Home » বিশেষ নিবন্ধ » পদ্মা নদীর অন্তর্ধান :: তিস্তা কি অপেক্ষায়?

পদ্মা নদীর অন্তর্ধান :: তিস্তা কি অপেক্ষায়?

হায়দার আকবর খান রনো

last 2দুই বছর আগে খ্যাতনামা চিত্র নির্মাতা সৈয়দ অহিদুজ্জামান ডায়মন্ড নির্মিত একটি অসাধারণ পূর্ণ দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ঢাকায় প্রদর্শিত হয়েছিল। চলচ্চিত্রটির নাম ‘অন্তর্ধান’। নির্মাতা ও চিত্র পরিচালক সৈয়দ অহিদুজ্জামান ডায়মন্ড নিঃসন্দেহে প্রতিভাবান, যিনি নিম্নবর্গের শোষিত, বঞ্চিত মানুষের জীবন কথা সিনেমার পর্দায় তুলে ধরার জন্যই বিশেষভাবে পরিচিত। বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত এই পরিচালক ইতোপূর্বে গঙ্গা যাত্রা ছবিটির জন্য শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতা ও পরিচালক হিসাবে জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন। এবারের অন্তর্ধান ছবিটিও কলকাতায় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে (নভেম্বর ২০১৩ সাল), দিল্লীতে জাগ্রান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে (আগস্ট ২০১৩) এবং সিঙ্গাপুরে দর্পণ চলচ্চিত্র উৎসবে (সেপ্টেম্বর ২০১৪) প্রদর্শিত হলে বহু দর্শকের মনে প্রবল দাগ কেটেছিল। ‘অন্তর্ধান’ মানে যা কিছু একদা ছিল কিন্তু এখন আর নেই হারিয়ে গেছে। চলচ্চিত্র নির্মাতা একটি করুণ কাহিনীর মধ্যদিয়ে দেখাচ্ছেন, কিভাবে একটা নদীও হারিয়ে যায়। অন্তর্ধান! সাথে সাথে হারিয়ে যায় সেই নদীর পারের গরিব শ্রমজীবী মানুষের জীবনে যে সামান্য সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ছিল, সেটাও।

পরিচালক ডায়মন্ড বিশাল প্রমত্তা পদ্মা নদীর হারিয়ে যাওয়ার কথাই বলেছেন। হ্যা, সেই বিশাল নদীর বিশালত্ব আর নেই। উন্মুক্ত জলতরঙ্গের জায়গায় এখন শুধুই ধুধু বালি। পদ্মা নিয়ে কতো কাহিনী, গল্প, উপন্যাস, কবিতা। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’। কিছুদিন পরে তা বোধহয় অবাস্তব কাহিনী বলে মনে হবে। প্রমথ নাথ বিশীর একটা উপন্যাস আছে নাম ‘পদ্মা’। বর্ষাকালের প্রলয়ংকরী সেই পদ্মার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘প্রলয়ের সহদরা, কাল নাগিনী’। তবে শুধু প্রমত্ত পদ্মার ধ্বংসাত্মক চিত্রই পুরো চিত্র নয়। পদ্মার জলে তীরের ভূমি হয়ে ওঠে শস্য শ্যামলা। নদীতে মাছ আসে। তা দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে মানিক বন্দোপাধ্যায়ের কুবের মাঝির মতো কয়েক লাখ মৎস্যজীবী। গোটা অববাহিকা জুড়ে মানুষের জীবন গড়ে উঠেছে, জীবিকা নিশ্চিত হয়েছে পদ্মা নদীকে কেন্দ্র করে। হায় পদ্মা! সেই পদ্মা আর নেই। এক ফারাক্কা বাধ পদ্মার পানি আগেই সরিয়ে নিয়েছে অন্যত্র। ফারাক্কা বাধ নির্মাণের প্রতিবাদ জানিয়ে মজলুম মানুষের নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৭৬ সালে ঐতিহাসিক লং মার্চ করেছিলেন। দূরদর্শী নেতা তখনি দেশবাসীকে সচেতন করেছিলেন নদীর পানি প্রবাহ সম্পর্কে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোড়ন তুলেছিলেন। মওলানা ভাসানী তখনি যা আশঙ্কা করেছিলেন, তাইই দেখতে পেলাম। এখনো পাচ্ছি। ‘অন্তর্ধান’ চলচ্চিত্রে সেই করুণ চিত্রই ফুটে উঠেছে।

