Home » বিশেষ নিবন্ধ » বামপন্থী রাজনীতির অবস্থা প্রসঙ্গে :: আহমদ ছফা

বামপন্থী রাজনীতির অবস্থা প্রসঙ্গে :: আহমদ ছফা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বামপন্থীদের কোনো অবস্থান না থাকার কারণে বেবাক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দক্ষিণপন্থী কক্ষ পথে ঢুকে পড়েছে। এই দুষ্টচক্রের ভেতর থেকে রাজনীতিকে টেনে বের করতে না পারার কারণে গোটা রাজনীতিটাই পচে উঠেছে

Last 2সুবিধাবাদী, আপোষকামী, লাভালাভ বিবেচনায় নীতিবদল এবং এ কারণে মিথ্যাকে সত্য বলে বয়ান করার মানসিকতার একেবারেই বিপক্ষ দলের একজন মানুষ ছিলেন আহমদ ছফা। সত্যকে সত্য বলার, ন্যায়অন্যায় বিবেচনার সূক্ষ্ম বোধবুদ্ধিসম্পন্ন একজন বিরল মানুষ ছিলেন তিনি। সব সময়ই স্পষ্ট এবং অপ্রিয় কথাগুলো তিনি বলতেন নির্দ্ধিধায়, ভয়ভীতিহীনভাবে। দেশ এবং সাধারণ মানুষের প্রতি অসীম ভালোবাসার কারণে রাষ্ট্র ও সমাজের অবিচার, অনাচার এবং বুদ্ধিজীবী নামধারী চাটুকারদের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ানো, প্রতিবাদ করার সক্ষমতা, দৃঢ়তা এবং ঋজু চরিত্রের অধিকারী ছিলেন বলেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন তার সময়কালের হাতেগোনা দু’চারজনের মধ্যে সবচেয়ে অগ্রগামী। তাঁর জন্ম ১৯৪৩ সালের ৩০ জুন, আর প্রয়ান ২০০১ সালের ২৮ জুলাই। মহান, কৃর্তিমান ও সাহসী আহমদ ছফা’র প্রতি আমাদের অসীম শ্রদ্ধা। এই শ্রদ্ধা জানানোর উদ্দেশ্যেই তার লিখিত প্রাচ্যবিদ্যা প্রকাশনীর ‘সাম্প্রতিক বিবেচনা বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ বইয়ের অংশ বিশেষ পুনঃপ্রকাশিত হলো।।

সম্পাদক

বাংলাদেশী রাজনীতি সংস্কৃতির যা কিছু উজ্জ্বল অংশ তার সিংহভাগই বামপন্থী রাজনীতির অবদান। ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে বামপন্থী রাজনীতির উত্তাপ থেকেই বাঙালি সংস্কৃতির নবজন্ম ঘটেছে। সমস্ত সংস্কৃতির প্রভাবমুক্ত একটি নতুনতরো সংস্কৃতির উন্মেষ বিকাশ লালনে বামপন্থী সংস্কৃতি সেবীদের যে বিরাট সাফল্য এবং ত্যাগ; তিলতিল করে সংস্কৃতির আসল চেহারাটি ফুটিয়ে তোলার কাজে বামপন্থী সংস্কৃতি কর্মীরা যে শ্রম, মেধা এবং যত্ন ব্যয় করেছেন, সে কাহিনী এখন প্রায় বিস্মৃতিতে বিলীন হতে চলেছে। তাঁদের সাফল্যের পরিমাণ হয়তো আশানুরূপ ছিল না। কিন্তু সূচনাটি করেছিলেন এবং অনেকদিন পর্যন্ত সংস্কৃতিকে লালন করেছেন। সংস্কৃতিতে উত্তাপ, লাবণ্য এবং গতি সঞ্চার করার ব্যাপারে বামপন্থী সংস্কৃতি কর্মীরা অনেক কিছু দিয়েছেন। সেই সব মহান অবদানের কথা শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করার প্রয়োজন এখন বড়ো হয়ে দেখা দিয়েছে।

