কৃত্রিম পদ্ধতিটি একটু সংযত হয়ে ব্যবহার করা।

কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে হন্যে হয়ে থাকা এদের পর এক ব্রিটিশ সরকার এ কথাটি কোনো দিন আমলেই নেয়নি। সরকারি গোপনীয়তার দোহাই দিয়ে এসব চুক্তিকে সব সময়ই আড়াল করে রাখা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আর্কাইভ থেকে প্রকাশিত তথ্যাদি একত্রে সাজালে প্রকৃত সত্যটি বেরিয়ে আসে।

১৯৬৭ সালে সম্পাদিত এক নম্বর চুক্তি

এ চুক্তির আওতায় বিক্রয় হয়েছিল ৪২টি হালকা জঙ্গি বিমান এবং একটি এইআই রাডার মূল্য ১০ কোটি ৪০ লাখ পাউন্ড (বর্তমান মূল্যে ১১০ কোটি পাউন্ডের সমান)। প্রদত্ত কমিশনের পরিমাণ : কমপক্ষে ৭৮ লাখ পাউন্ড (বর্তমান মূল্যে ৮ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড) কমিশনের হার : ৭ শতাংশ। সরকার : লেবার (হ্যারল্ড উইলসন)। নথিতে দেখা যায় বিএই প্রতিটি হালকা যুদ্ধ বিমানের দাম ৫০ হাজার পাউন্ড বেশি করে দেখিয়েছে। (বর্তমান মূল্যে এর পরিমাণ ৫ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড করে) বাড়তি এ মূল্যকে এজেন্সির খরচ হিসাবে দেখানো হয়েছে। মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে ইয়র্কশায়ারবাসী সাবেক আরএএফ পাইলট জিওফ্রে এডওয়ার্ড নিজের কমিশন বাবদ এখান থেকে ২০ লাখ পাউন্ড আগেই হাতিয়ে নিয়েছিলেন। ব্রিটিশ দূতাবাসও জানত, সৌদি কর্মকর্তাদের বশ করার জন্যই তাকে ভাড়া করা হয়েছিল। দূতাবাস জানায়, বিএই সৌদি কর্মকর্তারা কী পরিমাণ ঘুষ চায় তা জানার জন্য এডওয়ার্ডকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আর্কাইভস থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, ঘুষের এ অর্থ গ্রহণ করেছিলেন সুলতানের দুই ভাই যুবরাজ আহমেদ এবং যুবরাজ তুর্কি। এছাড়া যুবরাজ খালিদ এবং যুবরাজ তুর্কি বিন আবদুল রহমান নামে আরও দুজন কনিষ্ঠ যুবরাজও এ ঘুষের ভাগ পেয়েছিলেন। তবে এডওয়ার্ড নিজেই জানিয়েছেন, তিনি ওই কমিশনের অর্থের অর্ধেকটাই সুলতানের অন্য এক ভাই যুবরাজ আবদুল রহমানকে প্রদান করার ব্যাপারে অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিলেন। তাছাড়া তিনি সৌদি রাজপরিবারের চিকিৎসকের পুত্র গেইথ ফেরাউনের হাতে নগদ ৮০ হাজার পাউন্ড তুলে দিয়ে বাদশাহর নেক নজরে আসার চেষ্টা করেছিলেন। এ চুক্তিটিকে সে সময়ে বহির্বিশ্বে ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসেবে অভিহিত করা হতো।

বিএই’র কমিশন প্রদানের প্রথম এই ঘটনাটি যুক্তরাজ্য সরকার সরাসরি তত্ত্বাবধান করেনি। তবে সরকারি কর্মকর্তারা বিষয়টির অনুমোদন দিয়েছিলেন। সরকারের অন্তত তিনটি সংস্থা বিষয়টির ব্যাপারে পুরোপুরিই ওয়াকিবহাল। সংস্থাগুলো হলো আর্থিক রফতানি এজেন্সি, বৈদেশিক মুদ্রা গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ট্রেজারি এবং কর কর্তৃপক্ষসমূহ। বিষয়টি নিয়ে একান্ত মন্তব্যে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বিভাগ বলেছে, কঠিন বাস্তবতা হলো ঘুষ লেনদেন একটি অতি দরকারি ব্যাপার।

লেনদেন নম্বর দুই, ১৯৭৩

১০টি স্ট্রাইকমাস্টার জঙ্গি বিমান এবং বিদ্যমান হালকা জঙ্গি বিমানগুলোর জন্য প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ক একটি সাংগঠনিক কাঠামো ক্রয়। মূল্য ৩৫ কোটি ৩০ লাখ পাউন্ড (বর্তমান মূল্যে ২০০ কোটি পাউন্ড)। প্রদত্ত কমিশন ৩ কোটি পাউন্ডেরও বেশি (বর্তমান মূল্যে ২৪ কোটি পাউন্ড) কমিশনের হার : ১৩ শতাংশ। সরকার : রক্ষণশীল (এডওয়ার্ড হিথ)

