Home » অর্থনীতি » বাড়ছে মাথাপিছু বৈষম্য

বাড়ছে মাথাপিছু বৈষম্য

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

Dis 1বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে বাংলাদেশকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে বাংলাদেশ এক ধাপ উপরে উঠল বলে দাবি করছে সরকার। কিন্তু এটি যে শুভংকরের ফাঁকি তা বুঝতে বাকি নেই কারো। সামষ্টিক অর্থনীতির কোন দেশের মাথাপিছু আয় হচ্ছে জনগণের সর্বমোট ব্যক্তিগত আয়কে মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে যা পাওয়া যায় তা। এক কথায় একজন কোটিপতির আয় এবং একজন ভিক্ষুকের আয়ের গড় হিসাব হচ্ছে মাথাপিছু আয়। সাধারন ভাবে মাথাপিছু আয় দিয়ে একটি দেশের মোট অর্থনৈতিক ধারণা পাওয়া গেলেও বাস্তবে এই চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এক্ষেত্রে আমাদের যে বিষয়টা দেখা দরকার তা হচ্ছে এই অর্থনৈতিক সুফলতা সাধারন মানুষ কতটা পাচ্ছে?

মাথাপিছু আয়, গড় বৈদেশিক বিনিয়োগ, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) এবং দেশের গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেও সেই অনুপাতে আমদের ক্রয় ক্ষমতা কতটুকু বেড়েছে অথবা আদৌ সাধারন মানুষের ক্রয় ক্ষমতা সে অনুপাতে বেড়েছে কিনা, মোট জাতীয় উৎপাদন আদৌ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরন করছে কিনা, মূল্যস্ফীতি কতগুন বেড়েছে এবং সে সঙ্গে মাথাপিছু ঋনের পরিমান কতটা বেড়েছে তা আমাদের চিন্তা করা দরকার। কারন আমরা জানি একটি হাতি এবং একটি পিঁপড়ার গড় ওজনের যেমন কোন পার্থক্য নেই তেমনিভাবে একজন কোটিপতির আয় এবং একজন ভিক্ষুকের আয়ের গড় হিসাবেরও কোন মূল্য নেই। তাই এই মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সুফলতা সাধারন জনগণ কতটুকু পাচ্ছে তা আমাদের ভেবে দেখা উচিত। জাতিসংঘের একটি সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে যে, বিশ্বের ধনী অংশ মাত্র ১ (এক) শতাংশ মানুষ এবং এরা পৃথিবীর শতকরা ৪০ ভাগ সম্পদের অধিকারী। আর ১০ শতাংশ বিত্তবান বিশ্বের ৮৫ শতাংশ সম্পদ ভোগ করছে। এমন ভয়াবহ বৈষম্য আমাদের দেশেও আজ বিদ্যমান।

২০০০ সাল থেকে ১৯৯৫৯৬ সালকে ভিত্তি বছর ধরে জিডিপি গণনা শুরু হয়। আগের ১৯৮৪৮৫ ভিত্তি বছরের চেয়ে পরবর্তী ভিত্তি বছরে জিডিপির আকার প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়েছিল। দেখা যাচ্ছে, দু’বারই আওয়ামী লীগ শাসনামলে শেষ বছরে এসে ভিত্তি বছর পরিবর্তন করা হলো। ২০০৫০৬ নতুন ভিত্তি বছর হিসেবে বেছে নেয়ার পর অর্থনীতির সূচকগুলোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বিগত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৩ থেকে ৬ দশমিক ১৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মাথাপিছু আয় ৯২৩ ডলার থেকে ১০৪৪ ডলারে বৃদ্ধি পেয়েছে। জিডিপি ৪ লাখ ৩৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা থেকে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ২০ হাজার ৪০০ কোটি টাকায়। বিনিয়োগ জিডিপির ২৬ দশমিক ৮৪ থেকে ২৮ দশমিক ৭০ শতাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। সঞ্চয় ২৯ দশমিক ৫১ থেকে ৩০ দশমিক ৮৫ শতাংশ হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, ভিত্তি বছর ১০ বছর এগিয়ে আনার ফলে এ পরিবর্তন কেন হলো? প্রথমেই জানা দরকার অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বুঝবার জন্য ভিত্তি বছরের তাৎপর্য কী? আমরা জানি, যেকোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় প্রতি বছর কমবেশি মূল্যস্ফীতি হয়। মূল্যস্ফীতির ফলে বিদ্যমান মূল্যস্তরের ভিত্তিতে জিডিপি হিসাব করলে পরিবর্তনের সঠিক ধারণাটি পাওয়া যায় না। জিডিপি নিয়ে দুটি ধারণা আছে। এগুলো হলো, নমিনাল জিডিপি এবং রিয়েল জিডিপি। জিডিপি বলতে বোঝায়, একটি দেশে এক বছরে যে পরিমাণ পণ্য ও সেবাসামগ্রী উৎ্পাদন হয়, বিদ্যমান বাজারদর অনুযায়ী তার মোট পরিমাণ। এভাবে জিডিপির হিসাব করলে আমরা পাই নমিনাল জিডিপি। কিন্তু চলতি বছরের বাজারদরের পরিবর্তে ভিত্তি বছরের বাজারদরে জিডিপি হিসাব করলে আমরা পাই রিয়েল জিডিপি। ভিত্তি বছর থেকে পরবর্তী বছরগুলোয় জিডিপির হিসাব করলে বার্ষিক পরিবর্তন সম্পর্কে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া যায়। চলতি বাজারমূল্যে জিডিপি হিসাব করার পর ডিফ্লেটর দিয়ে এ হিসাবকে ভাগ করে রিয়েল জিডিপিতে উপনীত হওয়া যায়। এ পরিবর্তন প্রধানত হিসাব পদ্ধতির পরিবর্তনের ফল। মাথাপিছু জাতীয় আয় হিসাব পদ্ধতি পরিবর্তনজনিত কারণে ১২১ ডলার বেড়ে গেল বাংলাদেশী টাকায় বার্ষিক প্রায় ১০ হাজার টাকা। কিন্তু বাস্ততা হলো, নতুন হিসাবের আগে আমাদের অবস্থা যেমনটি ছিল, এখনো তাতে কোনো পরিবর্তন হয়নি।