বামপন্থী রাজনৈতিক সংগ্রাম থেকেই বাংলাদেশের জাতীয়তার বোধটি প্রথম অঙ্কুরিত এবং মুকুলিত হয়। বাঙালি জাতীয়তার প্রাথমিক সোপানগুলো বামপন্থী রাজনীতির নেতাকর্মীরাই নির্মাণ করেছিলেন। সে জন্য তাঁদের জেল, জুলুম, অত্যাচার নির্যাতন কম সহ্য করতে হয়নি। সেই সময়ে আওয়ামী লীগ দলটির কাছ থেকেও তাঁদের কম নিগ্রহ ভোগ করতে হয়নি। পাকিস্তানের সংহতি বিনাশকারী, বিদেশী গুপ্তচর ইসলামের শত্রু এই ধরনের অভিযোগ বামপন্থী রাজনীতির নেতা এবং কর্মীদের বিরুদ্ধে হামেশাই উচ্চারিত হতো। এসব সব লাঞ্ছনা সহ্য করেও বামপন্থী রাজনীতির নেতা এবং কর্মীরা ধর্মতান্ত্রিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামোর ভেতরেই একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের ভ্রুন রোপণ করতে পেরেছিলেন। বর্তমানে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরা যেটুকু সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করেন, তার পেছনে রয়েছে বামপন্থী রাজনীতির বিপুল পরিমাণ অবদান। বামপন্থী রাজনীতিই শ্রমিক, কৃষক, নিম্নবিত্ত সমস্ত নির্যাতিত মানুষকে অধিকার আদায়ের স্বপ্ন দেখিয়েছে, সংগঠিত করেছে এবং আন্দোলনে টেনে নিয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশের দুর্ভাগা বামপন্থী আন্দোলন এখন রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ উত্থানরহিত।

বামপন্থী রাজনীতির মুমূর্ষূ অবস্থা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্যকে তমাশাচ্ছন্ন করে রেখেছে। এই দেশটির সত্তর ভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। অথচ এই দেশটির রাজনৈতিক ক্ষমতা যারা নিয়ন্ত্রণ করে, তার মধ্যে এই বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। বাংলাদেশের কৃষক শ্রমিক নিম্নবিত্ত মানুষ গুটিকয় মানুষের শোষণ পীড়নের শিকারে পরিণত হয়ে আসছে। তারা এমন কোনো রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলতে পারেননি, যার সাহায্য তাঁরা নিজেদর ভাগ্য গড়ে তোলার সুযোগ পান।

মধ্যশ্রেণীভুক্ত রাজনৈতিক দলগুলো বাংলাদেশের নির্যাতিত জনগোষ্ঠীকে শোষণের মাধ্যমেই নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রেখেছে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ। তারা দেশে শিল্পকারখানা তৈরি করে দেশের বেকার সমস্যা সমাধান করতে পারেন না। অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতেও তারা অক্ষম। বাংলার ঘুণেধরা গ্রাম সমাজের কাঠামোর পরিবর্তন করে নতুন সমাজ সৃষ্টি করার পরিকল্পনা তাঁদের নেই। সংখ্যাধিক জনগোষ্ঠীর প্রাণপ্রিয় দাবি খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও শিক্ষা ব্যবস্থা এ সবের ব্যবস্থা তারা করেন না। আমাদের ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে বিপুল পরিমাণ সৃজনী ক্ষমতা রয়েছে, সেটাকে মুক্তি দিয়ে দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণও তাদের অভিষ্ঠ হতে পারে না। তারা নিজেদের শাসন শোষণের মাধ্যমে জরাজীর্ণ সমাজ ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে গোটা সমাজটাকে এমন একটা কারাগার বানিয়ে রাখতে চান, যাতে করে মানুষ তার অধিকার কখনো ভোগ করতে না পারে। শাসকশ্রেণী সমাজের ওপর তাদের অপ্রতিহত শোষণ ব্যবস্থা কায়েম রাখার জন্য বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তাবেদারী করে এবং আগ্রাসী শক্তির সঙ্গে হাত মেলাতেও কুণ্ঠিত হন না।

এই সমাজে শ্রমিক কৃষক মেহনতি সমাজের স্বার্থরক্ষা করতে পারে এমন বলিষ্ঠ আন্দোলন সমাজের অভ্যন্তর থেকে জেগে উঠতে পারছে না। আমাদের রাজনৈতিক জীবনে বামপন্থী রাজনীতির প্রভাব খুবই সামান্য। বামপন্থী রাজনীতির মধ্যে কোনো ঐক্য নেই। তারা অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপদলে বিভক্ত। দেশের প্রকৃত বাস্তব পরিস্থিতি বিচার বিশ্লেষণের বদলে অপ্রয়োজনীয় মতাদর্শগত বিতর্কে তাদের সময় কাটে। বাংলাদেশের বামপন্থী দলগুলোর পক্ষে সাধারণ নির্বাচনে প্রার্থী দেয়া অসম্ভব হয়ে উঠে। কোনো রকমে প্রার্থী দাঁড় করাতে পারলেও সে সকল প্রার্থী, নির্বাচনে এমন শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়, তাঁদের জামানত পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত হয়। তাদেরকেও মধ্যশ্রেণীভুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর মতো ধনিকদের চাঁদার ওপর নির্ভর করতে হয়। এক কথায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে বামপন্থীদের কোনো অবস্থান না থাকার কারণে বেবাক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দক্ষিণপন্থী কক্ষ পথে ঢুকে পড়েছে। এই দুষ্টচক্রের ভেতর থেকে রাজনীতিকে টেনে বের করতে না পারার কারণে গোটা রাজনীতিটাই পচে উঠেছে।

