Home » রাজনীতি » গণতন্ত্র নয় উন্নয়নের শ্লোগান :: স্বৈরতন্ত্রের জয়গান

গণতন্ত্র নয় উন্নয়নের শ্লোগান :: স্বৈরতন্ত্রের জয়গান

আমাদের বুধবার বিশ্লেষক

Dis 4অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন গণতন্ত্র প্রসঙ্গে তিনটি কথা বলেছেন। প্রথমত, গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে হলে ব্যক্তি স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, গণতন্ত্র কতটা উৎকর্ষ লাভ করল, সে বিতর্কে না গিয়েও এর বিকাশের প্রতিই নজর দেয়া জরুরি। তৃতীয়ত, গণতন্ত্রে আলোচনা ছাড়া কিছু সম্ভব নয়। এটি তাঁর কোনো নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নয়, গণতন্ত্র ও উন্নয়ন সম্পর্কে এত দিনকার সুচিন্তিত অভিমত পুনর্ব্যক্ত হয়েছে মাত্র। সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসে তিনি এ কথা বলেন। ‘অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবিক প্রগতি’ বক্তৃতায় তাঁর প্রদত্ত মন্তব্য আমাদের সমকালীন রাজনীতিতে বিবেচনার দাবি রাখে বটে, তা হলো মানবিক প্রগতি ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার মধ্যে একটি দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক রয়েছে। তাই বলে কেবল প্রগতি বা উন্নয়ন দেখিয়ে মানবিক প্রগতিকে দুর্বল করা গ্রহণযোগ্য হবে না। আগে গণতন্ত্র, না উন্নয়ন এই তর্ক থেকে অমর্ত্য দর্শনের দূরত্ব যোজন যোজন।

অর্থনীতির সঙ্গে দরকার মানবিক প্রগতিও। অমর্ত্য সেন আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, গণতন্ত্রের বহুমাত্রিকতা রয়েছে। এটা কেবল নির্বাচিত হওয়া বা ভোটযজ্ঞনির্ভর ব্যবস্থা নয়। আমাদের দেশে গণতন্ত্রের রাজনৈতিক দিকটি যত বেশি দৈনন্দিন জীবনের আলোচনায় জেঁকে বসে, ততটাই কিন্তু অমর্ত্য সেন নির্দেশিত জবাবদিহি, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় মানুষের অংশগ্রহণের বিষয়টি উপেক্ষিত থাকছে। আলোচনা ও জবাবদিহি থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতের মতো সামাজিক বিনিয়োগ বাড়ানোর সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নের যেমন, তেমনি গণতন্ত্রের উন্নয়নের সম্পর্ক রয়েছে।

