Home » শিল্প-সংস্কৃতি » চলচ্চিত্র কীভাবে সীমান্ত পার হয় (দ্বিতীয় পর্ব)

চলচ্চিত্র কীভাবে সীমান্ত পার হয় (দ্বিতীয় পর্ব)

মিহির ভট্টাচার্য

last 5বিশ্বায়নের এই মধ্যগগনে সুঁচ থেকে শুরু করে উড়োজাহাজ পর্যন্ত যেখানে দেশ থেকে দেশান্তরিত হয়, সেখানে চলচ্চিত্রের মতো একটা শিল্পমাধ্যমের সীমান্ত পাড়ি দেয়া খুবই স্বাভাবিক। তবে বাণিজ্যের সাথে সংস্কৃতিও যখন একতরফা আদানপ্রদান হয় তা কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একতরফা গ্রহণ দেশজ রাজনীতিঅর্থনীতির মতো চলচ্চিত্রেও ভয়াবহ রূপ নেয়। ‘বিশ্বায়ন ভাবনাদুর্ভাবনা’ নামে প্রকাশিত বিশ্বায়নের উপর ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও চলচ্চিত্র বিশ্লেষক মিহির ভট্টাচার্য বেশকিছু প্রবন্ধ ছাপা হয়। চলচ্চিত্রের সীমান্ত পারাপারারের উপরও বিশ্লেষণী একটি প্রবন্ধ তিনি লিখেছেন। সেই দীর্ঘ প্রবন্ধের বিশেষ বিশেষ উল্লেখযোগ্য অংশ ধারাবাহিকভাবে পুনঃপ্রকাশিত হচ্ছে

রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দ বা সুধীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে বাজারের নিয়ম মেনেই পৌঁছায় : পান্ডুলিপি থেকে তৈরি হয়েছিলো ছাপা বই, প্রকাশক তার দাম ঠিক করে দিয়েছিলো, বিক্রেতার কাছ থেকে টাকা নিয়ে কিনেছে পাঠক, তবে তো তার চৈতন্যের গোচরে এসেছে অমর কবিতার সম্ভার। অনেক সাংস্কৃতিক বাজার সারা দুনিয়া জুড়ে রয়েছে। মোৎসার্ট শুনতে হলে, চ্যাপলিন দেখতে চাইলে কাফকা পড়ার ইচ্ছা হলে উদঘাটন করে মানবজাতির মুক্তির উপায় নির্দেশ করেছে সেই মার্কসবাদ ছাপাইবাঁধাই, দোকানবাজার পাইকারিখুচরো ইত্যাদি বিপণনের নিয়ম মেনেই পৌঁছায় কৌতুহলী পাঠক বা সমবায়ী বিপ্লবীর কাছে। কিন্তু ‘ দাস কাপিটাল’ যদি মূল্যবান হয় তবে সেটা বোধহয় বাজারের নিয়মে নয়। আর যে কোনো হাজারটা পণ্যের মতো একটি বই, একটি সংগীত বা একটি ছবির বাজারদর নির্ধারিত থাকে বটে, কিন্তু তার মূল্য পরিমাপের সময় উপযোগিতা বা নিবন্ধ শ্রমের মানদন্ড ব্যবহার করলে সেটা হাস্যকর হয়ে উঠবে। এই মূল্য বাজারদরের চাহিদাজোগান অনুসারী নয়। যে টাকা খরচ করলে ‘চারুলতা’ দেখা যায় তার বেশি লাগে ‘কাভি খুশি কাভি গাম’ দেখার জন্য। চাহিদা বা বাজারদর দিয়ে দ্বিতীয়টির উৎকর্ষ নির্ণয় করলে হয়তো সুবিচার হবেনা। শিশুর মুখের হাসি বা ছাতিম ফুলের সুগন্ধ কি দরদস্তুর করে পরিমাণের সমীকরণে আনা যায়? শিশুকে বড় করতে হলে অর্থিক আয়োজন লাগে বা ছাতিম গাছ লাগানোরও খরচ আছে কিন্তু হাসি বা গন্ধ যে মূল্যের জগতে বিচরণকালে তার গঠন অন্যরকম।

