Home » অর্থনীতি » তদন্তও শেষ হয়নি অর্থ লোপাটের

তদন্তও শেষ হয়নি অর্থ লোপাটের

ব্যাংক থেকে মাত্র কয়েক বছরে ২০ হাজার কোটি টাকা লুণ্ঠন

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

Dis 4আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে দেশ! তবে তা হলো লুটপাটের। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশে বড় বড় অর্থ লুটের ঘটনা ঘটেছে। কেবল রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, রূপালী, অগ্রণী ও বিশেষায়িত বেসিক ব্যাংক থেকে মাত্র কয়েক বছরে ২০ হাজার কোটি টাকার ওপর লোপাট করা হয়েছে। লুট করা হয়েছে বিদেশী মেহমানদের উপহার দেয়া সোনার মেডেলের স্বর্ণ। লুটেরারা শেয়ারবাজারে কারসাজি করে হাজার কোটি কোটি টাকা লুট করে নিয়েছে। রেন্টাল, কুইকরেন্টালের ভর্তুকির নামে লুট হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। এছাড়া এ পর্যন্ত কেবল সরকারি কোষাগার থেকেই ভর্তুকির মোড়কে লোপাট হয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে পচা গম আমদানির মাধ্যমে ৪শ কোটি টাকা লুটের পাঁয়তারা হচ্ছে। হলমার্ক, ডেসটিনি, ইউনিপের নামে লুটপাট করা হয়েছে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা। অথচ এই সকল লুটের কোনো তদন্ত আলোর মুখ দেখেনি আজ পর্যন্ত। সংসদে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, সরকারদলীয় লোকদের চাপের কারণে ব্যাংক জালিয়াতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না।

ব্যাংকিং খাতে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেয়ার প্রবণতা বেড়েই চলেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটছে। শুধু তাই নয়, নিয়ম ভেঙ্গে দেয়া বেশিরভাগ ঋণ অবলোপন করা হচ্ছে। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকগুলো ৩৭ হাজার ২৫২ কোটি ১৫ লাখ টাকার মন্দ ঋণ অবলোপন করেছে। বর্তমানে অবলোপন করা মন্দ ঋণ ও খেলাপি ঋণের পরিমাণ যোগ করলে মোট খেলাপির পরিমাণ ৯১ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা। মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫৪ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এক বছর আগে (২০১৪ সালের মার্চ শেষে) ব্যাংক খাতে মন্দ ঋণ ছিল ৩১ হাজার ৪৩৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে অবলোপনকৃত ঋণ বেড়েছে পাঁচ হাজার ৮১২ কোটি টাকা। আর তিন বছরের ব্যবধানে অবলোপনকৃত ঋণ বেড়েছে ১৬ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা। ২০১২ সালের মার্চ পর্যন্ত অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ২০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। উল্লেখ্য, বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা মন্দ বা খেলাপি ঋণ একপর্যায়ে ব্যাংকের স্থিতিপত্র (ব্যালান্স শিট) থেকে বাদ দেয়াকে ঋণ অবলোপন বলা হয়। এক্ষেত্রে ব্যাংকের মুনাফা থেকে শেয়ারহোল্ডারদের বঞ্চিত করে ব্যাংকগুলোকে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হচ্ছে মন্দ ঋণের বিপরীতে। ব্যাংকগুলো মূলত আর্থিক সূচকের উন্নতি দেখানোর কৌশল হিসাবে ঋণ অবলোপন করে থাকে। এ ক্ষেত্রে যে ঋণ অবলোপন হচ্ছে ওই গ্রাহকের বিরুদ্ধে বাড়তি শুধু একটি মামলা করতে হয়। ফলে ব্যাংকের স্থিতিপত্র ‘দুর্নামমুক্ত’ হয়ে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো ৫ বছরের আগের ঋণ এ প্রক্রিয়ায় অবলোপন করতে পারে। কিন্তু ব্যাংকগুলো বর্তমানে বিধি ভঙ্গ করে এক বছরের পুরনো ঋণও অবলোপন করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাংকিং খাতে ঋণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম বিশেষ করে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, আনন্দ শিপইয়ার্ড, নূরজাহান গ্রুপ, বেসিক ব্যাংকসহ বড় ধরনের আর্থিক কেলেংকারিতে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এসব কেলেংকারির অর্থ আদায়ের কোনো সম্ভাবনা না থাকায় ব্যাংকগুলো খেলাপি কম দেখাতে ঋণ অবলোপন করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা না থাকায় এমনটি হচ্ছে। একদিকে সঠিকভাবে যাচাইবাছাই না করে ঋণ দিচ্ছে ব্যাংক, অন্যদিকে ঠিকভাবে আদায় হচ্ছে না। এ কারণে মন্দ ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে, যা একপর্যায়ে অবলোপন করতে হচ্ছে। এ কারণে প্রতিবছর অবলোপনের পরিমাণ বাড়ছে। তিনি উল্লেখ করেন, ব্যাংকগুলোর স্থিতিপত্র (ব্যালান্স শিট) পরিষ্কার রাখার জন্য ২০০৩ সালে অবলোপন নীতিমালা তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এখন ব্যাংকগুলো প্রতিযোগিতা করে অবলোপন করছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজর দেয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মার্চ ২০১৫ শেষে রাষ্ট্রীয় মালিকানার চার ব্যাংকের ঋণ অবলোপনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংক অবলোপন করেছে সর্বোচ্চ ৮ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা।

