Home » রাজনীতি » কেন্দ্রীভূত শাসনের ফলাফল

কেন্দ্রীভূত শাসনের ফলাফল

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

Dis 2সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান প্রধানমন্ত্রীর হাতে সর্বময় ক্ষমতা প্রদান করেছে। ১৯৯১ থেকে এই ক্ষমতার ওপর ভর করে প্রধানমন্ত্রীগন ‘একনায়কতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন, যা সংসদীয় পদ্ধতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এখানে প্রধানমন্ত্রী, তাঁর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রী পরিষদ ও নির্বাহী বিভাগের সংসদের কাছে জবাবদিহিতা নামমাত্র। অন্যদিকে, দলীয়করন ও দুর্নীতির কারণে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকারীতা হারিয়ে ফেলছে। এর সঙ্গে যুক্ত অযোগ্যতা ও অদক্ষতার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানগুলো রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী কাজ করছে না। এর অনিবার্যতায় রাষ্ট্রের প্রধান অঙ্গগুলো সুশাসন নিশ্চিত করার বদলে ব্যক্তি নির্ভর ও ইচ্ছাধীন হয়ে পড়ছে।

এই দুর্বিসহতায় ক্রোধক্ষুব্ধতাঅসহায়ত্ব নিয়ে রাষ্ট্রসমাজের ওপর হতাশ মানুষ এখন চরম অসহিষ্ণু

সংবিধান নির্বাহী প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে একচ্ছত্র ক্ষমতা দিয়েছে। আবার অনেক বিষয় চর্চার মধ্যেও নিয়ে আসা হয়েছে। অবস্থা এই পর্যায়ে পৌছেছে যে, একটি খুন বা গুমের ঘটনা বা কারো জমি দখলের ঘটনা দেখার বিষয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের ওপর ন্যাস্ত থাকলেও প্রধানমন্ত্রীকে এসব বিষয়েও হস্তক্ষেপ করতে হয়। প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা কিভাবে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গকে প্রভাবিত করছে তার বড় উদাহরনটি সৃষ্টি হয়েছে সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী পাশ করার সময়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল ঘোষণা করে সুপ্রীম কোর্টের দেয়া রায়ে নির্দেশনা ছিল; আরো দুই মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংসদ চাইলে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। সংসদীয় কমিটি বিষয়টি পর্যালোচনার পরে মত দিয়েছিল যে, আদালতের নির্দেশনা মেনে আরো দুই মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।

সংসদীয় কমিটির প্রস্তাবের বিপক্ষে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী অবস্থান নিলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী আনা এবং পাশ করা অনিবার্য হয়ে পড়ে। সংবিধানের মূল প্রস্তাবনায় ‘জনগনের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তি স্বরূপ’ শব্দগুচ্ছকে উপেক্ষা করে পঞ্চদশ সংশোধনী পাশ হয়েছিল শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর ‘অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তি’ হিসেবে। জনগনের অভিপ্রায় জানার জন্য সংবিধানে যে গনভোট ব্যবস্থাটি ছিল তা বাতিল করে দেওয়াও ছিল সংবিধানের মূল প্রস্তাবনার সাথে সাংঘর্ষিক। জাতীয় সংসদ চাইলে আরো দুই মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন হতে পারে মর্মে সর্বোচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণএর সাথে সঙ্গতি রেখে সে সময়ে নানা আলোচনা, জনমত, সর্বোপরি সংসদীয় কমিটির সুপারিশ সবই উপেক্ষিত হয়েছে ব্যক্তির অভিপ্রায় বা সিদ্ধান্তের কাছে। অত:পর সংসদ তাঁর ইচ্ছা বাস্তবায়নে পঞ্চদশ সংশোধনী পাশের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। আজকের বাংলাদেশের নির্বাচনমুখী গণতন্ত্র সংকটের শুরু সেখান থেকেই।

একটি শক্তিশালী সংসদীয় রীতির সরকারের ব্যাপারে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু সরকারের প্রধান নির্বাহীর একক ক্ষমতা ও নির্বাহী বিভাগের বিস্তৃত নিয়ন্ত্রন সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থাকে দুর্বল করে রেখেছে। এই রাষ্ট্রের সরকার প্রধান, সংসদ নেতা, দলীয় প্রধান একই ব্যক্তি হওয়ায় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাটি তাঁর ইচ্ছাধীন হয়ে পড়েছে এবং এ সুযোগটি তিনি পেয়েছেন সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে ও চর্চার কারণে। অন্যদিকে দ্বন্দ্বমুখর ও সহিংস রাজনীতি, ক্ষমতাসীন দলের আধিপত্য ও বিরোধী দলের লাগাতার সংসদ বর্জন, দুর্বল সংসদীয় সংস্কৃতি ইত্যাদি কারণ সংসদীয় পদ্ধতির শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে।