সৌদিদের কমিশন প্রদানের ঘটনায় এবারই প্রথম যুক্তরাজ্য সরকার সরাসরি জড়িত নয়। সৌদিরা সরকারের সাথে সরকারের চুক্তির দাবি করেছিল। কারণ তারা বেসরকারি কোম্পানীগুলোর কার্যকলাপ নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সৌদি আরবের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং রিয়াদের কাছ থেকে পাওনা অর্থ বুঝে নেয়। মন্ত্রণালয় এরপর বিএইকে প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে নিয়োগ দেয় এবং এ সময় সম্পাদিত চুক্তিতে সরকারের প্রাপ্য হিসাবে একটি লভ্যাংশের কথা উল্লেখ থাকে। তবে সরকারের লভ্যাংশ কথাটি সৌদি ক্রেতাদের কাছে অনেকটাই অস্পষ্ট থেকে যায়। এ অবস্থায় দাম অনেক বাড়িয়ে দেয়া হয় এবং বিএই সুইস ব্যাংকের বেনামি একাউন্টে কোটি কোটি পাউন্ড পাঠিয়ে দেয়। সরকারি নিরীক্ষক স্যার ডগলাস হেনলির প্রতিবেদনে বলা হয়, মন্ত্রণালয়ের হিসাবের মাধ্যমে পরামর্শক ফি হিসাব জমা পড়া অর্থের পরিমাণ ৩ কোটি পাউন্ড ছাড়িয়ে যাবে। তবে মন্ত্রণালয়ের হয়ে যেসব নিরীক্ষক নিরীক্ষাকার্য চালিয়েছেন তাদের পক্ষে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি কারা এসব অর্থের গ্রহীতা ছিলেন। সুতরাং জমা পড়া ঘুষের অংকের দায়িত্ব সরকারকেই বহন করতে হবে বলে মন্তব্য করেন হেনলি। এবং পক্ষপাতহীন হিসাব বিজ্ঞানের ভাষায় তিনি বলেন, চুক্তিতে কমিশন সংক্রান্ত ধারা সংযোজনের সাথে মন্ত্রণালয়ই জড়িত ছিল।

হোয়াইট হাউসের নিজস্ব আইনজীবীরা লেস্টার সাফিল্ডের অস্ত্র বিক্রেতাদের আচরণকে কিছুটা অনৈতিক আখ্যায়িত করে বলেন, কমিশনের ব্যাপারটি যদি আইনসিদ্ধ এবং ন্যায্য হতো তবে এ সম্পর্কিত কোনো তথ্য গোপন করার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু আইনজীবীদের এ মতামতটি হিনলের কাছে গোপন করা হয় এর সংশ্লিষ্ট অংশটির ওপর। ‘গোপনীয়’ কথাটি লিখে দেয়া হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল এটি রাজস্ব এবং নিরীক্ষা বিভাগের নজরে আনার প্রয়োজন নেই।

চুক্তি নম্বর তিন, ১৯৭৮

হালকা যুদ্ধ বিমান ক্রয়ের ধারাবাহিকতা। মূল্য : ৪০ কোটি পাউন্ড (বর্তমান মূল্যে ১৪০ কোটি পাউন্ড), প্রদত্ত কমিশনের পরিমাণ : ৬ কোটি পাউন্ড (বর্তমান মূল্যে ২১ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড), কমিশনের হার : ১৫ শতাংশ। সরকার : লেবার (জেমস কালাহান)। সাফিল্ড স্থায়ী সচিব স্যার ফ্রাংককুপারকে জানান, এ চুক্তিতে প্রদেয় বিপুল অংকের কমিশনের যে উল্লেখ আছে সেই অংকটির আজকাল সৌদি আরবে দিতে হয় এবং এটিই এখন চল হয়ে দাড়িয়েছে। তবে কমিশনের পরিমাণ এভাবে বাড়তে থাকা নিয়ে তিনি উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, আজকাল বিপুল পরিমাণে কমিশন গুণতে হচ্ছে। ভবিষ্যতের যখন প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত চুক্তিগুলো আরও বেশি উচ্চাভিলাষী হয়ে উঠবে তখন দালালদের দাবিও ভয়ংকর রকম বেড়ে যাবে, যদি না এ ব্যাপারে এখন থেকেই কিছুটা লাগাম কষা হয়।

সাফিল্ডের উদ্বেগ যথার্থই ছিল। তিনি সৌদিদের দেয়া কমিশনের পরিমাণ ৮ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করেছিলেন। তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন বাকি ৫ শতাংশ যেন বিএইএ’র কর্মকর্তাদের লভ্যাংশ থেকে কেটে নেয়া হয়। তার মতে, এটি ঘুষের মাত্রা বাড়তে থাকাকে কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আনবে। কিন্তু তাতে খুব একটা কাজ হয়নি। সৌদিরা বিভিন্ন খাত থেকে ঘুষের মাত্রা বাড়িয়ে যেতে থাকে।

বর্তমান বাজার মূল্যে সৌদি আরবের সাথে বিএইএ’র করা চুক্তি তিনটির আর্থিক পরিমাণ ৪৫০ কোটি পাউন্ড এবং সৌদি রাজ পরিবারসহ অন্যদের দেয়া ঘুষের পরিমাণ ৫০ কোটি পাউন্ড।।

(চলবে…)