Home » বিশেষ নিবন্ধ » প্রগতিশীল সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গোড়ার কথা (প্রথম পর্ব)

প্রগতিশীল সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গোড়ার কথা (প্রথম পর্ব)

Last 4প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে পুজিবাদী অর্থনীতি কে মহামন্দায় আক্রান্ত হয়। মহামন্দার কবলে পড়ে বিশ্ব রাজনৈতিকভাবে পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে। জনজীবন ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের বাস্তবতায় তাড়িত হয়ে পড়ে। সেই সময় নতুন রাজনৈতিক মতবাদ বিশ্ব তথা ভারতীয় উপমহাদেশের কোটি কোটি মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করে। রাজনীতিকে শাণিত করে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। অবিভক্ত ভারতের সেই সময়কার একদল সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মী নতুন মতাদর্শ নিয়ে সংস্কৃতির জগত আলোড়িত করেন। গড়ে তোলেন প্রগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন বা প্রগতিশীল লেখক সংঘ। পুজিবাদের বর্তমান বিশ্বায়ন তত্ত্বের ক্লেদাক্ত সময়ে পুনরায় আর একটি মহামন্দার আবহে বর্তমান সাহিত্য ও সংস্কৃতিও নির্জীব। সাহিত্য ও সংস্কৃতির এই অবক্ষয়ের সময়ে নতুন সাহিত্য ও সংস্কৃতি আন্দোলনের ধারাটি কী হওয়া উচিত তা বুঝতে প্রগতিশীল লেখক সংঘের ইতিহাস জানা তাই আবশ্যক। অজয় আর্শীবাদ মহাপ্রশস্তের এই লেখাটির ভাষান্তর করা হলো।

যে সময়টাতে আমরা বসবাস করছি সে সময়টা সম্পর্কে আপনার যদি ধারণা না থাকে তবে আমর গল্পগুলো পড়ুন। গল্পগুলো যদি আপনার কাছে অসহ্য লাগে তবে বুঝতে হবে আমাদের সময়টাই আসলে অসহনীয়।’ খ্যাতিমান লেখক সাদত হাসান মান্টোর এই বক্তব্য কেবল একটি ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ মাত্রই নয়, স্বাধীনতাপূর্ব ভারতের সবচেয়ে প্রগতিশীল লেখকদের লেখক মানসেরই তাৎপর্যপূর্ণ অভিব্যক্তি এটি। মান্টো, মুন্সি প্রেম চাঁদ, কিষণ চন্দর, রাজিন্দর সিং বেদি, ইসমাত চুঘতাই, ভীষ্ম সাহনি এবং ফিরাক গোরকপুরির মতো উল্লেখযোগ্য আঞ্চলিক লেখকরা তাদের লেখায় এ সময় এমন সব বিষয়বস্তু তুলে আনছিলেন যা ইতোপূর্বে আর কখনো ভারতীয় সাহিত্যে অতটা গুরুত্বের সাথে উপস্থাপিত হয়নি। এসব বিষয়বস্তু ছিল মানব জীবনের নিরেট বাস্তবতারই অংশ। আর সেই জীবন ছিল ঔপনিবেশিক শাসনাধীন এক জীবনযাত্রা। বিষয়বস্তুগুলোর বাস্তব অবস্থারই আবেগঘন প্রতিচ্ছবি। কেবল পাঠক হৃদয়কে আনন্দ দেয়ার উদ্দেশ্য থেকেই কিন্তু এসব বিষয়বস্তু সাহিত্যের পাতায় স্থান পায়নি।

সে সময়কার সাম্রাজ্যবাদী সমাজ ব্যবস্থার বাস্তবতা থেকেই এই লেখকরা তাদের কাহিনীর চরিত্রগুলো বেছে নিয়েছেন। এসব চরিত্রের মধ্যে ঔপনিবেশিক পুঁজিবাদেও শিকার মানুষের চেহারাই প্রতিবিম্বিত হয়েছে। তারা এমন একটি জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিল যা তাদের প্রায় নানা রকম নৈতিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। কখনো কখনো তারা আত্মবিধ্বংসী কর্মকান্ডেও লিপ্ত হয়েছে। তাদের জীবনে নেমে এসেছে অবক্ষয় ও নৈতিক স্খলন। এতদসত্ত্বেও তারাই কিন্তু এসব কাহিনীর প্রধান চরিত্র। তারা কখনো কোনো কল্পকাহিনীর নায়ক না হওয়া সত্ত্বেও পাঠকের সহানুভূতি কিন্তু তাদের ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে।

অবিভক্ত ভারতের সাহিত্য জগতে এই লেখকরা পূজনীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। কারণ বাস্তব জীবনের এসব কাহিনী বর্ণনা করার সময় তারা তাদের লেখার গঠনশৈলী ও মান বজায় রাখার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট মনোযোগী ছিলেন। এসব কাহিনী পাঠক হৃদয়কে আলোড়িত করেছে, বিচলিত করেছে, পাঠক মনে চিন্তার খোরাক যুগিয়েছে। পাঠক বুঝতে শিখেছে, এসব কাহিনীর মধ্যে উপস্থাপিত সংকট আর সমস্যাগুলো সৃষ্টির জন্যে তারা নিজেরা দায়ী নয়, এগুলো বরং বিশেষ একটি সমাজ ব্যবস্থারই ফলাফল। এসব ঔপন্যাসিক এবং কবি কেবল ব্যক্তিগত লাভালাভের বিবেচনা থেকেই লেখালেখি করেননি। তারা তাদের লেখার মাধ্যমে ভারতীয় বুদ্ধিজীবীতা এবং রাজনৈতিক সংগ্রামকে সমৃদ্ধ ও উজ্জীবিত করেছেন। তারা ভারতীয় সাহিত্যের ক্ষেত্রে বিরাজমান গত শতকের ত্রিশের দশকের ধারা থেকে খুব স্পষ্টভাবেই সরে এসেছিলেন। এর আগে ভারতীয় সাহিত্যের অধিকাংশই ছিল বিদেশী পর্যটকের ভ্রমণ কাহিনী কিংবা রাজানুকূল্যে রচিত বিভিন্ন ধরনের বর্ণনাধর্মী লেখা।

