Home » প্রচ্ছদ কথা » ভীতির মধ্যে বসবাস

ভীতির মধ্যে বসবাস

আমীর খসরু

Coverভুটানের তৎকালীন রাজা জিগমে সিংগে ওয়াংচুক ১৯৭২ সালে ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ (মোট দেশজ শান্তি ও আত্মতুষ্টি)-এর ধারণাটি প্রথম দিয়েছিলেন। তিনি এই ধারণাটি দিয়েছিলেন জনগণ কতোটা সুখ ও তুষ্টি নিয়ে বসবাস করছে এবং তারা কতোটা সন্তুষ্ট তা নির্ধারণের লক্ষ্যে। পরবর্তীকালে তার এই দর্শন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত হয়েছে। ভুটানের রাজার দেয়া এই দর্শনের ভিত্তি হচ্ছে, টেকসই উন্নয়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহার এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য লালন ও প্রসার। এসব ব্যবস্থাবলী গৃহীত হলে মানুষের মধ্যে শান্তি বিরাজিত থাকবে এমনটাই তিনি মনে করতেন। ভুটানের রাজার ওই দর্শনকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘের একটি ইনডেক্স আছে, যার মাধ্যমে বিশ্বের কোন কোন দেশের মানুষ কতোটুকু সুখ এবং শান্তিতে জীবনযাপন করছে তা ওই দেশের মানুষের সাথে কথা বলে নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট প্রতি বছরই বের হচ্ছে এর উদ্দেশ্য সুখী মানুষের দেশটিকে চিহ্নিত করা। এখানে বলা প্রয়োজন, রাষ্ট্রে শান্তি বিরাজ করে তখনই যখন দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, বিচার প্রাপ্তিসহ সব অধিকারগুলো নিশ্চিত করা হয় এবং রাষ্ট্রটির ম্যানেজার হিসেবে সরকার জনগণের স্বপক্ষে কর্মরত থাকে। ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টে বাংলাদেশ কখনো প্রথম শ’খানেক দেশের মধ্যে বেশ কিছুকাল ধরে ছিল না, এখনো নেই।

বরং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘গ্যালপ’ বিষন্নতায় ভরা, অশান্তি বিরাজমান দেশগুলোর একটি তালিকা প্রস্তুত করে প্রতি বছর। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওই প্রতিষ্ঠানের তালিকা মোতাবেক বিশ্বের অখুশী, শান্তি বিরাজ করে না এমন বিষন্ন দেশগুলোর তালিকায় শেষ তিনটি দেশের একটি বাংলাদেশ। ২০১৪ সালে ১৪৩টি দেশের উপর পরিচালিত ওই জরিপ এবং গবেষণা শেষে যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে তাতে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪১ নম্বরে। সুদান আছে সর্বনিম্ন অর্থাৎ ১৪৩ নম্বরে এবং এর উপরে তিউনিশিয়া। ভাগ্য ভালো যে, দুর্নীতির তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করার অভিজ্ঞতা আমাদের থাকলেও, অশান্তি ও অখুশীর দেশ হিসেবে আমরা এখনো প্রথম হইনি। এই তালিকাটি ২০১৪ সালের। কিন্তু তারপরেও এ দেশে কিছু ভয়ঙ্কর এবং অশ্রুতপূর্ব ঘটনাবলী ঘটেছে।

২০১৫ সালে ৪ জন ব্লগারকে হত্যা করা হয়েছে। নির্মম, পাশবিক অত্যাচারে নিহত করা হয়েছে কয়েকটি শিশুকে। ক্রমবর্ধমান যৌন সন্ত্রাসের কাছে আমরা হেরে যাচ্ছি। আইনশৃঙ্খলা এবং বিচারহীনতার কি পরিস্থিতি তা আমরা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারছি। ঘরেবাইরে কোথাও আমরা নিরাপদ নই, নিরাপদ নয় আমাদের শিশুরা, নারীসহ সাধারণ মানুষ কেউই।

পরিস্থিতি কেমন তা বোঝার জন্য মাত্র দুটো দিনের সংবাদপত্রের কিছু খবরের দিকে আমরা দৃষ্টি দিতে পারি। তবে এ কথা মনে রাখতে হবে, সব খবর ঢাকা পর্যন্ত এমনিতেই পৌছায় না এবং এখন এই পৌছানোতেও নানা চাপ আছে। ১৩ আগস্টের কয়েকটি খবর হচ্ছে প্রকৌশলীকে পেটালেন সংসদ সদস্য বদি, সিলেটে নিজেদের কর্মীদের ছুরিকাঘাতে খুন ছাত্রলীগ নেতা, বিমানবন্দরে যুবলীগ পরিচয় দানকারীদের বিমানবন্দরে পণ্য ছিনতাইয়ের ঘটনার আসামী খুজে পাচ্ছে না পুলিশ, ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগের দু’পক্ষের সংঘর্ষে আহত ১৫, ঢাকার মিরপুরে ছাত্রলীগ নেতা আটকের পর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ১৪ আগস্ট সংবাদপত্রে প্রকাশিত কয়েকটি খবর হচ্ছে মাদারীপুরে দুই স্কুল ছাত্রীকে নির্যাতন করে হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগ, ঢাকায় বাড্ডায় আওয়ামী লীগ নেতা দু’জনকে গুলি করে হত্যা, র‌্যাবের হাতে আটকের পরে পলায়ন, ১৭ ছাত্রকে ছাত্রলীগের মারধরের অভিযোগ তদন্ত কমিটি, সিলেট মদনমোহন কলেজের ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে আরেকজন গ্রেফতার, খুলনায় দুর্বৃত্তের গুলিতে কাউন্সিল পুত্র খুন। মাত্র দু’দিনের যেসব খবরাখবর উল্লেখ করা হলো তাই সব খবর নয় বা সংবাদপত্র পর্যন্ত এসে পৌছেছে তাও নয়। তবে যা এসেছে তা পরিস্থিতি বোঝার জন্য যথেষ্ট।

