Home » আন্তর্জাতিক » ‘আন্দোলনগুলো এখন আর প্রগতিপন্থী নয়’ :: অরুন্ধতী রায়

‘আন্দোলনগুলো এখন আর প্রগতিপন্থী নয়’ :: অরুন্ধতী রায়

Last 3করপোরেটচালিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের যোগসূত্র কামনাকারী হিন্দু রক্ষণশীলদের (হিন্দু রাইট) মোকাবিলায় বিশ্বাসযোগ্য বিরোধী হিসেবে বামপন্থীদের উত্থানের ব্যাপারে হতাশা ব্যক্ত করেছেন লেখকঅ্যাক্টিভিস্ট অরুন্ধতী রায়। সম্প্রতি চেন্নাইতে ‘অম্বেদকর সুদার’ পুরস্কার গ্রহণকালে প্রভাবশালী দ্য হিন্দুর কাছে অরুন্ধতী রায়ের সাক্ষাতকার প্রকাশ করা হয়। এই সাক্ষাতকারে তিনি এসব মন্তব্য করেন। অনুবাদ: হাসান শরীফ

হিন্দু রক্ষণশীলরা ধর্মান্তরিত মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ফিরিয়ে নেওয়ার ‘ঘর ওয়াপসি’ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বি আর অম্বেদকরকেও নিজেদের দলভুক্ত করতে চাচ্ছে। এ কারণ অরুন্ধতী রায় মনে করেন, ভারতীয় সমাজে বর্ণব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে বামদের উচিত বুদ্ধিবৃত্তিক পুনঃমূল্যায়ন করা। তিনি বলেন, “বামরা বর্ণবাদ ইস্যুটিকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালার বামেরা ‘বর্ণবাদকে একটি শ্রেণি’ হিসেবে অভিহিত করে নিজেদের পরাজিত এবং অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলেছে। এ ব্যাপারে ড. অম্বেদকর ও শ্রীপদ অমৃত দাঙ্গের (১৯২০এর দশকে ভারতীয় ট্রেড ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য) মধ্যে বোম্বাইয়ের মিল শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে সৃষ্ট মতানৈক্যের ইস্যুটি গুরুত্বপূর্ণ। দলিত শ্রমিকেরা সেখানে কেবল কম বেতনের চাকরিই পেত। অম্বেদকর অত্যন্ত যথাযথভাবে সেখানে সাম্য না থাকার কারণটি উল্লেখ করেছিলেন। ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির আত্মপ্রকাশের পর থেকে বিষয়টি এমনই।”

অরুন্ধতী রায় বলেন, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই একটি জটিল বিষয়। ‘দর্শনগতভাবে বললে বলতে হয়, নিম্নতর বর্গগুলোকে তাদের পরিচিতি নিয়ে গর্ব করতে হবে এবং বর্ণগত নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই করার সময় সেই গর্ব দৃঢ়তার সাথে প্রকাশ করতে হবে। কিন্তু তারপর এমন একটি পর্যায়ের উদ্ভব হবে যেখানে ওই প্রগতিমুখী অবস্থাকে এর বিরুদ্ধেই ব্যবহার করতে হবে যাতে স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে বিকশিত করা যায় এবং এগিয়ে যাওয়ার জন্য সেই সুবিধাটিকে যুগোপযোগী করা সম্ভব হয়।’

নতুন নয়

তিনি ধর্মান্তরিত মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ‘ফিরিয়ে নেওয়ার’ হিন্দু রক্ষণশীলদের ‘ঘর ওয়াপসি’ কর্মসূচিকে নিম্নতর বর্ণকে ‘বড় পরিবারে অন্তর্ভুক্ত করে তাদেরকে চাকরমহলে রাখার’ ব্যবস্থা করা হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘ঘর ওয়াপসি কর্মসূচি নতুন কিছু নয়। ১৯ শতকের শেষ দিকে ও ২০ শতকে অশুদ্ধদের শুদ্ধ করতে এবং ধর্মান্তরিত বর্ণগুলোকে হিন্দু পতাকাতলে ফিরিয়ে আনার জন্য আর্য সমাজ ও শুদ্ধি আন্দোলন এই কর্মসূচি শুরু করেছিল’। তিনি দাবি করেন, সাম্রাজ্যের রাজনীতি প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের রাজনীতির দিকে ধাবিত হতে থাকার প্রেক্ষাপটে জনসংখ্যাকে প্রভাবিত করার লক্ষ্যে এটা ছিল হিন্দু রক্ষণশীলদের একটা উদ্ভাবনকুশল পাল্টাপদক্ষেপ। তিনি বলেন, ‘এর আগে পর্যন্ত নিম্নবর্ণের লোকজন কখন ইসলাম, খ্রিস্টান বা শিখ ধর্ম গ্রহণ করেছিল তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি। কিন্তু তারপর হঠাৎ করে জনসংখ্যার হিসাবনিকাশ হয়ে পড়ল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই ইতিহাসে (যাতে আর্য সমাজের মতো গ্রুপগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়, গান্ধী ছিলেন সেই ঐতিহ্যের উত্তরসূরি) অচ্ছ্যুতব্যবস্থা নিয়ে অনেক কথা হয়, কিন্তু বর্ণবাদ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। বর্ণব্যবস্থার আসল ভিত্তি তথা অধিকার নিয়ে তথা ভূমি, সম্পদ, নির্দিষ্ট কাজ করার অধিকার নিয়ে আলোচনা হয়নি। এখন তারা আবার বিষয়টি লাইমলাইটে নিয়ে এসেছে। কারণ দলিত সম্প্রদায়গুলো এবং এমনকি আদিবাসীরা পর্যন্ত তাদের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।’

