Home » অর্থনীতি » যদি দুর্নীতির মাত্রা সহনীয় পর্যায়েও থাকতো, তাহলে…

যদি দুর্নীতির মাত্রা সহনীয় পর্যায়েও থাকতো, তাহলে…

এম. জাকির হোসেন খান

Dis 3পদ্ধতিগত দুর্নীতি না থাকলে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ২ থেকে ৩ শতাংশ বাড়তো’, সম্প্রতি এ মন্তব্যটি করেছেন ক্ষমতাসীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এমন নয় যে, এ তথ্যটি নীতি নির্ধারকদের এতদিন অজানা ছিলো। তবে এ মন্তব্যটি অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেছে সদ্য বিশ্ব ব্যাংক কর্তৃক বাংলাদেশকে নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ হিসাবে ঘোষণা প্রদানের পর। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কতখানি বা দুর্নীতির সর্বব্যাপী বিস্তারের কারণে আদৌ অদূর ভবিষ্যতে আয়বৈষম্যহীন মধ্যম আয়ের দেশ হিসাবে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান পাবে কিনা, সাধারণ মানুষের জীবন এবং জীবিকার ওপর মাথাপিছু আয়ের এ প্রবৃদ্ধি আদৌ কোনো ফল বয়ে আনবে কিনা তা পর্যালোচনা করা দরকার। উল্লেখ্য, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল প্রণীত দুর্নীতির সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার’।

২০০০ সালে প্রণীত বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ যদিও অর্থনীতিতে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে তবুও যদি এমন দেশের (যেমন, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি) পর্যায়ে দুর্নীতির মাত্রা কমিয়ে নিয়ে আসতে পারতো, তাহলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার অতিরিক্ত আরো ২.১৪% বৃদ্ধি পেয়ে ৬% থেকে ৮.১৪% হতো। আর যদি বর্তমান দুর্নীতির মাত্রা সর্বোচ্চ সততা চর্চার দেশের পর্যায়ে নামিয়ে নিয়ে আসতে পারতো তবে তা ৮.% এ দাড়াতো’। ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অতিরিক্ত আরো লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা জিডিপিতে যুক্ত হতো যার একান্ত দায় অতীত এবং বর্তমানে ক্ষমতাসীন সরকারগুলোর। শুধু তাই নয়, ওই প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়, বাংলাদেশের দুর্নীতির ঝুকির মাত্রা (১৯৯১৯৭ সময়কালে আন্তর্জাতিক কান্ট্রি রিস্ক গাইড সূচকের গড় মান ছিলো ১.৭৬, যা অনেক নিম্নতম) পোল্যান্ড বা হাঙ্গেরি’র পর্যায়ে নামিয়ে আনা হলে বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় উৎপাদনের পরিমাণ ১৯৯৭ সালে ৩৫০ ডলারের পরিবর্তে প্রকৃতপক্ষে ১৮% বৃদ্ধি পেয়ে ৪০০ ডলারে দাড়াতো। যদি এ হিসাবই ধরা হয়, সরকারগুলো যদি দুর্নীতির বিস্তারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতো দুর্নীতির বিস্তার না হলে মাথাপিছু জাতীয় আয় ২০১০১১ অর্থ বছরে অর্থাৎ ৫ বছর আগেই ১০৪০ ডলারে পৌছতো। ক্ষমতাসীনরা এটা কখনো স্বীকার তো করেই না উল্টো যখনই দুর্নীতির বিষয়টি নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে উত্থাপিত হয়েছে তখনই তাদেরকে দেশের উন্নয়ন বিরোধী বা বিদেশি শক্তির এজেন্ট হিসাবে চিত্রিত করার অপচেষ্টা চালিয়েছে।

