Home » আন্তর্জাতিক » চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ২২)

চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ২২)

অর্থনীতির নতুন গতি

আনু মুহাম্মদ

Last 2সমাজ ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের পাশাপাশি বিশাল দেশে পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার পুনর্গঠন এবং অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা গতিশীল করার জন্য ১৯৫২ পর্যন্ত অনেকগুলো ব্যবস্থা নেয়া হয়, যার ধারাবাহিকতা পরেও অব্যাহত থাকে। চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘পিপলস ব্যাংক অব চায়না’র কর্তৃত্বে পুরো ব্যাংক ব্যবস্থা জাতীয়করণ করা হয়। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে মুদ্রাব্যবস্থা একীভূত করা হয়, ঋণ সংকোচন করা হয়, সরকারি ব্যয় কঠোর নিরীক্ষার মধ্যে আনা হয় এবং মুদ্রামান অক্ষণ্ন রাখবার বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়। আন্তর্জাতিক ও দেশিয় বাণিজ্য সম্প্রসারণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয় যার মধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গঠন অন্যতম। এই প্রতিষ্ঠান বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা করে উৎপাদকদের কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করতো এবং দেশি বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করতো। চীনে বিপ্লবপূর্ব সরকারের আমলেই শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর এক তৃতীয়াংশ এবং আধুনিক পরিবহণের বৃহদাংশ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে ছিলো, বিপ্লবী সরকার প্রথমেই এগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। বাকি ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোরও অনেকগুলো ক্রমে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তবে ১৯৫২ সাল পর্যন্তও শতকরা ১৭ ভাগ শিল্প কারখানা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিলো।

কৃষির কথা আগেই বলেছি। ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে শতকরা ৪৮ ভাগ আবাদী জমি ভূস্বামীদের হাত থেকে নিয়ে গরীব বা ভূমিহীনদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এরপর পারস্পরিক সহযোগী দলের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে যৌথ চাষ এবং পরে কমিউন প্রতিষ্ঠার দিকে চীন অগ্রসর হয়। ১৯৫২ সাল নাগাদ কৃষক পরিবারের শতকরা ৩৯ ভাগ মানুষ পারস্পরিক সহযোগী দলে যুক্ত ছিলো। এই বছরের মধ্যেই গ্রাম শহরের অর্থনীতি একটি স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছায়। দাম স্থিতিশীল হয়, বাণিজ্য ব্যবস্থা সংগঠিত হয়, শিল্প ও কৃষি বিপ্লবপূর্ব কালের উৎপাদন সূচকে পৌঁছে তা অতিক্রমের দিকে অগ্রসর হয়।

বস্তুত ১৯৫৮ সালের মধ্যে কৃষিতে কমিউন ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ আকার নেয়। এগুলো যে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার অধীনেই অগ্রসর হয়ে একটি স্পষ্ট রূপ নিয়েছে তা নয়, স্থানীয় উদ্যোগ এবং করতে করতে শেখাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৫৮ সালের আগষ্ট মাসে অনুষ্ঠিত পলিটব্যুরোর সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, এই গণকমিউনগুলোই গ্রামীন চীনের নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো হিসেবে কাজ করবে। সারাদেশে মোট ৭৪ হাজার কমিউনের মধ্যে ৭ লক্ষ ৪০ হাজার বৃহৎ কৃষি সমবায় সংগঠিত হয়। বছরের শেষে সরকারি ঘোষণায় বলা হয় যে, শতকরা ৯০.৪ ভাগ কৃষক পরিবার কমিউনের অন্তর্গত হয়েছে। কমিউনগুলো ছিলো তুলনামূলকভাবে স্বনির্ভর সমবায়ী ব্যবস্থা। যেখানে মুদ্রা ও মজুরি কর্মপয়েন্ট দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছিলো।

বাংলাদেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক, লেখক ও সংগঠক ফয়েজ আহমদ ৬০ ও ৭০ দশকে একাধিকবার চীন সফর করেন। প্রথমবার সাংস্কৃতিক বিপ্লবের আগে গিয়ে বেশ কিছুদিন ছিলেন, এরপর গেছেন মাও পরবর্তী চীনে। তাঁর লেখায় দুই সময়েরই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও সাক্ষাৎকার পাওয়া যায় যা চীনের পরিস্থিতি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ১৯৬৬ সালে কমিউন সফর করেছিলেন এবং এক সপ্তাহ সেখানে কৃষকদের সাথে থেকেছেন। তাঁর লেখা থেকে এই বিশাল ও নতুন সমাজঅর্থনৈতিক কাঠামোর সম্পর্কে একটি চিত্র পাওয়া যায়। কমিউনের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে ফয়েজ আহমদ লিখেছেন: ‘বর্তমানে কৃষকদের প্রত্যেক দিনের কাজের ভিত্তিতে ‘ওয়ার্ক পয়েন্টে’ মাসিক মজুরী দেয়া হয়ে থাকে। তাছাড়া শস্যের মওসুমে বিনিপয়সায় শস্য ও শাকসব্জী তাদের মধ্যে বন্টন করা হয়। কোন পরিবারের জনসংখ্যা অধিক ও শ্রমশক্তি তার তুলনায় অল্প হলে কমিউন থেকে অতিরিক্ত পয়সা দেয়া হয় সংসার চালাবার জন্যে। কমিউনের সদস্যদের এখন জীবনের পাঁচটি রক্ষাকবজ রয়েছে যথা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা। একটি কমিউনের ছোটবড় শতাধিক গ্রামও থাকতে পারে। অবশ্য অনেক ক্ষেত্রে পঁচিশত্রিশটি গ্রাম একত্র করা হয়েছে। কমিউনের তিনটি স্তর বা বিভাগ। প্রথমে কমিউনের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব, দ্বিতীয় স্তর ব্রিগেড ও ব্রিগেডের অধীন উৎপাদক টিম। প্রত্যেকটি টিমের কৃষকগণ বিভিন্ন গ্রুপে কাজ করেন।’

তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণ থেকে আরও বলেছেন, ‘কমিউন প্রতিষ্ঠার পর পল্লী সমাজে কয়েকটি ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। প্রথমে বাড়ীর কর্তা ব্যক্তির আয় ও ব্যয়ের কর্তৃত্ব বিলুপ্ত হয়েছে এবং একজনের রুজির উপর পরিবারের সবাই নির্ভর করেন না। কার্য্যক্ষম প্রত্যেকেই মা, স্ত্রী, ছেলেমেয়ে রোজগার করেন এবং শ্রম অনুযায়ী পয়সা পান। দ্বিতীয়ত:, অনেক কমিউনে সাধারণ খাবার ঘর চালু করা হয়েছে এবং এ সমস্ত পাবলিক ডাইনিং হলে যে কোন সদস্য স্বেচ্ছায় খাদ্য গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু অধিকাংশই নিজের বাড়ীতে রান্না করে খান, তদুপরি সর্ব্বত্র নার্সারী ও কিন্ডারগার্টেন প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এর ফলে মহিলাদের কাজের সুবিধা হয়েছে এবং তাঁরা পারিবারিক ঝামেলা থেকে রেহাই পেয়েছেন।কমিউনের কৃষক পরিবারের ব্যক্তিগত স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি কিছু নেই বলে একটা প্রচার রয়েছে। কিন্তু কোন কমিউনেই ব্যক্তিগত সম্পত্তি সম্পূর্ণ বিলুপ্তির প্রমাণ পাওয়া যায় না। সমস্ত কমিউনেই কৃষকদের ব্যক্তিগত চাষাবাদের জন্য জমি দেয়া হয়।.. এই জমিতে কৃষকগণ প্রধানত: বছরে তিনবার শাকসব্জী উৎপাদন করেন।’

তথ্যসূত্র

১। এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা আছে : Mark Selden and Victor Lippit (ed): The Transition to Socialism in China, NY, 1982.

২। ফয়েজ আহমদ: চীনে ক্রান্তিকাল, পুঁথিপত্র প্রকাশনী, ঢাকা। ১৯৮২।