Home » অর্থনীতি » তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (একাদশ পর্ব)

তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (একাদশ পর্ব)

ঘুষ লেনদেনে ব্রিটিশ সরকারের সংশ্লিষ্টতা ধামাচাপা

Last 6অস্ত্র ব্যবসার সাথে তেল সম্পদের অর্থের একটি গভীর সখ্যতা রয়েছে। একটি অপরটিকে টিকিয়ে রাখে। আর পরস্পরের ঘনিষ্ঠ দুই ব্যবসার কুশীলবরা। এই ব্যবসার নেপথ্যে রয়েছে ঘুষ, অর্থ কেলেঙ্কারিসহ নানা ভয়ঙ্কর সব ঘটনাবলী। এরই একটি খন্ডচিত্র প্রকাশ করা হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। প্রভাবশালী দ্য গার্ডিয়ানএর প্রখ্যাত দুই সাংবাদিক ডেভিড লে এবং রাব ইভানসএর প্রতিবেদন প্রকাশের পরে এ নিয়ে বিস্তর আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। এ সংখ্যায় ওই প্রতিবেদনের বাংলা অনুবাদের (একাদশ পর্ব) প্রকাশিত হলো। অনুবাদ : জগলুল ফারুক

অস্ত্র বিক্রয়ে ঘুষ লেনদেনের সাথে ব্রিটিশ সরকারের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিলেন ১৯৭৬৭৯ সময়ের ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জেমস কালাহান। ১৯৭৫ সালের ৬ জুন ফরাসি জেনারেল পল স্টেনলি একটি বাসের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তথাকথিত লকহিড কেলেঙ্কারির প্রথম বলি তিনিই। এ ঘটনার পরই আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার ক্ষেত্রে একটি সংস্কার আনার চেষ্টা শুরু হয়। বিদেশে ঘুষ প্রদান বেআইনি ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র ফরেন করাপ্ট প্র্যাকটিসের অ্যাক্ট পাস করে। তবে তারপরও ব্রিটিশ সরকার তার দুর্নীতির ঘটনাগুলো কীভাবে লুকিয়ে রাখতে পেরেছিল সে সম্পর্কে আজ পর্যন্ত কিছুই জানা যায়নি।

মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রিটেনকে এই মর্মে হুশিয়ার করে দিয়েছিলেন যে, প্রেসিডেন্ট কার্টার বিদেশে বেআইনি লেনদেনের বিরুদ্ধে একটি শক্ত অবস্থান নিতে যাচ্ছেন। জেরাল্ড ফোর্ড বিদেশে সন্দেহজনক করপোরেট লেনদেনের বিষয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছিলেন। তবে এ ব্যাপারে তার উত্তরসূরি কার্টারের অবস্থান ছিল আরও শক্ত। ব্যাপারটিকে ইউরোপীয়রা বেশ ক্ষোভের সাথেই নতুন মার্কিন নৈতিকতা বলে বিদ্রƒপ করতে শুরু করে। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জেমস কালাহান ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তার মন্ত্রিসভার সহকর্মীদের বলেছিলেন, অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে মার্কিনিদের মতো উচ্চ নৈতিক অবস্থান বজায় রাখা আমাদের পক্ষে বেশ কঠিনই হবে।

জাতিসংঘের ঘুষবিরোধী একটি দলের সাথে ব্রিটিশরা প্রতারণাপূর্ণ আচরণের আশ্রয় নিয়েছিল। ব্যক্তিগত পর্যায়ে কূটনীতিকদের বলে দেয়া হয়েছিল তারা যেন ঘুষ বিরোধী যে কোনো ধরনের তৎপরতা আটকে দেয়ার চেষ্টা করেন। দুর্নীতিমূলক কর্মকান্ডের সাথে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টতাটি ধামাচাপা দিয়ে রাখা হতো। একজন কর্মকর্তা বলেন, আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি বেচাকেনার সাথে নির্দিষ্ট কোনো বিভাগের জড়িত থাকার বিষয়টি প্রমাণ করা যাবে না।

