Home » আন্তর্জাতিক » বাংলাদেশে চীনের প্রভাব রুখতে ভারতের বন্ধুত্বের কৌশল

বাংলাদেশে চীনের প্রভাব রুখতে ভারতের বন্ধুত্বের কৌশল

আরাফাত কবির

DIS 5প্রতিবেশী দুই রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করার নতুন প্রত্যাশা নিয়ে বাংলাদেশে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফর সমাপ্ত হয়েছে। এ প্রত্যাশা বেড়েছে ঢাকা, নয়াদিল্লি দুই দিকেই। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে তেমন অগ্রগতি না হলেও, ভবিষ্যতে এর শান্তিপূর্ণ সমাধান হবে বলে ঢাকাকে আশ্বাস দিয়েছেন মোদী। শেখ হাসিনার সরকার মোদীর ওপর আস্থা রাখছেন। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সম্মেলনে তিস্তা ইস্যুটি সামান্যই উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে তিনি এ নিয়ে বিব্রত করতে চাননি। আর আপাতত ধৈর্য ধরার সুযোগ ঢাকার রয়েছে। কেননা, বাংলাদেশের সাথে অর্থবহ অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে মোদী স্পষ্ট আগ্রহ দেখিয়েছেন। ভারতের সংসদে অবশেষে সীমান্ত চুক্তি পাস করানোটা ছোট কোনো অর্জন নয়। মোদী একে বার্লিন প্রাচীর পতনের মতো গুরুত্ববহ হিসেবে দেখছেন। সীমান্ত চুক্তি দিয়ে মোদী ঢাকার আস্থা ও সমর্থন অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন, ভারতের দোরগোড়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ন্ত্রণে এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের খুবই প্রয়োজন ছিল।

