Home » আন্তর্জাতিক » তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (ত্রয়োদশ পর্ব)

তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (ত্রয়োদশ পর্ব)

বিএই’র গোপন অর্থ পাচার যন্ত্র

BAE Systemsঅস্ত্র ব্যবসার সাথে তেল সম্পদের অর্থের একটি গভীর সখ্যতা রয়েছে। একটি অপরটিকে টিকিয়ে রাখে। আর পরস্পরের ঘনিষ্ঠ দুই ব্যবসার কুশীলবরা। এই ব্যবসার নেপথ্যে রয়েছে ঘুষ, অর্থ কেলেঙ্কারিসহ নানা ভয়ঙ্কর সব ঘটনাবলী। এরই একটি খণ্ডচিত্র প্রকাশ করা হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। প্রভাবশালী দ্য গার্ডিয়ানএর প্রখ্যাত দুই সাংবাদিক ডেভিড লে এবং রাব ইভানসএর প্রতিবেদন প্রকাশের পরে এ নিয়ে বিস্তর আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। এ সংখ্যায় ওই প্রতিবেদনের বাংলা অনুবাদের (ত্রয়োদশ পর্ব) প্রকাশিত হলো। অনুবাদ : জগলুল ফারুক

স্যার ডিক ইভান্স ১৯৯০ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত বিএই’র প্রথমে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তদন্তাধীন বহু অস্ত্র বিক্রয় চুক্তির দায়দায়িত্বই তার। গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকেই বৃটেনের অস্ত্র বিক্রেতাদের জন্য একটি অস্বস্তিকর অবস্থা সৃষ্টি হতে শুরু করে। এর আগের ৩০টি বছর ধরে ডেসো ব্রিটেনের অস্ত্র বিক্রয় সংক্রান্ত দুর্নীতি রোধের প্রচেষ্টা থামিয়ে রেখেছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে পরিবর্তনের হাওয়া এখন বইতে শুরু করেছে।

ওইসিডি ১৯৯৪ সালে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি বিদেশে ঘুষ প্রদান বন্ধ রাখার একটি আহবান জানায়। ১৯৯৭ সালে এ ব্যাপারে একটি কড়াকড়ি নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়। ব্রিটেন এতে স্বাক্ষর করে এবং ১৯৯৯ সাল থেকে এটি কার্যকর হয়। নিষেধাজ্ঞা চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো অঙ্গীকার করে যে, তারা দুর্নীতিকে বেআইনি বলে গণ্য করবে। তবে এ ব্যাপারে হোয়াইট হলের ভেতরকার প্রতিক্রিয়া ছিল বরাবরের মতোই ভন্ডামিপূর্ণ। মার্গারেট থ্যাচার জমানায় বিএইসহ বহু রাষ্ট্রীয় কোম্পানিই ইতোমধ্যে বেসরকারি খাতে চলে গিয়েছিল। সুতরাং ওই সব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সরাসরি এজেন্ট নিয়োগের প্রয়োজন ফুরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তখনো পর্যন্ত বিএই’র হয়ে বিদেশে তদবিরের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। তারা আন্তঃসরকার পর্যায়ে সৌদি আল ইয়ামামাহ চুক্তির মতো বড় আকারের চুক্তি সম্পাদন করছিল। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকার করে নেয়া অঙ্গীকারসমূহ বাস্তবায়নের পরিবর্তে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কেবল ঘুষ প্রদানকারী কোম্পানিগুলোর সাথে নিজেদের নামমাত্র একটি দূরত্ব বজায় রাখছিল। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের ১৯৭৭ সালের কুপার নির্দেশিকাটিকে ১৯৯৪ সালে এসে আরও বেশি অস্পষ্ট ভাষায় নতুন করে লিপিবদ্ধ করে। আগেরবারের নির্দেশিকায় বলা ছিল, কর্মকর্তারা এখন থেকে কোনো অবস্থাতেই দৃশ্যমাণভাবে কমিশন প্রদানের বিষয়টিকে ‘অনুমোদন’ দেবেন না। কিংবা এসব বিষয়ে কোনো রকম যোগাযোগ রক্ষাকরে চলবেন না। নতুনভাবে লিখিত নির্দেশিকায় বলা হলো তারা বিষয়টি ‘বিবেচনায়’ নিবেন না এবং ‘পরামর্শ’ প্রদান করবেন না।

