Home » অর্থনীতি » সড়ক দুর্ঘটনা :: ওরা শুধুই সংখ্যা

সড়ক দুর্ঘটনা :: ওরা শুধুই সংখ্যা

এম. জাকির হোসেন খান

Dis 3ঈদ পূর্ব এবং পরবর্তী যাত্রায় ১৫ জুলাই থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত মহাসড়কে সংঘটিত প্রায় ২০০ সড়ক দুর্ঘটনায় ২৫০ জন মানুষ নির্মমভাবে নিহত হন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ২৪টি প্রাণ হারিয়ে গেছে। আহত হয়েছে শত শত মানুষ যাদের অনেকেই সারা জীবনের জন্য কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। ঈদযাত্রায় মহাসড়কে প্রাণহানির এ সংখ্যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। উল্লেখ্য ‘ঈদুল ফিতরের সময় দুর্ঘটনায় ২০১৪ সালে ৬৭ জন, ২০১৩ সালে ৫২ জন, ২০১২ সালে ৪২ জন, ২০১১ সালে ৪৮ জন এবং ২০১০ সালে ৬৩ জন মৃত্যুবরণ করেন’। এরই প্রেক্ষিতে, সরকার মহাসড়কে অটো রিক্সা নিষিদ্ধ ঘোষনা করে এবং যথারীতি মিডিয়া প্রেমিক যোগাযোগ মন্ত্রী নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল রোধ করার ‘স্বপ্ন’দেখান। প্রশ্ন হলো, বিদ্যমান সড়ক পরিবহন আইনের মাধ্যমে পরিবহন খাতে এবং মহাসড়কে শৃংখলা আনার সুযোগ থাকলেও তা না করে পরিবহন খাতকে সকল অবৈধ উপার্জন, কালো টাকা সাদা করা এবং অপরাজনীতির হাতিয়ার বানিয়ে নাগরিকদের মৃত্যুমুখে ঠেলে দিয়ে সত্যকে ধামাচাপা আর কতদিন?

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী প্রতিষ্ঠান চার মন্ত্রীপ্রতিমন্ত্রীসহ ৪৪ সদস্যের ‘জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলে’র দু’মাস অন্তর সভা হওয়ার কথা থাকলেও গত তিন বছরে মাত্র দুটি বৈঠক হয়েছে। আর এসব সভায় নেয়া সিদ্ধান্তের অধিকাংশই বাস্তবায়ন না হওয়ায় দুর্ঘটনার হার বেড়েই চলছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করে নিরাপদ সড়ক গড়ে তুলতে কাউন্সিলের হাতে অগাধ ক্ষমতা থাকলেও রহস্যজনক কারণে যথাযথভাবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করার ফলেই মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। একারনে জাতীয় মহাসড়কগুলোয় ২৩ জুলাই থেকে সিএনজি চালিত অটোরিকশা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত সরকার নিলেও তা বাস্তবায়ন দুরুহ। বর্তমানে নিবন্ধিত প্রায় তিন লাখ সিএনজি অটোরিকশার বড় একটি অংশ মহাসড়কগুলোতে চলাচল করে থাকে। এর আগেও মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এবং অগভীর নলকূপের ইঞ্জিনচালিত তিন চাকার বাহন নসিমনকরিমন ও ভটভটির চলাচল নিষিদ্ধ করা হলেও এগুলোর চলাচল মহাসড়কে চলাচল কখনই বন্ধ ছিল না। কারণ, এসব যানবাহনের অধিকাংশের মালিক মূলতঃ ক্ষমতাসীন দলের সাথে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় নেতাকর্মী ও প্রভাবশালীরা। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা পরিষদের এ পর্যন্ত ২২টি সভার প্রতিটিতে এ ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত হলেও বাস্তবে ঢাকাচট্টগ্রাম ও ঢাকাসিলেটসহ বিভিন্ন মহাসড়কে এসব যানবাহন বন্ধ হয়নি। উল্লেখ্য, এবং গত কয়েক বছরে সিএনজি অটোরিক্সা, টুকটুকি, নছিমনসহ বিভিন্ন ধীরগতির যানবাহনের অবৈধভাবে হাইওয়ে বা থানা পুলিশের সাথে যোগসাজশে মহাসড়কে অনুপ্রবেশ ফলে দুর্ঘটনার পরিমাণ আশংকাজনক হারে বেড়ে গেছে। আর ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মী, কতিপয় অসাধু পুলিশের সহযোগিতায় ও পরিবহন নেতাদের যোগসাজশে বেশির ভাগ মহাসড়কে এসব যানবাহন চলাচল করতে দেখা যায়। তাই এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এ নিষিদ্ধ হওয়া ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, তা কখনো কার্যকর হবেনা, যতক্ষন না আইন সবার জন্য সমান হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘মহাসড়ক ক্রমেই মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে’। দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই) এর প্রতিবেদন মতে, গত ১৫ বছরে ৪৯,৮৪৭টি দুর্ঘটনায় ৪২,৫২৬ জন নাগরিকের মৃত্যু হয় এবং ৮০ হাজার ২শ ৩৯ জন আহত বা পঙ্গুত্ব বরণ করেন। প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি হবে, কারন অনেক স্থানীয় পর্যায়ের দুর্ঘটনার খবর প্রকাশিতই হয়না। ২০০৮ এ প্রণীত টিআইবি’র বিআরটিএ বিষয়ক গবেষণা প্রতিবেদন মতে, থানায় মামালা দায়েরকৃত মামলা অনুযায়ী ৪,৮৬৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩,৭৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং সংঘটিত দুর্ঘটনার মাত্র ১৯% থানায় এজাহারভুক্ত হয়। এআরআই’র সাবেক পরিচালক এর মতে, ‘দেশের বিদ্যমান যোগাযোগ অবকাঠামো ঈদের মতো বড় উৎসবের বিপুল মানুষের চাপ নেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। আবার অধিক মুনাফার লোভে পরিবহন চালকমালিকেরা তখন অতিরিক্ত ট্রিপ দেয়। ফলে চালক এবং পরিবহন কোনটারই বিশ্রাম মেলে না। ফিটনেসবিহীন যানবাহন বা ভালো যানবাহন বিরামহীন চলাচলের কারণে বিগড়ে যায়। আর চালকের মধ্যে বেপরোয়া গতি তোলার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়’। ঈদে যাত্রী বেড়ে যাওয়ায় প্রতিটি পরিবহন কোম্পানি বাসের যাত্রা (ট্রিপ) ১৫২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। ফলে বাড়তি চাহিদার সুযোগ নিয়ে নগর পরিবহনের প্রায় পাঁচ হাজার লক্কড়ঝক্কড় বাস মহাসড়কে নেমে পড়ে।

