Home » আন্তর্জাতিক » ফিরে দেখা আনবিক বোমার বর্বরতা :: হিরোশিমা-নাগাসাকি

ফিরে দেখা আনবিক বোমার বর্বরতা :: হিরোশিমা-নাগাসাকি

হায়দার আকবর খান রনো

Last  1আজ থেকে সত্তর বছর আগে ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট মার্কিন প্রশাসন জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে এটম বোমা নিক্ষেপ করে তাৎক্ষণিকভাবে ৩ লাখ ৪০ হাজার মানুষকে হত্যা করেছিল। আনবিক তেজষ্ক্রিয়ার কারণে পরে আরও অনেকে মারা যান। পরবর্তী এক দশক ধরে একই কারণে জাপানে অনেক বিকলাঙ্গ শিশু জন্মগ্রহণ করেছিল। মানবতার বিরুদ্ধে বিশ্ব ইতিহাসে এত বড় জঘন্য অপরাধ খুব কমই আছে। ইতিহাস সচেতন যে কোন সৎ ব্যক্তি স্বীকার করবেন যে, মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বর্বর, সবচেয়ে নৃশংস মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল তিনটি এক, শ্বেতাঙ্গ কর্তৃক আমেরিকা মহাদেশে একটি জাতিকে পুরো নিশ্চিহ্ন করে দেয়া অর্থাৎ রেড ইন্ডিয়ান হত্যা, দুই, আফ্রিকা থেকে কালো মানুষ শিকার করে দাস ব্যবসা এবং আধুনিক যুগে আমেরিকায় দাস প্রথা নতুন করে প্রবর্তন, তিন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক এটম বোমা নিক্ষেপ। লক্ষ্যণীয় যে, পৃথিবীর ইতিহাসে এই তিনটি সবচেয়ে জঘন্য বড় অপরাধ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসকরা এবং আজ পর্যন্ত তারা এই অপরাধের জন্য দোষ স্বীকার বা ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। তার মানে এই জাতিটি প্রযুক্তিগত ও অর্থ সম্পদের দিক দিয়ে সর্বোচ্চ স্থান দখল করলেও সভ্যতার বিবেচনায় চরম পর্যায়ে নিম্ন স্তরেই পড়ে আছে। প্রযুক্তি ও বিত্ত নয় বরং মানসিক বিকাশই মানুষকে সভ্যতার স্তরে উন্নীত করে।

এটম বোমা প্রয়োগকে মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, ‘বিজ্ঞানের সবচেয়ে শয়তানীপূর্ণ ব্যবহার’। এখানে আরও লক্ষ্যণীয় যে, আজ পর্যন্ত একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই এটম বোমা ব্যবহার করেছে দুইবার। তাহলে এই ক্ষেত্রে এই দেশটিই হচ্ছে দায়ী। বিশ্ব শান্তি রক্ষা করতে হলে তাহলে প্রথমে দায়ীকেই ধরতে হয়, তাকেই নিরস্ত্র করতে হয়। কিন্তু না, এখন দেখা যাচ্ছে, উল্টো ঘটনা। কয়েকটি বড় শক্তি হিরোশিমার চেয়েও ভয়ংকর এটম বোমা মজুত রাখতে পারবে, তা দিয়ে পৃথিবীতে ভয় দেখাতে পারবে। অন্য কেউ, শান্তিপূর্ণ কাজে আনবিক শক্তি ব্যবহার করতে চাইলেও বাধা আসবে। আনবিক বোমা (ব্যাপক বিধ্বসী অস্ত্র) আছে এই মিথ্যা অজুহাতে জাতিসংঘের অনুমতি ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেনসহ পশ্চিমী দুনিয়া স্বাধীন দেশ ইরাক দখল করলো। তার জন্য বিশ্ব বিচারে ভয়ংকর অপরাধে অপরাধী বুশব্লেয়ারের আজও পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধী হিসাবে সাজা হয়নি, বিচারও হয়নি।