সুশাসন ছাড়া যেমন গণতন্ত্র পূর্ণাঙ্গভাবে সুরক্ষা করা যায় না, তেমনি গণতন্ত্র না থাকলে সুশাসনও প্রতিষ্ঠা করা যায় না। গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যতিরেকেও রাষ্ট্রনায়কগণ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে দেশ শাসন এবং উন্নয়ন করতে পারেন। তবে সে উন্নয়ন সুষম, জবাবদিহিমূলক ও টেকসই হয় না। বৃহৎ দেশ চীনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি, কিন্তু উন্নয়নে দেশটি বহু গণতান্ত্রিক দেশের চেয়ে এগিয়ে আছে। বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারত গণতন্ত্র চর্চায় বিশ্বের বহু উন্নত দেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে, কিন্তু উন্নয়নে অনেক দেশ থেকে পিছিয়ে থাকলেও তাদের উন্নয়ন জবাবদিহিমূলক ও টেকসই। আসলে গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়ন পরস্পরের পরিপূরক, একটি ছাড়া অন্যটি পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হতে পারে না। অনেক রাষ্ট্রনায়ক মতামত দেন যে, উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্রের প্রয়োজন নেই। কিন্তু গণতন্ত্র না থাকলে একটি দেশে জনগণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে, স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারে না, ভয়ভীতিতে তাদের চিন্তা, চেতনা মাটি চাপা দিয়ে রাখতে হয়, গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে সত্য প্রকাশ করতে পারে না, তাই রাষ্ট্রনায়ক, আমলা, ব্যবসায়ীরা যথেচ্ছ দুর্নীতি করতে পারেন। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের মতে, যে দেশে স্বাধীন গণমাধ্যম আছে, সে দেশে দুর্ভিক্ষ হতে পারে না। দুর্ভিক্ষ বিত্তশালীদের ব্যক্তিস্বার্থে সৃষ্টি করা হয়, তেমনি দুর্নীতিও ব্যক্তি লালসার কার্যকারণ। তাঁর মতে, উন্নয়ন মানেই মুক্তি, সে অর্থে গণতন্ত্র মানেই উন্নয়ন, আর্থসামাজিক, মানবিক, রাজনৈতিক উন্নয়ন। গণতন্ত্র ছাড়াই উন্নয়ন করা যায়এই মতবাদের পক্ষে কর্তৃত্ববাদী মালয়েশিয়ার সরকার দেশ শাসন করে কৃতকার্য কতটুকু হয়েছে তাও প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, দেশটি অসাধারণ অর্থনৈতিক উন্নতি করেছে, কিন্তু এত উন্নতির পরও সেখানে জনগণ এখন গণতন্ত্রের জন্য সোচ্চার হচ্ছে। যদি একই সঙ্গে গণতন্ত্রেও উন্নয়ন অর্জন করা যেতো, তাহলে হয়তো আরও উন্নতি করতে পারতো। দক্ষিণ কোরিয়ার কর্তৃত্ববাদী সরকারও জনগণকে প্রচুর অর্থনৈতিক উন্নয়ন উপহার দিয়েছিল, কিন্তু জনগণ সুখী হতে পারেনি, তারা রাস্তায় নেমে আসে, সংগ্রাম করে গণতন্ত্র হাসিল করেছে।

অর্থনীতির দু’টি দিক। একটি হচ্ছে দ্রব্য উৎপাদন। দ্রব্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে মানুষকে ব্যবহার করতে হয় প্রাকৃতিক নিয়ম। কিন্তু এর একটি দিক হচ্ছে দ্রব্য ভোগের নিয়ম, যা প্রাকৃতিক নিয়মের ওপর নির্ভর করে না। তা নির্ভর করে সামাজিক নিয়মের ওপর। প্রাকৃতিক নিয়ম মানুষ বদলাতে পারে না; কিন্তু সামাজিক নিয়ম পারে। এই সামাজিক নিয়ম রচনার ক্ষেত্রে আসে গণতন্ত্রের ধারণা। গণতান্ত্রিক উপায়ে গঠিত সরকার নিয়মতান্ত্রিকভাবে আইন করে নির্দিষ্ট করতে পারে উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কে কতটা পরিমাণে উৎপাদিত দ্রব্য ভোগ করতে পারবে। এভাবেই রাষ্ট্র ও অর্থনীতির সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। সম্ভব হয়েছে অর্থনীতির ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ।

আজকাল আমাদের দেশে কিছু ব্যক্তি বিশেষত ক্ষমতাসীন রাজনীতিক ও সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা বলছেন, আগে উন্নয়ন পরে গণতন্ত্র। এদের কথা শুনে মনে হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর গণতন্ত্র যেন পরস্পরের সাথে সাংঘর্ষিক। কিন্তু ইতিহাস তা বলে না। বর্তমানে যেসব রাষ্ট্রকে বলা হচ্ছে অর্থনৈতিক দিক থেকে উন্নত, তারা সবাই প্রায় হলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর গণতন্ত্র পরস্পরবিরোধী হলে এটা কখনোই হতে পারত না।

