Home » রাজনীতি » শুধু উন্নয়নের প্রচার, কমছেই বিদেশী বিনিয়োগ

শুধু উন্নয়নের প্রচার, কমছেই বিদেশী বিনিয়োগ

এম. জাকির হোসেন খান

dis 4আমি নিজেও বুঝতে পারছি না, কেন বাংলাদেশে কাঙ্খিত বিনিয়োগ আসছে না। তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য সব ধরনের প্রণোদনা রয়েছে। তাদের জন্য বিওআইয়ে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুু করা হয়েছে। অনলাইনে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্য অনেক জটিলতা নিরসন করা হয়েছে।’ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে গত বছর ভারত, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপে এমনকি সহিংসতায় নাকাল এবং গোলযোগপূর্ণ পাকিস্তানে এফডিআই বাড়লেও বাংলাদেশে কেন তা বাড়ছে না, এমন প্রশ্নের জবাবে বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আগামী বছর দেশে এফডিআই বাড়বে’। অথচ সত্য হলো, রাজনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল থাকলেও বাংলাদেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ কমেছে। সম্প্রতি বিভিন্ন দেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) হালনাগাদ তথ্য নিয়ে জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা ইউনাইটেড নেশন্স কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আঙ্কটাড) প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ২০১৪ সালে বাংলাদেশে নিট এফডিআই দেখানো হয়েছে ১৫৩ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ কোটি ডলার বা প্রায় ৫ শতাংশ কম। ২০১৩ সালে দেশে ১৬০ কোটি ডলার নিট এফডিআই এসেছিল।

ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা দাবি করেন, ‘আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে প্রদত্ত তথ্যে মারাত্মক ভুল রয়েছে, সংস্থাটি বৈশ্বিক বিনিয়োগের সঠিক তথ্য দিতে পারছে না। এটি তাদের ব্যর্থতা’। তার দাবি বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ ২০০ কোটি ডলার। তার দাবি, বছরের অর্ধেক সময়ের জন্যও যদি অর্থ বা উপকরণ ব্যবহার হয়, তাহলে সেটাও বিনিয়োগ বলে বিবেচিত হবে এবং সেক্ষেত্রে গত বছর দেশে মোট এফডিআই এসেছে ২০৬ কোটি ডলার, যা আঙ্কটাড প্রতিবেদনে মোট (গ্রস) এফডিআই হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যেহেতু প্রথমে বিনিয়োগ করলেও বছরের মাঝামাঝি সময়ে ৫৩ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ বা উপকরণ অর্থ দেশের বাইরে চলে গেছে, বছরজুড়ে অর্থ বাংলাদেশে খাটানো হয়নি, তাই আঙ্কটাড প্রতিবেদনে চূড়ান্ত হিসাবে তা বাদ দিয়ে বিনিয়োগের পরিমাণ দেখানো হয়। উল্লেখ্য, আঙ্কটাডের এফডিআই সংক্রান্ত সংজ্ঞায় বলা আছে, ‘পুরো বছর ধরে যে অর্থ বা উপকরণ খাটানো হয়, সেটাই বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হবে’। আঙ্কটাডের সংজ্ঞা অনুসারে প্রদত্ত হিসাবে যে কোনো গড়মিল নেই তা পরিস্কার।

এটা উল্লেখ করা প্রয়োজন, জ্বালানি খাতে গত বছর শেভরন কোম্পানী বিবিয়ানায় ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করলেও বছরের মাঝামাঝি সময়ে আবার ৪০ কোটি ডলার নিয়ে গেলে তা কিভাবে এক বছরের নিট বিনিয়োগে দেখানো হবে সে সম্পর্কে সরকারের কোনো যুক্তি অবশ্য এখন পর্যন্ত চোখে পড়েনি। তাছাড়াও সরকার রাশিয়া, ভারত, চীনসহ অন্যান্য দেশ থেকে যেসব ঋণ নিয়েছে, সেটিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে হলে ২০০ কোটি ডলারও যথেষ্ট কিনা? পার্শবর্তী দেশ মিয়ানমারে বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় ৪ গুণ বা ৮০০ কোটি ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ কেন হলো তা খতিয়ে না দেখে, উল্টো আঙ্কটাড’র তথ্যে ভুল খোঁজা সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা ছাড়া অন্য কিছু নয়।

