Home » আন্তর্জাতিক » ভারতের নতুন ‘পেশীশক্তির ভাবমূর্তি’ বুমেরাং হতে পারে

ভারতের নতুন ‘পেশীশক্তির ভাবমূর্তি’ বুমেরাং হতে পারে

এম কে নারায়ানন

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

last 1তিন সপ্তাহ আগে ৪ জুন ঘটনাটা ঘটেছে। দিনটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য ‘কৃষ্ণ দিবস’। শান্তির সময়ে এ দিনই ভারতীয় বাহিনী এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ প্রাণহানির শিকার হয়। গুপ্ত হামলায় ৬ ডোগরা রেজিমেন্টের প্রায় ২০ সৈন্য নিহত এবং আরো অনেকে আহত হয়। সেনা কনভয়টি মনিপুরের চান্ডেল জেলায় আক্রান্ত হয়। সদ্য গঠিত ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব ওয়েসির (ওয়েস্টার্ন সাউথ ইস্ট এশিয়া) কিছু সদস্য সূচারু পরিকল্পনায় উন্নত বিস্ফোরক, রকেটচালিত গ্রেনেড ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছিল। ৩৩ বছর আগে ১৯৮২ সালে আরেকটি সেনাদল উত্তরপূর্বে একই ধরনের প্রাণঘাতী হামলার শিকার হয়েছিল। তাতে ১৫ জনের বেশি জওয়ান প্রাণ দিয়েছিল।

এবারের হামলাটি উত্তরপূর্ব এলাকায় ভারতের বিদ্রোহ ও সন্ত্রাস দমন প্রয়াসে সাময়িক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সরকার এবং সশস্ত্র বাহিনীর কাছ থেকে যে প্রবলতম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে, তা অপ্রত্যাশিত ছিল না। ভারতমিয়ানমার সীমান্তজুড়ে জঙ্গিদের গোপন আস্তানা এবং পচাদ্ভূমি খুঁজে বের করে সেগুলো ধ্বংস করার জন্য জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। বিদ্যমান স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর বজায় রেখে, কেবল সম্ভবত অপারেশনের মাত্রা এবং প্যারা কমান্ডো ব্যবহারের সিদ্ধান্তটি ছাড়া, সবকিছু করা হয়।

সুযোগ হারানো

এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় সামরিক গোয়েন্দাদের ভয়াবহ ব্যর্থতার কোনো উল্লেখ হয়নি। সম্ভাব্য ব্যতিক্রম মিজোরামকে বাদ দিলে উত্তরপূর্ব অঞ্চলটি এখনো বহু ধরনের বিদ্রোহে আক্রান্ত অঞ্চল। মনিপুরেই ৩৩টির মতো জঙ্গি সংগঠন সহিংস কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। একইসঙ্গে সুচারু মহড়ার মাধ্যমে যে হামলা হতে পারে তা অনুমান করতে এবং পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্যর্থতা গোয়েন্দা সামর্থ্যরে অক্ষমতাই ফুটিয়ে তুলেছে। এটাও বলা যায়, বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাফল্যের সাথে কাজ করার ঘটনাও বিরল।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুটি সুনির্দিষ্ট ঘটনা সংস্থাগুলোকে সতর্কতা সৃষ্টি হওয়া উচিত ছিল যে, কিছু একটা হতে যাচ্ছে। প্রথমটা হলো এনএসসিএন(কে)-এর একতরফাভাবে ভারত সরকারের সাথে তার যুদ্ধবিরতি বাতিল করার সিদ্ধান্ত। এর মানে হলো, তারা সহিংসতার পথে ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। দ্বিতীয়টি হলো, উত্তরপূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জঙ্গি সংগঠনের মধ্যে ‘রঙধনু’ জোট গঠন। এসব সংগঠনের মধ্যে রয়েছে ন্যাশনাল সোস্যালিস্ট কাউন্সিল অব নাগাল্যান্ড এনএসসিএন (কে), পরেশ বড়–য়ার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম (উলফা), সংবিজিতের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট অব বড়োল্যান্ড এবং কেসিপি, কেওয়াইকেএল ও পিইউএলএফের মতো কয়েকটি মনিপুরি সংগঠন। এসব সংগঠনের প্রতিটিরই ভারতের প্রতি সুসম্পর্ক নেই, পাকিস্তান ও চীনসহ, এমন দেশগুলোর সাথে যোগাযোগ রয়েছে, যদিও সত্যিকারের সম্পর্ক খুব সূক্ষ্ম। এই ঘটনাটি আরো জোরালো ইঙ্গিত ছাড়া আর কিছুই নয় যে, উত্তরপূর্বে বিদ্রোহের নতুন অধ্যয়ের সূচনা হতে যাচ্ছে।

