Home » আন্তর্জাতিক » ভারতের সরকারের সাথে নাগা বিদ্রোহীদের চুক্তি টিকবে তো?

ভারতের সরকারের সাথে নাগা বিদ্রোহীদের চুক্তি টিকবে তো?

সুবীর ভৌমিক, বিবিসি অনলাইন

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

Last 1উত্তরপূর্ব নাগাল্যান্ডের বিদ্রোহীরা ২০ লাখ নাগা উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাধীন আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার জন্য ৬০ বছরের বেশি সময় ধরে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা এই বিদ্রোহীদের দমনে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কিন্তু তাতে খুব একটা ফল আসেনি। আর এ কারণেই আবারও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার নাগা বিদ্রোহীদের একাংশের সাথে একটি চুক্তি সম্পাদন করেছে ৩ আগস্ট। ভারত ইতোপূর্বে দুবার নাগাদের সাথে চুক্তি করা হয়েছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন পর্যন্ত বিদ্রোহটি যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সংযত রাখা হয়েছে। প্রধান বিদ্রোহী গ্রুপ ন্যাশনাল সোস্যালিস্ট কাউন্সিল অব নাগাল্যান্ডের (এনএসসিএন) থুইনগালেঙ মুইভা নাগাদের সমস্যা উপলব্ধিএবং শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করার জন্য ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। মোদি বলেছেন, নাগা সমস্যা এত দীর্ঘ সময় বিরাজ করার কারণ হলো ভারত ও নাগারা একে অপরকে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল।

অবশ্য ১৯৫৬ সালে গঠিত নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিল (এনএনসি) ১৯৭৫ সালে ভারতের সাথে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করার পর তাতে ভাঙন ধরে। এনএনসি থেকে বেরিয়ে এনএসসিএন নেতারা সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৮০ সালে গঠিত এনএসসিএন এখন চারটি গ্রুপে বিভক্ত, প্রত্যেকেরই ভবিষ্যত নাগা আবাসভূমির নিজস্ব ভিশন রয়েছে।

সবর্স্ব বিক্রি

কিন্তু ৩ আগস্টের চুক্তিটি (বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি) সব বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপের সাথে নয়, বরং এনএসসিএনএর প্রধান অংশের সাথে করা হয়েছে। মুইভার প্রতিদ্বন্দ্বি নাগা নেতা এস এস খাপলাঙ গত মার্চে ভারতের সাথে সম্পাদিত একটি অস্ত্রবিরতি থেকে সরে যায়। তার যোদ্ধারা তার পর থেকে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। এসব আক্রমণে অন্তত ৩০ ভারতীয় সৈন্য নিহত হয়েছে, গত জুনে এক হামলাতেই নিহত হয়েছে অন্তত ২০ জন।

উত্তর পূর্ব ভারতের আরো কয়েকটি বিদ্রোহী গ্রুপের সাথে আলাদা জোট ‘খাপলাঙ’ এর মধ্যেই ‘সর্বস্ব বিক্রি’ হিসেবে অভিহিত করে চুক্তিটির বিরোধিতা করেছে। তারা বলেছে, ‘স্বাধীনতার জন্য নাগাদের যে আকাঙ্ক্ষা’ তার সাথে কোনো ধরনের আপস করবেনা’। নাগা সাংবাদিক বানু হারালুর মতে, ফলে এটা নিশ্চিত যে, খাপলাঙের যোদ্ধারা চুক্তিটিকে ক্ষতবিক্ষত করার জন্য তাদের হামলা জোরদার করবে। সরকার বিদ্রোহীদের একটি অংশের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করে এই ঝুঁকিটি গ্রহণ করেছে। হারালু ১৯৮৬ সালের চুক্তির সফলতার নজির উল্লেখ করেছেন। ওই চুক্তিটি উত্তরপূর্ব রাজ্য মিজোরামের একই ধরনের বিদ্রোহের অবসান ঘটিয়েছে। হারালু বলেন, পরলোকগত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সরকার ১৯৮৬ সালের চুক্তিটি কোনো একটি গ্রুপ নয়, পুরো বিদ্রোহী নেতৃত্বের সাথে করেছিল। আর সে কারণেই চুক্তিটি বহাল থাকে।