বামপন্থী রাজনীতির এই দৈন্যদশা সমস্ত দেশপ্রেমিক এবং মুক্তিকামী মানুষের দুর্ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন একটা সময় ছিল, যখন বামপন্থী রাজনীতির উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সকলের সামনে পরিদৃশ্যমাণ হয়ে উঠেছিল। সকলে বামপন্থী রাজনীতির ভবিষ্যতের মধ্যেই দেশের ভবিষ্যৎ দেখতেন। এখন তাঁদের অতীতদিনের স্মৃতির কথা স্মরণ করে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। বাংলাদেশের শহর বন্দর গ্রামগঞ্জের হাজার হাজার কর্মী যারা দেশ এবং জাতির সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য সব রকমের আত্মত্যাগ করতে কুণ্ঠিত হননি। এই সমস্ত ত্যাগী এবং নিষ্কলঙ্ক কর্মীরা এখন সকলের করুণার পাত্রে পরিণত হয়েছেন। রাজনীতি, কালোবাজারী, লুটেরা, চোরাচালানি এক কথায় সমাজের যতো খারাপ মানুষ আছে, তাদের স্থায়ী পেশায় রূপান্তরিত হয়েছে। রাজনীতিতে সৎ মানুষের অবস্থান বহুকাল পূর্বেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, চিহিৃত অপরাধী, মাফিয়াচক্রের হাতে দেশের কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য বন্দী হয়ে আছে। এই অবস্থাটি যদি দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকে, এই সমাজ মানুষের বসবাসের সম্পূর্ণ অযোগ্য হয়ে পড়বে।

এই পরিস্থিতির অবসান ঘটানোর জন্য দেশের কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের একটি রাজনৈতিক উত্থান অবশ্যম্ভাবী। পরিতাপের বিষয় হলো কৃষক, শ্রমিক, বিত্তহীন এবং নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনের সঙ্কট পূর্বের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। অথচ তাদের প্রতিবাদ করার কোনো উপায় নেই। তাঁদের দাবির কাছে শোষকশ্রেণীগুলোকে নতিস্বীকারে বাধ্য করতে পারে, এমন কোনো সংগঠন নেই। ইতিহাস ঘাটলে এমন বহু প্রমাণ পাওয়া যাবে বাংলাদেশের নির্যাতিত জনগণ অতীতে এ রকম উত্থান শক্তিহীন ছিল না। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র এবং নিম্নবিত্ত মানুষের সম্মিলিত আন্দোলনের তোড়ে ভূতপূর্ব পাকিস্তানের জঙ্গী লাট আয়ুব খানকে পর্যন্ত পরাজয় স্বীকার করতে হয়েছে। অথচ বর্তমান সময়ে দারিদ্র মানুষের একজন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পর্যন্ত নির্বাচিত করার ক্ষমতা নেই।

বামপন্থী রাজনীতির বর্তমান স্থবিরতার কারণগুলো অনুসন্ধান করতে হলে আমাদের পেছনের দিকে না তাকিয়ে গত্যন্তর নেই। বামপন্থী রাজনীতির মধ্যে যে উজ্জ্বল সম্ভাবনা মূর্তিমান হয়ে উঠেছিল, তা অনেকের মধ্যেই আশাবাদ জাগিয়ে তুলতে পেরেছিল। সকলে আশা করেছিলেন বামপন্থী রাজনীতিই দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে। বামপন্থী রাজনীতির প্রবল প্রবাহে স্তরের পর স্তর বালু সঞ্চিত হয়ে মূল স্রোতো ধারাটিই রুদ্ধ করে ফেলেছে। বিভ্রান্তি বিচ্যুতির সে বালুরাশি খনন করে বামপন্থী রাজনীতির গতিমুখটি উন্মুক্ত করে দেয়ার জন্য অতীতের বিচ্যুতি এবং বিভ্রান্তিগুলোর দিকে অত্যন্ত নির্মোহ দৃষ্টিতে তাকানো অত্যাবশ্যকীয় হয়ে উঠেছে।।

(চলবে…)

১টি মন্তব্য

  1. আহমেদ ছফা অনেক উচুদরের মানুষ ছিলেন। তার লেখার মন্তব্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।