এটম বোমা ব্যবহৃত হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। হিটলার হয়তো এই মারাত্মক বোমা বানাতে পারেন (কারণ ত্রিশের দশকেই বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত ছিলেন যে, এটমের নিউক্লিয়াসকে বিভক্ত করে প্রচন্ড শক্তি বের করা সম্ভব এবং ১৯৩৮ সালে দুজন জার্মান বিজ্ঞানী অটো হ্যান ও ফ্রিটজ স্ট্র্যাসমান এই ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন)। আমেরিকায় প্রবাসী লিয়ো জিলার্ডের অনুরোধে আরেক মহান প্রবাসী জার্মান বিজ্ঞানী আইনস্টাইন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে এটম বোমা বানানোর প্রকল্প গ্রহণের জন্য চিঠি দিয়েছিলেন ১৯৩৯ সালের ২ আগস্ট এবং যে কারণে পরে তিনি অনুতপ্ত হন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে যোগদান করে ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট। তারপর এটম বোমা বানানোর প্রকল্প গৃহীত হয়েছিল। ১৯৪৫ সালের ৮ মে হিটলারের পতন হলে উপরোক্ত বিজ্ঞানী লিয়ো জিলার্ড ও অ্যালবার্ট আইনস্টাইন উদ্যোগ নেন যাতে এই বোমাটি বানানো না হয়। কারণ তারা এর ভয়াবহতা বুঝতে পেরেছিলেন। নোবেল বিজয়ী বৈজ্ঞানিক জেমস ফ্র্যাংকের নেতৃত্বে সরকার কর্তৃক নিয়োজিত একটি কমিটি ১৯৪৫ সালের ১১ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ সচিবের কাছে পেশ করেন যে রিপোর্ট তাতে এই ভয়ংকর বোমাটি ব্যবহার না করার আবেদন রাখা হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান বিজ্ঞানীদের মতামতকে গ্রাহ্য করেননি।

তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র প্রথম সফল আনবিক পরীক্ষা চালিয়েছে। তার আগে হিটলারের পতন হয়েছে। আরও আগে ইতালি পক্ষ পরিবর্তন করেছে। ইউরোপে যুদ্ধ নেই। শুধু পূর্বদিকে জাপানের সাথে যুদ্ধ চলছে। জাপান কোন রকম মুখরক্ষা করে আত্মসমর্পণের জন্য প্রস্তুত। ঠিক এমন সময় এটম বোমা নিক্ষেপের কোন প্রয়োজন ছিল কি? তাছাড়া মিত্রশক্তির প্রধানদের (স্তালিন, রুজভেল্ট/ট্রুম্যান এবং চার্চিল) ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে শীর্ষ বৈঠক ইয়েলটা সম্মেলন এবং ১৭ জুলাই থেকে ২ আগস্ট ১৯৪৫ সালে পোটসড্যাম সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, মাষ্ণুরিয়ায় অবস্থিত সোভিয়েত লাল ফৌজ জাপান আক্রমণ করবে এবং তারিখও নির্ধারিত ছিল ৮ আগস্ট। যদিও পোটসড্যাম সম্মেলনের আগেই রুজভেল্ট মারা গিয়েছিলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান উপস্থিত ছিলেন। সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেক সমুদ্র উপকূলে লাল ফৌজ প্রস্তুতও ছিল। কিন্তু তার আগেই আচমকা ৬ আগস্ট আমেরিকা জাপানে এটম বোমা ফেললো। এটা ছিল মিত্র শক্তির যৌথ সিদ্ধান্তের সাথে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা। কারণ কথা ছিল সোভিয়েত জাপান আক্রমণ করবে। তাই সোভিয়েত সরকার অবাক হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে তারা সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে যে জাপান আক্রমণের পরিকল্পনা ছিল তা স্থগিত রাখলো। তবু আমেরিকার ভয় ছিল, যদি পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৮ আগস্ট লাল ফৌজ জাপানে এসে পড়ে। তাই তারা ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে আরেকটা এটম বোমা ফেললো।