২০০০ সালের বিশ্ব ব্যাংকের একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় বাংলাদেশে দুর্নীতির মাত্রা যদি সামান্যও কমানো সম্ভব হতো অর্থাৎ ঝুকি সূচকে বাংলাদেশের মান ১৯৯১৯৭ সময়কালে ভারতের (সূচকের মান ২.৭১) কাছাকাছিও অর্জন করা সম্ভব হতো, তবে প্রতি বছর অতিরিক্ত ৩০০ মিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ আনা সম্ভব হতো। তাই সরকার যতই সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করুক না কেন সম্প্রতি ‘বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ফিরে আসছে’ বলে অর্থমন্ত্রী মন্তব্য করলেও একইদিন একটি জাতীয় দৈনিক জানায়, ‘টয়োটা, নকিয়া, স্যামসাং, সনি, কোকোকলা, নেসলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে চাইলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা, লাল ফিতার দৌরাত্ম এবং অনৈতিক সুবিধা প্রদানের দাবির প্রেক্ষিতে বিনিয়োগ প্রস্তাব গুটিয়ে ভারতে, মিয়ানমার বা অন্য কোন দেশে চলে গেছে’। ‘বৈদেশিক বাণিজ্য ঝুঁকি: বাংলাদেশ’ (ওভারসিজ বিজনেস রিস্ক: বাংলাদেশ) শীর্ষক এই যুক্তরাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার সবচেয়ে বড় সমস্যা সাংঘর্ষিক রাজনীতি, ঘুষ ও দুর্নীতি। এ ছাড়াও রাজনীতিবিদ, আমলা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বৈষম্যমূলক ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে’। দুর্নীতির কারণে বিনিয়োগের এ দুর্বল অবস্থানের প্রেক্ষিতে আগামি ৩ বছরের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন ক্রমেই দু:স্বপ্নে পরিণত হবে তা অনায়াসে বলা যায়।

বাণিজ্য এবং উন্নয়ন সংক্রান্ত জাতিসংঘের সংস্থা (আঙ্কটাড) এর মতে, গত ৪ দশকে বাংলাদেশে পূঞ্জীভূত বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) পরিমাণ দাড়িয়েছে জিডিপি’র মাত্র ৬.%, অথচ সার্কভুক্ত দেশসমূহের ক্ষেত্রে তা বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ (জিডিপি’র ১১.%) এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে এ হার বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় ৪ গুণ (অর্থাৎ জিডিপি’র ২৫.২ শতাংশ)। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে গত বছর ভারত, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপে এমনকি সহিংসতায় নাকাল এবং গোলযোগপূর্ণ পাকিস্তানে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লেও বাংলাদেশে তা বাড়েনি, রাজনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল থাকলেও বাংলাদেশে এফডিআই কমেছে। সম্প্রতি আঙ্কটাড প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালে বাংলাদেশে নিট এফডিআই দেখানো আগের বছরের তুলনায় ৭ কোটি ডলার বা প্রায় ৫ শতাংশ কম। তার কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে চট্টগ্রামের কোরিয়ান ইপিজেডের মালিক কিহাক সাং জানান, ‘কোরিয়ান ইপিজেডের পরিবেশ ছাড়পত্র পেতে তাঁর ১০ বছর ঘুরতে হয়েছে—-ক্রেতারা আগে বাংলাদেশকে পছন্দ করলেও তাঁরা এখন বাংলাদেশের চেয়ে ভিয়েতনামকে পছন্দ করছেন’। আর বিনিয়োগ না বাড়ার ফলেই দেশে বেকারত্ব ক্রমেই বাড়ছে, যার ফলে আয়বৈষম্য আরো বেড়ে দরিদ্র আরো দরিদ্রতর হচ্ছে এবং মধ্যবিত্ত নিম্ন মধ্যবিত্তে পরিণত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)’র সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশে বেকারত্ব বৃদ্ধির হার নব্বই এর দশকে ১.৯ শতাংশ ছিল, যা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে তা ৩.৭ শতাংশে দাড়িয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা প্রায় ৩০ মিলিয়ন বলে জানানো হয়।