এটি একটি জীবন কাহিনী। পদ্মার পানি শুকিয়ে যাওয়াতে পদ্মা পারের মানুষের জীবনে নেমে এসেছে দারুন অভাব, দারিদ্র। বড় অসহায় বোধ করে সেই মানুষগুলো। নৌকা চলে না। নদীতে পানি নেই। মাছও নেই। কূল ছাপিয়ে সামান্য বন্যা পাশের জমিকে করতো উর্বরা। তাও এখন নেই। নদীর দেশ, সবুজের দেশটা কি মরুভূমিতে পরিণত হবে? এই করুণ দৃশ্য চোখের সামনে তুলে ধরেছে অসাধারণ এই চলচ্চিত্রটি।

মূল কাহিনীর পাশে একটা ছোট্ট কাহিনীও আছে। অনেকটা রূপক আকারে। নদী নামে একটি বালিকা এবং আকাশ নামে এক বালকের বালু চরে খেলা, মান অভিমান। বিস্তীর্ণ বালু চরে একটু খানি পানির রেখা দেখা যায়। বালি খুড়ে ছোট্ট একটা জলাশয় বানিয়েছে খেলার ছলে দুই খেলার সাথী। হঠাৎ করে কোথা থেকে একটা মাছ লাফিয়ে উঠলো। নদী নামের মেয়েটি মাছটিকে যতœ করে আশ্রয় দিল তাদের বানানো জলাশয়ে। (প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখযোগ্য যে, নদীর চরিত্রে অভিনয় করেছে যে বালিকা, ওয়াহিদা সাব্রিনা ২০১৪ সালে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে এই অভিনয়ের জন্য)। বালক আকাশ একটু ধনী পরিবারের ছেলে। আর বালিকা নদী একেবারেই গরিব ঘরের মেয়ে। দুজনের মধ্যে যে ছেলেমানুষী দ্বন্দ্ব আমরা দেখি সিনেমায় তা যেন একটা প্রতীকী ব্যাপার। নদীর পানি নিয়ে ভারতবাংলাদেশের সম্পর্কের বিষয়টি কৌশলে তুলে আনা হয়েছে রূপকের সাহায্যে।

তবে ভালো কথা এই যে, কলকাতায় ও দিল্লীতে এই ছবি প্রদর্শিত হলে ভারতীয় দর্শকরা কোন বিরূপ মনোভাব দেখাননি। বরং দর্শক ও সাংবাদিকদের মনে দাগ কেটেছিল। Statesman পত্রিকায় এই ছবির উপরে উল্লেখিত প্রসঙ্গ নিয়েও মন্তব্য করেছে। The decade old debate between India and Bangladesh over sharing of river water has come alive on the silver screen on Bangladeshi film. খেলার সাথী দুই বালকবালিকা নদী ও আকাশের ছোট্ট কাহিনী সম্পর্কে পত্রিকাটির মন্তব্য While playing on the river bed , they start fighting over a dyke built to regulate water flow into two small puddles. Their quarrels , although childish, are allegoricial enough to remind viewers about the old controversy surrounding the Farraka barrage project. The puddles act as motif in the film.’ Times of India এই ছবিটি সম্পর্কে যে প্রতিবেদন ছাপিয়েছিল তার হেডলাইনে লেখা ছিল Bangla film on woes scores a hit.

দিল্লী থেকে প্রকাশিত প্রবাসের চিঠিতে সম্পাদকীয়তে ফারাক্কা বাধ নির্মাণের সমালোচনা আছে সরাসরি। বলা হয়েছে, ‘ব্রহ্মপুত্র নদের উপর বিরাট বাধ বানাচ্ছে চীন। ফলে ভারতে ব্রহ্মপুত্রের মতো নদ শুকিয়ে যাবার আশংকা দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে ভারত’। পত্রিকাটি এই প্রসঙ্গ টেনে বাংলাদেশের আপত্তির যৌক্তিকতা তুলে ধরেছে।

ভারতীয় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চিত্র পরিচালক ডায়মন্ড বলেছেন, ‘এ শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। ভারতের সমস্যা, বিশ্বের অন্য দেশেরও। এ ছবি তাই সব দেশের, বিশেষত নদীর নিম্ন অববাহিকায় থাকা দেশগুলোর সমস্যা। সেখানে নদী গ্রাস করার মতো স্বার্থান্বেষীরাও রয়েছে। আগামী দিনের সংকটকে কেউ ভাবছে না। তাদের ভাবাতেই এই ছবি’।

মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা মার্চ অথবা ডায়মন্ডের অন্তর্ধান ছবি অথবা বাংলাদেশের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পানির ন্যায্য হিস্যা দাবি করার মধ্যে কোনো অন্ধ ভারত বিরোধীতা নেই। ডায়মন্ডও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে পদ্মার স্বাভাবিক প্রবাহ দাবি করেছেন।