উদার গণতান্ত্রিকব্যবস্থায় মানুষ সবচেয়ে অধিক ব্যক্তিস্বাধীনতা ভোগ করতে পারে। গণতন্ত্র উন্নত জীবনব্যবস্থা। কারণ মানুষ এখানে হয়ে পড়ে না রাষ্ট্রযন্ত্রের দাস। বলতে পারে তার আপন দাবিদাওয়ার কথা। নিয়ন্ত্রিত করতে পারে তার আশাআকাক্ষা অনুসারে রাষ্ট্রকে। গণতন্ত্র নিজেই হলো উন্নয়নের একটি মাপকাঠি। অর্থাৎ সে নিজেই একটি লক্ষ্য। অন্য কোনো লক্ষ্যের মাপকাঠি দিয়ে তার বিচারপ্রচেষ্টা অবান্তর। মানুষের কোনো কিছুই নিখুঁত নয়। বিলাতের রাজনীতিক স্যার উইনস্টন চার্চিল (১৮৭৪১৯৬৫) একবার বলেছিলেন, উদার গণতন্ত্রের গলদ আছে অনেক। কিন্তু মানুষ রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে এখন পর্যন্ত এর চেয়ে ভালো কিছু আবিষ্কার করতে পারেনি।

উন্নয়ন ও গণতন্ত্র এখন মনে হচ্ছে পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চলেছে ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক উদ্যোগে। কিন্তু সে দেশেও এখন রাষ্ট্রকে জড়াতে হচ্ছে বেশ কিছুটা অর্থনীতির সঙ্গে। আমার কয়েক বছর আগে দেখলাম, অতিকায় যৌথ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ‘জেনারেল মোটরস’কে অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়তে। এই সঙ্কট কাটানোর জন্য মার্কিন কেন্দ্রীয় সরকারকে দিতে হলো অর্থনৈতিক অনুদান। কিন্তু এ সম্পর্কে আমাদের পত্রপত্রিকায় তেমন কোনো আলোচনা হতে দেখা গেল না। অর্থনীতি নিয়ে আমাদের পত্রপত্রিকায় তেমন কোনো আলোচনা হয় না। কেবলই গাওয়া হয় গরিবের দুঃখ নিয়ে কিছু গদবাঁধা গান। আমাদের হতে হবে অর্থনীতিসচেতন।

গণতন্ত্র সূর্যের মত সর্বব্যাপী। রাষ্ট্রে প্রকৃত গণতন্ত্র থাকলে সুশাসন, সুবিচার, উন্নয়ন, জবাবদিহিতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সবই থাকে ও বিকশিত হয়। তবে উন্নয়নের জন্য যখন গণতন্ত্রকে বাদ দেওয়ার কথা বলা হয় তখন বিশেষ কিছু মতলব প্রকাশ পায়। গণতন্ত্রতো উন্নয়নের অন্তরায় নয়। তাহলে ’গণতন্ত্র না উন্নয়ন’ এরূপ চিন্তার মতলবটা কি? গণতন্ত্র না থাকলেও উন্নয়ন হতে পারে। গাদ্দাফির লিবিয়াসহ পৃথিবীর কিছু দেশে তেমনটি হয়েছে। তাই বলে কি ’স্বৈরশাসন জিন্দাবাদ’ বলতে হবে? উন্নয়ন একটি দৈহিক ব্যাপার। গণতন্ত্র সে দেহের মনন, চেতনা, সভ্যতা ও সংস্কৃতি। প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেলেই একটি দেহ শক্তসমর্থ হবে। তাই বলে কি মানব সন্তান সভ্যতা ও সংস্কৃতি বাদ দিয়ে শুধু শরীরের পুষ্টি নিয়েই ভাববে? গণতন্ত্রের কারণে উন্নয়ন হয় না এমন একটি দর্শনের আবিস্কার ও সেই দর্শনের পক্ষে জনমত গঠনের চেষ্টা প্রকৃতপক্ষে স্বৈরতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ছাড়া কিছু নয়।

উন্নয়ন একটি চলমান ও ক্রমবর্ধমান প্রক্রিয়া। তথ্য বিপ্লবের কারণে আমরা এখন অনেক সচেতন। জ্ঞান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি এবং উৎকর্ষের কারণে আমাদের অনেক কিছু বেড়ে যাচ্ছে। মানুষের গড় উচ্চতা বেড়েছে। গড় আয়ুর পাশাপাশি গড় চেহারাও বেড়েছে। নতুন নতুন ওষুধের পাশাপাশি সৌন্দর্যবর্ধক বিভিন্ন প্রকার প্রশাধনী ও মেদ বিধ্বংসী উপকরণ এখন আমাদের হাতের মুঠোই। এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে সেসব প্রশাধনী বিগত এক বৎসরে এদেশের সতের কোটি মানুষ আগের বৎসরের তুলনায় অনেক বেশি ব্যবহার করেছেন। এর ফলে আমাদের গড় চেহারা এক বৎসরে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী বছরে আরও বৃদ্ধি পাবে। এভাবে দিনে দিনে আমাদের চেহারা অনেক ভালো হয়ে যাচ্ছে । সুতরাং এবার তাহলে গণতন্ত্র নিপাত যাক!