নির্বাহী বিভাগের ওপর সংসদের দুর্বল নিয়ন্ত্রন এবং সংসদে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো কমই আলোচিত হয়। হলেও অনেকটা দায়সারা গোছের এবং তা নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্তগুলি জায়েজ করার জন্য আলোচনায় আসে। জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার সুযোগ জনগনের সামনে নেই। জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষকতার ব্যাপক অভিযোগ থাকলেও তাদের রয়েছে দায়মুক্তির ব্যবস্থা। এলাকার উন্নয়ন এবং স্থানীয় সরকারের ওপর নিয়ন্ত্রন হাসিল, তদবীরসহ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কাজে নিয়োজিত থাকায় সংসদ সদস্যদের মূল দায়িত্ব আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রটি ব্যাপকভাবে উপেক্ষিত ও ক্ষতিগ্রস্ত।

২০১৪ সালের ১৪ মে প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টান্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণা সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, সাংবিধানিক একচ্ছত্র ক্ষমতার কারণে কার্যত: দেশে ‘প্রধানমন্ত্রীর একনায়নকতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এজন্য সুশাসন উন্নয়ন ও প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহ ‘নখদন্তহীন বাঘে’ পরিনত হয়েছে। সুশাসনের অভাবে রাজনীতি জনকল্যানের বদলে গণশত্রুতায় পরিনত হয়েছে। রাজনীতির ব্যর্থতা বা অপরাজনীতির সাফল্য রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিকতাকে আঘাত করছে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতায় রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র, সরকারের ভেতরে সরকার তৈরী করছে। গোটা অবয়বটি দুষ্টচক্রের মত জনজীবনে উৎপীড়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এই দুর্বিসহতায় ক্রোধক্ষুব্দতাঅসহায়ত্ব নিয়ে রাষ্ট্রসমাজের ওপর হতাশ মানুষ এখন চরম অসহিষ্ণু।

ব্যক্তির ইচ্ছাধীন রাষ্ট্রসমাজে এখন যা ঘটছে তা পরম্পরাহীন তো নয়ই, অন্তরালে রয়েছে একটি দর্শনগত ঐক্য। ক্রমাগত বিচারহীনতা ও আইনের শাসনহীনতা নিয়ে একটি রাষ্ট্র চলতে পারে না। একটি সময়ে তার অবয়বে ভর করে পৈশাচিকতা ও নৃশংসতা। আর এর শিকার হয়ে সবচেয়ে দুর্বল ও প্রতিরোধহীন মানুষগুলো একের পর এক ঘটনা পরম্পরার শিকার হচ্ছে। দায়মুক্তি, বিচারহীনতা ও আইনকে শাসন করার মধ্য দিয়ে ক্ষমতাবানরা অতিশয় তৃপ্তজাতি হিসেবে আমরা কিন্তু বেশ এগুচ্ছি। ইতিহাসের পাঠক মাত্রই অনুধাবন করবেন, রাষ্ট্রসমাজে এখন যা ঘটছে তার একটি ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা রয়েছে। যে ধারাবাহিকতার চূড়ান্ত প্রদর্শনী বাংলাদেশের মানুষ এখন প্রত্যক্ষ করছে।

দেশটির জন্মলগ্ন থেকে ক্রমাগত গড়ে তেলা হয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় রাষ্ট্রের স্থপতি ও রাষ্ট্রপতিকে সপরিবারে হত্যা করা খুনীরা সাংবিধানিক ইনডেমনিটি নিয়ে নানা পদমর্যাদায় চাকরী করেছে, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছে, এমনকি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। এর আগে রক্ষী বাহিনী নামের আধাসামরিক বাহিনীর হাতে শত শত মানুষ বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন। বিপ্লবী নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ সিকদারের হত্যার পরে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছিলেন, কোথায় আজ সিরাজ সিকদার! পচাত্তর থেকে একাশিমাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে দু’জন রাষ্ট্রপতিকে হত্যার পাশাপাশি জেলখানায় জাতীয় চার নেতা ও পুলিশের হাতে আটক জেনারেল মঞ্জুরকে হত্যা করা হয়। ঐ সময়ে ক্যুপাল্টা ক্যু এর শিকার হয়ে শত শত সেনা অফিসার, সৈনিক, সিভিলিয়ান নিহত হয়েছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে কাজ করেছে প্রতিশোধস্পৃহা ও নিশ্চিহ করার দেবার মানসিকতা। নেপথ্যে ছিল ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করা ও ব্যক্তির ইচ্ছাধীনে রাষ্ট্রসমাজ পরিচালিত করা।