মূলধারার ভাষ্যকারেরা বর্ণবাদীব্যবস্থা এবং অন্যান্য বৈষম্য থেকে মুক্তির ব্যবস্থাপত্র হিসেবে বিশ্বায়ন ও চরমপুঁজিবাদীব্যবস্থা প্রবর্তণের সুপারিশ করলেও অরুন্ধতী রায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলছেন, ‘পুঁজিবাদকে গ্রহণ করলে বর্ণবাদের কাঠামো তো ভেঙে পড়বেই না, বরং তা আরো কঠোর হবে’।

বিষাক্ত মিশ্রণ

বিষয়টা হলো এটা তাৎপর্যপূর্ণভাবে ঘটেনি। টমাস পিকেটি তার গ্রন্থ ‘ক্যাপিটাল ইন দি টুয়েন্টিফার্স্ট সেঞ্চুরি’তে দেখিয়েছেন, কিভাবে যারা উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদের অধিকারী তাদের পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এটা বর্ণবাদী ব্যবস্থাকে পুঁজিবাদের ধাত্রীতে পরিণত করেছে, কারণ বর্ণব্যবস্থায় উত্তরাধিকার সূত্রে অধিকার লাভকে ধর্মীয় ম্যানডেট বিবেচিত হয়। বর্ণ ও পুঁজিবাদ একটি বিষাক্ত মিশ্রণে মিলে গেছে। কোটা সংরক্ষণের ফলে সরকারি কার্যক্রমে দলিতদের পা রাখার সামান্য যে জায়গাটুকু আছে, বেসরকারিকরণে সেটিও ধ্বংস হয়ে যাবে।’ অরুন্ধতী ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) পার্লামেন্টে উত্থাপিত নতুন ‘ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন বিল’এর সমালোচনা করে এটা আরো বেশি চাকরি করবে বলে যে কথা বলা হচ্ছে তা নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নতুন অর্থনীতিতে করপোরেটের ভূমি গ্রাস একটি অনিবার্য বিষয়। সেটা আইটি, কয়লা বা স্টিল কোম্পানি যাই হোক না কেন, তাদের প্রথম পদক্ষেপ হলো ভূমি ও পানি সম্পদের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। তাদেরকে সুযোগ দেওয়া হলে তারা চাকরি সৃষ্টি করবে বলে যে কথা বলা হয় তা স্রেফ একটা মিথ। পরিসংখ্যান বলে, আমরা কেবল একটা ‘চাকরিহীন প্রবৃদ্ধি’ দেখতে যাচ্ছি।

দিল্লির শিল্প বেল্টের এক কোটি শ্রমিকের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা ‘নতুন অর্থনীতির জানালা প্রদর্শন’ করছে বলে উল্লেখ করে অরুন্ধতী বলেন, এরা করপোরেটচালিত শিল্পায়ন শ্রমিকদের জীবনমানের বিকাশ ঘটায় বলে যে ধারণাটি আছে সেটি মিথ্যা প্রমাণ করছে। ‘তারা শোচনীয় দারিদ্র এবং তাদের ভূস্বামীদের পাশাপাশি তাদের নিয়োগকর্তাদের সৃষ্ট সন্ত্রাসের মধ্যে বাস করছে।’ তিনি দুঃখের সাথে উল্লেখ করেন, ’৬০ ও ’৭০এর দশকে ভূমি নিয়ে যে বিতর্ক ছিল সেটা এখন তা সে তুলনায় আর ‘প্রগতিবাদী’ নয়। তিনি বলেন, ‘যখন নক্সালি আন্দোলন শুরু হলো, জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে বিক্ষোভ ঘটল, তখন ইন্দিরা গান্ধীর এক সমালোচক প্রবল উদ্দীপনায় বলেছিলেন, তারা কী নিয়ে কথা বলছে? তারা সামাজিক ন্যায়বিচার, ভূমির পুনঃবণ্টন, ‘লাঙল যার, জমি তার’ ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলছে। আজ এমনকি সবচেয়ে ‘প্রগতিবাদী’ আন্দোলনও কেবল আদিবাসীদের ভূমি তাদের কাছে রেখে দেওয়ার দাবিটুকু জানিয়েই ক্ষান্ত থাকছে।’