গণতন্ত্র না উন্নয়ন? : প্রশ্নটি নতুন নয়। এই প্রশ্নটি বা এই ইস্যুটি ওঠার পর মনে পড়ছে পাকিস্তান আমলের কথা। তখন ক্ষমতায় ছিলেন জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খান। ১০ বছর তিনি রাজত্ব করেছেন এবং করেছেন দোর্দপ্রতাপে। আইয়ুব খানের স্লোগান ছিল Development rather than Democracyঅর্থাৎ গণতন্ত্রের চেয়ে আমাদের বেশি প্রয়োজন অর্থনৈতিক উন্নয়ন। সম্ভবত এই নীতিতে আইয়ুব খান দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন বলেই তিনি গণতন্ত্রকে ছেঁটে ফেলেছিলেন। তিনি চালু করেছিলেন এক আজব গণতন্ত্র। সেটির নাম ছিল মৌলিক গণতন্ত্র।

আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্র : আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির শাসন চালু করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন জনগণের ভোটে। তবে জনগণ সরাসরি ভোট দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করবেন না। পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলে অর্থাৎ সাবেক পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার ইউনিয়ন পরিষদ। সেগুলোর চেয়ারম্যান এবং সদস্যদের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২০ হাজার। এই ১ লাখ ২০ হাজার সদস্য সরাসরি ভোট দিয়ে দেশের প্রেসিডেন্ট বানাবেন। এই প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা হবেন মৌলিক গণতন্ত্রের স্তম্ভ। এভাবে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা ব্যবস্থাকে বলা হবে মৌলিক গণতন্ত্র। সোজা কথায় আইয়ুব খানের জামানায় অর্থনৈতিক উন্নয়নের দোহাই দিয়ে গণতন্ত্রের পরিধিকে মারাত্মকভাবে সঙ্কুচিত করা হয়েছিল। জনগণকে দেয়া হয়েছিল সীমিত গণতন্ত্র। সেজন্যই আইয়ুব খানের থিওরি ছিল ‘গণতন্ত্রের চেয়ে আমাদের বেশি প্রয়োজন অর্থনৈতিক উন্নয়ন’।

অনেক আন্দোলন আর সংগ্রামের পর ১৯৭০ এর নির্বাচন। গণতন্ত্রের লড়াই অতপর এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মাধ্যমে বিশ্বের বুকে জন্ম লাভ করেছে এক নতুন রাষ্ট্র। নাম বাংলাদেশ। সেই বাংলাদেশের ৪৪ বছর পর আবার শোনা যাচ্ছে আইয়ুব খানের কণ্ঠের প্রতিধ্বনি। আ’লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দ, যারা সরকারের কাারী, তাদের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে আইয়ুব খানের থিওরির প্রতিধ্বনি, “এখন দরকার বেশি উন্নয়ন, কম গণতন্ত্র”। এই কথা একাধিক মন্ত্রীর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে। আ’লীগের একজন মন্ত্রী বা একজন সদস্যও এই কথার প্রতিবাদ করেননি। এমনকি প্রধানমন্ত্রীও সেই উক্তিকে প্রত্যাখ্যান বা অস্বীকার করেননি। সুতরাং ধরে নেয়া যায়, আ’লীগের বর্তমান সরকার আইয়ুব খানের সেই পথেই হাঁটছে। এখন থেকে আইয়ুব খানের সেই সব কথা বলে তারা জনগণকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করছেন।