এই দাবি এখন আর শুধুই মানবিক দাবি নয়, আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে অধিকারও। ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যে নদী কনভেনশন গৃহীত হয়েছিল তার ধারা বলে (বিশেষ করে ৭.১ ও ৭.২ ধারা) ভাটির দেশের সাথে সমঝোতা না করে উজান দেশ নদীর পানি অন্যত্র সরাতে পারবে না। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ভোটাভুটির সময় (১৯৯৭ সালের ২১ মে) ভারত ও পাকিস্তান বিরত ছিল। চীন, তুরস্ক ও বুরুন্ডি বিপক্ষে ভোট দিয়েছিল। তবে এটি আইনে পরিণত হতে হলে পরবর্তীতে ৩৬টি দেশের স্বাক্ষর প্রয়োজন ছিল। বাংলাদেশ এই কনভেনশনের পক্ষে ভোট দিলেও এতো বছরেও সেই স্বাক্ষরটি করেনি। ইতোপূর্বে ৩৫টি দেশের স্বাক্ষর পাওয়া গিয়েছিল। বাকি ছিল একটি মাত্র দেশের স্বাক্ষর। বাংলাদেশ দিলেই এটি আইনে পরিণত হতো। কিন্তু এতো বছরেও কেন বাংলাদেশ স্বাক্ষর দেয়নি? এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলের সরকারই এসেছে ও গেছে। কেন কেউ তারা স্বাক্ষর করেনি? ভারত অসন্তুষ্ট হবে, এই মনে করে কি? তাই যদি হয়, তবে দেশপ্রেম কাকে বলবো?

যাহোক, গত বছর ভিয়েতনাম স্বাক্ষর করেছে। এটি এখন আন্তর্জাতিক আইন। তাই তিস্তা বা অন্য কোন নদীর পানি বন্টনের প্রশ্ন এলে অবশ্যই বাংলাদেশের সাথে সমঝোতা করতে হবে। কিন্তু ভারত কোন রকম আলাপআলোচনা ছাড়াই একক সিদ্ধান্তে জলপাইগুড়ি জেলার গজলডোবায় বাধ দিয়ে তিস্তার পানি সরিয়ে নিচ্ছে। ১৯৭৩ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রবেশ মুখে আমরা পেতাম ৬৭১০ কিউসেক পানি। এই বছর গত মার্চ মাসে আমরা পেয়েছি মাত্র ২৩২ কিউসেক। ২০১২, ২০১৩, ২০১৪ সালে একই পয়েন্টে মার্চ মাসে পেয়েছি যথাক্রমে ৩৫০৬, ২৯৫০ ও ৫৫০ কিউসেক পানি। অর্থাৎ ক্রমাগত পানির প্রবাহ হ্রাস পাচ্ছে। পদ্মার মতো তিস্তাও কি দ্বিতীয় অন্তর্ধান হতে চলেছে। উত্তরবঙ্গের বিশাল অঞ্চল জুড়ে এর ভয়াবহ ক্ষতিকর প্রভাব দেখা দিচ্ছে, আরও দেবে। তিস্তার পানি দ্বারা অন্যান্য যে সকল নদী পুষ্ট হতো সেগুলোও শুকিয়ে যাচ্ছে। গোটা উত্তরবঙ্গ জুড়ে সেচের কাজ দারুনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মাছ থাকবে না। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে আসায় মরুকরণ প্রকিয়া দেখা দেয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। ভারত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে একতরফাভাবে তিস্তার বা অন্য কোন নদীর পানি সরাতে পারে না। আমাদের সরকারকেও বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে হবে। আন্তর্জাতিক আইনের সহায়তা নিতে হবে। অবশ্যই ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমেই পানি সমস্যার সমাধান করতে হবে। কিন্তু ন্যায়সঙ্গত অধিকার ছাড় দিয়ে নয়, আত্মসম্পর্ণ করেও নয়।

ভারতের ক্যারিজমেটিক প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঢাকা সফরকালে বলেছেন, ‘বাতাস, পাখী, নদীর কোন সীমানা নেই। নদীর প্রবাহ আমাদের বিরোধের কারণ না হয়ে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার কারণ হয়ে উঠুক’। কী কাব্যিক ভাষায় তিনি এতো চমৎকার বলতে পেরেছেন। তার কথাই সত্য হোক। নদী হয়ে উঠুক দুই দেশের বন্ধুত্বের প্রতীক। পদ্মার মতো আরেকটি নদীর অন্তর্ধান আমরা দেখতে চাই না।।