Home » আন্তর্জাতিক » রাজনৈতিক ফায়দা ও বাড়াবাড়িতে ক্রিকেট যেন বিপথগামী না হয়

রাজনৈতিক ফায়দা ও বাড়াবাড়িতে ক্রিকেট যেন বিপথগামী না হয়

LAST 2সামগ্রিকভাবে কূটকৌশলে, নিজেদের ফায়দা লোটার জন্য দুর্ভাগ্যজনকভাবে যে বিভক্তির সৃষ্টি করা হয়েছে ও হচ্ছে আজ সে বিষয়ে আমাদের মনোযোগী হবার সময় এসেছে। রাজনৈতিক বাড়াবাড়িতে ক্রিকেট যেন বিপথগামী না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। রাজনৈতিক ফায়দা নিতে গিয়ে আমরা আমাদের অনেক সোনালি ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে ফেলেছি। তাই ক্রিকেটের সাফল্যকে রাজনৈতিক পুঁজি করার প্রবণতা, নিজেদের কৃতিত্ব হিসেবে জাহির করা, ক্ষমতায় থাকার সুযোগকে কাজে লাগানোর লোভ সংবরণ করতেই হবে।

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

রাজনৈতিক সংঘাতসহিংসতাঅস্থিরতা, অসহিষ্ণুতা, বাড়াবাড়ি, দমনপীড়ন, অর্থনৈতিক মন্দা, দুর্নীতি, দলাদলি, মারামারি, পারস্পরিক অশ্রদ্ধাসর্বমুখী স্থবিরতা, জটিলতা, কেলেঙ্কারি বাংলাদেশকে আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে রেখেছে। ক্রমাগত হঠকারিতা, নৈরাজ্য, দায়িত্বহীনতা, একগুঁয়েমিতে প্রচআশাবাদী মানুষটির মনেও সংশয় দানা বাঁধতে বাধ্য। টানেলের ওপাশের মিটিমিটি আলো ক্রমাগত ম্লান হতেই দেখা যাচ্ছে। আলাদিনের জাদুর চেরাগও এই গভীর গর্ত থেকে আমাদের বের করতে পারবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

এমন এক পরিবেশেই বাংলাদেশের মানুষ আনন্দে ফেটে পড়েছে। ক্রিকেটে পাকিস্তানের পর ভারতকে হারানোর গৌরবে প্রতিটি মানুষ নিজেকে শরিক করেছে। দেশের প্রতিটি কোণে এক সুর শোনা গেছে। সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মুস্তাফিজকে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত সবাই আপন করে নিয়েছে। ক্রিকেটদল দেখিয়ে দিয়েছে, আমরাও পারি। যারা মনে করেছিল বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পারফরমেন্স নিছকই ফ্লুক, তাদের কাছে জবাব ছিল পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করা। আবার যারা বলছিল, ইনজুরি এবং নানা বিতর্কে জর্জরিত পাকিস্তান তাদের সেরা দল পাঠাতে পারেনি, তাদের মুখ বন্ধ হয়েছে ভারতের দুর্ধর্ষ দলকে বিধ্বস্ত করার মাধ্যমে।

বাংলাদেশের মানুষ এখন এই একটা বিষয়ে আশাবাদী। এই বিন্দুতে এক হতে পারে। ক্রিকেটে বাংলাদেশের জয়ের দিনেই কেবল পুরো দেশ একসাথে বিজয়োল্লাসে ফেটে পড়তে পারে। প্রধানত রাজনৈতিক ইস্যুতেই মূল বিভক্তি। বাংলাদেশে বিভক্তি এত বেশি যে, রাজনীতির প্রভাব পড়েছে সংস্কৃতি কিংবা অন্য ইস্যুতেও, আর একারনে একবিন্দুতে কোনো দিনও সবাইকে এক করতে পারা যায়না। ওইসব বিষয়েও প্রবল মতানৈক্য দেখা যায়। এমন বিভক্তি অন্য কোনো দেশে আছে কি না সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতিটি দাড়িয়েছে এমন যে, ক্রিকেটে জয়ের দিনে সবাই একসাথে রাজপথে নামতে পারে। ক্রিকেট নিয়েই ছেলেমেয়ে, মাবাবা, পাড়াপড়শী এক সমতলে দাড়াতে পারে, কথা বলতে পারে, চায়ের কাপে সমঝোতা হতে পারে। অথচ সমগ্র দেশ এক সাথে, একসুরে গাইতে পারে গান, তুলতে পারে শ্লোগান বিজয়ে এমনটা আমাদের ইচ্ছাকৃতভাবে, কৌশলে, নিজস্বার্থে ভুলিয়েই দেয়া হয়েছিল এতদিন।

