Home » অর্থনীতি » এশিয়ার কৌশলগত ভরকেন্দ্রের পরিবর্তন

এশিয়ার কৌশলগত ভরকেন্দ্রের পরিবর্তন

ভ্যান জ্যাকসন

অনুবাদ: আসিফ হাসান

Last 5গত বছর পেন্টাগন ছাড়ার আগে আমি মূল পরিকল্পনায় সামান্য পরিবর্তন লক্ষ করেছিলাম। ওবামা প্রশাসন যখন ‘এশিয়ার ভারসাম্যের পুনঃবিন্যাস’ নীতির অংশ হিসেবে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করলেন, তখন তাতে দক্ষিণ চীন সাগর, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও মিয়ানমার আরো বেশি করে সম্পৃক্ত হলো। ভারত হয়ে পড়ল বৃহত্তর কৌশলগত অগ্রাধিকার। আর জনগণ অবান্তরভাবে এশিয়াকে ‘প্যাসিফিক মঞ্চ’ থেকে এশিয়াকে ‘সমুদ্র থিয়েটার’ হিসেবে চিন্তা করতে শুরু করল।

সরকার ত্যাগ করার পর থেকে আমি উত্তরপূর্ব এশিয়ায় আরো বেশি তীব্র, অত্যাধিক আনুষ্ঠানিকতাপূর্ণ কণ্ঠস্বর এবং সাজ সাজ রব দেখছি। পূর্ব চীন সাগরে চীন ও জাপান প্রচবিরোধপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে, তাইওয়ান প্রণালীজুড়ে চীন ও তাইওয়ান উভয়েই অচলাবস্থা ধরে রাখতে চাইছে। উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার সম্পর্ক এখনো স্থবির হয়ে রয়েছে এবং স্বাভাবিকরণের ৫০ বছর পরও জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ক টেকসই উন্নতি পর্যায়ে উন্নীত হয়নি।

উত্তরপূর্ব এশিয়া এমন একটি উদ্যান, যার অব্যাহতভাবে পরিচর্যার প্রয়োজন। অঞ্চলটি এখনো বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং মার্কিন স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর এখানে কোনো সঙ্ঘাত সৃষ্টি মানে সভ্যতার সমাপ্তি। কিন্তু সব পক্ষের নীতিনির্ধারকেরা তাদের পূর্বসূরীদের গ্রহণ করা নীতিতেই মোটামুটিভাবে আঁকড়ে ধরে আছেন। প্রতিযোগিতার রেখাটি স্পষ্ট এবং অত্যন্ত সামরিকায়নকৃত। ফলে ঝুঁকিটা অত্যন্ত বেশি।

এশিয়ার অন্যান্য অংশে প্রবেশ ও প্রভাব বিস্তারের সুফল বিপুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও প্রতিযোগিতার গতিশীলতা অনেক কম প্রত্যক্ষ এবং বেশ অস্পষ্ট। উত্তরপূর্ব এশিয়ান ভূরাজনীতিতে অনমনীয়তা রয়েছে, আর বাকি অঞ্চল ভূরাজনৈতিক ‘ওয়াইল্ড ওয়েস্টে’র মতো। এশিয়ার কৌশলগত ভরকেন্দ্র দৃশ্যত ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরের দিকে বদলে যাচ্ছে। অনেক কারণে এই পরিবর্তন বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ওপর এটা কোথায় ও কিভাবে প্রভাব ফেলছে সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

খুব বেশি দিনের কথা নয়, রবার্ট ক্যাপলান ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, ১০০ বছর আগের মতো আবারো এশিয়ার ভবিষ্যৎ ভারত মহাসাগর ও এর আশপাশের এলাকার ভবিষ্যতের সাথে অনেক বেশি সম্পৃক্ত হবে। তিনি ভুল বলেননি। বাণিজ্য, বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহ অব্যাহত রাখার গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র রুট এবং সেইসাথে শক্তি প্রক্ষেপের ভিত্তি হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়া আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছে।

