Home » অর্থনীতি » গরু পাচার বন্ধে আবারো ভারতের কঠোরতা

গরু পাচার বন্ধে আবারো ভারতের কঠোরতা

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

Dis 4বাংলাদেশে গরু পাচার বন্ধে নতুন উদ্যোগে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন ভারত সরকার সীমান্তজুড়ে ৩০ হাজার সীমান্তরক্ষী (বিএসএফ) মোতায়েন করেছে এবং তারা পাহারা দিচ্ছে কঠোরভাবে। একটা গরুও তারা বাংলাদেশে আসতে দেবে না। লক্ষ্য : বাংলাদেশের মানুষ যাতে গরুর গোশত খেতে না পায়। বিএসএফ সদস্যরা এখন অস্ত্র ছাড়াও লাঠি, দড়ি নিয়ে ধান ক্ষেত, পাট ক্ষেত দিয়ে ছুটছে, কখনো পুকুরে সাঁতার কাটছে।

বাংলাদেশে ভারতীয় গরুর একচেটিয়া বাজার দীর্ঘদিনের। আনুষ্ঠানিক রফতানি বন্ধ থাকায় চোরাচালান ছিল একমাত্র মাধ্যম। হিন্দুস্তান টাইমসের হিসাব মতে সাম্প্রতিক কালে বছরে প্রায় ২০ লাখ গরু ভারত থেকে বাংলাদেশে আসে। ৬০ কোটি ডলারের বাণিজ্য এটা। কিন্তু নরেন্দ্র মোদী সরকার এটা বন্ধ করতে চাইছে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং গত বসন্তে বাংলাদেশ সীমান্ত সফর করে বিএসএফ সদস্যদের গরু পাচার সম্পূর্ণ বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন যাতে, ‘বাংলাদেশের মানুষ গরুর গোশত খেতে না পারে।’ তার যুক্তি ছিল, ‘আমাকে বলা হয়েছে, গরু পাচারের বিরুদ্ধে নজরদারি কড়াকড়ি করার কারণে বাংলাদেশের গরুর গোশতের দাম ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। আপনারা পাহারা আরো বাড়িয়ে দিলে গরু পাচার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। এতে করে বাংলাদেশে গরুর গোশতের দাম ৭০ থেকে ৮০ ভাগ বেড়ে যাবে। ফলে বাংলাদেশের মানুষ গরুর গোশত খাওয়া ছেড়ে দেবে।’

পশ্চিমবঙ্গের আরএসএস মুখপাত্র বিষ্ণু বসু বলেছেন, ‘একটা গরু হত্যা বা পাচার একটা হিন্দু বালিকাকে ধর্ষণ কিংবা একটা হিন্দু মন্দির ধ্বংস করার মতো অপরাধ।’

গোশতের দাম বেড়েছে, রফতানি কমেছে: হিন্দুস্তান টাইমসের ৩ জুলাইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিএসএফ সৈন্যরা চলতি বছর এ পর্যন্ত ৯০ হাজার গরু জব্দ করেছে, আটক করেছে ভারতীয় ও বাংলাদেশী ৪০০ পাচারকারীকে। বাংলাদেশের মানুষের কাছে গোশতের উৎস ছাড়াও চামড়া শিল্পে ভারতীয় গরু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ১৯০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে চামড়া শিল্পের অবদান প্রায় ৩ শতাংশ। কাজেই ভারতীয় গরু আসা বন্ধ হওয়া মানে বড় ধরনের ধাক্কা খাওয়া। হিন্দুস্তান টাইমস ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার কাছে বিষয়টি স্বীকারও করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম। তার মতে, গোশত বিক্রি এবং চামড়া শিল্প যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাতে ‘কোনো সন্দেহ নেই’।