ইতিহাসের সাম্প্রতিক সময়ে এসে অব্যাহত রয়েছে বিনা বিচারে হত্যা, অপহরণগুম এবং প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ করে দেবার প্রবনতা। শাসক বদলাচ্ছে, প্রতিপক্ষ বদল হচ্ছে কিন্তু খুনের বিচারহীনতা হত্যাকারীদের একধরনের অলিখিত ইনডেমনিটি দিয়ে রেখেছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষবিহীন, ভোটারবিহীন নির্বাচনকে জাতীয়আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত করার চেষ্টা চলছে। এরকম নির্বাচন এ দেশে নতুন কিছু না। ১৯৭৩ সালে স্বাধীন দেশের প্রথম নির্বাচনে যে কলঙ্কতিলক লেপন করা হয়েছিল দু’একটি ব্যতিক্রম বাদে তা অব্যাহত থেকেছে। আজকে যারা ২০১৪ এর নির্বাচন নিয়ে কথা বলছি তাদের মনে রাখতে হবে ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে ওরকম একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছিল। সেখানেও ১৪২ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে গিয়েছিল। ১/১১ এর সিভিলমিলিটারি অভ্যূত্থানের কারণে সে নির্বাচন আলোর মুখ দেখেনি।

১৯৭৩ সালের নির্বাচনে প্রাপ্ত নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের নিয়ে গিয়েছিল একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠায়। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপিজামায়াত জোটের ওরকম সংখ্যাগরিষ্ঠতা তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে দলীয়করনে প্রণোদনা জুগিয়েছিল এবং ঐ ব্যবস্থার অসাড়তা প্রমান করে দিয়েছিল। আর ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট নির্বাচনে তিনচতুর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার বাসনা তৈরী হয়। তারা বিরোধী দলকে অস্তিত্ববিহীন করে ফেলতে সবরকম কৌশল গ্রহন করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালে একক নির্বাচন অনুষ্ঠান করে বিরোধী দলবিহীন সংসদ চালু করে বিরোধী দলবিহীন সংসদ কায়েম করে। এভাবেই জন্ম থেকে বাংলাদেশ পরিচালিত হয়েছে কখনও সংসদীয় ব্যবস্থার নামে প্রধানমন্ত্রীর শাসনে, রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির ইচ্ছায় অথবা সামরিক ডিক্টেটরদের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে।

রাষ্ট্রসমাজমানুষ কখনই পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং পরিপূরক। এটিকে বিচ্ছিন্ন করে দেবার জন্য শুরু থেকেই নষ্ট করে দেয়া হয়েছে সব রকম নৈতিকতা। প্রশ্রয় দিয়ে অন্যায়অনিয়মকে করে তোলা হয়েছে স্বাভাবিক। ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাবানদের জন্য দায়মুক্তি বিচারহীনতা, আইনের শাসনহীনতার উন্মত্ত পরিনাম রাষ্ট্রের সকল অঙ্গে দৃশ্যমান। সমাজের সর্বত্র এই প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ায় তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত অপরাধের বিস্তার হচ্ছে। মাসের পর মাস হরতালঅবরোধের পেট্রোল বোমায় পুড়েছে সারাদেশ। অপহরণগুমের শিকার মানুষেরা আর ফিরে আসছে না। উৎসবে যৌন সন্ত্রাসের ঘটনাকে বলা হচ্ছে ‘তরুনদের দুষ্টুমী’। বাসেরেলেজলযানেঘরেবাইরে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে নারীশিশু। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী পুড়েধ্বসে মরে যাচ্ছে হাজার হাজার শ্রমিক, জনাকীর্ণ রাস্তায় খুন হয়ে যাচ্ছে লেখক, সাগরেজঙ্গলে মানুষ মরছে অকাতরে পাচারকারীদের কবলে পড়ে। একি মধ্যযুগের কোন দেশকাল নাকি সময় পার করছি আমরা!