অবশ্য ২০১৪ সালের মার্চ শেষে রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকগুলো অবলোপন করেছিল ১৫ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে ঋণ অবলোপন করা হয়েছে ১৫ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১২ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা। এদিকে, মন্দ ও অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখতে গিয়ে ব্যাংকগুলোর তহবিল খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ঋণের সুদের ওপর।

ঋণ খেলাপী থেকে এখন ব্যাংক লুটের দিকে নজর পড়েছে বেশী। সরকারিবেসরকারি ব্যাংকগুলোতে মিথ্যা তথ্যে ঋণ বরাদ্দ ও বেনামে অ্যাকাউন্ট খুলে ঋণপত্র (এলসি) জালিয়াতিসহ বিভিন্নভাবে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সরকারিবেসরকারি ১১টি ব্যাংকের প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্তে নেমে রীতিমতো হতবাক দুদক কর্মকর্তারা। দুর্নীতির সঙ্গে ব্যাংকের অধিকাংশ কর্মকর্তা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। অনেক কর্মকর্তা দুর্নীতিতে সরাসরি জড়িত থাকলেও দালিলিক প্রমাণ না থাকায় পার পেয়ে যাচ্ছেন। দুদকের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, রূপালী, অগ্রণী, জনতা ও কৃষি ব্যাংকে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া, বেসরকারি ব্যাংক আইএফআইসি, প্রাইম, মার্কেন্টাইল, প্রিমিয়ার ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। দুদকের অনুসন্ধানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা পর্ষদের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ঋণ বরাদ্দের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা পর্ষদের কর্মকর্তারা দালিলিকভাবে দায়িত্ব পালন করায় তাদের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে সহজেই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে বরাদ্দের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের প্রভাব খাটানোর বিষয়ে অভিযোগ থাকলেও দালিলিক প্রমাণ না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে আপাতত সক্রিয়ভাবে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাচ্ছে না।

তবে, মামলা দায়েরের পর আসামিদের ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে দোষী পরিচালকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে দুদক। সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্যাংকিং ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে হলমার্কের ঋণ কেলেঙ্কারি প্রকাশের মধ্যদিয়ে। এই কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রকাশের পর অন্যান্য ব্যাংকের বিরুদ্ধে একই ধরনের ঋণ জালিয়াতির অভিযোগ আসতে থাকে দুদকে। গত বছর মে থেকে বিভিন্ন ব্যাংকের বিরুদ্ধে এ ধরনে দু’শতাধিক অভিযোগ দুদকে জমা পড়ে। এর মধ্যে ৪৪টি অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করা হয়েছে। এতে ২০০৯ থেকে চলতি বছর পর্যন্ত সরকারিবেসরকারি ১১ ব্যাংকে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকেই প্রায় দশ হাজার কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা ঘটেছে। একইভাবে রূপালী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় প্রায় দেড় হাজার কোটি, জনতা ব্যাংকের কয়েকটি শাখায় ১ হাজার ৯০ কোটি, কৃষি ব্যাংকের ছয়টি শাখায় ৬২১ কোটি, অগ্রণী ব্যাংকের কয়েকটি শাখায় প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ঋণের নামে লুটপাট হয়েছে। এছাড়া, আইএফআইসি ব্যাংকে ৩৫০ কোটি, প্রাইম ৪০৮ কোটি, মার্কেন্টাইল ব্যাংকে ৪০ কোটি, যমুনা ব্যাংকে ১৬৪ কোটি, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে ১৪৮ কোটি এবং প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে ৬৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জানা যায়, হলমার্কসহ কয়েকটি অখ্যাত প্রতিষ্ঠান মিথ্যা তথ্য দিয়ে একই কায়দায় সোনালী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে। এ ঘটনায় হলমার্ক গ্রুপ ও ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পর্ষদের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাসহ ২৭ জনের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করেছে দুদক। এ দুর্নীতিতে ব্যাংকের কয়েকজন পরিচালকের জড়িত থাকার অভিযোগ এলেও অনুসন্ধানে দালিলিক প্রমাণ না পাওয়ায় দুদক মামলা করতে পারেনি। তবে, সরাসরি অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত না হলেও বিকল্প হিসেবে কয়েকজন পরিচালকের অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করেছে।