এসব গাড়ির চালকদের অনেকেরই দূরপাল্লার বাস চালানোর অভিজ্ঞতা থাকে না বা থাকলেও তা যৎসামান্য। টিআইবি’র বিআরটিএ বিষয়ক গবেষণা প্রতিবেদন, ২০০৮ এ ৩৬৬ জন গাড়ি চালকের ওপর জরিপে দেখা যায়, ৯৭% চালক প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়া গাড়ি চালনা পেশায় এসেছেন; ৬১% চালক পরীক্ষা না দিয়ে লাইসেন্সের ধরন ভেদে ৫০০ থেকে ৭,০০০ টাকা ঘুষ দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স সংগ্রহ করেছেন এবং ৫৪% চালক মেয়াদউত্তীর্ণ লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন। বৈধ লাইসেন্সবিহীন চালকের সংখ্যা প্রায় সাত লাখ। অনেকদিনের খবর, শাজাহান খানের শ্রমিক ফেডারেশনের তালিকা ধরে ১৯৯০ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার পেশাদার চালককে যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই লাইসেন্স দিয়েছে বিআরটিএ। এরপর ২০১০১১ সালেও একইভাবে লাইসেন্স দেওয়ার জন্য ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছিলেন শাহজাহান খান ও তাঁর সংগঠন। জরিপে দেখা গেছে, বৈধ লাইসেন্স পেতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে গ্রাহক ভূয়া মেডিকেল সনদ ব্যবহার করেন। বর্তমানে সারাদেশে রেজিস্ট্রিকৃত যানবাহনের সংখ্যা ২১ লাখ হলেও ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ। তবে, এআরআই প্রণীত এ গবেষণায় জানা যায়, ৫৪ শতাংশ দুর্ঘটনা হয় অতিরিক্ত গতিবেগ এবং ৩৮ শতাংশ দুর্ঘটনার কারণ বেপরোয়া গাড়ি চালানো। হাইওয়ে পুলিশ দুর্ঘটনা প্রতিরোধে তেমন কোন দায়িত্ব পালন করে না; বরং ফিটনেস বিহীন গাড়িকে ঘুষের বিনিময়ে ছেড়ে দিতেই অভ্যস্তÍ। আর মামলা হলেও উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে বা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দায়ী চালকরা প্রায়ই আদালত থেকে পার পেয়ে যায়। চালকদের স্বেচ্ছাচারিতা, অদক্ষতা, ট্রাফিক আইন না মানা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, মহাসড়কের অবকাঠামোগত ক্রুটিসহ এবং অতিরিক্ত যাত্রী বহন করায় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে এমন মর্মন্তুদ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