মার্কিন নৌ ও বিমান বাহিনী এখন প্রায়ই এশিয়াকে ‘এশিয়াপ্যাসিফিক’ হিসেবে উল্লেখ না করে ভুল পরিভাষা ‘ইন্দোএশিয়াপ্যাসিফিক’ (ভালো কথা যে, সেটা পেন্টাগনের অন্দরমহল পুরোপুরি ধরতে পারেনি) ব্যবহার করে। অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা বন্ধুরা অনেক বছর ধরেই ‘ইন্দোপ্যাসিফিক’ অঞ্চল নামকরণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে প্ররোচিত করছে। স্থানীয় সামরিক বাহিনীগুলোর সাথে কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা জাপান করে গেলেও প্রথমবারের মতো এই ২১ শতকে দেশটি দক্ষিণ চীন সাগর ও ভারত মহাসাগরে তার নৌবাহিনীর হাত সম্প্রসারণ করেছে। সহস্র বছরের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার পর চীন ও ভারত আবার একে অন্যের প্রভাব বলয়ে নাক গলানোর প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেছে। ভারত কেবল পূর্ব দিকেই তাকিয়েই ক্ষান্ত থাকছে না, সে ক্রমবর্ধমান হারে ওই দিকে ভূমিকা রাখছে, আর চীন দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে তার কৌশলগত উদ্যোগ স্থানান্তরিত করে স্থানীয় প্রবেশাধিকার, উপস্থিতি ও সম্পদের জন্য ভারতের সাথে প্রতিযোগিতা করছে।

এই অঞ্চলের বিভিন্ন অংশে প্রতিযোগিতামূলক যুক্তিও ভিন্ন। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনকে মোকাবিলা করার জন্য বৃহত্তর ঝুঁকি নেয়ার যেকোনো আহ্বান কিংবা চীনা বিষয়ক কোনো একটি বিকল্প গ্রহণ করতে বাধ্য করার জন্য পরিকল্পিতভাবে কোনো বিরোধ সৃষ্টি এটা বুঝতে না পারাটাই প্রদর্শন করে যে, নির্দিষ্ট ধরনের আচরণের উৎসাহ প্রদান স্থান থেকে স্থানে ভিন্ন হয়। উত্তরপূর্ব এশিয়ায় খেলাটার নাম দাবা (অনেকে এটাকে দাবাসদৃশ ড্রাফট খেলাও বলে থাকে)। দক্ষিণপূর্ব এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরে খেলাটা অনেকটাই প্রাচ্যের বুদ্ধিবৃত্তিক খেলার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যে খেলাটা চীনে ‘ওয়েকি’, কোরিয়ায় ‘বাদুক’ এবং জাপানে ‘গো’ নামে পরিচিত। এই উপঅঞ্চলজুড়ে অভিন্নতা নেই বললেই চলে। কিন্তু তবুও পূর্ব কৌশগলগত খেলার মত্ত হওয়টা হবে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় কঠিন, আধাজমে যাওয়া মোকাবিলা।

ফিলিপাইনে জাপানি সামরিক সহায়তা, শ্রীলঙ্কায় চীনা অর্থনৈতিক অবকাঠামো এবং সেইসাথে জঙ্গি বিমান ও অন্যান্য অত্যাধুনিক অস্ত্র সরবরাহ এবং মিয়ানমারে ভারতীয় পাইপলাইন প্রকল্পগুলোর সবই নিরেট উদাহরণ, অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এসব চাল দেয়া হয়েছে, যেগুলোর অস্তিত্ব যুক্তরাষ্ট্র এই কিছুদিন আগেও বুঝতে পারেনি। ক্যাপলান লক্ষ করেছেন, ‘ভারত মহাসাগরে চীনের পদক্ষেপ যতটা না সাম্রাজ্য বিনির্মাণের আগ্রাসী উদাহরণ, তার চেয়ে অনেক বেশি ন্যায়সঙ্গত বাণিজ্যিক সুবিধা গ্রহণের একটি সূক্ষ্ম মহা পরিকল্পনা, সেগুলো সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থানে গজিয়ে ওঠে।’ একই কথা প্রযোজ্য হতে পারে এশিয়ার উদীয়মান ভরকেন্দ্রে সক্রিয় অন্যান্য শক্তির বেলাতেও।