হোয়াইট হল থেকেও বলা হয়, ইতোমধ্যেই বিদেশে আমাদের অনেক ব্যবসা আটকে গেছে। শিল্পোন্নত অন্য দেশগুলোর চেয়েও বেশি মাত্রায় পবিত্র নিয়মনীতি প্রণয়ন করে কিছুতেই আমরা আমাদের বিদেশের ব্যবসাগুলো হাতছাড়া করতে পারি না। অর্থমন্ত্রী জোয়েল বার্নেট তো প্রকাশ্যেই বললেন, কোনটা গ্রহণযোগ্য কিংবা কোনটা গ্রহণযোগ্য নয় সে সব দেখাদেখির দায়িত্ব ক্রেতা দেশগুলোর ওপরই বর্তায়।

দুর্নীতির সাথে ব্রিটিশ সরকারের সম্পৃক্ততার কারণে বিদেশের মাটিতে চাকরি করতে গিয়ে একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তাকে যথেষ্ট অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়তে হয়। এ কথাটি নিজের নথিতে লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে একজন বেসামরিক আমলা ব্রিটিশ সরকারের দুর্নীতির সমালোচনা করেছিলেন। এ জন্য তাকে তীব্র ভর্ৎসনার শিকার হতে হয়েছিল। তাকে বলা হয়েছিল অর্থমন্ত্রীর প্রকাশ্য বক্তব্য যতোটাই অস্বচ্ছ হয়ে থাকুক না কেন, সেটিতে হোয়াইট হলের ভেতরকার সিদ্ধান্তেরই প্রতিফলন ঘটেছিল। তবে তার সরকার যে কতোটা ওতপ্রোতভাবে দুর্নীতির সাথে জড়িত ছিল সে কথাটিই কেবল তার কাছ থেকে আড়াল করা হয়েছিল। অর্থমন্ত্রক নিয়মিতভাবেই বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থ ছাড় করছিল, সুনির্দিষ্টভাবে বিদেশে ঘুষ প্রদানের জন্য। নথি বলছে, সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিশেষ কমিশনের বরাদ্দ বাবদ অর্থ জমা দানের অনুরোধ জানিয়ে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে প্রায় প্রতিদিনই দরখাস্ত জমা পড়তো।

কেবল অস্ত্রই নয়, টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম, জাহাজ এবং গাড়ি বিক্রয়কারী সরকারি বিভাগ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোও নোংরা দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ছিল। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্রিটিশ লেল্যান্ড কোম্পানির একজন নির্বাহীর সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে জানা যায়, ব্যবসার ক্ষেত্রে অবৈধ লেনদেনের পরিমাণ দ্রুত হারেই বেড়ে চলেছে। চুক্তিতে উল্লেখ করা কোনো পণ্যের নির্ধারিত মূল্যের ওপর কমিশন হিসেবে বাড়তি আরো ২০ শতাংশ হারে মূল্য প্রদর্শনের জন্য বিক্রয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট মূল ব্যক্তিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।

ব্রিটিশ লেল্যান্ড কোম্পানি দুর্নীতির সাক্ষ্য বহনকারী তার সব কাগজপত্র দ্রুতই সুইজারল্যান্ডে পাঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কোম্পানিটির অর্থ পরিচালক বলেন, এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো গোপন অ্যাকাউন্টসমূহের কাগজপত্রগুলো আরো নিরাপদ কোনো স্থানে পাঠিয়ে দেয়া। ডেভিড রান্ডেল নামে অসৎ এক ডিএসও কর্মকর্তা ইরানে নিজের স্যুটকেসে করেই নগদ ২৫ হাজার পাউন্ড বহন করেছিলেন। পরে তিনি ওমানের একটি কোম্পানির কাছ থেকেও অর্থ আদায়ের চেষ্টা চালাতে গিয়ে গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় পড়ে যান। আদালতে বিষয়টি নিয়ে একটি মামলা হলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়ে। মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব বিষয়টি সামাল দিতে গিয়ে জারিকৃত এক নির্দেশনায় বলেন, দালালকে প্রদত্ত অর্থের পরিমাণ যুক্তিসঙ্গত হতে হবে। আমরা যা কিছুই করি না কেন প্রয়োজন দেখা দিলে মন্ত্রীরা যেন জনসমক্ষে বিষয়টির একটি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেন সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।।

(চলবে…)