বিদ্যমান পদ্ধতি অনুযায়ী বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে বলে কোনো বিদেশী কোম্পানি বিনিয়োগ বোর্ডকে কোনো আগ্রহ পত্র দিলেই তা দেশে বিদেশী বিনিয়োগ হিসাবে দেখানো হয়, যা প্রকৃত বিনিয়োগকে না দেখিয়ে স্ফীত আকারে দেখানো হয়। বর্তমান বিনিয়োগ বোর্ড দায়িত্ব নেওয়ার পর ইউরোপসহ নানা স্থানে বিশেষ করে লন্ডন, সিঙ্গাপুর এবং বিভিন্ন দেশে কোটি কোটি টাকা খরচে যে রোড শো করলো তার কোনো ফল তো দেখা যায়নি, রাষ্ট্রের অর্থের শুধু অপচয় করা হয়েছে মাত্র। আমাদের কাছে অবশ্য অর্থ কোনো সমস্যা নয় বলেই অবস্থা দেখে মনে হয়। বাস্তবে অবস্থাটা এমন যে, টাকা লাগবে ঋণ করবো। হলমার্ক কেলেংকারির ঘটনায় সোনালি ব্যাংক থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা লোপাট হলেও অর্থ মন্ত্রী তাকে সামান্য অর্থ বলে উপহাস করেছিলেন। বিনিয়োগের ঘাটাতিতে দেশের বেকার সমস্যা বাড়লেও সেদিকে নজর না দিয়ে বা বিনিয়োগ পরিবেশকে উন্নত না করে অন্যের ঘাড়ে দায় চাপানো বা সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টার মধ্যেই ক্ষমতাসীনরা দিন কাটালে বিনিয়োগ যে আসবেনা তা তো নিশ্চিত।

বিনিয়োগের আকাল এমনিতেই হয়নি। তবে সত্য হলো দেশীয় বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হওয়ায় বিদেশী বিনিয়োগ এমনিতেই কম হবে এটাই স্বাভাবিক। অথচ ক্ষমতাসীনরা বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে বেশি ভারতমুখী হলেও ভারত নিজেই চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে বৈদেশিক বিনিয়োগ খুঁজছে। আর কেন বিনিয়োগ আসছেনা সে প্রসঙ্গে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিস এর সভাপতি রূপালী চৌধুরী বলেন, ‘আঙ্কটাডের তথ্য নিয়ে আলোচনা না করে বরং বাংলাদেশে কেন বিনিয়োগ আসছে না, সেদিকে সবার মনোযোগ দেয়া উচিত। এফডিআইয়ের পথে বাধা চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি’। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে কাঙ্খিত হারে এফডিআই না আসার পেছনে মূল কারণ অবকাঠামো সংকট, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কে দায়ী করা হয়েছে। ফলে সম্ভাবনার বাংলাদেশকে পশ্চাতে ফেলে কম সম্ভাবনার দেশ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, তিউনিশিয়া, মিয়ানমারে বানের মতো আসছে বিদেশী বিনিয়োগ।

