Home » রাজনীতি » মধ্যবর্তী নির্বাচন :: বিদেশীদের চাপের নেপথ্যে

মধ্যবর্তী নির্বাচন :: বিদেশীদের চাপের নেপথ্যে

আমীর খসরু

dis 3মধ্যবর্তী নির্বাচন সহসাই অনুষ্ঠান হবে কিনা এবং হওয়া উচিত কি উচিত নয় কিছুটা বিরতি দিয়ে নতুন করে এ নিয়ে আবার আলাপআলোচনা চলছে। বিষয়টি এখন পর্যন্ত খুব যে বেশি একটা এগিয়েছে তাও নয়। তবে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের ব্যাপারে বিদেশীদের দিক থেকে চাপ আরও প্রবল হয়েছে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের সময়ই ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে পশ্চিমা দেশ এবং গুরুত্বপূর্ণ দাতাদের এমন বার্তা দেয়া হয়েছিল যে, ওই নির্বাচনটি নিয়ম রক্ষার জন্য ও যথা শিগগিরই সম্ভব সব দলের অংশগ্রহণে নতুন একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হবে। সেই থেকে মধ্যবর্তী বা নতুন একটি নির্বাচনের সম্ভাবনার কথা পশ্চিমী দুনিয়ায় এবং দেশের নানা পর্যায়ে আলাপআলোচনা চলছিল। কিভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানটি সম্ভব তা নিয়ে বিএনপির সমর্থক পেশাজীবীদের পক্ষ থেকে একটি উদ্যোগও ওই দলটির মধ্যে বজায় ছিল কিছুকাল। কিন্তু এটা খুব একটা আগায়নি, মূলত সরকারের দিক থেকে কোনো সঙ্কেত না পাওয়ায়। ওই পেশাজীবীদের পক্ষ থেকে বিএনপির মধ্যে এই ধারণার জন্ম দেয়া হয়েছিল যে, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেয়াটা হবে নতুন একটি সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্র প্রস্তুত। সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পরে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাড়ায়, দেশীবিদেশী কেউই আর বিশ্বাস করতে পারছেন না যে, এই সরকারের অধীনে কোনো অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব।

এই বিষয়টি উল্লেখ করা প্রয়োজন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি অনুষ্ঠানের পরপরই ওই নির্বাচন যথাযথভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং ভোটারবিহীন বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদের মেয়াদ ৫ বছরই হবে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের পক্ষ থেকে এ কথা বারবার বলা হয়েছে ও এখনো হচ্ছে।

সরকারের উপরে নতুন একটি নির্বাচনের চাপ পশ্চিমী দুনিয়ার পক্ষ থেকে রয়েছে। ২০১৪’র নির্বাচনের সময় সবদলের অংশগ্রহনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের একাট চাপ ছিল বেশ বড়ভাবে। তবে এই দফার ব্যাপক এই চাপটি আসে ২০১৫’র প্রথমদিকের সংঘাতসহিংসতাপূর্ণ আন্দোলনের সময়েই। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এই পর্যায়ে মহাসচিব বান কি মুন বাংলাদেশের সঙ্কট নিরসনের দায়িত্ব দেন অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোকে। তারানকো ক্ষমতাসীনদের সাথে সরাসরি আলাপের জন্য ঢাকায় আসতে চেয়েছিলেন এবং এমন ইচ্ছার কথা তিনি জানিয়েও ছিলেন তাদের। সরকারের অনাগ্রহ এবং অসহযোগিতার কারণে তিনি তখন ঢাকা সফর করতে পারেননি। এরপরের চাপটি আসে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে এবং পরে।