বিএই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার দালালদের যে সব কমিশন প্রদান করত ডিক ইভান্স চেয়ারম্যান থাকাকালে সে সব কমিশন লেনদেনের পুরোটাই সম্পন্ন হতো সুইজারল্যান্ডে। এটি যে একটি বেআইনি কাজ তা বলা যাবে না। তবে এই কাজগুলো করার জন্য যে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়েছিল সেই প্রতিষ্ঠানটিকে একটি বৈশ্বিক মুদ্রা পাচার যন্ত্র হিসেবেই বর্ণনা করা যেতে পারে। নামজাদা একটি সরকারি কোম্পানীর ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিটি অনুসরণ করতে গিয়ে বিস্ময়েরই সৃষ্টি হয়েছিল।

বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করতে গিয়ে ব্রিটেনের সিরিয়াস ফ্রড অফিস পরে বলেছিল, পুরো ব্যবস্থাটিই এমন একটা রাখঢাক অবস্থার মধ্যে পরিচালিত হচ্ছিল যে, শেষে অর্থ লেনদেনের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়েই সন্দেহ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। পুরো প্রক্রিয়াটিই নিয়ন্ত্রিত হতো বিএই’র ফার্নবরো অফিসের ওয়াবউইক হাউস নামক নিরাপদ একটি ব্লক থেকে। হাগ ডিকসনের নেতৃত্বে পরিচালিত হতো ‘এইচকিউ মার্কেটিং সার্ভিসেস’টি। ডিকসন এম ১৬এর সাথে কোম্পানির পক্ষ থেকে যোগাযোগ রক্ষা করারও দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। জুলিয়া আলড্রিজ দীর্ঘদিন তার ডেপুটি হিসেবে কাজ করেছেন। দলিলাদি থেকে বোঝা যায়, কোম্পানির প্রতিটি চুক্তি অনুমোদনের জন্য বোর্ড পর্যায়ের কর্মকর্তারা বৈঠকে মিলিত হতেন।

বিএই নভেলমাইট লিমিটেড নামে তার একটি অঙ্গ সংস্থা খুলেছিল। সংস্থাটি তার সুইস ব্যাংক শাখা লয়েড টিএসবি’র সহযোগিতায় নিজ ক্ষমতাবলেই জেনেভায় শীর্ষ নিরাপত্তা সংবলিত একটি অফিস ভাড়া করে। অফিসটি ৪৮ নম্বর রুট দ্যু একেসিয়াসের একটি ভবনের ষষ্ঠ তলায় অবস্থিত ছিল। সেখানে সার্বক্ষণিক নজরদারি, ভিডিও ক্যামেরাসহ ফ্যাক্স ও ফোন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। সেই অফিসে নগদ অর্থ মজুদ রাখার জন্য ভল্ট বসাতে যুক্তরাজ্য থেকে একজন বিশেষজ্ঞও উড়ে গিয়েছিলেন। এরপর ১৯৯৭ সালে ব্রিটেন ওইসিডি চুক্তিতে সই করার ঠিক আগে আগে কোম্পানির সব এজেন্ট সম্পর্কিত তথ্যাবলী ভর্তি ফাইলিং কেবিনেট এবং সেফগুলো একটি ভ্যানে বোঝাই করে বিশ্বস্ত কর্মচারীদের দিয়ে ফার্মবরো থেকে জেনেভায় পাঠিয়ে দেয়া হয়।।

(চলবে…)