নিলাদ্রীসহ এ বছরই ৪ জন ব্লগারকে হত্যা, পাশবিক পন্থায় নির্মম নৃশংতায় হত্যা করা হয়েছে রাজন, রাকীব, রবিউলসহ কয়েকটি শিশু এবং সবশেষ ১৬ বছরের রাজা মিয়াসহ শিশুকিশোর হত্যা ও নির্যাতন, একের পর এক ধর্ষণ, ঘরেবাইরে হত্যাকাণ্ডসহ সামগ্রিকভাবে সমাজের সর্বত্র এমন এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে যা সাম্প্রতিক অতীতে আমরা দেখিনি। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার পর পরই যে ভয়াবহতা আমরা দেখেছিলাম তার চেয়ে পরিস্থিতি কি এখন ভালো?

বর্তমান সরকারের অবস্থাটি দাড়িয়েছে এমন, যে ক্ষেত্রে রাজনীতি বিজ্ঞানী ক্রিস্টফ লোমানের কথার উদ্ধৃতি দেয়া প্রয়োজন। তিনি সুশাসন করে না এমন সরকার সম্পর্কে বলেছেন ‘শাসক ও প্রশাসনের দায়িত্ব হচ্ছে যে কোনো বিষয়কে প্রথমেই অবজ্ঞা করা’। দেশে এখন সেই পরিস্থিতিই চলছে বলে মনে হয়। এমন এক ভীতিকর, আতঙ্কজনক ও অনিশ্চয়তা পরিস্থিতি বিরাজমান রয়েছে যাতে মানুষ বিপন্ন, অসহায়, হতবিহ্বল। ভীতির সংস্কৃতির মধ্যে মানুষকে বসবাস করতে হচ্ছে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ কর। এক সময় সরকারের উচুতলা থেকে বলা হয়েছিল, ‘কারো বেডরুম পাহারা দেয়া সরকারের দায়িত্ব নয়’। বাস্তবে ঘটনা ঘটছে এমন যে, জনারণ্যে রাজপথ, অফিসআদালত, চেনা পথ, অতি পরিচিত গলি কোনো কিছুই এখন আর নিরাপদ নেই, নিজের ঘরের মধ্যেও মানুষ নিরাপত্তাহীন।

সরকার নিশ্চিতভাবে ভীতির এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চেয়েছিল এবং তা হয়েও গেছে। যে কোনো কর্তৃত্ববাদী, অগণতান্ত্রিক শাসকই তাদের শাসন ক্ষমতাকে নির্বিঘ্ন করতে চায় জনভীতি সৃষ্টির মধ্যদিয়ে। এটাই ওই সব ক্ষমতাসীনদের মূলধন। এ লক্ষ্যে বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে দলীয় লোকজনদের দিয়ে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস, যৌন সন্ত্রাস সৃষ্টির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় বাহিনী দিয়ে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, অপহরণ, গুম, খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে। এর একটিও ওই ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকে আর কমেনি, বরং বেড়েছে। ভীতির সংস্কৃতি সৃষ্টিতে ক্ষমতাসীনরা যতোটা সময় ব্যয় করেছে, তার একশ ভাগের একভাগ সময়ও ব্যয় করেনি জনগণের কল্যাণ কামনায়। মুখে উন্নয়নের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা যেমন কাজে আসেনি, তেমনি গণতন্ত্র, আইনের শাসন সব কিছুই জনগণের কাছ থেকে যোজন যোজন দূরে সরে গেছে।

সাধারণ মানুষ এখন এক সীমাহীন ভীতি এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে। নিরাপত্তাহীনতা, অনিশ্চয়তার মাত্রা আকাশ ফুড়ে বেরিয়ে গেছে। অথচ ক্ষমতাসীনরা এখনো বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যৎসামান্য বাদ দিলে দেশে শান্তি বিরাজ করছে। কিন্তু তারা একবারও এ কথা বলেন না যে, আইনের শাসন কেন অনুপস্থিত? দোষীদের বিচার কেন হয় না? দায়ীরা কেন দায়মুক্তি পেয়ে যায়? সর্বোপরি এসবের জন্য যা প্রয়োজন সেই গণতন্ত্র কতোটুকু এবং কোন মাত্রায় বিদ্যমান আছে? এসব প্রশ্ন করাও এখন বিপজ্জনক ধৃষ্টতা। কারণ ভীতির সংস্কৃতির কারণে নিজ দায়িত্বে কথা বলার উপরও সেন্সরশীপ আরোপ করতে হচ্ছে যাকে সেলফ সেন্সরশীপ বলা হয়। এই সেলফ সেন্সরশীপ কি গণতন্ত্র, আইনের শাসন সমাজে বিদ্যমান থাকার ইঙ্গিত দেয়? মোটেই না। মার্কিন প্রখ্যাত বিচারক পটার স্টুয়ার্ডএর কথাটি এক্ষেত্রে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, ‘সেন্সরশীপ সমাজের উপরে আস্থা হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টিই প্রমাণ করে’। কাজেই জনআস্থা যেখানে এবং যখন থাকে না, সে স্থান দখল করে নেয় ক্ষমতালিপ্সার কারণে সৃষ্ট ভয়ের সংস্কৃতি।

তবে মহান রাজনৈতিক দার্শনিক নিকোলো ম্যাকিয়্যাভেলীর কথাটিই ইতিহাসে সব সময় সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে – ‘জনসাধারণের সন্তুষ্টি ছাড়া কোনো শাসন ব্যবস্থাই নিরাপদ নয়’।।