প্রশ্ন হলো ক্ষতাসীনরা বাংলাদেশকে উন্নয়নের জোয়ারে ভাসিয়ে দিচ্ছে বলে দাবি করলেও ২০০৯ সাল এ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর গত ৭ বছরে দুর্নীতির মাত্রা না কমে উল্টো তা ব্যাপকভাবে কেন বাড়লো? অথচ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার দিনবদলের সনদে (প্যারা ২) বলেছিলো, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে বহুমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে, ক্ষমতাধরদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণ দিতে হবে, রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরের ঘুষ, দুর্নীতি উচ্ছেদ, অনুপার্জিত আয়, ঋণখেলাপি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, কালোটাকা ও পেশী শক্তি প্রতিরোধ ও নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে’। এমনকি ক্ষমতাসীনরা সকল বিতর্কিত কর্মকান্ডকে ঢাকার জন্য সংবিধানকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করলেও একই সংবিধানের ২০() অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসাবে কোন ব্যক্তি অনুর্পাজিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবে না’। অথচ বাস্তবে সকল ক্ষেত্রেই দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০১৪ সালে ০১০০ পয়েন্ট স্কেলে ২৫ পয়েন্ট পেয়ে ২০১৩ সালের তুলনায় তালিকার উচ্চক্রম অনুযাযী বাংলাদেশের ৯ ধাপ অবনতি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারের প্রকৃত অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ।

দুর্নীতি রোধে জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার যে প্রধান নিয়ামক সে সম্পর্কে জনষ্টন এবং ডয়েগ (১৯৯৬) বলেন, ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যথাযথভাবে কার্যকর থাকলে গভীরে প্রোথিত দুর্নীতির মাত্রা কমে তুলনামূলকভাবে সহনীয় বা নিম্নতম পর্যায়ে দুর্নীতি সংঘটিত হয়’। অথচ ক্ষমতাসীনরা দাবি করছে, গণতন্ত্র ছাড়াই তারা বাংলাদেশকে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর বানিয়ে ফেলবে। কিন্তু যে সত্যটা গোপন করছে তা হলো ওসব দেশে অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রাথমিক পর্যায়ে আইনের শাসন বিশেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা নিশ্চিতে কঠোরতা ছিল। মাহাথির মোহাম্মদ কিংবা লী কুয়ানের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কতখানি জেহাদ করেছেন তা ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয়। প্রকৃত মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রের সকল মানুষের জীবন মানের সুষম উন্নয়ন বা বৈষম্যহীন সমাজ নিশ্চিত করতে হলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ না করলে মাথাপিছু জাতীয় আয় বৃদ্ধি যে প্রকৃতপক্ষে অর্থনীতির গুণগত মান অর্জন সম্ভব নয়, তার চাক্ষুষ প্রমাণ হলো ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল, মেক্স্রিকো এবং পূর্ব ইউরোপের দেশ সমূহ। এসব দেশে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জবাবদিহিতাহীন সরকার ক্ষমতায় থাকায় এবং মাফিয়াতন্ত্রের ব্যাপক উপস্থিতির ফলে দুর্নীতির বিস্তার ঘটেছে এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে যাচ্ছেনা। রোজ অ্যাকারমান বলেন, ‘যখন কোনো রাষ্ট্র্র ক্লিপটোক্রেসি (একচেটিয়া ঘুষ গ্রহীতা) এবং মাফিয়াতন্ত্রের হাতে জিম্মি হয় তার সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একটি গোষ্ঠীর স্বার্থেই পরিচালিত হয়’।

