Home » অর্থনীতি » বাংলাদেশ কি কোকেনের ট্রানজিট পয়েন্ট!

বাংলাদেশ কি কোকেনের ট্রানজিট পয়েন্ট!

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

Dis 4বাংলাদেশের পুলিশ জুনের শেষ দিকে চট্টগ্রাম বন্দরে এশিয়ার এ যাবৎকালের বৃহত্তম তরল কোকেনের চালান আটক করেছে। পুলিশ বলছে, চালানটি যাওয়ার কথা ছিল ভারতে। মাদক চক্র দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের ব্যবসা বাড়িয়ে চলেছে, এই ঘটনা সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

১৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের এই কোকেনের চূড়ান্ত গন্তব্য ভারত ছিল কিনা কিংবা তা এশিয়া বা ইউরোপের অন্য কোনো দেশে পাচারের জন্য ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহৃত হতে যাচ্ছিল কিনা তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। বাংলাদেশের পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে ভেড়ার পর তারা চেয়েছিল জাহাজটিকে ভারতে নিয়ে যেতে। তিনি জানিয়েছেন, তিনি এমন চিঠিও পেয়েছেন, যাতে বলা হয়েছিল, চালানটি ভারতের যেকোনো বন্দরে যাবে।

এই অঞ্চলে মাদকের বড় বড় চালান বেশ সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। গত তিন মাসে ভারতীয় ও বিদেশী পুলিশ সূত্রগুলো জানিয়েছে, দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার মাদক চক্রগুলোর পাঠানো স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিমাণে উচ্চপরিশোধিত কোকেন ভারতে আটক হয়েছে। কাঠমান্ডুতেও কয়েক কেজির চালান ধরা পড়েছে। এসব দেশে মাদকের চালান আটকের ঘটনা এই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সম্ভবত ল্যাতিন আমেরিকার অত্যন্ত সংঘবদ্ধ চক্রগুলো এই অঞ্চলের বন্দরগুলোর শিথিল নিরাপত্তার সুযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারগুলোতে গোপনে চালান পাঠাতে দক্ষিণ এশিয়াকে ট্রানশিপমেন্ট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করছে।

অন্যান্য বৈশ্বিক ব্যবসার মতো মেক্সিকোর সিনালোয়া কিংবা প্যাসিফিক কার্টেলের মতো গ্রুপগুলোর কাছে এশিয়া মনে হচ্ছে প্রবৃদ্ধি বাজার। তারা সাম্প্রতিক সময়ে অস্ট্রেলিয়া, হংকং, ফিলিপাইনের দিকেও নজর দিয়েছে।

জাতিসংঘ মনে করে, এশিয়া দিয়ে আরো অনেক বেশি কোকেন পাচার হচ্ছে, সেগুলো শনাক্ত করা যাচ্ছে না। মাদকবিষয়ক জাতিসংঘ সংস্থা ইউএনওডিসি’র এশিয়া প্রতিনিধি ক্রিস্টিনা অ্যালবারতিন বাংলাদেশে কোকেনের এই চালান আটক প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটা সচেতন হওয়ার বড় ধরনের সতর্কবাণী।’ এই ঘটনার আগ পর্যন্ত এই অঞ্চলের মাদকবিরোধী সংস্থাগুলো মূলত হেরোইন ও সিনথেটিক মাদক বিশেষ করে বিশ্বের ৯০ ভাগ অবৈধ আফিম উৎপাদনকারী আফগানিস্তানের দিকেই নজর দিত। কোকেন আটকের ঘটনাগুলো তাদেরকে বিস্মিত করেছে।

ইউএনওডিসি চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মকর্তাদের কিভাবে কাগজপত্রের সূত্র ধরে সন্দেহভাজন চালান শনাক্ত করা যায় সে ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়েছে, তাদেরকে পরীক্ষার সরঞ্জামাদিও দিয়েছে। কিন্তু এসব সরঞ্জামের মধ্যে কোকেন পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। জাতিসংঘ এখন তাদেরকে কোকেন পরীক্ষার সরঞ্জামাদি দেওয়ার কথা ভাবছে।

ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার তুলনায় এশিয়ায় এখনো কোকেন অনেক কম ব্যবহৃত হয়। তবে এই অঞ্চলের দ্রুত প্রবৃদ্ধিশীল দেশগুলোর পার্টিতে যাওয়া নব্য ধনীদের মধ্যে এই মাদকটি ক্রমবর্ধমান হারে জনপ্রিয় হচ্ছে। ইউএনওডিসি’র মেক্সিকো প্রতিনিধি অ্যান্টোনিও মাজিতেলি বলেন, ল্যাতিন আমেরিকার মাদক পাচারকারী সংস্থাগুলো অত্যন্ত সঙ্ঘবদ্ধ। তারা এখন বিশেষ করে তাদের কোকেন ও মেথামফেটামিন পণ্যের জন্য নতুন নতুন বাজার খুঁজছে। বর্তমানে এশিয়া হলো তাদের সে ধরনের বাজার।

ভারতের নারকোটিকস ব্যুারোর হিসাবমতে, ২০০৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত দেশটিতে মাদক আটক প্রায় তিনগুণ বেড়েছিল। তবে গত বছর কমে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তা বাড়ছে। উদারহণ হিসেবে বলা যায়, পেরুর এক ব্যক্তিকে গত জুনে স্যুটকেসে লুকানো এক কেজি ড্রাগসহ আটক করা হয়। তিনি এর আগে চারবার ভারতে এসেছিলেন। পুলিশের মতে, এই মাদক বেঙ্গালুরু, দিল্লী ও মুম্বাইয়ের মতো ভারতীয় নগরগুলোতে ব্যবহারের জন্য আনা হয়েছিল।

গত মে মাসের প্রথম দিকে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে তথ্য পেয়ে বাংলাদেশে কাস্টমস এজেন্টরা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে একটি কন্টেইনারে সূর্যমুখী তেলভর্তি ১০৭টি নীল প্লাস্টিক ব্যারেল আটক করে। কর্মকর্তারা হিসাব করে দেখেছেন, ওই তেলে ৬০ থেকে ১০০ কেজি কোকেন মেশানো রয়েছে। সম্ভবত স্থলপরিবেষ্টিত দেশ বলিভিয়া থেকে কোকেন আসে। এই দেশটি সূর্যমুখী তেলের জন্য বিখ্যাত, তাছাড়া শীর্ষ স্থানীয় কোকেন উৎপাদকও।

৩০ মার্চ চালানটি উরুগুয়ে থেকে সিঙ্গাপুর আসে। বাংলাদেশী পুলিশ জানিয়েছে, চালানটি এসেছিল সাউথ ফ্রেইট লজিস্টিকস নামের একটি কোম্পানির নামে। কন্টেইনারটি পরে একটি ছোট জাহাজে করে চট্টগ্রামে পাঠানো হয়েছিল। সাউথ ফ্রেইট লজিস্টিকসের যে নম্বরটি দেওয়া হয়েছিল, সেটিকে সক্রিয় পাওয়া যায়নি, এমনকি মন্তব্য করার জন্য কোম্পানির কেউ সাড়া দেয়নি।।

(গার্ডিয়ান অবলম্বনে)