Home » অর্থনীতি » তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (নবম পর্ব)

তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (নবম পর্ব)

সৌদি প্রিন্সদের নানা অজানা কাহিনী

last 4আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার সাথে তেল সম্পদের অর্থের একটি গভীর সখ্যতা রয়েছে। একটি অপরটিকে টিকিয়ে রাখে। আর পরস্পরের ঘনিষ্ঠ দুই ব্যবসার কুশীলবরা। এই ব্যবসার নেপথ্যে রয়েছে ঘুষ, অর্থ কেলেঙ্কারিসহ নানা ভয়ঙ্কর সব ঘটনাবলী। এরই একটি খন্ডচিত্র প্রকাশ করা হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। প্রভাবশালী দ্য গার্ডিয়ানএর প্রখ্যাত দুই সাংবাদিক ডেভিড লে এবং রাব ইভানসএর প্রতিবেদন প্রকাশের পরে এ নিয়ে বিস্তর আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। এ সংখ্যায় ওই প্রতিবেদনের বাংলা অনুবাদের (নবম পর্ব) প্রকাশিত হলো। অনুবাদ: জগলুল ফারুক

অক্সফোর্ড শায়ারের গ্লিম্পটন গ্রাম। আল ইয়ামামা অস্ত্র ক্রয় চুক্তিটি সম্পাদন করার পর পরই যুবরাজ বন্দর এখানকার ২০০ একর আয়তনের এই ম্যানর হাউজ ও খেলাধূলার এস্টেটটি কিনে নেন। প্রথম দর্শনে গ্লিম্পটনকে ইংল্যান্ডের আর দশটা গ্রামের মতো একটি গ্রাম বলেই মনে হয়। তবে পুরো কটমওল্ডস হ্যামলেট এবং এর আশপাশ এলাকার ৮১০ হেক্টর আয়তনের খেলাধূলার এ এস্টেটটির মালিক একজন সৌদি ধনকুবের। সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী যুবরাজ সুলতানের পুত্র যুবরাজ বন্দর ব্রিটেনের সাথে সর্ববৃহৎ অস্ত্র কেনাবেচা চুক্তিটি সম্পাদনের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে গ্লিম্পটন গ্রামটি কিনে নেন। তিনি তার ম্যানসনের সীমানা প্রাচীরের ভেতরে পুরোপুরি ইংরেজি কেতায় একটি পাব নির্মাণ করেন বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে আমোদফূর্তি করার জন্য। তবে তার এজেন্ট ওয়াফিক সাইদ নামের সিরীয় এক ভদ্রলোকও এ ব্যাপারে কম যাননি। কাছাকাছি জায়গায়ই তিনি গ্রিক স্থাপত্য রীতি অনুসরণ করে তাসমুর পার্ক নামে বিশাল এক রাজকীয় বাড়ি নির্মাণ করেন।

১৯৮৫ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থেচার বিএই’র হয়ে তথাকথিত এই আল ইয়ামামা চুক্তিটিকে বৈধতা দেয়ার জন্য বন্দরের সাথে আলোচনায় বসেন। আর সেই আলোচনার ফলাফলটি ছিল পিলে চমকানো। ২০ বছরে বিএই তার যুদ্ধবিমান বিক্রির ব্যবসা থেকে ৪৩০০ কোটি পাউন্ড কামিয়ে নিয়েছে।

আল ইয়ামামা অস্ত্র চুক্তি বিএই’র নির্বাহী কর্মকর্তা ডিক ইভানসের ক্যারিয়ারের শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি ঘটিয়েছে। এর জোরেই তিনি কোম্পানিটির চেয়ারম্যান পর্যন্ত হতে পেরেছিলেন। পুলিশ পরে হিসাব কষে বের করেছিল, চুক্তিটিকে ঘিরে দালাল এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ৬০০ কোটি পাউন্ডেরও বেশি পরিমাণ অবৈধ কমিশন ছড়ানো হয়েছিল। নতুনভাবে পাওয়া তথ্য প্রমাণ এবং আমাদের নিজস্ব তদন্ত থেকে আমরা জানতে পেরেছি যে, এসব কমিশনের অর্থ কোথায় এবং কার কার কাছে গিয়ে থাকতে পারে।