এই নৈতিক বা নান্দনিক বলে স্বীকৃত মূল্যকে যদি ইতিহাসের প্রেক্ষিতে বিচার না করি তাহলে আমাদের আলোচনা নিত্যশাশ্বতঅপৌরুষের সংজ্ঞার্থের ফাঁদে পড়ে বিপর্যস্ত হবে। শিশুর হাসি মূল্যবান অর্থাৎ আনন্দদায়ক, নিঃস্বার্থ, সরল ইত্যাদি এই বিবেচনা মস্ত বড় একটা স্বীকৃতির ভিত্তিতেই প্রচলিত আছে। ইতিহাস বা সমাজের বাইরে এই হাসিও নেই তার সার্বজনীন মূল্যও নেই। কেউ যদি শিশুর হাসিকে মূল্যবান না মনে করে তাহলে তার কাছে সমাজের প্রচলিত যুক্তি হাজির করতে হবে, কিন্তু কোনো অবিসংবাদী অজর অমর সত্য দিয়ে বা হাসির কোনো অপরিবর্তনীয় সত্তার ভিত্তিতে তাকে খন্ডন করা যাবেনা। ঠিক এভাবেই রামকথা কেনো ভালো লাগে এই প্রশ্নের অনেক উত্তর আছে, আলাদা আলাদা ভাষিক সম্প্রদায়ের মধ্যে যেমন, তেমনই একই ভাষিক সমাজে শ্রেণী, গোষ্ঠী, লিঙ্গ, বয়স ইত্যাদি অনুসারে। বলিদ্বীপের যে দর্শক ছায়ানৃত্যের উপভোক্তা, হয়তো সামান্য কয়েকটি পয়সা দক্ষিণা হিসাবে দিতে হয়েছে তাকে, আর যে পাঠক অনেক টাকা খরচ করে রাজ সংস্করণের রামচরিত মানস কিনে পড়েছে, তাদের মধ্যে তুলনা করতে গেলে বাজারদর হবে গৌণ, প্রায় উপেক্ষার ব্যাপার। যেটা ধর্তব্যের মধ্যে আসবে সেটা হলো পাঠ্যের প্রসার। ছাপাখানা এবং বাজারের দৌলতে অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছে চিন্তা ও কল্পনার বিপুল সম্ভার।

