Home » বিশেষ নিবন্ধ » প্রগতিশীল সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গোড়ার কথা (শেষ পর্ব)

প্রগতিশীল সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গোড়ার কথা (শেষ পর্ব)

Last 4প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে মহামন্দায় আক্রান্ত হয়। মহামন্দার কবলে পড়ে বিশ্ব রাজনৈতিকভাবে পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে। জনজীবন ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের বাস্তবতায় তাড়িত হয়ে পড়ে। সেই সময় নতুন রাজনৈতিক মতবাদ বিশ্ব তথা ভারতীয় উপমহাদেশের কোটি কোটি মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করে। রাজনীতিকে শাণিত করে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। অবিভক্ত ভারতের সেই সময়কার একদল সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মী নতুন মতাদর্শ নিয়ে সংস্কৃতির জগত আলোড়িত করেন। গড়ে তোলেন প্রগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন বা প্রগতিশীল লেখক সংঘ। পুঁজিবাদের বর্তমান বিশ্বায়ন তত্ত্বের ক্লেদাক্ত সময়ে পুনরায় আর একটি মহামন্দার আবহে বর্তমান সাহিত্য ও সংস্কৃতিও নির্জীব। সাহিত্য ও সংস্কৃতির এই অবক্ষয়ের সময়ে নতুন সাহিত্য ও সংস্কৃতি আন্দোলনের ধারাটি কী হওয়া উচিত তা বুঝতে প্রগতিশীল লেখক সংঘের ইতিহাস জানা তাই আবশ্যক। অজয় আশীর্বাদ মহাপ্রশস্তের এই লেখাটির ভাষান্তর করা হলো।

বিপ্লবী সিদ্ধান্ত

লেখকদের একটি সংগঠন, ধারণা হিসেবে ভারতে অভিনবই ছিল, আর ললক্ষ্ণৌতে অনুষ্ঠিত এর প্রথম সম্মেলনে গৃহীত বিপ্লবী সিদ্ধান্তটিও ছিল সে রকমই। গত শতকের ত্রিশের দশকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা বিবেচিত হয়েছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক রাজনৈতিক তৎপরতা হিসেবেই। সর্বসম্মতভাবে গৃহীত সিদ্ধান্ত হিসাবে সংঘের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে বলা হয় – ‘ভারতের বিভিন্ন ভাষাভাষী অঞ্চলে সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে লেখকদের সংগঠন গড়ে তোলা হবে, সম্মেলন আহবান ও সাহিত্য প্রকাশনার মাধ্যমে এসব সংগঠনের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা হবে, কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সংগঠনগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা হবে এবং সংঘে মৌলিক লক্ষ্য ও আদর্শের সাথে নিজেদের লক্ষ্য ও আদর্শ সাংঘর্ষিক নয়, এমন সব সাহিত্যিক সংগঠনগুলোর প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়ানো হবে, ভারতের গুরুত্বপূর্ণ সব শহরেই সংঘের শাখা প্রতিষ্ঠা করা হবে, প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতিকে মোকাবেলার জন্য প্রগতিশীল সাহিত্য রচনা ও অনুবাদ করা হবে, এ পথেই ভারতের স্বাধীনতা ও সামাজিক পুনর্জাগরণ ত্বরান্বিত হবে, প্রগতিশীল লেখকদের স্বার্থ সমুন্নত রাখা হবে, চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় লড়াই চালিয়ে যাওয়া হবে’।

গৃহীত প্রস্তাবটি বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে ছিল বাম উদারনৈতিক ধরনের। নিজেদের আপেক্ষিক স্বাধীনতা বজায় রেখে বাম ধারার সংস্কৃতি ও রাজনীতি এখানে পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল। সাফদার হাশমী মেমোরিয়াল ট্রাস্ট আয়োজিত সম্মেলনে পঠিত কোনো কোনো লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে যে, প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মসূচির জন্য এ ধরনের স্বাধীনতা দরকার ছিল। আর বাম সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর ওপর কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকার কারণেই দেখা গেল যে, ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর সংগঠনগুলোর মধ্যে বিপর্যয় নেমে এসেছে। এই বিষয়টিই বিখ্যাত ঐতিহাসিক কে এন পানিক্কর এবং খ্যাতিমান নাট্য ব্যক্তিত্ব সমীক ব্যানার্জি তাদের লেখায় বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। ১৯৫৫ সালের পর থেকে প্রগতিশীল লেখক সংঘ কিংবা ভারতীয় গণনাট্য সংঘের কোনোটিই তাদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারেনি। বাম ধারার লেখক এবং শিল্পীরা সংঘ ছেড়ে চলে যান। তবে সংঘের আদর্শের আলোকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে তারা তাদের লেখালেখির কাজ অব্যাহত রাখেন। দেশভাগের কারণ সৃষ্ট মনস্তাত্ত্বিক সঙ্কট এবং গত শতকের চল্লিশের দশকের শেষ ভাগে সংঘটিত হিংসাত্মক ঘটনাবলী প্রগতিশীল লেখক সংঘের লেখকদের হতভম্ব করে দেয়। তাদের লেখা গল্পগুলোতে এই অবস্থাটি ধরা পড়ে। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরে জন্ম নেয়া তীব্র বিতর্কও প্রগতিশীল লেখক সংঘটিকে আরেক দফা দুর্বল করে ফেলে। যে সব লেখক আর প্রগতিশীল লেখক সংঘের সাথে যুক্ত থাকলেন না তারাই পরবর্তীতে সংঘের উত্তরাধিকারটিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