কয়েক বছর ধরে ভারতবাংলাদেশ সম্পর্ক তিক্ত অধ্যায়ে পূর্ণ ছিল। প্রায়ই এ সম্পর্ককে পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি, ভুল বোঝাবুঝি ও উভয় দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পর বিরোধী আদর্শিক অবস্থান দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা হতো। ২০০৮এ ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনা দিল্লির সাথে সম্পর্কোন্নয়নকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেন। ভারতের তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার তার প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানায়। হাসিনার আওয়ামী লীগ আর ভারতের কংগ্রেসের মধ্যকার ঐতিহাসিক বন্ধন অনেক পুরোনো, যার শেকড় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পর্যন্ত। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সামনের দিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে এ বিষয়টি অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং যখন ঢাকা সফর করেন তখন তার লক্ষ্য ছিল শক্তিশালী সম্পর্ক গঠনের মাধ্যমে হাসিনা সরকারের ইতিবাচক মনোভাবের প্রত্যুত্তর দেয়া। কিন্তু কূটনৈতিক এক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ওই সফর শেষ হয়। ভারতের গুরুত্বপূর্ণ এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের তীব্র বিরোধিতার কারণে (পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী) মনমোহন সিং ঢাকার অনেককে হতাশ রেখে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর না করেই ফিরে যান।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে চড়াই উৎরাই অব্যাহত থাকে ঢাকা ও নয়াদিল্লির। এদিকে, চীনবাংলাদেশ বন্ধুত্ব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জোরদার হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক যখন বাংলাদেশের সব থেকে বড় অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল তখন বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল হাসিনা সরকার। তখন সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল চীন। দেশটি অব্যাহতভাবে বাংলাদেশে অন্যতম বড় একটি উন্নয়ন অংশীদার। এদিকে বাংলাদেশ চীনা অস্ত্রের অন্যতম বড় ক্রেতা রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। চীনের কাছ থেকে সাবমেরিন কেনার খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল বাংলাদেশ নৌবাহিনী। পরে দিল্লি তাদের লবিং জোরদার করে ঢাকাকে চীনের কাছ থেকে সাবমেরিন কেনা থেকে নিরুৎসাহিত করেছিল বলে খবর আসে। ঢাকায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের পাশাপাশি নিকটবর্তী সমুদ্রসীমায় চীন নির্মিত সাবমেরিন ঘুরে ফিরে বেড়ানোয় ভারতের অস্বস্তি সহজেই বোধগম্য হয়। এ কারণে মোদী সরকার আরও কিছু প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে যা সানন্দে গ্রহণ করেছে ঢাকা। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়নে ঋণ এবং ব্যবসাবাণিজ্য জোরদার বিস্তৃত আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনের আশ্বাস। ভারত তাদের বর্তমান বিদ্যুৎ রপ্তানি ৫০০ মেগাওয়াট থেকে ১১০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করতে সম্মত হয়েছে। এর পাশাপাশি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোয় সহায়তা করতে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করবে। এ ছাড়া নেপাল ও ভুটানের উদ্বৃত্ত পানি বিদ্যুৎ আমদানি করার সুযোগও থাকছে হাতের নাগালে। কেননা নিজ ভূখের ওপর দিয়ে দেশ দুটিতে যোগাযোগের সুযোগ দিচ্ছে ভারত। স্পষ্ট অনুপ্রাণিত ঢাকা এরপর ভারতের উদারতার প্রত্যুত্তরে উদারমনা একাধিক সুযোগ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারতের উত্তরপূর্ব রাজ্যে ট্রানজিট, চট্টগ্রাম ও মংলাবন্দরে ভারতীয় কার্গো আসার সুযোগ আর ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক জোন যা কিনা দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের জন্য প্রথম। বাংলাদেশের ভূখের ওপর দিয়ে ভারতের সেভেন সিস্টার্স বা সাত রাজ্যে ট্রানজিটের জন্য দিল্লির অনুরোধ দীর্ঘদিনের। কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সংবেদনশীলতার কারণে কোনো বাংলাদেশী সরকার এমন প্রস্তাবে সম্মত হতে রাজি হয়নি। এমনকি ’৯০এর দশকের শেষের দিকে প্রথম মেয়াদের হাসিনা সরকারও নয়। বাংলাদেশে সমুদ্রবন্দরগুলোতে প্রবেশলাভের ভারতীয়দের জন্য অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে বিরাট সুবিধাজনক। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ট্রানজিটের অর্থ হলো ভারত তাদের উত্তরপূর্বে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে সময় ও ব্যয় উভয়ই কমিয়ে আনতে পারবে। এটা নিশ্চিতভাবে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর উপকারে আসবে যাদের ওই সব রাজ্যে বড় ধরনের অবস্থান রয়েছে। কৌশলগত দিক থেকে ভারত চট্টগ্রামেও যাতায়াত সুবিধা পাবে যেখানে চীন গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রস্তাব দিয়ে আসছে। এভাবেই বাংলাদেশ সফর মোদীকে একাধিক কৌশলগত অর্জন এনে দিয়েছে। তবে ভারতের এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, বিদ্যমান অনেক ইস্যু রয়েছে যেগুলো জরুরিভিত্তিতে আমলে নেয়া প্রয়োজন। যেমন অবৈধ সীমান্ত পারাপারের ক্ষেত্রে ভারতের দেখামাত্র গুলি করার নীতি, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা এবং অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টন অধিকারগুলো নিশ্চিত করা। এটাও সত্যি যে, স্থল সীমান্ত চুক্তির জন্য মোদী সরকারকে অনেক খাটতে হয়েছে। হাজার হলেও, সেই ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের সাথে সমঝোতা হওয়া একটি চুক্তি অবশেষে পাস করানোর জন্য আইন প্রণেতাদের সম্মত করানোটা সহজ কাজ ছিল না। কাজেই এটা আশ্চর্যের কিছু নয় যে, ঢাকা মনে করে মোদীর মাঝে তারা একজন মিত্র খুঁজে পেয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ের জন্যই স্থলসীমান্ত চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। এ চুক্তির ফলে দু’দেশ সীমান্তের উভয় পাশে অবস্থিত টুকরো টুকরো জমিগুলো বিনিময় করতে পারবে। ছিটমহলগুলোতে বসবাসাকরী কার্যত রাষ্ট্রহীন মানুষগুলো এখন তাদের নাগরিকত্ব বেছে নিতে পারবে। কিন্তু এতে দিল্লির জন্য অতিরিক্ত একটি কূটনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। দীর্ঘ দিনের এ ইস্যুটির শান্তিপূর্ণ সমঝোতা বেইজিংকে বার্তা পাঠাবে যে মোদী চীনের সাথে তাদের সীমান্ত বিরোধ মিটিয়ে ফেলতে গঠনমূলক আলোচনায় বসতে আগ্রহী। মোদী তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে সার্কভুক্ত রাষ্ট্র প্রধানদের আমন্ত্রণ জানানোর মধ্য দিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্কোন্নয়নে তার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এরপর তিনি তার ‘প্রতিবেশী প্রথম নীতি’র কথা বলেছেন। বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন, ভারতের ‘বড় ভাই’য়ের ভাবমূর্তি পাল্টাতে এটা অনেক প্রয়োজনীয় একটি নীতিগত পরিবর্তন। ‘বড় ভাই’ ভাবমূর্তির ধারণাটি বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় রয়েছে। পরস্পর সংযুক্ত বা ইন্টারকানেক্টেড প্রতিবেশী এলাকা গঠনে মোদীর উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে তার কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সফলতা নির্ভর করবে ভারত তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে কতটা সুযোগ সুবিধা দিতে ইচ্ছুক তার ওপর। এ লক্ষ্যে চলার পথে ভারত যদি হোঁচট খায়, তাহলে বেইজিং দ্রুতই পরিস্থিতি পাল্টে নিজেদের জন্য সুবিধাজনক করে নেবে। এমন ইঙ্গিত স্পষ্ট ছিল তিস্তা নিয়ে চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সিনহুয়ার প্রতিবেদনে। এর শিরোনাম ছিল – ‘বাংলাদেশকে তৃষ্ণার্ত রেখে সফর শেষ করলেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী’।।

(ফোর্বস এশিয়া ম্যাগাজিন থেকে অনুবাদ)