মনসুর ওলসন (১৯৯৩) মতে, ক্লিপটোক্রেসি সাধারণত তখনই উদ্ভব হয়, যখন রাষ্ট্রে সম্পদের স্বল্পতা থাকে, আইনী কাঠামো অস্পষ্ট ও দুর্বল হয় এবং সর্বোপরি সাংবিধানিকভাবে একক ব্যক্তি’র হাতে সর্বময় ক্ষমতা কেন্দ্রীভুত থাকে। দুর্নীতির বিস্তারের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ প্রসঙ্গে নিকসন (১৯৯৬) বলেন, ‘এ ধরনের ক্লিপ্টোক্রেটরা দেশের সার্বিক অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ না করলেও পৃষ্ঠপোষকতা ও সম্পদের যোগান ও বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে অনুগত এবং সংকীর্ণ চিন্তার প্রশাসন সৃষ্টি এবং এক শ্রেণীর ব্যবসায়ীদের সাথে অনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করার ক্ষেত্রে ‘অর্থনীতি’ ও ‘রাজনীতি, ‘সরকারি’ এবং ‘ব্যক্তিগত’ সম্পদের মাঝে সুনির্দিষ্ট সীমারেখা তুলে দিয়ে যেকোন প্রকারে সম্পদ আত্মসাতে লিপ্ত হয়। আর তা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে ক্লিপটোক্রেটরা রাষ্ট্রের কর ব্যবস্থা, আইন প্রণয়ন বা রহিত, দাম নিয়ন্ত্রণ এবং বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশে জনপ্রতিনিধি, সরকারের উচ্চ পদস্থ ব্যক্তি এবং ক্ষমতাসীনদের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও গোষ্ঠী অবাধে কর ফাকি দিলেও সাধারণ জনগণের ওপর ব্যাপকভাবে পরোক্ষ করা বা ভ্যাটের বোঝা চাপানো হচ্ছে।

শুধু তাই নয়, ২০০৯ এ ক্ষমতাসীন মন্ত্রী, এমপিদেও সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করার কথা বললেও এখন পর্যন্ত ক্ষমতাসীনরা সম্পদের কোনো হিসাব প্রকাশ করেনি। তাছাড়াও, জ্বালানি সংকটের অজুহাতে ‘বিদ্যুত ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’ প্রণয়ন করে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য যাচাই ছাড়াই কমিশনের বিনিময়ে রেন্টাল বিদ্যৎ কেন্দ্রের চুক্তির ফলে শুধুমাত্র ২০১২১৩ এবং ২০১৩১৪ অর্থ বছরেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদান করতে হয় সরকারি কোষাগার থেকে। এমনকি দুদকের নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষমতাসীনরা শেয়ার বাজার সহ ব্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে আমেরিকা, কানাডা, লন্ডন, দুবাই, মালয়েশিয়া সহ বিভিন্ন দেশে পাঁচার করলেও বা পদ্মা সেতু নির্মাণে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ দুদক দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্তদের নির্বিচারে দায়মুক্তি দিচ্ছে। শুধু তাই নয় দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ক্ষমতাসীনদের বাঁচাতে দুদক আইন সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় দুর্নীতি সংঘটনের সুযোগ অবারিত হয়েছে। দুর্নীতি রোধে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্বপ্রাপ্ত গণমাধ্যমের অধিকাংশ মালিকানা দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ক্ষমতাসীনদের আশীর্বাদপুষ্ট ব্যবসায়ী হওয়ায় দুর্নীতি ক্রমেই রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় পাওয়ায় অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি উল্লেখ করেন, ‘‘নিজেদের দলীয় লোকের সমর্থনের কারণে সোনালী ও বেসিক ব্যাংকে আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় জড়িত সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাচ্ছে না’।