খ্যাতিমান বাঙালি পণ্ডিত মিহির ভট্টাচার্যের মতে, ‘প্রগতিশীল লেখক সংঘের মতো একটি রাজনৈতিক গণআন্দোলন সংস্কৃতির জগতে এমন একটি মুহূর্তের জন্ম দিয়েছিল যে মুহূর্তটি একক শক্তি বলেই সংস্কৃতির গতিপথের ধারাটি বদলে দেয়। আন্দোলনটি স্তিমিত হয়ে গেছে বটে, তবে সেই মুহূর্তটি এখনো টিকে আছে এবং আমাদের চিন্তার জগতে গঠনপুর্নগঠন প্রক্রিয়া চালিয়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়। প্রায়শই যে অন্তর্নিহিত এক শক্তি হিসেবে অন্যান্য শক্তির সাথেও সম্পর্ক গড়ে তোলে’। এই উত্তরাধিকারকেই বর্তমান সময়ের অনেক প্রগতিশীল লেখক অনুসরণ করার চেষ্টা করছেন।

প্রগতিশীল পরীক্ষানিরীক্ষা

সম্মেলনে পঠিত কয়েকটি নিবন্ধে উল্লেখ করা হয় যে, তামিলনাড়ু এবং কেরালার মতো রাজ্যগুলোতে প্রগতিশীলতা নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষার বিষয়টি আজকাল অনেকেরই মনোযোগ আকর্ষণ করছে। কেউ কেউ প্রগতিশীলতার এই ব্যাপারটির পুনরুজ্জীবনেও আগ্রহী হয়ে উঠছেন। অথচ একই সময়ে অন্য রাজ্যগুলোর সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে আছে এবং নিজেদের নতুন করে আবিষ্কারে তারা ব্যর্থ হচ্ছে। এমনি অবস্থায় সাফদার হাশমী প্রতিষ্ঠিত জননাট্য মঞ্চ আজকের দিনেও দর্শক ও স্বেচ্ছাকর্মীদের মনোযোগ আকর্ষণে সফলতা দেখিয়ে যাচ্ছে যা অন্য অধিকাংশের পক্ষেই সম্ভব হয়নি। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সাফদার হাশমীর স্ত্রী মলয়শ্রী হাশমী কিভাবে তারা তাদের নাটকগুলো লিখতেন এবং যেখানে যেতেন সেখানেই কীভাবে মানুষজন এসব নাটকের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠতেন সে সব কথা তুলে ধরেন।

প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কাজ হচ্ছে জনসম্পৃক্ত সংবেদনশীলতাকে জাগ্রত করা। এ থেকেই রাজনৈতিক সচেতনতা জন্ম লাভ করে। বিপ্লবপূর্ব রাশিয়া এবং বিশশতকের গোড়ার দিকের ইউরোপে যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল সে সত্যও প্রমাণিত। ভারতে আগ্রাসী সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার (মাওবাদী) মতো অতিবাম সংগঠনগুলোকে উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে একটি শক্ত ভিত্তি প্রদান করেছে। ফলে দলিত জনগোষ্ঠী এখানে একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্বায়নের এই যুগে ধনী এবং দরিদ্র্যের মধ্যেকার বৈষম্য বেড়েই চলেছে। জনগণের মধ্যে নিজেদের প্রভাব ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নির্বাচনপন্থী বাম রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গসংগঠনগুলো নতুনভাবে সক্রিয় করার ক্ষেত্রে এখন কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে?

এ ব্যাপারে প্রভাত নির্দেশনাটি ব্যাপারটি নতুন পথের নির্দেশনা দিতে পারে। তিনি বলেন, মার্কসবাদী সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে কেবল শ্রেণীবৈষম্যের কথা বললেই চলবে না, তাকে ভারতীয় সমাজের স্থায়ী সমস্যাগুলোর ব্যাপারেও কথা বলতে হবে। এর মধ্যদিয়েই কমিউনিস্ট আন্দোলন একটি দেশজ অবয়ব লাভ করবে। এই বক্তব্যের মধ্যদিয়ে তিনি কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকতাবাদের সার্বজনীন ধারণা থেকে সরে এসেছেন। তিনি তার প্রবন্ধে বলছেন, ‘প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে অবশ্যই তার নিজের ভুবনে দাঁড়িয়ে লড়াই করতে হবে। আর সে লড়াইটি কেবল বুর্জোয়া এবং ধনী ভূস্বামীদের স্বার্থরক্ষায় ব্রতী শোষণ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে করলেই চলবে না। লড়াইটি চালাতে হবে পুরনো ধ্যানধারণা ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতির বিরুদ্ধে, লড়াই চালাতে হবে বর্ণ প্রথা, পুরুষতান্ত্রিকতা, সাম্প্রদায়িকতাসহ পুরনো সমাজ ব্যবস্থার তথাকথিত যে সব রীতিনীতি একজন ব্যক্তিকে নির্যাতনের শিকারে পরিণত করছে সে সবের বিরুদ্ধে। শেষের এই লড়াইটি হচ্ছে স্থায়ী এক লড়াই। নতুন একটি সমাজ ব্যবস্থা কায়েম না হওয়া পর্যন্ত এ লড়াই চলতেই থাকবে’। ঠিক এই কাজটিই সেদিন প্রগতিশীল লেখক সংঘ করেছিল সর্বদা পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক আবহকে হৃদয়ঙ্গম করে, বাম ধারার সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও আজকের দিনে নতুন আঙ্গিকে সেই কাজগুলোই আবার শুরু করতে পারে।।