সোনালী ব্যাংকে দুর্নীতি

প্রায় চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় হলমার্ক ছাড়াও ৫টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ডিএন স্পোর্টস লিমিটেড, টি অ্যান্ড ব্রাদার্স, প্যারাগন নিট কম্পোজিট লিমিটেড, নকশি নিট কম্পোজিট লিমিটেড ও খান জাহান আলী সোয়েটার লিমিটেড। অভিযোগ অনুযায়ী, জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ দেখিয়ে টি অ্যান্ড ব্রাদার্স ৬০৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, প্যারাগন নিট ১৪৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা, নকশি নিট ৬৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, ডিএন স্পোর্টস ৩৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং খানজাহান আলী সোয়েটার লিমিটেড চার কোটি ৯৬ লাখ টাকা সোনালী ব্যাংক থেকে তুলে নিয়েছে।

রূপালী ব্যাংক

ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে রূপালী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা লোপাটের কয়েকটি অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকটি অভিযোগের অনুসন্ধান শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে ১৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে রূপালী ব্যাংকের মতিঝিল দিলকুশা স্থানীয় শাখার মহাব্যবস্থাপক, একই শাখার জ্যেষ্ঠ প্রিন্সিপাল অফিসার ও গুলশান শাখার উপমহাব্যবস্থাপকসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে গত ১৬ সেপ্টেম্বর মামলা করে দুদক। অপর দুই আসামি হলেন এভারেস্ট অ্যান্ড টেকনোলজি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। এছাড়া, ব্যাংকটির লোকাল অফিস থেকে মেসার্স বেনিটেক্স লিমিটেড, মাদার টেক্সটাইল মিলস ও মাদারীপুর স্পিনিং মিলস নামে ৩টি প্রতিষ্ঠানকে অবৈধভাবে অন্তত ৮০১ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে একইভাবে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ঋণ দেয়ার অভিযোগ পেয়েছে দুদক।

জনতা ব্যাংক

ব্যাংকের রমনা করপোরেট ও লোকাল অফিস থেকে তানভীর চৌধুরীর নাম ব্যবহার করে মেসার্স চৌধুরী নিটওয়্যারস লিমিটেড এবং মেসার্স চৌধুরী টাওয়েলের নামে ঋণ দেখিয়ে ৩৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান পরিচালনা করছে দুদকের সহকারী পরিচালক মাহমুদ হাসানের নেতৃত্বে ৪ সদস্যের একটি বিশেষ টিম। এছাড়া ভুয়া এলসির মাধ্যমে ৩৯২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বিসমিল্লাহ গ্রুপ নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

কৃষি ব্যাংক

ব্যাংকের কুষ্টিয়া শাখা থেকে ভুয়া ঋণপত্রের মাধ্যমে ১৭৪ কোটি টাকা আত্মসাত করা হয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সুরেখা এন্টারপ্রাইজ, আলম এন্টারপ্রাইজ, ব্রাদার্স অ্যাসোসিয়েট, শাহনাজ ট্রেডিং এবং এমআর করপোরেশনের নামে এলসি খুলে ওই পরিমাণ ঋণ দেয়া হয়। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ওই শাখার ম্যানেজার (বরখাস্ত) গুলজার হোসেনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুদক।

