Home » অর্থনীতি » তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (দশম পর্ব)

তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (দশম পর্ব)

সৌদি প্রিন্সদের আরও কাহিনী

Last 4অস্ত্র ব্যবসার সাথে তেল সম্পদের অর্থের একটি গভীর সখ্যতা রয়েছে। একটি অপরটিকে টিকিয়ে রাখে। আর পরস্পরের ঘনিষ্ঠ দুই ব্যবসার কুশীলবরা। এই ব্যবসার নেপথ্যে রয়েছে ঘুষ, অর্থ কেলেঙ্কারিসহ নানা ভয়ঙ্কর সব ঘটনাবলী। এরই একটি খন্ডচিত্র প্রকাশ করা হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। প্রভাবশালী দ্য গার্ডিয়ানএর প্রখ্যাত দুই সাংবাদিক ডেভিড লে এবং রাব ইভানসএর প্রতিবেদন প্রকাশের পরে এ নিয়ে বিস্তর আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। এ সংখ্যায় ওই প্রতিবেদনের বাংলা অনুবাদের (দশম পর্ব) প্রকাশিত হলো। অনুবাদ : জগলুল ফারুক

যুদ্ধ বিমানের ইঞ্জিন, অস্ত্র এবং ইলেকট্রনিক্সের ব্যবসা করেন যুক্তরাজ্যের এমন অনেক ঠিকাদারই জানিয়েছেন, পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে তাদের কমিশন বাবদ বহু অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। আল ইয়ামামা চুক্তির আওতায় খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় সামরিক ছাউনি নির্মাণের মতো ব্যবসার মধ্যেও ঘুষ এবং দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতা থাকার অভিযোগ রয়েছে। সাবেক ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়ান গিলমার নিউজনাইটের কাছে বলেছেন, আপনি যদি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে ঘুষ প্রদান করেন তবে সৌদি আইনে সেটি অন্যায়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ঘুষ লেনদেনে তেমন কোনো সমস্যাই হয় না।

২০০১ সালে রাজ পরিবারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে যুবরাজ বন্দরের উত্তর ছিল আপনি যদি বলেন, এই দেশটিকে গড়ে তুলতে গিয়ে আমরা ৪০ হাজার কোটি ডলারের অপব্যয় করেছি এবং যদি বলেন, এখান থেকে আমরা ৫ হাজার কোটি ডলার অর্থ সরিয়ে নিয়েছি তবে আমি বলব, হ্যাঁ করেছি, তো কী হয়েছে? দুর্নীতি আমরা আবিষ্কার করিনি। এটা চলে আসছে সেই আদম হাওয়ার কাল থেকেই। এটিই মানব প্রকৃতি। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার এখনো পর্যন্ত সৌদি ঘটনার সাথে নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকারই করে চলেছে। তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইকেল হেসেলটাইন তো দাবিই করে বসলেন যে, সৌদি আরবের লোকজনকে কমিশন প্রদানের ব্যাপারে সরকার কিছুই জানে না। এসব লেনদেনে সরকারের কোনো রকম সংশ্লিষ্টতাই নেই।

অথচ দলিল প্রমাণাদি বলছে, ১৯৭৭ সালের কুপার নির্দেশিকা যা এখনো পর্যন্ত বহাল রয়েছে এবং ওই অনুযায়ী যুক্তরাজ্য এসব কমিশন লেনদেনে ওতপ্রোতভাবেই জড়িত ছিল। ‘সৌদি কর্তৃপক্ষ অর্থ গ্রহণ করেছে’ মর্মে লেখা এই চিঠিতে সই করার জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বিএইকে নির্দেশ দিয়েছিল। কমিশনের পরিমাণটি ঠিক করে দিয়েছিলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা স্যার কলিন চ্যান্ডলার এবং সেটি মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব স্যার ক্লাইভ হোয়াইটমোর কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছিল।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আগের চুক্তিগুলোর মতোই এ চুক্তি থেকেও বিএই’র জন্য একটি লভ্যাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছিল। মন্ত্রণালয় ব্যবস্থাপনা খরচ বাবদ সৌদিদের কাছ থেকে ২ শতাংশ হারে ফি আদায় করে এবং লন্ডনে আন্তঃসরকার চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্যে বেসামরিক পর্যায়ে একটি পূর্ণাঙ্গ অফিসও স্থাপন করে। অভিযোগ রয়েছে, যুবরাজ বন্দরের কেনাকাটার জন্য যেসব অর্থ ব্যয় হতো তা ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে রক্ষিত সৌদি অর্থ থেকেই তোলা হতো। এ অর্থের অ্যাকাউন্টটি ডিইএসও এবং বিএই যৌথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতো।

চুক্তি সম্পাদনের বিষয়টি ঘোষিত হওয়ার দিন কয়েকের মধ্যেই আরবি ভাষার একটি ম্যাগাজিন থ্যাচারের প্রধান উপদেষ্টা চার্লস পাওয়েলের টেবিলে এসে হাজির। পত্রিকাটি কমিশন গ্রহণের অভিযোগে বন্দর ও অন্যদের কঠোর সমালোচনা করেছে। হোয়াইট হল জানান, এসব অভিযোগের যেন কোনো রকম উত্তর দেয়া না হয়। মন্ত্রণালয় যেন এ ব্যাপারে কোনো রকম মন্তব্য করা থেকে পুরোপুরি বিরত থাকে। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় এক্ষেত্রে বেসামরিক আমলারা আরো বেশি যুৎসই ও চৌকষ উত্তর দিতে পারতেন যদি তারা প্রাচীন একটি আরব প্রবাদ ব্যবহার করতেন। প্রবাদটি হলো – ‘কুকুরের ঘেউ ঘেউ কাফেলার পথ চলা থামাতে পারে না’। সবশেষে বলতে হয়, আল ইয়ামাহ চুক্তির নোংরা ঘেটে এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটন করতে বাইরের লোকদের ২০ বছরেরও বেশি সময় লেগে গিয়েছিল।

(চলবে…)