ভারত মহাসাগর এবং দক্ষিণ চীন সাগরে কোন ধরনের সহায়তায় বিশেষ করে সামরিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার শ্রেণি বিভাজন করা কঠিন কাজ। তবে তা সূক্ষভাবে এবং সেখানকার খেলার অনুযায়ী ধরণটি প্রতিফলিত করে। সব ধরনের অঐতিহ্যবাহী নিরাপত্তা ইস্যু সেখানে সক্রিয়, কাউকে সহায়তা করার কোনো অজুহাত পাওয়া মানে নিজেকেই সহায়তা করার সুযোগ লাভ। রাষ্ট্রগুলো জোট নয়, দুর্বল সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী, যা ভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রবলভাবে কার্যকর হতে পারে বলে আমাদের জানিয়ে দেয়।

উত্তরপূর্ব এশিয়ার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন, এখানে কৌশল খাটানোর অবকাশ খুবই কম। নতুন উদ্যোগ খুবই বিরল, বিশেষ করে যদি দীর্ঘস্থায়ী বিবাদগুলোর সাথে তুলনা করা হয়। উত্তরপূর্ব এশিয়ায় সাইবার নিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো অঐতিহ্যবাহী নিরাপত্তা ইস্যুগুলো নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়। আর যদি আলোচনা কালেভদ্রে হয়ও, তবে তা সেখানকার আঞ্চলিক গতিশীলতায় কোনোই প্রভাব ফেলে না। উত্তরপূর্ব এশিয়ায় পরোক্ষ প্রতিযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা যে কারো জন্যই কঠিন, কারণ লেনদেনের শর্তাবলী কঠোরভাবে নির্ধারিত।

ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগর তাই কেবল তাদের নিজেদের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এটি কম সুনির্দিষ্ট উপঅঞ্চল হওয়ায় উত্তরপূর্ব এশিয়ার বাজিমাতের জন্য নতুন নতুন সুযোগ ও সীমাবদ্ধতার সৃষ্টি করছে। যেসব কারণে আমি উত্তর কোরিয়ার আবেগকে দক্ষিণ কোরিয়ার অতীত, এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ভবিষ্যত হিসেবে অভিহিত করেছি, তার একটি হলো সম্ভবত দক্ষিণপশ্চিমমুখী অনুভূতিগত ধারণার জবাব।

উত্তরপূর্ব এশিয়ার প্রতিযোগিতার এই ভিন্নধর্মী প্রকৃতিনীতি প্রণয়নের জন্য নির্দেশনামূলক। উত্তরপূর্ব এশিয়ার জন্য অঐতিহ্যবাহী নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা কিংবা সেখানে অপেক্ষাকৃত ‘কম রাজনীতিতে’ ব্যাপকভাবে সক্রিয় হওয়াটা বড় সাফল্য হিসেবে দেখা দেয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আমরা যেমন পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক সামরিকায়ন পছন্দ করব না, অনেকটা তেমনভাবেই উত্তরপূর্ব এশিয়ার স্থিতিশীলতা সঙ্ঘাতমূলক ভূরাজনৈতিক যুক্তি কামনা করে। তবে দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় সামরিকমূলক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করার নীতি নিশ্চিতভাবেই বিচ্ছিনতাবাদ ও বন্ধুহীন করে দেবে। সেখানে প্রতিযোগিতা অনিবার্য, তবে সঙ্ঘাত এড়ানো কমই কাজে দেবে।

এশিয়ার আধুনিক মানচিত্র মাত্র একটি খেলা। কোন খেলাটি সেখানে খেলা হচ্ছে এবং তাতে জয়ের ন্যূনতম সম্ভাবনা কতটুকু, তা জানতে হবে।।