ভারত ইতোপূর্বে দুবার নাগাদের সাথে চুক্তি করেছিল। একবার ১৯৬০ সালে উদার নেতাদের সাথে, যারা ১৯৫৬ সালে এনএনসির ছড়িয়ে দেওয়া সহিংস আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল এবং ১৯৭৫ সালে এনএনসির সাথে।

নাগা আকাঙ্ক্ষা

১৯৬০ সালে সরকার ও উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৬ দফা চুক্তিতে প্রতিবেশী আসামের নাগা হিল জেলাকে কেটে নাগাল্যান্ডকে দেওয়া হয়। ১৯৭৫ সালের শিলং চুক্তির লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র আন্দোলনের সমাপ্তি যাতে নাগাদের আকাঙ্ক্ষাপূরণ করার লক্ষ্যে ব্যাপকভিত্তিক সমঝোতা হয়। মজার ব্যাপার হলো, ইনগালেঙ মুইভার নেতৃত্বাধীন এনএনসির কট্টরপন্থীরা ১৯৭৫ শিলং চুক্তিকে ‘সর্বস্ব বিক্রি’ হিসেবে অভিহিত করে এর বিরোধিতা করে তাদের সশস্ত্র আন্দোলন এগিয়ে নেওয়ার সংকল্প ব্যক্ত করেছিলেন। তার ১৯৭৫ সালের তীব্র বিরোধিতার ঠিক ৪০ বছর পর এখন মুইভা এমন একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেন, যেটাকে মোদি দাবি করলেন নাগাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে।

৩ আগস্টের চুক্তিটির বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া না গেলেও নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যতটুকু জানা গেছে, সে অনুযায়ী, এতে নাগাল্যান্ড সীমান্তের তিন রাজ্য মনিপুর, আসাম ও অরুনাচল প্রদেশের নাগা প্রাধান্যপূর্ণ এলাকাগুলো নিয়ে এনএসসিএনের ‘নাগালিম’ (বৃহত্তর নাগা রাজ্য) গঠনের দাবিটি মেনে নেওয়া হয়নি। এনএসসিএন জোর দিয়ে বলেছে, তারা তাদের দীর্ঘ দিনের স্বাধীনতার দাবি পরিত্যাগ করবে, যদি ভারত এই ‘গ্রেটার নাগালিম’ বাস্তবায়ন করে। কিন্তু এই চুক্তিতে ভারত সরকারের হয়ে মধ্যস্ততাকারী আর এন রবি সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, এই দাবি ‘সাংবিধানিকভাবে সম্ভব, তবে রাজনৈতিকভাবে কঠিন।’

মনিপুর, আসাম ও অরুনাচল প্রদেশ রাজ্য জানিয়েছে, তারা এই দাবির বিরোধিতা করে, তারপরও যদি তা মানা হয়, তবে তারা নাগাপ্রাধান্যপূর্ণ এলাকাগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে গ্রহণ করবে। তবে এই চুক্তিতে নাগারা এখন যতটুকু ভোগ করছে, তার চেয়ে অনেক বেশি স্বায়াত্বশাসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া নাগাল্যান্ডের সাথে তাদের সাংস্কৃতিক বন্ধন জোরদারের কিছু ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

মোদি ইতোমধ্যে বিরোধী ও আঞ্চলিক দলগুলোকে চুক্তিটি সম্পর্কে অবগত করেছেন। নাগা চুক্তিটি বাস্তবায়ন করার জন্য সম্ভাব্য সাংবিধানিক সংশোধন করার জন্য তাদের সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে। ভারতের প্রাচীনতম জাতিগত বিদ্রোহ অবসানে সহায়তা করতে তারা মোদিকে সমর্থন করবেন কি না তা অনিশ্চিত বিষয়। আর খাপলাঙের নেতৃত্বাধীন গ্রুপটিসহ নাগা বিদ্রোহীদের সহিংসতা ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও চুক্তিতে ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে।

ভারতের প্রাচীনতম বিদ্রোহ অবসানের চেষ্টা মোদির গ্রহণ করার কারণ হলো তার ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ পররাষ্ট্রনীতির সফলতার জন্য এর প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য। এই পররাষ্ট্রনীতিতে পশ্চাদপদ অঞ্চলের উন্নয়ন এবং ভারতের অর্থনীতি বিকাশের সহায়তার লক্ষ্যে ভারতের উত্তরপূর্ব অংশকে দক্ষিণপূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার দ্বার বিবেচনা করা হয়েছে।।