Home » আন্তর্জাতিক » মিয়ানমারের উপরে জোরালো কূটনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা উচিত :: শাফকাত মুনীর

মিয়ানমারের উপরে জোরালো কূটনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা উচিত :: শাফকাত মুনীর

LAST 1শাফকাত মুনীর, নিরাপত্তা বিষয়ক প্রভাবশালী গবেষণা সংস্থাবাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অফ পিস এ্যন্ড সিকিউরিটি স্টাডিজএর এসোসিয়েট রিসার্স ফেলো এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক। মিয়ানমার কর্তৃক বিজিবি’র সদস্যকে ধরে নিয়ে যাওয়া, তাকে ফেরত না দেয়া ও বাংলাদেশের করনীয় এবং দু’দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন আমাদের বুধবারএর সাথে।

আমাদের বুধবার : মিয়ানমার বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি’র একজন সদস্যকে ধরে নিয়ে আটকে রেখেছে। তাকে ফেরত দেয়া হচ্ছে না। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশমিয়ানমার সম্পর্ককে আপনি কিভাবে বিশ্লেষণ করছেন?

শাফকাত মুনীর : মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের যে ঘটনাটি চলছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কর্তব্যরত অবস্থায় বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি’র সদস্যকে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীরা ধরে নিয়ে গেছে। এক সপ্তাহ অতিবাহিত হওয়ার পরেও তাকে ফেরত দেয়ার ব্যাপারে কোনো দৃশ্যমাণ অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ওই দেশটির পক্ষ থেকে আশ্বাস দেয়া হয়েছে বলে বিজিবি’র কর্মকর্তারা বলছেন, কিন্তু তাকে ফেরত দেয়া হবে বা হচ্ছে এমন কোনো সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি এখনো আমরা দেখতে পাচ্ছি না। এই বিষয়টি মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের সম্পর্কে অনেকদিন ধরে টানাপোড়েন চলছে। এই টানাপোড়েনের পেছনে রয়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যাসহ অন্যান্য কিছু কারণ। তাছাড়া মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির যে নানা বিষয়আশয় রয়েছে তাও প্রভাবক হিসেবে এখানে কাজ করছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যাটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হিসেবেই দাড়িয়েছে। সে কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুকে বাংলাদেশের উপর চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা বারবার মিয়ানমার সরকারের দিক থেকে দেখতে পাচ্ছি। আবার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ ও ফেরত পাঠানোর (পুশ ব্যাক) নীতি, সব মিলিয়েই একটি ঘোলাটে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এরই প্রতিফলন আমরা দেখেছি গত বছর যখন আরেকজন বিজিবি সদস্যকে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীরা ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে এবং তার মরদেহ অসম্মানজনকভাবে ফেরত দেয়া হয়। এবারও আমরা দেখছি একজন বিজিবি সদস্যকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং এখনো পর্যন্ত তাকে ফেরত দেয়া হয়নি। এসব কিছুকেই বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো অবকাশ নেই। সম্পর্কের মাত্রাটা কতোটা খারাপ হয়ে গেলে এই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

আমাদের বুধবার : এক্ষেত্রে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দুর্বলতার কথা বলা হচ্ছে। আপনার কি মনে হয়?

শাফকাত মুনীর : বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কিছু দুর্বলতা রয়েছে। যেমন মিয়ানমার সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এবং ধারণার বিশাল এক ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশের শুধুমাত্র দুটি সরাসরি প্রতিবেশী রাষ্ট্র রয়েছে, একটি ভারত অন্যটি মিয়ানমার যাদের সঙ্গে রয়েছে আমাদের অভিন্ন সীমান্ত। কিন্তু মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা কতোটা জানি? মিয়ানমার সরকারের উপরে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর যে চাপ ও সব কিছু মিলিয়ে রাজধানী নেপিডো’র উপরে যে বিশাল চাপের সৃষ্টি হয়েছে এবং সামগ্রিকভাবে সেখানে যে একটি উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজমান রয়েছে এসব বিষয়গুলোকে কি আমরা পারস্পরিক সম্পর্কের নিরীখে মূল্যায়নে নিয়েছি? এসব বিষয়গুলো নিয়েই সব সময় প্রশ্নগুলো উঠে আসে। আমরা বিচলিত এই কারণে যে, এখনো পর্যন্ত আমরা অপহৃত বিজিবি সদস্যের দেশে ফেরাকে নিশ্চিত করতে পারিনি।

আমাদের বুধবার : তাহলে কি আপনি বলতে চাইছেন আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্যহীনতা এবং সঙ্কটের পরিস্থিতি রয়েছে?

শাফকাত মুনীর : পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে প্রায়শই ভারসাম্যহীনতার কথা উঠে আসে। এটা বলতে কোনো দ্বিধা নেই যে, ভারতের ব্যাপারে গুরুত্বটি বেশি থাকবে, কিন্তু মিয়ানমার যেহেতু আরেকটি সরাসরি প্রতিবেশী দেশ সে কারণে ওই দেশটির ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টি আরও নিবদ্ধ করা প্রয়োজন ছিল। আরও যা প্রয়োজন ছিল তা হচ্ছে এই যে, সম্পর্কটিকে কিভাবে খারাপ পর্যায় থেকে উন্নততর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়, সে লক্ষ্যে প্রচেষ্টা গ্রহণ। পুরো বিষয়টিই যে গুরুত্বপূর্ণ তা আমাদের অনুধাবন করা উচিত ছিল। একটি কথা বলতেই হচ্ছে, আশা করি নায়েক আবদুর রাজ্জাককে আমরা ফেরত পাবো, তবে তার পরেও যে মিয়ানমারের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকবেনা তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

আমাদের বুধবার : তাহলে বাংলাদেশের কি করা উচিত বলে আপনি মনে করছেন?

শাফকাত মুনীর : এই মুহূর্তে মিয়ানমারের উপর খুব জোরালো কূটনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা উচিত বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। সাথে সাথে জনগণকে আস্থায় নিয়ে আমাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি জরুরি। তবে এটি করা হচ্ছে কি হচ্ছে না তাও স্পষ্ট নয়। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আমরা আরও তথ্য চাই এ বিষয়ে অধিকতর অবহিত হওয়ার জন্য। আমরা জানতে চাই ঠিক কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। তাছাড়া চলমান ঘটনার পরিসমাপ্তির পরে বাংলাদেশের উচিত মিয়ানমারের সাথে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সমস্যাবলী সম্পর্কে সামগ্রিকভাবে সুস্পষ্ট একটি সংলাপ অনুষ্ঠান করা। এর উদ্দেশ্য হবে আমাদের মধ্যে বিদ্যমান কি কি সমস্যা রয়েছে এবং কিভাবে আমরা তা সমাধান করতে পারি। সেই সাথে মিয়ানমারকে আমাদের এটাও বোঝাতে হবে যে, ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা ঘটলে তার প্রতিক্রিয়াটি হবে ভিন্ন। এই বিষয়টিও আমাদের মনে রাখতে হবে যে, মিয়ানমারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অন্য দশটি দেশের মতো নয়। তারা আশ্বাস দিলেও সত্যিকার সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের দ্বৈতনীতি বা দ্বিমুখী মনোভাব সক্রিয় থাকে। এর প্রমাণ আমরা বারবার পেয়েছি, আর এটিও আমাদের জন্য একটি বড় অন্তরায়।

আমাদের বুধবার : আপনাকে ধন্যবাদ।।