হট পারসিউট’ (সামকি বাহিনীর আন্তর্জাতিক সীমান্ত উপেক্ষা করে ক্ষিপ্র ধাওয়ার)-এর নেপথ্যে

ফলে ৯ জুন মিয়ানমার সীমান্তজুড়ে স্পেশাল বাহিনী ২১ প্যারা রেজিমেন্টের প্যারা কমান্ডোদের দুটি জঙ্গি ক্যাম্পে (প্রধানত এসনএসসিএন(কে) সদস্যদের অধিকৃত) সার্জিক্যাল আক্রমণ ছিল খুবই সময়োচিত। এই আক্রমণে সরকারি হিসাবে ২০ থেকে ৫০ জন জঙ্গি নিহত হয়। আক্রমণটি চালানো হয়েছে ‘হট পারসিউট’ নীতিমালা অনুসরণ করে, যদিও এই পরিভাষাটি ব্যবহার করা ঠিক হচ্ছে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। কারণ আক্রমণটি চালানো হয়েছে প্রায় পাঁচ দিনের ব্যবধানে।

ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর কাছে ‘হট পারসিউট’ অপরিচিত নয়। এর হয়তো আন্তর্জাতিক ন্যায়নিষ্ঠতা বা আইনগত যৌক্তিকতা নেই, তবে অনেক দেশই এ ধরনের পরিস্থিতিতে এই পদ্ধতির আশ্রয় নিয়ে থাকে। ভারতের সশস্ত্র বাহিনী, ‘স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স’ এবং সীমান্ত রক্ষা বাহিনী কোনো না কোনো সময় ‘হট পারসিউট’ নাম দিয়ে এ ধরনের বিশেষ অভিযানে নেমেছে। বলতেই হচ্ছে, এগুলোর বেশির ভাগই এমন মাত্রায় ছিল না, কিংবা সম্ভবত সত্যতা স্বীকার করা হয়নি। এই পন্থায় যেসব দেশের সার্বভৌমত্ব ‘লঙ্ঘন’ করা হয়েছে, তারা হয় এই পদক্ষেপের প্রতিবাদ করেছে, কিংবা ‘না দেখার ভান’ করেছে। মিয়ানমারের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ দৃশ্যত হইচই এড়ানোর কৌশল হিসেবে চুপচাপ থাকার নীতি অবলম্বন করেছে। এমন খবরও পাওয়া গেছে, মিয়ানমার এ ধরনের আর কোনো অভিযানে রাজি হতে চাচ্ছে না।