বাস্তব পরিস্থিতি হচ্ছে আমাদের মহাসড়কগুলো মহাসড়কের চরিত্র ধারণ করেনি। মহাসড়কে বাস একটু দ্রুতই চলে, এটাই স্বাভাবিক। কারণ তাকে অনেক দূরের পথ পাড়ি দিতে হবে। কিন্তু দেশের অধিকাংশ হাইওয়েতেই ডিভাইডার নেই, নেই সামনের রাস্তার দিক নির্দেশনা। ফলে বাঁক নেওয়ার সময়ই অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া আছে ছোট, মাঝারি ও ভারী যানবাহনের দৌরাত্ম। আবার ট্রাফিক সিগন্যাল নেই অধিকাংশ রাস্তায়, নেই রাতে আলোর ব্যবস্থা, সেতু বা বেইলি ব্রিজের নির্দেশনা। এসব না থাকার কারণেও অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। দূরপাল্লার পরিবহনের জন্য বাসগুলোতে একাধিক চালক রাখার বিধান থাকলেও তা কোনোভাবেই কার্যকর হয়নি। এখন অধিকাংশ রাস্তাই নষ্ট, খানাখন্দে ভরপুর। এর ফলে গাড়ির গতি কমে যায়। ফলে যখন রাস্তা ভালো থাকে তখন চালকরা দ্রুত চালায়। তাই শুধু অটোরিকশা বন্ধ করলেই সড়ক দুর্ঘটনা কমবে না। প্রশ্ন হচ্ছে, যথাযথ প্রশিক্ষণ না নিয়ে লাইসেন্স পাচ্ছে কি করে? দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ও আইন অমান্যকারীদের কঠোর শাস্তি প্রদানের দায়িত্ব যাদের তারাই বা কি করছে। পাঠকের নিশ্চয় মনে আছে, ক্ষমতাসীন একজন মন্ত্রী একইসাথে যিনি নিজেকে শ্রমিক নেতা বলেও দাবি করেন, তিনি বিআরটিএ কর্তৃক কোনো পরীক্ষা নয় শুধু রাস্তায় শুধু গরুছাগল চিনতে পারলেই তাকে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার দাবি করেছিলেন। সুতরাং নতুন আইন প্রণয়নের কথা বলে দ্বৈত অবস্থান বা শ্রমিকদের নিয়ে ক্ষমতাসীনদের অপরাজনীতি করার মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা কমবে না।

উল্লেখ্য, গত বছরের অক্টোবর মাসে নাটোরে অথৈ পরিবহন ও কেয়া পরিবহন নামের দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘষের্র পর নিহত এবং আহত যাত্রীদের ওপর গাড়ি চালিয়ে দেওয়ায় ৩৬ জন যাত্রী নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পর সরকারি তদন্তে জানা যায়, কেয়া পরিবহনের ফিটনেস সার্টিফিকেট ও রুট পারমিট হালনাগাদ ছিল না, অথৈ পরিবহনের রেজিস্ট্রেশন নম্বরও ছিল ভুয়া, নিয়ম ভেঙ্গে তারা ছাদে যাত্রী তুলেছিল এবং চালক বেপরোয়া গতিতে সড়কের পরিস্থিতি ও যানবাহনের গতিবিধি না বুঝেই একটি ট্রাককে ‘ওভারটেক’ করার ফলে এতগুলো মানুষের মৃত্যু হয়।

এআরআই দেশের সড়কমহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ণ ১৪৪টি ব্ল্যাক স্পট চিহ্নিত করেছে। এআরআই পরিচালক ডঃ তানভীর এর মতে, ‘অধিকাংশ ড্রাইভার কিভাবে নিরাপদভাবে (বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহন থেকে কমপক্ষে ২০০ থেকে ৩০০ ফুট দূরত্ব বজায় রাখা) ওভারটেক করতে হয় তা জানে না, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ না নিয়ে যাদের নিরাপদ গাড়ি পরিচালনার ন্যূনতম জ্ঞানও নেই এমন পূর্বসূরীদের কাছে থেকে ড্রাইভিং শিখে। অনেক সময় এ ওভারটেকগুলোকে ড্রাইভাররা খেলা হিসাবে নেয়’। এআরআই জরিপে আরো দেখা যায়, ২০১২ সালে ৩৮.১ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বাস এবং ৩০.৪ শতাংশের জন্য দায়ী ট্র্রাক। অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি মহাসড়ক ক্ষমতাসীনদের নীরবতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে মদদে ক্রমেই মহাসড়ক মরণ ফাঁদে পরিণত হচ্ছে।