অ্যাকারম্যানের (১৯৯৬) মতে, দুর্নীতির ফলে যেকোনো সরকারি প্রকল্পের ব্যায় ৩০৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। গত কয়েক বছরে সরকার কর্তৃক বাস্তবায়িত বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প যেমন, পদ্মা সেতু, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বিভিন্ন ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজের টেন্ডার প্রদানের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, কোনো ধরনের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা মূলক ব্যবস্থা ছাড়াই সরকারি ব্যায় ২০০৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় দুর্নীতির অবাধ বিস্তারের ফলে একদিকে ধনীদরিদ্রের বৈষম্য বাড়ছে, আর অন্যদিকে সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যক্রমের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জালিয়াতি বা অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুস্পষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলেও তা হিমাগারে, উল্টো বিরোধী বিবেচনায় শত শত কর্মকর্তাকে ওএসডি করে রেখে প্রশাসনকে অদক্ষ করা হচ্ছে। কওফম্যান (২০১০) এর মতে, ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য সরকারি বা বেসরকারি অফিসের ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ঘুষ, আত্মসাৎ, স্বজনপ্রীতি বা রাষ্ট্র দখল (state capture)বা রাষ্ট্র কর্তৃক আইন প্রণয়ন, নীতিমালা প্রণয়ন করার মাধ্যমে বিভিন্ন অনৈতিক কার্যক্রম যেমন, টেন্ডারবাজি, প্রতারণা বা অর্থ পাঁচারের ন্যায় কার্যক্রমের মাধ্যমে নির্দিষ্ট গোষ্ঠী লাভবান হচ্ছে, যা ক্রমেই জোরদার হয়। ২০০৩২০১৪ সময়কালে প্রতি বছর গড় বৃদ্ধির হার হিসাবে (২৮.৮৫%) বাংলাদেশ থেকে ২০১৪ সালেই কমপক্ষে প্রায় ১৮.৪১ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা পাঁচার হয়।

১৯৯৫ সালে মাউরু, ১৯৯৬ সালে অ্যাকারম্যান এবং ১৯৯৮ সালে গুপ্ত, ডেভোডি এবং অ্যালান্সোটার্ম স্পষ্ট করে উল্লেখ করেন, ‘দুর্নীতির ফলে নিম্ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও কারণে সমাজে আয় বৈষম্য এবং দারিদ্র হার বৃদ্ধি পায়; শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক খাতে ব্যয় হ্রাস পায়; সামাজিত কর্মসূচীর জন্য যথাযথভাবে সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হয়না। সর্বোপরি দরিদ্রদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ঝুঁকির সৃষ্টি হয়’। ২০১০ এর খানা আয়ব্যয় জরিপের তথ্যানুযায়ী, ১৯৮৩৮৪ অর্থ বছরে সর্বনিম্ন ৪০% মানুষের আয় সর্বমোট আয়ের ১৮.৯৫% হলেও ২০১০ এ তা হ্রাস পেয়ে ১৪.৩২% এ দাড়িয়েছে, অন্যদিকে সর্বোচ্চ উপার্জনকারী ১০% খানার আয় ১৯৮৩৮৪ অর্থ বছরে সর্বমোট আয়ের ২৯.২৩% হলেও ২০১০ সালে তা বেড়ে ৩৫.৮৪% এ দাড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, টিআইবি’র ২০১২ সালের খানা জরিপে জানা যায়, বাংলাদেশের ৬৩.% সেবা গ্রহণকারী কোনো না কোনো দুর্নীতর শিকার হয়েছে এবং এর মধ্যে ৫৩.% কে সেবা গ্রহণ করতে ঘুষ দিতে হয়েছে। এ হিসাবে চলতি বাজার মূল্যে বাংলাদেশের খানাগুলোকে ২০১১১২ অর্থ বছরে জিডিপি’র ২.% এবং জাতীয় বাজেটের ১৩.% অর্থ ঘুষ ও নিয়মবহির্ভূত অর্থ দিতে হয়েছে। উক্ত জরিপের তথ্যানুযায়ী নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে তাদের বাৎসরিক ব্যয়ের ৫.৫ শতাংশ অবৈধ ঘুষ হিসাবে ব্যায় করতে হয়েছে অথচ উচ্চ আয়ের পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এ হার ছিল মাত্র ১%, যা বৈষম্যের সামান্য চিত্র মাত্র।

গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত হলেও ক্ষমতাসীনরা উল্টো পথে পরিচালিত হওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতির কারণে নিম্ন বিনিয়োগ, চুড়ান্ত পণ্য উৎপাদনের শিল্পে ধীর প্রবৃদ্ধি এবং দুর্বল শ্রম বাজারের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকা বা ব্রাজিলের মতো দশকের পর দশক মাথাপিছু মধ্যম আয়ের প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে ‘নিম্ন মধ্যম আয়ের ফাঁদে’ অবস্থান করতে হতে পারে।