ক্রিকেটই বাংলাদেশের মানুষকে আনন্দ করার সুযোগ করে দিয়েছে। প্রশ্ন ওঠতে পারে, ক্রিকেট খেলে কয়টা দেশ? টেস্ট প্লেয়িং দেশের সংখ্যা মাত্র ১০টি। এর মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ডের মতো দেশে ক্রিকেট প্রথম খেলা নয়। তারা ফুটবল, রাগবিকেও সমান গুরুত্ব দেয়। কেবল উপমহাদেশের চারটি দেশেই ক্রিকেট বলা যায় একমাত্র কমন খেলা। অলিম্পিক গেমস, এশিয়ান গেমস ইত্যাদি আন্তর্জাতিক আসরে ক্রিকেট অনুপস্থিত। ক্রিকেট খেলে না মাথায় দেয়, বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষ তা জানে না। নিউ ইয়র্কের রাস্তা দিয়ে ‘ক্রিকেট ঈশ্বর’ শচিন টেন্ডুলকার হেঁটে গেলে (ক্রিকেট দেশগুলোর কোনো লোক না থাকলে) কেউ তার দিকে তাকাবেও না।

এমন এক খেলায় ভালো করার কোনো মূল্য আছে? আছে। বর্তমানে ক্রিকেট যে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, ফুটবল যখন এর চেয়েও বেশি জনপ্রিয়তা ভোগ করত, তখন কি আমরা এভাবে উল্লাস প্রকাশ করতে পারতাম? বিশ্ব বা এশিয়া পর্যায়ে দূরের কথা, উপমহাদেশের দেশগুলো নিয়ে আয়োজিত সাফ গেমস বা সাফ ফুটবলেও কি আমরা সাফল্য পেয়েছিলাম? বারবার আমরা উল্লাসে ফেটে পড়তে চেয়েছি, আমাদের সামর্থ্যও কম ছিল না, কিন্তু পারেনি। সাফ গেমস আর সাফ ফুটবলে আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, তবে অনেক পরে। তখন ফুটবলের সেই জৌলুস অস্তগামী। জয়ের আকর্ষণ নষ্ট হয়ে গেছে।

এখানেই ক্রিকেট এগিয়ে। এ কারণেই ক্রিকেট নিয়ে ভাবতে হবে। সামগ্রিকভাবে কূটকৌশলে, নিজেদের ফায়দা লোটার জন্য দুর্ভাগ্যজনকভাবে যে বিভক্তির সৃষ্টি করা হয়েছে ও হচ্ছে আজ সে বিষয়ে আমাদের মনোযোগী হবার সময় এসেছে। রাজনৈতিক বাড়াবাড়িতে ক্রিকেট যেন বিপথগামী না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। রাজনৈতিক ফায়দা নিতে গিয়ে আমরা আমাদের অনেক সোনালি ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে ফেলেছি। তাই ক্রিকেটের সাফল্যকে রাজনৈতিক পুঁজি করার প্রবণতা, নিজেদের কৃতিত্ব হিসেবে জাহির করা, ক্ষমতায় থাকার সুযোগকে কাজে লাগানোর লোভ সংবরণ করতেই হবে।

ক্রিকেটই বাংলাদেশের মানুষের মনে অতি দরকারি আত্মবিশ্বাসটা সঞ্চার করতে পারে। এটাই পারে নিভুনিভু আলোটাকে উজ্জল ও সোনালী একটি সময়ে পরিণত করতে যা আমাদের আজ বড্ড বেশী প্রয়োজন। সেই উজ্জল ও সোনালী সময়ে সব হতাশা, ব্যর্থতা, গ্লানি শেষ করে দেবে; নতুন দিনের গানে পুরো দেশকে ভরে দেবে।।