মার্কিন সূত্র জানিয়েছে, কোটি কোটি পাউন্ড গেছে বন্দরের হাতে। ওয়াশিংটনস্থ রিগস ব্যাংকে বন্দরের অ্যাকাউন্টে একবারেই জমা পড়েছে অন্তত ৩ কোটি ডলার (১ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড)। আরও কোটি কোটি পাউন্ড বিএই’র পক্ষ থেকে জমা দেয়া হয়েছে ওয়াদিক সাইদের সাথে সম্পর্কিত সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। বন্দরের পিতা যুবরাজ সুলতান সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে একজন ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ‘সব ধরনের চুক্তিতেই তার কিছু অবৈধ স্বার্থ যুক্ত থাকতো’। আইনি সূত্রগুলো জানিয়েছে, বিএই তার ঘুষের বহু অর্থ পজিডন নামে ভুয়া এক বিদেশী কোম্পানির মাধ্যমে পাচার করতো। অভিযোগ রয়েছে, এ পদ্ধতিতে প্রেরিত অর্থের বড় একটি অংক পৌছতো মোহাম্মদ সাদাফি নামের এক লেবাননী রাজনীতিকের কাছে। তিনি সৌদি বিমান বাহিনীর মূল নিয়ন্ত্রক সুলতানের জামাতা যুবরাজ তুর্কি বিন নাসেরের হয়ে কাজ করতেন। কমপক্ষে ১০০ কোটি পাউন্ড ঘুষের অর্থ পজিডনের মাধ্যমে পাচার হয়েছে। তাছাড়া ভুয়া এবং অতিরিক্ত খরচ প্রদর্শনের আড়ালে বিএই এবং স্থানীয় ঠিকাদারদের মধ্যে আরও বড় বড় অংকের অনেক লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অংকের দিক থেকে তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও বিএই কর্তৃপক্ষ ৬ কোটি পাউন্ডের জমকালো একটি তহবিল রেখে দিয়েছিল যুবরাজ তুর্কি বিন নাসেরের পাশ্চাত্যে ভ্রমণকালে খরচ করার জন্য।

অস্ত্র বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলো তার জন্য ব্যয়বহুল অবকাশ যাপনের আয়োজন করতো। ভ্রমণের সময় তার সাথে থাকতো বিলাস বহুল মোটর গাড়ির বহর। বিমান বোঝাই হতো তার কেনাকাটায়। আর তাকে সঙ্গ দিতো অপূর্ব সুন্দরী সব মেয়ে বন্ধু। বিএই’র দাবি তার পেছনে যে এতটা খরচ করতে হবে সে কথা তার সাথে সম্পাদিত চুক্তির মধ্যেই বলা ছিল। কিন্তু বাস্তবে খরচের এ বিলটি ‘সাপোর্ট সার্ভিসেস’ নামের এক শব্দ বন্ধের ছত্মাবরণে আল ইয়ামামা চুক্তির আওতায়ই লিপিবদ্ধ হতো। বিএই তার বিক্রি করা যুদ্ধ বিমানের মূল্য সব সময়ই বাড়িয়ে নির্ধারণ করতো। আর বাড়তি এই মূল্যে থেকেই তাদের ঘুষ বাবদ ব্যয়িত অর্থ এসে যেতো।

ঘটনাক্রমে প্রকাশ হয়ে পড়া যুক্তরাজ্যের কিছু দলিল থেকে দেখা গেছে, যুদ্ধ বিমানগুলোর আসল মূল্যের ওপর ৩২ শতাংশ হারে বাড়তি মূল্য দেখানো হয়েছিল। আর এর ফলে বিমান বিক্রয় থেকে ৬০ কোটি মিলিয়ন পাউন্ড বাড়তি আয় হয়ে যায় যা পরে কমিশন হিসেবে প্রদান করা হয়েছিল। সেটিই ছিল শুরু।।

(চলবে…)