অগ্রণী ব্যাংক : ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখায় ঋণ জালিয়াতি ছাড়াও রয়েছে জাল প্রতিরক্ষা সঞ্চয়পত্র নিয়ে ঋণ দেয়ার ঘটনা। অজ্ঞাত ব্যক্তিদের জমা রাখা জাল প্রতিরক্ষার বিনিময়ে অন্তত ২৫ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। অথচ এখন ঋণ নেয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে, অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তা প্রতিরক্ষা সঞ্চয়পত্র গ্রহণ ও ঋণ দেয়ার সঙ্গে যুক্ত, তাদের শনাক্ত করতে মাঠে নেমেছেন দুদকের কর্মকর্তারা। এছাড়া, চেক জালিয়াতির মাধ্যমেও ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেয়ার ঘটনা ঘটেছে। ঋণ জালিয়াতি, জাল সঞ্চয়পত্রে ঋণ দেয়া ও চেক জালিয়াতির মাধ্যমে এই ব্যাংকের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের বিষয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুদক।

মার্কেন্টাইল ব্যাংক

মিথ্যা তথ্য দিয়ে বেনামি অ্যাকাউন্ট খুলে প্রায় বিশ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকটির পরিচালক এসএম আহসানের বিরুদ্ধে। দুদকের উপপরিচালক আবু সাঈদ আহমেদ অনুসন্ধান শুরু করেছেন। অভিযোগে বলা হয়, এসএম আহসান গত বছর ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন। এ সময় পরিচালনা বোর্ডের সিদ্ধান্ত ছাড়াই ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিতাস এগ্রো কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির নামে ৯ কোটি ৫৫ লাখ এবং রিজেন্ট করপোরেশনের নামে ৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করেন।

প্রাইম ব্যাংক

ব্যাংকের কয়েকটি শাখায় মোট ৩৭টি সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাবে অর্থ স্থানান্তর এবং ভুয়া এলসির মাধ্যমে ৪০৬ কোটি টাকা আত্মসাত করা হয়েছে। শাখাগুলোতে ভুয়া বিনিয়োগ (ঋণ) হিসাব সৃষ্টি করে জিএল (জেনারেল) হিসাব থেকে অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে। কখনও কখনও লেনদেনহীন বিনিয়োগ হিসাবে নতুন করে লিমিট দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন ভুয়া সঞ্চয়ী বা চলতি হিসাবে স্থানান্তরের মাধ্যমে আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে, দিলকুশার ইসলামী ব্যাংকিং শাখায় মেসার্স নিউ এসকে এন্টারপ্রাইজের একটি চলতি হিসাবের মাধ্যমে (যার নম্বর ১০৮১১০৩০০০০৭৩৮) প্রায় ৬২ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। লেনদেনহীন বিনিয়োগে নতুন লিমিট দিয়ে প্রায় ৪০ কোটি টাকা আত্মসাত করা হয়। এছাড়া, ভুয়া এলসির মাধ্যমে ৩০৬ কোটি ২২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বিসমিল্লাহ গ্রুপ।

আইএফআইসি ব্যাংক

ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড কমার্স (আইএফআইসি) ব্যাংকের মতিঝিল, ধানমন্ডি, গুলশান, নয়াপল্টন শাখা এবং চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও চকবাজার শাখায় সাড়ে ৩০০ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান চলছে। এছাড়া, প্রায় দেড় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বাংলাদেশ ড্রেজিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ দু’জনের বিরুদ্ধে ১ নভেম্বর মামলা করেছে দুদক।

ঋণ জালিয়াতির ঘটনাগুলোর মধ্যে সম্প্রতি বহুল আলোচিত হয়েছে বিসমিল্লাহ গ্রুপের নাম। পাঁচটি ব্যাংক থেকে অন্তত ১১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধাররা পালিয়ে বিদেশ গেছেন। তারা জনতা ও প্রাইম ব্যাংক ছাড়াও যমুনা ব্যাংক থেকে ১৬৩ কোটি ৭৯ লাখ, শাহজালাল ব্যাংক থেকে ১৪৮ কোটি ৭৯ লাখ এবং প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে ৬২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে তথ্যউপাত্ত পেয়েছে দুদক।।