Home » আন্তর্জাতিক » ইয়াবা না তৃতীয় কোন দেশের মদত

ইয়াবা না তৃতীয় কোন দেশের মদত

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

cover২৬ জুন দিনটি ছিল মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস। পাঠক লক্ষ্য করলে যুগপৎ হতাশা ও কৌতুক বোধ করবেন এটা ভেবে যে, মাদক অপব্যবহার, তার মানে কি ব্যবহার করা যাবে, অপব্যবহার করা যাবে না? আবার পাচার তো সবসময়ই অবৈধ, এর সাথে অবৈধ শব্দটি যুক্ত করা কি অন্য সবকিছুকে বৈধ করে নেয়ার প্রয়াস? আমরা জানি না, হতে পারে এটি আন্তর্জাতিক দিবস, তাই নামটিও বোধকরি ওরকম। তবে এই দিবসে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য প্রাণিধানযোগ্য। ঢাকার একটি সেমিনারে তিনি বলেছেন, ‘অবৈধ মাদক পাচারের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না’। প্রশ্ন হচ্ছে, কথাটি কি তিনি সচেতনভাবে বলেছেন, নাকি মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেছে? অতীতবর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীবর্গের এরকম বক্তব্যনসিহত জনগণ শুনে আসছেন এবং শুনতে থাকবেন। এর কোন ইতরভেদ হবেনা। ‘৪৮ ঘন্টার মধ্যে আসামী ধরা হবে, অপরাধী যত ক্ষমতাধর হোক পার পাবে না, অপরাধী যেই হোক তার রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি’। খোদ প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সকল মন্ত্রীরাও আকছার বলে আসছেন একথা। মাদক প্রতিরোধ দিবসে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কি সে কথারই প্রতিধ্বনি করলেন?

প্রশ্নটি এজন্যই যে, কালান্তক মাদক ইয়াবা চোরাচালানীদের যে তালিকাটি তাঁর মন্ত্রণালয় তৈরী করেছে, সেখানে এক নম্বর ব্যক্তিটি হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য। আর রয়েছে তার ছয় ভাইসহ ২৬ জন আত্মীয়। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এ তথ্য জানেন না এটি কেউই বিশ্বাস করবে না! এরপরেও তিনি মাদক প্রতিরোধ দিবসে আশ্বস্ত করছেন, মাদক পাচারে যুক্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না। জনগণ আশ্বস্ত হতে পারতো যদি মাদক পাচারের সাথে জড়িত শীর্ষ ব্যক্তিটিকে গ্রেফতারের পরে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এই বক্তব্যটি দিতেন। কারন তিনি তো জানেনই, মানবপাচার, ইয়াবা ব্যবসা আর রোহিঙ্গা বৈধকরন এরকম অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা কে, কারা? জনগণ বিশ্বাস করতে চায়না, তাঁর কাছে এ খবর নেই অথবা তাঁর নিয়ন্ত্রিত বাহিনীগুলো এ সম্পর্কে অবগত নয়।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর নায়েক আব্দুর রাজ্জাককে বাংলাদেশের সীমানা থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায় মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি)। এ ঘটনার পরে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছিলেন, সামান্য ভুল বোঝাবুঝির কারনে এটি ঘটেছে। তাঁর ভাষায়, ভুল বোঝাবুঝির কারনে অপহৃত রাজ্জাককে ৯ দিনের মাথায় ফেরত দেবার পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বিজিবি’র মহাপরিচালক সংবাদ সম্মেলনে সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, ‘এ ঘটনা ভুল বোঝাবুঝির কারনে হতে পারে না’। তবে বিজিবি’র হাবিলদার লুৎফরের বদলে মিয়ানমার বিজিপি নায়েক রাজ্জাককে ধরে নিয়ে গিয়েছিল, মহাপরিচালকের এই দাবির সাথে একমত হলে ধরে নেয়া যায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এটিকে যদি ভুল বোঝাবুঝি হিসেবে বলতে চান, তাহলে অবশ্য বলার কিছু নেই।

বিষয়টি খানিকটা হলেও পরিস্কার করেছেন বিজিবি মহাপরিচালক। প্রসঙ্গক্রমে তিনি জানিয়েছেন, ২০১৪ সালের ২৭ মে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় নিহত হয়েছিলেন বিজিবি’র নায়েক মিজানুর রহমান। এটি ছিল ইয়াবা পাচারের রুট এবং এখান থেকে প্রচুর ইয়াবা আটক করা হয়েছিল। এক বছর পরে নায়েক রাজ্জাককে নাফ নদীর যেখান থেকে বিজিপি অপহরণ করে সেখান থেকে ইতিমধ্যেই ১২ লাখ পিস ইয়াবার চালান আটক হয়েছে। মহাপরিচালকের বক্তব্যে এটি সুস্পষ্ট যে, বিজিবি’র সৈনিকদের হত্যাঅপহরণের পেছনের কারন হচ্ছে ইয়াবা চোরাচালান। যার সাথে দুই দেশের অপরাধীরা জড়িত। জনগণের প্রশ্নটি হচ্ছে, বিজিবি মহাপরিচালক বিরোধী দলের আন্দোলননাশকতা দমনে জানান দিয়ে দেন, বিজিবি’র হাতে অস্ত্র আছে। আক্রান্ত হলে সেই অস্ত্র দিয়ে গুলি করা হবে। কিন্তু মিয়ানমার বিজিবি যখন হামলা চালায় তাঁর পরিচালনাধীন বাহিনীর ওপর, হত্যাঅপহরণ করে, একই কাজ যখন ভারতের বিএসফ করে বিষয়টি কি দাঁড়ায়?