বিশেষ অভিযান’ তত্ত্বের মূল কথা হলো, যেকোনো ধরনের আন্তর্জাতিক নিন্দা উচ্চারিত হওয়ার আশঙ্কায় ঘটনাটি ঘটার কথা আগাম নাকচ করার লক্ষ্যে এক ধরনের ‘প্লাজ্যাবলিটি ডেনাইবলিটি’ (প্রমাণের অভাবে অধস্তনদের করা নিন্দনীয় কোনো কাজের দায়দায়িত্ব অস্বীকার করা বা অবহিত থাকার কথা অস্বীকার করা) লাভ। এসব আক্রমণ সেখানেই হয়, যেখানে থেকে এর সূচনা হয়েছে। বর্তমান ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রচারে যেকোনো ‘বিশেষ অভিযানের’ মূল বিষয়টি লঙ্ঘিত হয়েছে। অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের জন্য অহেতুক ও অনাবশ্যক আন্তর্জাতিক মনোযোগ এড়াতে ‘প্লাজ্যাবলিটি ডেনাইবলিটি’এর আবরণের প্রয়োজন ছিল, এটা তা অপসারণ করে দিয়েছৈ।

বেসুরা আওয়াজ

সন্দেহ নেই, সরকার প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশসহ এই অভিযানের প্রকৃতি ও মাত্রার নিয়ে সৃষ্ট যেকোনো ধরনের সম্ভাব্য সমালেচানার যুক্তিপূর্ণ জবাব দেবে। ফলে এটা আর অমীমাংশিত বিষয় থাকছে না। যেটা উদ্বেগের বিষয়, তা হলো সরকারি মুখপাত্রদের (মন্ত্রীরা পর্যন্ত এর বাইরে নন) মুখে বিজয় উল্লাসের বন্যা। তাদের মুখে খই ফোটা বুলি ভারতের সন্ত্রাস প্রতিরোধে কৌশলে পরিবর্তনের বার্তা কিনা, তা নিয়ে দ্বিধা থাকলেও এটা নিশ্চিত যে, এর মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নতুন ও আগ্রাসী পর্যায়ের সূচনা হলো। আরো মারাত্মক ব্যাপার হলো, কর্তৃপক্ষসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিবৃতিতে সুনির্দিষ্টভাবে এই ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে যে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে পরিচালিত হামলাটি ভারতের পশ্চিম সীমান্তে যেকোনো ধরনের প্ররোচনার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে তার উদাহরণ বিবেচিত হতে পারে। সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তার ‘সীমান্তজুড়ে শান্তি ও শান্তাবস্থা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক অখণ্ডতার প্রতি যেকোনো হুমকি কঠোর জবাবের মাধ্যমে দেওয়া হবে’ ঘোষণাকে এই নতুন মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গির ‘ইঙ্গিত’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। এ ধরনের বিবৃতিত ভারতের নতুন ‘পেশীশক্তি ভাবমূর্তি’ প্রকাশ করে থাকলে যারা এ ধরনের বিবৃতি দিচ্ছেন, তাদের বোঝা উচিত, এটা বুমেরাং হতে পারে।

আর কোনো কোনো মহল যদি এর মাধ্যমে বিদ্যমান সন্ত্রাস প্রতিরোধ মতবাদ সংশোধনের কথা বুঝিয়ে ‘আগাম’ হামলার ধারণা চালু করতে চান, তবে ভারতের উচিত হবে এ ধরনের কৌশল গ্রহণের আগে পরিস্থিতি পুরোপুরি মূল্যায়ন করা। ‘আগাম হামলার মতবাদ’ প্রকাশ্যভাবে কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মতো দেশগুলো ঘোষণা করেছে। এই দেশ দুটি তাদের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বে আঘাত হানা মোকাবিলার লক্ষ্যে তাদের সীমান্তের বাইরে আগাম আঘাত হানার জন্য জাতীয় সীমান্তের প্রতিবন্ধকতা অগ্রাহ্য করে থাকে।

