Home » অর্থনীতি » তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (দ্বাদশ পর্ব)

তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (দ্বাদশ পর্ব)

বড় ধরনের দুর্নীতিতে বিপজ্জনক সংশ্লিষ্টতা

Last 6অস্ত্র ব্যবসার সাথে তেল সম্পদের অর্থের একটি গভীর সখ্যতা রয়েছে। একটি অপরটিকে টিকিয়ে রাখে। আর পরস্পরের ঘনিষ্ঠ দুই ব্যবসার কুশীলবরা। এই ব্যবসার নেপথ্যে রয়েছে ঘুষ, অর্থ কেলেঙ্কারিসহ নানা ভয়ঙ্কর সব ঘটনাবলী। এরই একটি খন্ডচিত্র প্রকাশ করা হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। প্রভাবশালী দ্য গার্ডিয়ানএর প্রখ্যাত দুই সাংবাদিক ডেভিড লে এবং রাব ইভানসএর প্রতিবেদন প্রকাশের পরে এ নিয়ে বিস্তর আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। এ সংখ্যায় ওই প্রতিবেদনের বাংলা অনুবাদের (দ্বাদশ পর্ব) প্রকাশিত হলো। অনুবাদ : জগলুল ফারুক

প্রধান অস্ত্র বিক্রেতা লেস্টার সাফিল্ড অবশ্য এ বক্তব্যটি মেনে নিতে পারেননি। তিনি বলেন, কুয়েতের কাছে ট্যাংক বিক্রির জন্য সবেমাত্র ৩৫ লাখ পাউন্ডের একটি কমিশন প্রদান করা হয়েছে। কুয়েতের বিষয়টি একটি স্পর্শকাতর ঘটনার জন্ম দিতে পারে। এক্ষেত্রে আমাদের সরকারের ছত্রছায়ায় থেকে বড় ধরনের ব্যবসা করার সমস্যাটি মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

১৫ শতাংশ নতুন সৌদি ব্যবসার অনুমোদন দিতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব ফ্র্যাংক কুপারের ওপরও চাপ সৃষ্টি করা হয়। সাফিল্ড তাকে ধমকের সুরেই জানান, সৌদিদের সাথে ব্যবসা করব না এ কথা কোনোভাবেই আমি তাদের জানাতে পারবো না। এসব ক্ষেত্রে সরকারি নিরীক্ষক স্যার ডগলাস হেনলি বরাবরই একটি সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছেন। এভাবে অস্বাভাবিক পথে ইরান এবং কুয়েতের দালালদের কাছে অত বড় অংকের অর্থ প্রেরণের যৌক্তিকতা ও এখতিয়ার নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন। সাফিল্ড ভয় পেয়ে যান পাছে ডগলাস বিষয়টি জনসম্মুখে প্রকাশ করে দেন। বিশেষত তিনি সে সময় সৌদিদের কাছে বিএই’র একটি অস্ত্র বিক্রয় চুক্তির ওপর কাজ করছিলেন। নতুন এই বিক্রয় চুক্তিটি প্রসঙ্গে সাফিল্ড বলেন, ইরান এবং কুয়েতে অস্ত্র বিক্রি করতে গিয়ে যে পরিমাণ কমিশন দিতে হয়েছিল এখনকার চুক্তিতে কমিশনের হারটি তার চেয়ে অনেক বেশি।