কবুল করে নেয়া ভাল, বিষয়টি নিপাট কূটনৈতিক। মিয়ানমার যেটি করছে সেটি আন্তর্জাতিক আইনের লংঘন এবং প্রতিবেশী দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর হুমকি বলে বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন। মিয়ানমারের সাথে এই জনপদের সম্পর্কটি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক। আরাকানি দস্যু, মগফিরিঙ্গিদের দুর্ধর্ষতা এবং অত্যাচারের কাহিনী ইতিহাসের বিষয়। শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে বার্মারেঙ্গুন উল্লেখিত হয়েছে নানাভাবে। ভাগ্য ফেরানোর আশায় আমাদের পূর্বপুরুষদের অনেকে বার্মায় যেয়ে স্থায়ী হয়ে গেছেন। নাফ নদীর এপারে বাংলাদেশ, ওপারে বার্মা যা এখন মিয়ানমার। দীর্ঘদিন সামরিক শাসনের কবলে ধুঁকে ধুঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা আন্তর্জাতিক অপরাধের সাথে সেখানকার ক্ষমতাশালীরা জড়িয়ে পড়েছে। নিজ দেশে রোহিঙ্গা অধিবাসীদের দেশ ছাড়া করার পাশাপাশি শাসকদের একাংশ জড়িয়ে পড়েছে মানবপাচার, মাদক ব্যবসা বিশেষ করে ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। মাঝখানে ছোট নাফ নদী ও বাংলাদেশের অপরাধ চক্রের সাথে মিয়ানমারের এই চক্রের যুক্ততায় বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে বার বার তারা হামলার শিকার হচ্ছেন।

মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষী বিজিপি মাদক ব্যবসার সাথে যুক্ত হলেও বাংলাদেশ বিজিবি এই ব্যবসার জন্য একটি বড় বাধাহুমকি। কিন্তু অত্যন্ত লাভজনক হওয়ায় মিয়ানমারের ক্ষমতাশালীরা যেমন ইয়াবা ব্যবসার সাথে যুক্ত। বাংলাদেশেও সংশিষ্ট মন্ত্রনালয় যে তালিকা করেছে তাতেও জনপ্রতিনিধি, আইনশৃংখলা বাহিনীর কোন কোন সদস্য, প্রভাবশালীদের নাম আছে এবং অনেক নাম সংবাদ মাধ্যম বলছে। সব মিলে গড়ে উঠেছে একটি অর্গানাইজড ক্রাইম সিন্ডিকেট। এই ইয়াবা চোরাচাালান ঠেকাতে গিয়ে বলি হচ্ছেন বিজিবি’র সৈনিকরা। নিহত হচ্ছেন, গুলিবিদ্ধ হচ্ছেন, অপহৃত হচ্ছেন, অপমানিত হচ্ছেন। পত্রিকার শিরোণামে যখন বাংলাদেশ হয়ে ওঠে ক্রিকেটের সত্যিকার বাঘ, তখন হাতে হাতকড়া, মুখে রক্তের দাগ সম্বলিত বিজিবি সদস্যের ছবি যখন ফেসবুকে আসে, তা দেশের কর্তাদের কাছে হয়ে ওঠে নিছক ভুল বোঝাবুঝির ইস্যু!

নিকটতম প্রতিবেশী মিয়ানমারের সাথে রাজনৈতিককূটনৈতিক, কোন সম্পর্কই অতীত ও বর্তমানে সহজতর নয়। অথচ ঐ দেশটির সাথে বাংলাদেশের রয়েছে স্পর্শকাতর সীমান্ত সম্পর্ক। এর জের ধরেই সীমান্ত সংঘর্ষ তো বটেই, অতীতে বার দুয়েক অঘোষিত যুদ্ধও সংঘটিত হয়েছে। সুদীর্ঘ কাল ধরে মিয়ানমারের জান্তা সরকার শক্তি প্রদর্শনে মত্ত। তাদের অধিবাসী রোহিঙ্গাদের দেশছাড়া করছে, এসব উদ্বাস্তরা ঢুকে পড়ছে বাংলাদেশে। এসবের বিরুদ্ধে শক্তিমান প্রতিক্রিয়া আমাদের কোন সরকারই দেখাতে পারেননি। বরং এডহক ভিত্তিতে সমস্যার সমাধানে সন্তুষ্ট থেকেছে। যেমনটি ঘটেছে বিজিবি’র সিপাহীর গুলিবিদ্ধ হওয়া এবং নায়েক রাজ্জাকের অপহরন ও লজ্জাজনক প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে। আশংকা রয়েছে নতজানু নীতির কারনে সন্তুষ্ট সরকার বিষয়টি নিয়ে আর এগোবে না। আর এই নতজানুতার সুযোগ নিয়ে মিয়ানমার আবারও আগ্রাসী হয়ে উঠবে না এমন কোন গ্যারান্টি নেই।

মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটলে রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক চ্যানেলে সরাসরি সমাধানের সুযোগ কি আছে? বিষয়টি পরিষ্কার নয়। সাম্প্রতিক ঘটনায় মিয়ানমার এতটাই ঔদ্বত্য দেখিয়েছে যে, ১৮ জুন তাদের রাষ্ট্রদূতকে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিক্রিয়ার জবাব আসে বিজিপি’র ফেসবুকে রাজ্জাকের নির্যাতনক্লিষ্ট ছবি প্রকাশের মাধ্যমে। দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রে মূল সংকটটি হচ্ছে, শক্তিশালী দেশগুলোর কাছে এই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক ও ভূঅর্থনৈতিক গুরুত্ব। সেজন্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মত শক্তিসম্পন্ন দেশগুলির প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার রাজনৈতিককূটনৈতিক খেলার শিকার হতে হচ্ছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে। এইসব দেশের নেপথ্য আস্কারা ও সহায়তা মূলত মিয়ানমারের আগ্রাসী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে মদত যুগিয়েছে। প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক গড়ে তোলার শক্তিশালী কূটনৈতিক উদ্যোগে এটি বড় বাধা।

মিয়ানমারের সাথে চীনের রয়েছে শক্তিশালী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক কৌশলগত সম্পর্ক। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বিরোধিতাকারী দেশ চীন। জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভে বিরোধী হিসেবে চীন ভেটো পর্যন্ত দিয়েছিল। চীনের সাথে এই দেশের সম্পর্ক উষ্ণতা লাভ করে সামরিক শাসক জিয়ার সময় থেকে। বাংলাদেশের উন্নয়ন অবকাঠামো গড়ে তুলতে চীনের অবদান বিশাল, বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে বলা যায় ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারনে আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষায় চীন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে সমর্থন দিয়েছে। এ বিশ্লেষণের যথার্থ যুক্তি রয়েছে যে, জুনের প্রথম সপ্তায়ে নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের পরে চীনের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছুটা ভারসাম্যহীনতা ও টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। সেই সুযোগটি সম্ভবত মিয়ানমার নিয়ে থাকবে।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সমস্যা সমাধানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে চীন। মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারে চীন। প্রশ্ন হচ্ছে, আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক রাজনীতির কোন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মিয়ানমার কি এ আগ্রাসী আচরন করছে? এর সঠিক ব্যাখ্যা জানা নেই, কিন্তু সমস্যা সমাধানে এটি জানা জরুরী। একটি দেশ আন্তর্জাতিক আইনের লংঘন করে একের পর এক হামলা চালাবে, উস্কানি দেবেতার পেছনে উদ্দেশ্যটি কি? এটি কি স্রেফ মানবপাচার, ইয়াবা ব্যবসা অথবা রোহিঙ্গা বিতাড়নের সাথে সম্পর্কিত? মিয়ানমারকে ব্যবহার করে তৃতীয় কোন দেশ ফায়দা লুটতে চায়? নাকি আঞ্চলিক রাজনীতির প্যাঁচে ফেলে বাংলাদেশকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে গভীর কোন ষড়যন্ত্রের দিকে?

এসব প্রশ্নের মীমাংসা না করে, ব্যর্থতা আড়াল করতে অসত্য তথ্য দিয়ে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করার অধিকার কি এই সরকারের আছে? মানবপাচারকারী, ইয়াবা ব্যবসায়ী, কোকেন আমদানীকারক, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠনকারীদের চিহ্নিত করা ও ব্যবস্থা নেয়া ছাড়াই আকছার শোনা যাচ্ছে, আমরা নাকি মধ্যম আয়ের দেশ হবো। তারপরে উচ্চ আয়ের দেশ! একটি আলামত অবশ্য আমজনতা দেখতে পাচ্ছে যে, এই দেশ হবে এলিটদেরউচ্চবিত্তদের, দেশ হবে রাজনীতিবিদ ও বড় আমলাদের। যাদের সুইস ব্যাংক একাউন্ট ফুলেফেঁপে উঠবে ফি বছর। বাড়ি হবে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর আর উত্তর আমেরিকায়। মধ্যম আয়ের দেশের নামে এই দেশ হচ্ছে লুটপাট করে আয়ের জায়গা। মাথাপিছু আয় বাড়বে, আর বাড়বে বৈষম্যসীমাহীন। সেই বাংলাদেশে মধ্যবিত্তনিম্নবিত্তদরিদ্র হয়ে যাবে একাকার। তাদের প্রতি গুরুত্ব বা দরদ থাকবে মুখে মুখে, বাস্তবে থাকবে না তার প্রতিফলন। আগামী ভবিতব্য কি তাই?