সমাজের সকল স্তরে এর সর্বগ্রাসী প্রভাব পড়ছে। পরিবার থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্রকোথাও মানুষ নিরাপদ নয়। এখানে প্রগতিশীল রাজনীতির বিকাশ ঘটেনি। তারা হয় ক্ষমতাসীনদের লেজুড় হিসেবে কাজ করেছেন অথবা রাষ্ট্রসমাজের সনাতনী বিশ্লেষণ ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে পারেননি এবং গণমানুষের দল হয়ে ওঠেননি। দলপ্রভাবমুক্ত কোন সিভিল সোসাইটি তো নেইই বরং মুক্ত চিন্তা ও দলনিরপেক্ষ মানুষ এখানে সবসময় নিগৃহীত হয়েছেন। অভ্যন্তরীন গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর বিকাশ বহুমাত্রিক হয়ে ওঠেনি। ধর্মনিরপেক্ষ, ধর্মের পক্ষে বা বিরুদ্ধেকারো মধ্যে সহনশীলতা বা পরমতসহিষ্ণুতা গড়ে ওঠেনি, বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার কারণে রাষ্ট্রসমাজের সকল স্তরে চরমপন্থা সৃষ্টি হয়েছে। রাষ্ট্র ক্রমশ: উদারপন্থার বদলে চরমপন্থাকে শ্রেয়তর মনে করতে শুরু করেছে।

ব্যক্তি বা এককের ইচ্ছাধীনে পরিচালিত শাসন ব্যবস্থায় এরকম প্রবণতা বিশ্বে নতুন কোন উদাহরন নয়। ব্যক্তিকে ঘিরেই যেখানে যে ক্ষমতাবলয় গড়ে ওঠে, সেখানে অবধারিতভাবেই কতিপয় মানুষ ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে এবং ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে তারা সবরকম কৌশলঅপকৌশল এবং শক্তি প্রয়োগের পথ বেছে নেয়। কোনকিছুকে তারা অন্যায় মনে করে না এবং ক্ষমতার বলে সব অন্যায়অনিয়মকে নিয়মে পরিনত করে ফেলে। বাংলাদেশে এখন যা কিছু ঘটছে তার জন্য গণতন্ত্রের চর্চা না থাকা ও সুশাসনবিহীনতা মুল কারণ। ইতিহাসের দিকে ফেরা যাক। মুশকিল হচ্ছে, এই ভূখণ্ডে কেউ কখনো ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েছে, এ রকম নজির নেই। ইতিহাসের অমূল্য শিক্ষাটি হচ্ছে, বাংলাদেশ জন্মের পর নির্বাচনবিহীন একদলীয় শাসন কায়েম করে ভুলটি করেছিল আওয়ামী লীগ, দ্বিতীয় বিপ্লবের আকাঙ্খায়। সেই ভুলের ভয়াবহ পরিনাম এবং ট্রাজেডি গোটা দেশ ও জাতিকে নিক্ষিপ্ত করেছিল এক অন্ধকার গহবরে। ইতিহাসের সব ভুলের ফল হয়তো একরকম নয়, কিন্তু অভিজ্ঞতাগুলি মূল্যবান।

প্রায় অর্ধশত বছর পরে জাতীয়, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বদলের মধ্যেও বাংলাদেশে ভিন্ন আদলে ক্ষমতার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করার জন্য সকলের মতামতইচ্ছে, সবকিছুই উপেক্ষা করা হয়েছেইতিহাসের কোন শিক্ষা মাথায় না রেখেই। সে সময়ের প্রেক্ষাপটের সাথে মিল রেখে ভিন্ন আদলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটানো হয়েছে। তফাৎ শুধু কখনো এটিকে সর্বদলীয় বা বহুদলীয় নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এবার জঙ্গিবাদ নির্মুলে, প্রগতিশীল রাজনীতি বাঁচাতে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও রায় কার্যকর করতে সংবিধান থেকে চুলমাত্র না নড়ে শেখ হাসিনা’র পুনর্বার প্রধানমন্ত্রী হবার বিষয়টি অনেকটা দ্বিতীয় বিপ্লবের সমান গুরুত্ব পেয়েছিল। সে কারণেই একপক্ষীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এরশাদকে সঙ্গে নিয়ে দ্বিতীয় বিপ্লবের অসম্পন্ন কাজটি সমাপ্ত করা হচ্ছে!