নথি বলছে, বিষয়টি প্রসঙ্গে তাড়াহুড়ো করে মন্তব্য করতে গিয়ে কুপার লেখেন, ঘটনা যেভাবে ঘটছ সেটা আমার কাছে একদম পছন্দনীয় নয়। এ বিষয়টি যে কোনো দিন জানাজানি হয়ে যেতে পারে। বিষয়টি নিয়ে চলতে থাকা হিনলের তদন্ত কাজ শেষ পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়া হয়। বিএই’র পক্ষ থেকে লেখা এক চিঠিতে বলা হয়, কমিশন বাবদ যে অর্থ প্রদান করা হয়েছে কোম্পানির জানা মতে, তাদের পরিচালনা পরিষদের চেয়েও ওপরের কোনো কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়েই তা দেয়া হয়েছে। অন্য এক চিঠিতে মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব জানান, বিএই’র ব্যাপারে তিনি একেবারে সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেই নিশ্চয়তা পেয়েছেন। কুপার বলেন, সরকারের সর্বোৎকৃষ্ট নীতি হচ্ছে বিষয়টি নিয়ে অতিমাত্রায় খোঁজাখুজি পরিহার করে চলা কিংবা পরবর্তী প্রজন্ম বিষয়টি নিয়ে বলবে এসব নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না, এসব নিয়ে আর কোনো কথা নয়। কিন্তু কুপারের দুর্ভাগ্য ঠিক ওই সময়েই একটি কেলেংকারির ঘটনা ফাঁস হয়ে পড়ে এবং দুর্নীতির সাথে সরকারের সম্পৃক্ততার বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। ডেইলি মেইল পত্রিকা তার ১৮ মে ১৯৭৭ তারিখের সংখ্যায় শিরোনাম হিসেবে প্রকাশ করে ‘লেল্যান্ড কোম্পানি কর্তৃক বিশ্বব্যাপী ঘুষ প্রদানের ঢেউ’ বিষয়টি নিয়ে লেল্যান্ডের নিজস্ব যে প্রতিবেদন তৈরি হয়েছিল তার কিছু অংশও জনসমক্ষে প্রকাশ হয়ে পড়ে। তাকে ‘বড় ধরনের দুর্নীতিতে বিপজ্জনক সংশ্লিষ্টতা’ বলে মন্তব্য করা হয়েছিল। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পূর্ববর্তী এক বছরে মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকায় তেলসমৃদ্ধ কয়েকটি দেশেই সবচেয়ে বেশি ঘুষ প্রদান করা হয়েছে। যা ইরানে ২১ লাখ ৭৪ হাজার পাউন্ড, ইরাকে ১৭ লাখ ৫ হাজার পাউন্ড, সৌদি আরবে ১৩ লাখ ৭৩ হাজার পাউন্ড, নাইজেরিয়ায় ৯ লাখ ৯১ হাজার পাউন্ড কেলেংকারিটি ধামাচাপা দেয়ার জন্য সপ্তাহান্তেই কালাহান তার সহকর্মীদের নিয়ে শলাপরামর্শে বসে যান। ডেনিস হিলি অবশ্য তার যথারীতি খোলামেলা মন্তব্যে বলেন, বহু বছর ধরেই বেশ বড় আকারে ঘুষের লেনদেন চলছে। এই কাজে ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অস্ত্র বিক্রয় বিভাগ এবং জাতীয়করণকৃত কোম্পানিগুলো জড়িত রয়েছে।

জ্বালানিমন্ত্রী টনি বেন তার রোজনামচায় লেখেন, হিলির কথাবার্তা শুনে বোঝা যায়, বিষয়টিকে তিনি একটু হালকা করারই চেষ্টা করছেন এবং বোঝাতে চাচ্ছেন সবাই যেন এটা করছে। তবে বেন প্রস্তাব করেন, কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যত কর্মকান্ডের জন্য একটি নীতিমালা বেধে দেয়া দরকার। বাণিজ্যমন্ত্রী এডমান্ড ডেল বলেন, তিনি চান না মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়–ক। শিল্পমন্ত্রী এরিক ভার্লে মন্তব্য করেন, আমাদের ব্যবসাবাণিজ্যের ১০ শতাংশে এমন সব কর্মকান্ড জড়িত থাকে যেগুলো সাধারণভাবে আমরা অন্যায় আচরণ বলে অভিহিত করে থাকি। নাইজেরিয়ায় ৮ কোটি পাউন্ডের সম্ভাব্য একটি ব্যবসায় ঘুষ দাবি করা হয়েছে। অথচ এ ব্যবসাটি পেলে বৃটেনের সংকটাপন্ন জাহাজ নির্মাণ শিল্পে অন্তত এক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারত। সহকর্মীদের বক্তব্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী কালাহান বলেন, আমি আমাদের নিজস্ব কোম্পানিগুলোর সুবিধাদি কাটছাট করার বিষয়টি এড়াতে চেয়েছিলাম। নথি বলছে, শেষমেষ কালাহান যখন বললেন, ব্রিটিশ অর্থনীতি বহুলাংশেই রফতানি বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল তখন তার সহকর্মীরা বিষয়টি নিয়ে চুপচাপ থাকার ব্যাপারে একমত হয়ে যান।

বাণিজ্য বিভাগের স্থায়ী সচিব স্যার লিও প্লিটেস্কির কাছ থেকে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত একটি প্রতিবেদন চাওয়া হয়। প্রতিবেদনটির শেষ দিকের মন্তব্য বলা হয়, বাস্তবতার নিরিখে এ সত্যই প্রতীয়মান হচ্ছে যে, দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব বাজারে আমাদের যে বাণিজ্যিক মন্দা চলছিল তা কাটিয়ে ওঠা অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছিল। ১৯৭৯ সালে কালাহান সরকারের পতন ঘটলে মার্গারেট থ্যাচার তার স্থলাভিষিক্ত হন। তবে ঘুষ প্রদানের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকায় সরকারি নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। নতুন বাণিজ্যমন্ত্রী সেসিল পারকিনসন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে ডগলাস হার্ডকে জানিয়ে আসেন, জাতিসংঘের কথা জাতিসংঘ বলতে থাকুক। যুক্তরাষ্ট্র যে দ্রুত অগ্রগতির বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে সেদিকে আমাদের মনোযোগ না দিলেও চলবে। বিশ্ব বাজারে আমাদের ব্যবসাবাণিজ্য যেভাবে এখন চলছে সেভাবেই ভবিষ্যতেও চলবে। এটিই আমাদের মৌলিক অবস্থান।।

(চলবে…)