পশ্চিম সীমান্ত

এখন যদি ভারত এই মতবাদের সাথে সংশ্লিষ্ট ‘প্রতিকূলতায় নৌকা ভাসাতে চায়’ তবে যুক্তরাষ্ট্রইসরাইল যে ধরনের পরিস্থিতিতে পড়েছে, সেগুলোর বিপদ উপলব্ধি করতে হবে। যে ধরনের উত্তেজনা ছড়ানো হচ্ছে, তাতে পাকিস্তান দৃশ্যত টার্গেটে পরিণত হবে। ভারতের মুখপাত্ররা বর্তমান ঘটনায় পাকিস্তানের নাম উচ্চারণ না করলেও পাকিস্তান ইতোমধ্যেই কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। ‘পাকিস্তান মিয়ানমার নয়’ বক্তব্য প্রদানের মাধমে এটাই বলে দিচ্ছে যে, যেকোনো ধরনের অনুপ্রবেশের ‘সম্ভব সব ধরনের জবাব’ দেওয়ার নীতি অবলম্বন করা হবে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সরকারি মতবাদে ইতোমধ্যেই সব ধরনের জবাব নীতি গৃহীত হয়েছে।

এসবের অনিবার্য বিপদ হলো, পাকিস্তান হয়তো অকার্যকর হয়ে গেছে, কিন্তু এর মানে এই নয়, এটা ব্যর্থ রাষ্ট্র। দেশটি কী করবে তা কোনোভাবেই বোঝা সম্ভব নয়, যদিও এমনকি সর্বোত্তম সময়েও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ হয় না পাকিস্তানের। পাকিস্তানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ হয় সাধারণভাবে কল্পনাপ্রবণভাবে। ফলে সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তারা যথাযথাভাবে সংজ্ঞায়িত লক্ষ্য অনুসরণ করবে, এমনটা প্রত্যাশা করা যায় না। পাকিস্তানের নীতিনির্ধারণে সেনাবাহিনী প্রাধান্য বিস্তার করে থাকায়, তারাই প্রতিশোধের মাত্রা নির্ধারণ করবে। এটা হয়তো ‘অলিভ ব্রাঞ্চ’ বা শান্তির বার্তাবাহী হবে না, বরং খুব বেশি সম্ভাবনা থাকবে ‘পারমাণবিক’ প্রতিক্রিয়ার।

এটা অযৌক্তিক নয় যে, পাকিস্তান প্রধানত ভারতকে লক্ষ্য করেই তার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সামর্থ্যরে বিকাশ ঘটিয়েছে। ফলে এটা এখন আশঙ্কার বাইরে নয় যে, এই তথাকথিত ‘আগাম হামলার মতবাদকে’ তার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সামর্থ্যকে ভারতের বিরুদ্ধে মোতায়েন করার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করবে। ভারতের অস্তিত্বহীন ‘কোল্ড স্ট্রার্ট ডকট্রিন’এর ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে যাবে, ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর যেকোনো ধরনের অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্র ও কৌশলগত পারমাণবিক সামর্থ্য গড়ে তুলবে। বর্তমানে শাহিন ‘ক্ষেপণাস্ত্র পরিবারের’ (শাহিন ১, শাহিন ২, শাহিন ৩ শ্রেণির ক্ষেপণাস্ত্র) মাধ্যমে পাকিস্তানের পারমাণবিক সামর্থ্য শক্তিশালী হয়েছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র ভারতের বেশির ভাগ অংশেই আঘাত হানতে পারে।

যারা আমাদের প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে (পাকিস্তানসহ) নতুন ‘পেশীশক্তি প্রতিক্রিয়া কৌশল’ অবলম্বনের গুণগান গেয়ে থাকেন, তাদের উচিত তাদের বিষয়টির বাগাড়ম্বড়তার ব্যাপারে সতর্ক থাকা। ভারতের বর্তমান নীতিতে কৌশলগত সংযম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এটা বেশ চিন্তাভাবনা করে প্রণয়ন করা হয়েছে। এটা ভালোমতোই ভারতের উদ্দেশ্য সাধন করে। বাস্তবতাপূর্ণভাবে বলা হলে বলতে হয়, সুচিন্তিত নীতির কোনো বিকল্প নেই।।

(এম কে নারায়ানন ভারতের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পশ্চিমবঙ্গের গভর্নর।)