বাংলাদেশী গরুর গোশত রফতানিকারক ‘বেঙ্গল মিট’এর সৈয়দ হাসান হাবিব বলেন, তাদেরকে আন্তর্জাতিক অর্ডার ৭৫ ভাগ বাতিল করতে হয়েছে। কোম্পানিটি উপসাগরীয় দেশগুলোতে বছরে ১২৫ টন গরুর গোশত রফতানি করে থাকে। তিনি বলেন, ভারতীয় পদক্ষেপের ফলে গত ছয় মাসে গরুর দাম ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ফলে তারা দুটি প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। হাবিব চাহিদা পূরণের জন্য নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমার থেকে গরু আমদানি করার পরিকল্পনা করছেন। তবে এও জানান, ভারতীয় গরুর গোশত ও চামড়া অনেক উন্নত। বাংলাদেশ ট্যানারি এসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ জানিয়েছেন, কাঁচা চামড়ার অভাবে ১৯০টি ট্যানারির মধ্যে ৩০টি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বেকার হয়েছে প্রায় চার হাজার কর্মী।

ভারতীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, ভারত তার এই নীতিতে অটল থাকবে। ফলে বাংলাদেশের উচিত হবে গরুর জন্য নতুন কোনো উৎস খোঁজা।

গরু রক্ষা আইন

ভারতে ৩০ কোটি গরু রয়েছে। দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম বিফ রফতানিকারক এবং পঞ্চম বৃহত্তম ভোক্তা। বিফ বলতে গরু ও মহিষের উভয়ের গোশত বোঝায়। ভারতে অবশ্য মহিষ জবাই করার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। গত বছর বিজেপি ক্ষমতায় এসে গরু রক্ষা এবং গোশত রফতানির ওপর বিধিনিষেধ কড়াকড়ি করার হুমকি দিতে থাকে।

অনেক সমালোচক এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে। তাদের যুক্তি, যারা প্রোটিনের জন্য গরুর গোশত খায়, এই সিদ্ধান্ত তাদের জন্য বৈষম্যমূলক। তাছাড়া কসাই, গরু ব্যবসায়ীসহ (যাদের বিপুল অংশ মুসলমান) হাজার হাজার লোক বেকার হয়ে পড়বে। উগ্র হিন্দুরা কেবল হুমকি দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি। তারা গরু সুরক্ষা দিতে সীমান্ত এলাকায় পাহাড়াও বসায়। পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে গত এপ্রিলে মোহাম্মদ তরফদার নামের এক গরু ব্যবসায়ী জানান, ‘গরু রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা তাকে একটা গাছের সাথে বেঁধে পিটিয়েছে’। বিএসএফের অনেক সদস্যও বুঝতে পারে না কেন গরুর পেছনে ছোটা হচ্ছে? অনেক গরু ধরে আবার পাচারকারীদের কাছে বিক্রিও করে দেওয়া হয়।

সম্ভাবনাও আছে

ভারতীয় গরু আসা বন্ধ হলে বাংলাদেশে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সেটা সাময়িকও হতে পারে। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, ভারতীয় গরুর জন্যই বাংলাদেশে গরু শিল্প বিকশিত হতে পারেনি। একসময় গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্প বেশ ব্যাপকভাবে বিকশিত হতে যাচ্ছিল। কিন্তু কোরবানি ঈদের সময় বিপুল সংখ্যায় সস্তা গরু আসতে থাকায় স্থানীয় উৎপাদকরা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের পক্ষে শিল্পটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।

ভারতীয় গরু আসা বন্ধ হলে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা চাহিদার আলোকে কাজে নামতে পারবেন। বাংলাদেশের মানুষ ইতোমধ্যে মুরগি, ডিম, মাছ উৎপাদনে যথেষ্ট সফলতা দেখিয়েছে। অনেক ফসলেই আমরা এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। ফলে গরু উৎপাদনে পিছিয়ে থাকবে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। ভারত যদি তার বর্তমান নীতিতে অটল থাকে, তাতে সুদূরপ্রসারী হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে লাভবান হতে পারে।