গণতন্ত্রের চেয়ে উন্নয়ন বেশি প্রয়োজন, আইয়ুব সরকারের এই তত্ত্বের মুখর সমালোচক ছিল সেইদিন আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ সেদিন আইয়ুব খানের এই অর্থনৈতিক দর্শনের কঠোর প্রতিবাদ করেছিলো। সেদিন শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ নয়, পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের অর্থাৎ সারা পাকিস্তানের প্রায় সমস্ত বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক এবং বিরোধীদলীয় পলিটিশিয়ানদের সঙ্গে অযুত কণ্ঠে জনগণ বজ্র নির্ঘোষে ঘোষণা করেছিলেন, গণতন্ত্রের বিনিময়ে উন্নয়ন নয়। কম গণতন্ত্র বেশি গণতন্ত্র, কম উন্নয়ন বেশি উন্নয়ন, এসব কথা তারা শুনতে রাজি নন। গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন দুটোই তারা এক সঙ্গে দেখতে চান। এখানে কম বেশির কোনো প্রশ্ন নেই।

৪৪ বছর পর আ’লীগ নেতারা গণতন্ত্র ছাঁটাই করে উন্নয়ন করবেন, এমন কথা কেন বলছেন সেটি মোটেই বোধগম্য নয়। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে দেখা যায়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সংহতি যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি ঈর্ষণীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নও সাধিত হয়েছে। ভারতপন্থী বলে আ’লীগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের পারসেপসন রয়েছে। সেটি ভিন্ন কথা। কিন্তু সেই ভারতেই বিপুল অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে। ভারতকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা হয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অধীনেই ভারত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলেছে এবং পরাশক্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। শিক্ষিত মানুষ জানেন যে অর্থনৈতিক বুনিয়াদ মজবুত না হলে সামরিক দিক দিয়ে শক্তিশালী হওয়া যায় না। প্রচলিত অস্ত্রশস্ত্রের নীরিখে বিচার করলে ভারত বর্তমানে পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম সামরিক শক্তি।

পৃথিবীর এক নাম্বার পরাশক্তি আমেরিকা। সেই আমেরিকায় বিগত ২৫০ বছর ধরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সাফল্যের সাথে ক্রিয়াশীল রয়েছে। তাদের গণতন্ত্রের ধরন আলাদা। সেখানে রয়েছে প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকার। কিন্তু যারা মার্কিন গণতন্ত্রের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করেছেন তারা দেখেছেন যে, এই দেশটিতে গণতান্ত্রিক কার্যক্রম নিখুঁত। মার্কিন পররাষ্ট নীতি এবং মধ্যপ্রাচ্য তথা মুসলিম জাহানের প্রতি তাদের ভূমিকাকে আগ্রাসনবাদী বললেও আপত্তি করার কিছু নাই। কিন্তু তাদের দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের চর্চা নিখাঁদ। সরকার ব্যবস্থা প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির হলেও প্রেসিডেন্ট যাতে ক্ষমতার অপব্যবহার করতে না পারেন তার জন্য প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে সিনেট এবং প্রতিনিধি পরিষদ।

ইংল্যান্ডের কথা বলাইবাহুল্য। এই দেশটি গণতন্ত্রের সূতিকাগার। গণতন্ত্রের ঐতিহ্য তারা শত শত বৎসর হলো অব্যাহত রেখেছে। শুধু ইংল্যান্ড নয়, পশ্চিম ইউরোপের সমস্ত দেশে রয়েছে নির্ভেজাল গণতন্ত্র। প্রতিটি দেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক সমৃদ্ধ। গণতন্ত্র তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিন্দুমাত্র বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট দেশগুলোও রেজিমেন্টেশনের খোলস ছেড়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে এসেছে। পূর্ব জার্মানি পশ্চিম জার্মানির সাথে একীভূত হয়ে এক জার্মানিতে বিলীন হয়েছে এবং গণতন্ত্রের পতাকাতলে আশ্রয় নিয়েছে। কমিউনিস্ট পূর্ব জার্মানি কমিউনিজমের নিগঢ়ে বন্দী ছিল। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গ্রহণের পর দেশটি দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধন করছে।।