সরকারের এক সময়ের সমর্থনদাতা দেশ চীনের অবস্থানেরও পরিবর্তন হয়েছে গেল কিছুদিনে। চীন অবশ্য ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পরে ওই নির্বাচনকে সমর্থন জানিয়েছিল প্রকাশ্যেই। তবে তা ছিল অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং ভূরাজনৈতিক কৌশলগত প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সমর্থন লাভের জন্য। কিন্তু তারা যা চেয়েছিল তা পরে পায়নি এবং ভূরাজনৈতিক কৌশলগত কারণে চীনের এই অবস্থানের পরিবর্তন ঘটেছে। ভারতের কংগ্রেস সরকারের ভূমিকা ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগেপরে ব্যাপকভাবে বিতর্কিত থাকলেও বর্তমান মোদী সরকার প্রথমে ওই নির্বাচনকে কোনোভাবেই পছন্দ বা অনুমোদন করেনি এবং তারা চেয়েছিল সবার অংশগ্রহণে নতুন একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। মোদী সরকারের অবস্থান প্রথমে বেশ কঠোরই ছিল তা বলা যায়। কিন্তু বাংলাদেশে ভারতের নানাবিধ স্বার্থগত বিষয় যেমন ট্রানজিটের নামে সড়ক, নৌ, রেল, করিডোর প্রাপ্তি, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার সুবিধা লাভ, বিদ্যুতসহ অন্যান্য সুবিধাদি এবং ভূরাজনৈতিক কৌশলগত কারণে মোদী সরকারের বাংলাদেশ নীতিতে বড় ধরনের একটি পরিবর্তন এসেছে। তবে বিভিন্ন সূত্র বলছে, সবার অংশগ্রহণে নতুন একটি নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকুক এমন অবস্থান থেকে তারা একেবারে সরে গেছে, তা নয়। মোদী সরকার চায়, বাংলাদেশে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন সে সরকারটি যেন কোনোক্রমেই ভারতের স্বার্থবিরোধী না হয়। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরকালে তিনি সরাসরি এব্যাপারে কিছু না বললেও যথেষ্ঠ ইঙ্গিত দিয়েছেন। এখানে বলা প্রয়োজন, দিল্লীর বুদ্ধিজীবীসহ বিশ্লেষকদের মধ্যেরও একটি অংশ বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করছেন। এই অংশের মনোভাব আগে ঠিক এমনটি ছিল না।

যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমী দুনিয়ার নেতিবাচক মনোভাবের প্রতিফলন গত বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাদের ধারণা, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতাসহ নানাবিধ নাগরিক অধিকারকে ক্ষুণ্ন ও অগ্রাহ্য করার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হচ্ছে। আর এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি অর্থনৈতিকভাবে দেশটিকে পিছিয়ে দিচ্ছে। উগ্রবাদ, জঙ্গীবাদী শক্তি এই অস্থিতিশীলতার সুযোগটি ইতোমধ্যেই নিয়েছে এবং আরও নিতে পারে এমনটাই তাদের বিশ্বাস। তাদের মনোভাব হচ্ছে এমন যে, গণতন্ত্রবিহীন, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া এবং জনঅনৈক্যের প্রেক্ষাপটটি সব বিবেচনায়ই বিপজ্জনক। ভারতের মনোভাবটিও এমন যে, জঙ্গীবাদ, উগ্রবাদের উত্থান হলে তাতে ভারতই বেশি মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশ থেকে প্রাপ্ত সুযোগসুবিধাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে এমন পরিস্থিতিতে এটা তারা মনে করে। চীনের দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্য ভিন্নমাত্রিক। তাদের ধারণা, ভূরাজনৈতিক কৌশলগত দিক এবং বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিবেচনায় বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে অধিকতর ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের বর্তমান মোদী সরকারের বৈদেশিক নীতি বিশেষ করে চীন বিরোধী অবস্থান জোরালো হওয়ার ব্যাপারে তারা বেশ চিন্তিত। এছাড়া ভারত তার পার্শ্ববর্তী এবং এই অঞ্চলের দেশগুলোর উপরে চীনের প্রভাব কমানোর যে উদ্যোগ নিয়েছে, সে বিষয়টিও ভাবিয়ে তুলেছে চীনের নীতিনির্ধারকদের। শ্রীলংকা, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটানসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ব্যাপারে ভারতনীতিতে চীন বেশ উদ্বিগ্ন। তাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের স্থানটি হচ্ছে ভারত মহাসাগর এং এটি কেন্দ্রীক ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা।

সামগ্রিক এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ পশ্চিমী দুনিয়ার দেশগুলোর সাথে সাথে চীন ও ভারতসহ সবার জন্যই বেশ প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই এসব দেশগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে জরুরি বলে মনে করে আপনআপন স্বার্থে। আর এ জন্যই সব দলের অংশগ্রহণে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দ্রুত ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন বলেই তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের চাপটিও সে কারণে প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে দিনে দিনে।

তবে সরকারের একটি অংশ মনে করে, বিরোধী দল বিএনপি’র বর্তমান সঙ্কটাপন্ন পরিস্থিতি একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তাদের জন্য সুবিধাজনক। ক্ষমতাসীনদের অপর অংশ মনে করে, সরকারের জনপ্রিয়তার মাপকাঠিটি সব সময়ই বিবেচনায় রাখা জরুরি। তবে দু’অংশেরই দৃঢ় বিশ্বাস বিএনপি এবং জামায়াতের নির্বাচনী ঐক্য অনিবার্য। এই দৃঢ় অবিশ্বাসটিও ক্ষমতাসীনদের মধ্যে ব্যাপক মাত্রায় বিদ্যমান। মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনা যাচাইবাছাইয়ে এসব বিষয়গুলো ক্ষমতাসীনদের বিবেচনায় আছে।।