অধিসাংস্কৃতিক এবং অধিজাতিকের তফাৎটা এবার একটু পরিচ্ছন্ন করে নেওয়া যাক। প্রথমোক্ত শ্রেণীর মধ্যে আছে দু’ধরনের পাঠ্য। এক হলো রামকথার মতো সমগ্রের অংশগ্রহণের নির্মিত পাঠ্য যা নিয়ত আমন্ত্রণ করে অসংখ্য পুনর্নির্মাণ, অজস্র মানুষের ক্রিয়াশীল পঠন। দুই হলো ব্যক্তিক সৃষ্টি, যার পাঠ্যগত শক্তি আকর্ষণ করে বহু পাঠকের মনোযোগ, অনবরত তৈরি করে দেয় পুনর্নির্মাণের ভিত্তি। শেকসপীয়রের ভারতঅভিযান (বা নাইজিরিয়া অভিযান বা মেক্সিকো অভিযান) হয়তো অবধারিত ছিল সাম্রাজ্যের অমোঘ যুক্তিতে, শেকস্্পীয়রকে দেশীয় পাঠ্য বানাতে বাঙালির (রুশের বা জাপানীর) বেশিদিন লাগেনি, কারণ পাঠককুল নিজেদের চেষ্টায় আবিষ্কার করে নিয়েছিল নাটকগুলোর অনন্ত এবং বিচিত্র সম্ভাবনা। ‘ব্যাটেলশিপ পটেমকিন’ বা ‘পথের পাঁচালী’ সিনেমার জগতে স্থান করে নিয়েছে নিজস্ব ক্ষমতায়, বাজার অথবা অন্য প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন সেখানে যান্ত্রিক কাঠামো ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু দ্বিতীয়য়োক্ত, অর্থাৎ অধিজাতিক পাঠ্যের প্রসার নির্ভর করে প্রধানত প্রাতিষ্ঠানিক অর্থাৎ বাজারের সমর্থনের উপরে। ‘টাইটানিক’ মানুষের কাছে পৌঁছেছে তার প্রধান কারণ হলো বাজার তৈরি করা হয়েছে এই পাঠ্যটির জন্য। দর্শকের অংশগ্রহণ এখানে সীমাবদ্ধ ; তাকে আটকে থাকতে হয় দর্শকত্বের চৌহদ্দির মধ্যে। পাঠ্য যে গ্রহণযোগ্যতা বহন করছে তার কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম তৈরি হয়ে আছে বলে সৃজনের কাজ, পুনর্নির্মাণের কাজ এই পঠনক্রিযায় নিমিত্তমাত্র। রলাঁ বার্থ কথিত একটি তফাৎ এখানে স্মর্তব্য। তিনি ‘লেখকোচিত’ বলেছেন, সেই পাঠ্যকে যার পঠন বা মূল্যায়ন আয়াসসাধ্য; পরিশ্রম করে আবিষ্কার করতে হয় তার অন্তর্গত অর্থ এবং কাঠামো। অন্যদিকে ‘পাঠকোচিত’ হলো এমন পাঠ্য তার ভিতরে ঢোকা সহজ এবং অনায়াস। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই ধরণের রচনা হলো ফর্মূলা নির্ভর। যেমন রহস্যকাহিনীর কাঠামো বা হিন্দি বাণিজ্যিক ছবির ঘটনা বিন্যাস। ‘পাঠকোচিত’ পাঠ্য সেহেতু অনেক বেশি পাঠককে টানবে বলে ভাবা হয় যেহেতু ব্যবসায়ী পুঁজি নিরন্তর পাঠকোচিত পাঠ্য নির্মাণেই বেশি মনোযোগী। অন্যদিকে যেহেতু এই লাইনের উৎপন্ন সামগ্রী একই রকমের, অর্থাৎ একটা থেকে আর একটা আলাদা করা মুশকিল, সেহেতু ঠিক কোনটা জনপ্রিয় হবে আর কোনটা মার খাবে সেটা ঠিক করা কঠিন। বছরে একশ বাণিজ্যিক ভারতীয় ছবির মধ্যে হয়তো পাঁচটি হিট করে, বড়জোর দুটো সুপারহিট। অর্থাৎ পঁচানব্বই ভাগই ফ্লপ। অন্যত্রও তথৈবচ। কাজেই বিনিয়োগের ঝুঁকি কমাতে হলে আশ্রয় নিতে হয় বিজ্ঞাপনের এবং পুঁজিবাদী বাজারের অন্যান্য কৌশলের।

টাইটানিক’ মুক্তি পায় ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বর মাসে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৬৭৪টি পর্দায়। প্রথম সপ্তাহান্তে থোক আয় হয় ২ কোটি ৮৬ লাখ ৩৮ হাজার ডলার; এক বছরের আগেই, ৪ অক্টোবর ১৯৯৮ পর্যন্ত, এই আয় দাঁড়ায় ৬০ কোটি ৮০ লাখ ডলারে। মার্কিন দেশের বাইরে থেকে এই ছবি এক বছরে আয় করে ১২১ কোটি ১৪ লাখ ডলার। লক্ষণীয় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে আয় তার দ্বিগুণ আসে বিদেশ থেকে। তাছাড়া অজস্র ক্যাসেট, সিডি, ডিভিডি বিক্রি হয়েছে; জনপ্রিয় হয়েছে গানের রেকর্ড। বাজারে ছড়িয়ে গেছে বিভিন্ন ধরনের চিহ্নিত সামগ্রী আর উপহারের জিনিস; লোকে এই ছবির গল্পের বই কিনেছে বিপুল সংখ্যায়। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল অনেক টাকা খরচ করে এই ছবির সত্ত্ব কিনেছে, আবার বিজ্ঞাপনের দৌলতে মুনাফাও করেছে প্রচুর। ছবি বানাতে খরচ হয়েছিলো ২০ কোটি ডলার। আজ পর্যন্ত হিসাব হলে দেখা যাবে যে লাভের অঙ্ক একশ কোটি বা বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।।

(চলবে…)