বাংলাদেশে মাথাপিছু আয়ের বৈষম্যের দিকে তাকালেই দেখা যাবে যে একদিকে কোন মানুষ হয়ত দিনে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা আয় করে অথবা কখনও সারাদিন উপোস করে সংসার চালাচ্ছেন। অন্যদিকে, কোন মানুষের দিনে এক লাখ টাকা আয় করে সংসার চালাচ্ছে। এভাবে কোন দেশের মাথাপিছু আয়ের প্রকট বৈষম্য রেখে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে না, পেছনে পড়ে রয়েছে? এ ধরনের বৈষম্য রেখে দেশের মাথাপিছু আয়ের হিসাবে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হলে সাধারন মানুষের কোনো লাভ নেই। বাংলাদেশের মানুষের টাকা রোজগারের পরিমাণ যে বাড়ছে, ইতোমধ্যে আমরা তা জেনেছি। দেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় বেড়েছে। গত বছরের মাথাপিছু গড় আয় ১১৯০ ডলার ছাড়িয়ে এ বছর ১৩১৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে। মাথাপিছু এই গড় আয় বৃদ্ধি নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা হতে পারে। এই আয় বৃদ্ধি একজন হতদরিদ্র ব্যক্তির আয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কিনা। কারণ তার যে আয়, তার সাথে একজন কোটিপতির আয়ও এসে মিশেছে। যেমন একজনের আয় যদি হয় ১০ টাকা এবং আরেকজনের হয় ২ টাকা, তাহলে গড় করলে দেখা যাবে দুই জনের গড় আয় ৬ টাকা। তাহলে দুজনের প্রকৃত আয় কি সমান হলো? এ প্রেক্ষিতে যদি ধরে নেয়া হয়, যার বার্ষিক আয় ৪ থেকে ৫ লাখ ডলার এবং একজন দিনমজুরের আয় যদি হয় চারপাঁচশ’ ডলার। তবে বলতে হবে দিনমজুরের আয়ের সাথে কোটিপতির আয় যুক্ত হয়ে হয়েছে ১৩১৪ ডলার। আবার কোটিপতির আয় বছরে যে হারে বৃদ্ধি পায়, দিনমজুরের বৃদ্ধি তার থেকে যোজন যোজন ব্যবধানে থাকে। কাজেই মাথাপিছু গড় আয়ের যে হিসাব, তা প্রকৃত চিত্র নয়। এর মধ্যে বেকার তরুণ শ্রেণীও রয়েছে। তাহলে কি বেকারের আয়ও ১৩১৪ ডলার? সরকারের তরফ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে বলে জোর দিয়ে বলা হচ্ছে। মনে হচ্ছে, গড় আয় বৃদ্ধির যে হিসাব দেয়া হচ্ছে, তা সেদিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি ইঙ্গিত সরকার দিতে চাচ্ছে। এরই মধ্যে আগামী বছর হয়তো এই আয় আরও বাড়বে। প্রশ্ন আসতে পারে, সরকার যেভাবে আয় বৃদ্ধির হিসাব দিচ্ছে এবং অর্থনীতির যে গতি দেখাচ্ছে, আসলে কি এ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে? এ প্রশ্ন নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, অভাবঅনটন থাকলেও বাংলাদেশ একটি সুখী দেশ। ২০১৮ সালের পর দেশে কোনো দারিদ্র্য থাকবে না। বর্তমানে আমাদের দারিদ্র্যের হার ২৪ শতাংশ। এ সময়ের মধ্যে তা ১১তে নেমে আসবে। এ ধরনের কথার বক্তব্য সুখকর ও আনন্দময়। অবশ্য গত ২০ মার্চ জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক সুখ দিবস উপলক্ষে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গ্যালাপের জরিপের ফলাফলে দেখানো হয়, বাংলাদেশ সুখী দেশের তালিকার নিচের দিক থেকে তৃতীয়। এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ আফগানিস্তান ও বোমাতঙ্কের দেশ পাকিস্তানেরও নিচে।