যুদ্ধ জয়ের জন্য এটম বোমা নিক্ষেপের কোন প্রয়োজনই ছিল না। এমনকি বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী চার্চিল বলেছিলেন যে, ‘এটা মনে করা ভুল হবে যে, এটম বোমার দ্বারা জাপানের ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছিল। প্রথম বোমা নিক্ষেপের অনেক আগেই তার পরাজয় নিশ্চিত হয়েছিল’। মার্কিন প্রেসিডেন্টের চিফ অফ স্টাফ ডব্লিউ বি ল্যাথিও একই কথা বলেছেন। মার্কিন সেনাপতি ডগলাস ম্যাক আর্থার বলেছেন যে, ১৯৪৫এর জুন মাসের দিকেই জাপান আত্মসমর্পণের পথ খুজছিল। তবু কেন এটম বোমা নিক্ষেপ করা হলো? এর উত্তর তদানীন্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারী ট্রুম্যানের মুখ থেকেই শোনা যাক। ‘যুদ্ধ শেষে আমাদের শর্ত চাপিয়ে দেয়া বা শর্ত মানতে বলার ক্ষেত্রে এই বোমা আমাদেরকে সুবিধাজনক অবস্থানে এনে দিয়েছে’। ট্রুম্যান প্রশাসনের যুদ্ধ সচিব হেনরী স্টিমসনের স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ ‘অন অ্যাক্টিভ সার্ভিস’এ এটম বোমা নিক্ষেপের ঘটনাকে ‘এ ব্যাডলি নিডেড ইকোয়ালাইজার ইন দি ডিপলোম্যাটিক স্ট্রাগল ইউথ ইউএসএসআর’ (সোভিয়েত ইউনিয়ন) বলে অভিহিত করেছিলেন।

তাহলে আসল ঘটনা হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বে সারা দুনিয়াকে ব্ল্যাকমেইল করা, বিশ্বে আধিপত্য বিস্তার করা এবং সর্বোপরি সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতের অগ্রাভিযানকে বন্ধ করার জন্য এই ভয়ংকর বোমাটি নিক্ষেপ করা হয়েছিল। বৃটিশ বিজ্ঞানী পি.এম.এস. ব্ল্যাকেট বলেছেন, এখান থেকেই শুরু হয়েছিল শীতল যুদ্ধ (Fears, War and the Bomb)। এভাবেই ভয়ংকর উত্তপ্ত ঘটনার মধ্যদিয়ে শুরু হয়েছিল শীতল যুদ্ধ।

যুদ্ধ পরবর্তী যুগে জাতিসংঘ গঠিত হয়। জাতিসংঘ আনবিক এনার্জি কমিশনের প্রথম বৈঠকেই সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ থেকে এন্দ্রি গ্রোমিকো সকল আনবিক অস্ত্র উৎপাদন ও মজুত নিষিদ্ধের প্রস্তাব রেখেছিলেন ১৯৪৫ সালের ১৯ জুন। যুক্তরাষ্ট্র তাতে সম্মত হয়নি। তারা ১৯৪৬ সালের ১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র আবার পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালায়। এবারও জাপানে। তবে সাগরে।

এটা দুঃখজনক ছিল যে, সেদিন অধিকাংশ রাষ্ট্র সোভিয়েতের পরিপূর্ণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন দেয়নি। ১৯৪৯ সালের ২৯ আগস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম এটম বোমা বানায়। এতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মনোপলি ভেঙ্গে গেল। এবার সোভিয়েত ইউনিয়ন আবারও পরিপূর্ণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের জন্য প্রস্তাব রাখে। যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ফ্রান্স তারা সকলেই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পরে গণচীন প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিল যে, তারা কখনোই প্রথমে পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করবে না এবং যে দেশের এই বোমা নেই অথবা যে দেশে পারমাণবিক ঘাটি নেই, সেই দেশের বিরুদ্ধেও এই পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করবে না। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পরবর্তীতে চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ও ফ্রান্সের কাছ থেকেও অনুরূপ ঘোষণা দাবি করে। কিন্তু আমেরিকা, বৃটেন, ফ্রান্স কখনোই এই রূপ ঘোষণা দেয়নি। বরং একমাত্র এটম বোমা ব্যবহারকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হিরোশিমানাগাসাকির পরও ২৮ বার পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের হুমকি দিয়েছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তৃতীয় বিশ্বের দেশের বিরুদ্ধে।

অন্যান্য অনেক দিক ছোড়া এই এটম বোমার প্রশ্নেও সাম্রাজ্যবাদ ও সমাজতন্ত্রের মৌলিক পার্থক্যটি বোঝা যায়। সাম্রাজ্যবাদ হলো শান্তি ও মানবতার দুশমন। আর সমাজতন্ত্র হলো বিশ্ব শান্তি ও শোষণ মুক্তির দুর্গ। ইতিহাসের এই শিক্ষাটি যেন আমরা মনে রাখি।।