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও জবাবদিহিতা না থাকায় ড্রাইভার ও শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন ও পরিবহন টার্মিনাল কমিটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন। জেলা শহর, সড়ক সংযোগ স্থল, জেলা ও বিভাগীয় শহরের প্রবেশ পথে গড়ে পাঁচ থেকে বিশটি স্থানে শ্রমিক ইউনিয়ন ও মালিক সমিতিকে বাস প্রতি মাসিক চাঁদা দিতে হয় (টিআইবি, ২০০৮)। অতিরিক্ত বা ছাদে যাত্রী বহন ও বাড়তি ভাড়া আদায়ের পেছনে অবৈধ চাঁদার প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। আর চাঁদা প্রদান না করলে রুটে গাড়ি চালানো সম্ভব হয় না।

টিআইবি’র বিআরটিএ বিষয়ক গবেষণা প্রতিবেদন, ২০০৮ এ সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হয় তা হলো, সড়ক নিরাপত্তা কমিটিগুলো কার্যকর না থাকা; মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩’র আইন ভঙ্গের দায়ে শাস্তির বিধান সংক্রান্ত ধারা ২০ বছরেও হালনাগাদ না করা; ‘ন্যাশনাল রোড সেফটি স্ট্র্যাটেজিক অ্যাকশন প্লানে’ অনুযায়ী প্রতি বছরে ১০% সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তা বাস্তবায়নের জন্য বিআরটিএকে পর্যাপ্ত সম্পদের যোগান না দেওয়া এবং অর্থ বরাদ্দের অভাবে বিআরটিএ’র ‘রোড সেফটি সেল’ ও এর সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক কার্যক্রম বন্ধ থাকার ফলে জোড়াতালি দিয়েই চলছে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। বিআরটিএ’র প্রয়োজনীয় সংখ্যক ও প্রশিক্ষিত জনবল, সরঞ্জাম, লোকবল ও পরিবহন যানের অভাবে নিয়মিতভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনাসহ মোটরযান নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

শুধু তাই নয়, উন্নত দেশের ন্যায় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটার পর দ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ নিতে উদ্ধারকারী সেল/ইউনিটও নেই। যার ফলে, দুর্ঘটনার পর ত্বরিৎ চিকিৎসার অভাবে অনেক আহত মানুষ মারা যায়। উল্লেখ্য, প্রতিবছর যে পরিমাণ রোগী সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে ভর্তি হন তাদের ৪৬ ভাগই সড়ক দুর্ঘটনার শিকার এবং তাদের বেশির ভাগই হারিয়ে ফেলেন কাজ করার সক্ষমতা। ফলে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিরা তার পরিবারের জন্যে উপার্জন করতে পারেন না। এ গবেষণায় জানা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে ১৫ হাজার কোটি টাকা (জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ) হারিয়ে যায়। নিহত বা আহত মানুষের ব্যক্তি এবং পরিবারের আর্থিক এবং অন্যান্য ক্ষতির প্রকৃত হিসাব করলে এ ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি হবে। অর্থনীতির এ রক্তক্ষরণ যদি ঠেকাতে না পারি তাহলে গুণগত অর্থনীতি নিশ্চিত করা কখনো সম্ভব নয়। নাগরিকদের এ বিশাল ক্ষতি প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার মেনে নিতে পারেনা।

কোন চেরাগ বলে নিয়মিত মাসোহারা নেওয়া বন্ধ করে দিয়ে মহাসড়ক থেকে অটোরিকশা উচ্ছেদের সরকারি নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করবে তা দেখতে চায় জনগণ। বিআরটিএ সহ আইনশৃংখলা বাহিনীর সহযোগিতায় এবং ক্ষমতাসীনদের মদদে ট্রাফিক আইন অমান্য করে অদক্ষ ও ভুয়া চালকরা যাত্রীদের জিম্মি করে ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানোর ফলেই ক্রমেই দুর্ঘটনার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। আর যোগাযোগ মন্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনারোধে জনসচেতনতা বাড়ানো ও নাগরিকদের আইন মেনে চলার উপদেশ দিচ্ছেন। আইন মেনে চলার দায়িত্ব কি শুধু নাগরিকদের? আর যারা নাগরিকদেরকে জিম্মি করে, নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে অকালে নাগরিকদের জীবনহানি ঘটাচ্ছে তাদের বিচার করার দায়িত্ব কার? অন্যান্য দেশে এতগুলো মানুষের মৃত্যু হলে মন্ত্রীদেরকে দায় নিয়ে পদত্যাগ করার নজির আছে, অথচ এদেশে দায় অন্যেও উপর চাপিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা রয়েছে অবিরাম। বিচার বহির্ভূত হত্যা, রানা প্লাজা ধ্বস, পিনাক লঞ্চ বা মহাসড়কের ক্রমাগত নির্মম দুর্ঘটনায় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটালেও ক্ষমতাসীনদের কোনো জবাবদিহিতা নেই। আর দায়মুক্তি এবং জবাবদিহিতাহীন পরিস্থিতিতে এমনটা ঘটবেই। যার ফলে ক্রমেই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।।