আসলে সত্য হলো, বিনিয়োগকারীদের শুধু ২৬ ধরনের ছাড়পত্র ও লাইসেন্সের জন্যই ঘুরতে ঘুরতে বছরের পর বছর কেটে যায়, প্রক্রিয়া আর শেষ হয়না। হতাশ হয়ে কেউ ফিরে যান, আবার কেউ অনবরত চেষ্টা চালিয়ে যান। কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগ বোর্ডে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালু করা হলেও সমস্যার সমাধান হয়নি, বাস্তবে পরিস্থিতির যে কোনো অগ্রগতি হয়নি সে সম্পর্কে সম্প্রতি ‘হতাশা’ ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ‘বিমানবন্দর থেকে বিনিয়োাগ বোর্ড, তিতাস থেকে পরিবেশ অধিদপ্তর, জমি থেকে জল প্রাপ্তি সর্বত্রই আইনি মারপ্যাঁচ, আমলাতান্ত্রিক ফাঁদ আর মাঝে মাঝে রাজনৈতিক অস্থিরতা রুদ্ধ করছে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের পথ’। বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের আগ্রহ দেখালেও ঘুরে ঘুরে হতাশা নিয়ে ফিরে যান জাপানের বিনিয়োগকারীরা। এ প্রেক্ষিতে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো), কেআরআই ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন, মিৎসুবিশি ইউএফজে রিসার্চ অ্যান্ড কনসালটিং এবং মুডি হামাদা অ্যন্ড মাৎসুমুটু বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের সমস্যা নিয়ে বিশদ একটি প্রতিবেদন ২০১৪ এর এপ্রিলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেয় যাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ১৩টি বাধা চিহ্নিত করে বলা হয়েছে, এসব সমস্যা দূর করা না হলে বাংলাদেশ থেকে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নেবে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে প্রথম বিদেশী কারখানা ইয়াংওয়ান করপোরেশনের চেয়ারম্যান ও সিইও এবং চট্টগ্রামের কোরিয়ান ইপিজেডের মালিক কিহাক সাং জানান, ‘কোরিয়ান ইপিজেডের পরিবেশ ছাড়পত্র পেতে তাঁর ১০ বছর ঘুরতে হয়েছে। যখন আমি ভিয়েতনামে যাই তখন ৯৫ শতাংশ সময় উৎপাদনে নজর দেওয়ার পেছনে ব্যয় করতে পারি, আর বাংলাদেশে সম্ভবত ব্যয় করতে পারি ২০ শতাংশ। বাকি সময় আমাকে সরকার সংশ্লিষ্ট কাজে ব্যয় করতে হয়। অথচ পাঁচছয় বছর আগেও ভিয়েতনাম খুব কঠিন জায়গা ছিল। আমাদের ক্রেতারা ভিয়েতনামের বদলে বাংলাদেশকে পছন্দ করতেন। সত্যি বলছি, তাঁরা এখন বাংলাদেশের চেয়ে ভিয়েতনামকে পছন্দ করছেন’। প্রশ্ন হলো ক্ষমতাসীনরা তো সাড়ে ছয় বছরের বেশী সময় ধরে ক্ষমতায় আছে, ভিয়েতনাম এ সময়ে অসম্ভবকে সম্ভব করলো, অথচ বাংলাদেশ কেন পারলোনা?

প্রকৃত এ সত্যটি এড়িয়ে গিয়ে ক্ষমতাসীনরা ধানের বাম্পার ফলন, তৈরি পোষাক খাতের রপ্তানি আয় এবং প্রবাসী শ্রমিকদের কষ্টার্জিত উচ্চ রেমিট্যান্স এর ওপর ভর করেই যেনতেন প্রকারে ক্ষমতায় থাকতে চেষ্টা করছে। আর যখনই কোনো রাজনৈতিক চাপের মধ্যে পড়ছে তখনই নতুন কোনো বিতর্ককে উস্কে দিচ্ছে। সত্যিকার উন্নয়ন যে হচ্ছেনা তা বিনিয়োগের আকাল থেকেই বোঝা যায়। ২০১৫ এর বিনিয়োগের পরিমাণ কম হলে ২০১৬ সালেও তার সার্বিক দায় বিরোধী রাজনৈতিক দলের উপর চাপিয়ে অধিক দায়ের ঋণে ঘি খাওয়ার চেষ্টা করা হবে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। এটা হঠাৎ করেই হয়নি। বাংলাদেশে আর্থিক খাত বিশেষ করে একের পর এক রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংক, বীমা এবং প্রতিষ্ঠান ও কারখানা লুটপাট এবং অদক্ষতার কারণে মুখ থুবড়ে পড়লেও উন্নয়নের গাল ভরা বুলি দিয়ে যে পার পাওয়া যাবেনা, তা জীবিকার অন্বেষণে সাগরে ভাসমান বা গণকবরে ঠাই নেওয়া বাংলাদেশের নিরীহ নাগরিকরা প্রমাণ করেছে। ক্ষমতাসীনরা যতই ঢাকডোল পিটিয়ে প্রচার করুক তাতে যে, বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব নয় তা তো প্রমাণিত।।