সে যাই হোক, কিছু লেখক স্বাধীনভাবে লেখালেখির একটা ধারা চালু করলেন। বিষয়বস্তু হিসেবে বেছে নিলেন সমসাময়িক ঘটনাবলী ও চিন্তাভাবনাকে। ক্রমে নিজেদের তারা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে প্রগেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন (পিডব্লিউএ) বা প্রগতিশীল লেখক সংঘের সাথে যুক্ত করলেন। ১৯৩৬ থেকে শুরু করে ১৯৪০এর দশকের শেষ দিক পর্যন্ত সময়কালে এই সংঘের কর্মকাণ্ড বেশ বেগবান ছিল। নিজেদের বিপ্লবী চিন্তাভাবনা এবং সমাজতান্ত্রিক বিশ্বাসের কারণে ‘পিডব্লিউএ’ ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির কাছ থেকে অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়ে আসছিল, বিশেষ করে কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সাধারণ সম্পাদক পিসি জোশীর কাছ থেকে। যোশী ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন (আইপিটিএ) বা ভারতীয় গণনাট্য সংঘ গঠনেও মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন। সংগঠনের জন্য তৃণমূল পর্যায় থেকে সম্ভাবনাময় শিল্পী ও লেখক সংগ্রহের দায়িত্বটিও তার ওপরই বর্তেছিল।

২০১১ সালে পিডব্লিউএএর ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হয়। বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে লেখক, সক্রিয় রাজনৈতিক, সামাজিকসাংস্কৃতিককর্মী এবং তাত্ত্বিক সমালোচকরা সমসাময়িক সাহিত্যে প্রগতিশীল চিন্তাভাবনার বিভিন্ন উপাদান যুক্ত করার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। এই প্রচেষ্টা চালানোর পাশাপাশি তারা বিশ্বায়নপরবর্তী যুগে তাদের ভাষায় ‘প্রাণহীন’ সাহিত্যকর্মেরও সমালোচনা করেছেন। বহু সমালোচকই মনে করেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে প্রকাশনা শিল্পের পরিমাণ কলেবরের দিক থেকে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। কিন্তু এর বিপরীতে সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে চিন্তাশীলতার দৈন্য হয়েছে প্রকট। লেখকরা নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেই নিজেদের তৃপ্ত ভাবছেন। সমাজে বিরাজমান বর্ণগত বৈষম্য, শোষণবঞ্চনার শিকার হওয়া গরিব মানুষ, কুসংস্কার কিংবা প্রশাসনের নিষ্ঠুরতা নিয়ে ভাববার কোনো অবকাশই তাদের নেই। অনেকেই বিশ্বাস করেন, সাহিত্যের বর্তমান ধারাটির লক্ষ্যই হলো বাজার কাটতি। গল্পগুলো পাঠকের মনোরঞ্জন করতে পারলো কিনা, এটাই এখন লেখকদের প্রধান বিবেচ্য। এমনি একটি বাস্তবতায় সাফদার হাশমি মেমোরিয়াল ট্রাস্ট দিল্লিতে একটি সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। সেই সম্মেলনে উপস্থিত শীর্ষস্থানীয় শিল্পী এবং পণ্ডিতরা ভারতের লেখালেখির জগতে তুলে ধরবার মতো প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয় বক্তব্য নিয়ে আলাপআলোচনা করেন। সম্মেলনে উপস্থিত দর্শকশ্রোতাদের সামনে প্রগতিশীল লেখক সংঘের (পিডব্লিউএ) লেখক এবং ভারতীয় গণনাট্য সংঘের (আইপিটিএ) শিল্পীদের কর্মকান্ডের কথা স্মরণ করা হয়। যেই আদর্শবাদ সেদিনের সেই শিল্পীলেখকদের অনুপ্রাণিত ও পরিচালনা করেছিল সেই আদর্শের কথাও আলোচনায় উঠে আসে। উঠে আসে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থনে সেদিন প্রগতিশীল লেখক সংঘ কিভাবে বিশাল একটি মহীরূহে পরিণত হয়েছিল। শুরুতে এটি কেবল হিন্দুস্তানী একটি ব্যাপার থাকলেও পরবর্তী সময়ে মালয়ালাম, বাংলা, অহমীয়, তামিল, তেলেগুসহ ভারতের অন্যান্য ভাষায়ও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। আঞ্চলিক ভাষাগুলোতে প্রগতিশীল লেখালেখির ধারাটি বিকশিত হওয়ার পাশাপাশি সে সব ভাষাভাষী অঞ্চলে একক একটি কমিউনিস্ট পার্টিরও উত্থান লক্ষ্য করা গেছে। কমিউনিস্ট পার্টি বিশ্বাস করত, জনগণকে কমিউনিস্ট রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি সাংস্কৃতিকভাবেও সচেতন করে তুলতে হবে। এমনকি কখনো কখনো রাজনৈতিকভাবে সচেতন করার আগে জনগণকে সাংস্কৃতিকভাবে সচেতন করে তোলার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।।

(চলবে…)