Home » রাজনীতি » সৈয়দ আশরাফের উৎকণ্ঠা ও সতর্কবাণী

সৈয়দ আশরাফের উৎকণ্ঠা ও সতর্কবাণী

হায়দার আকবর খান রনো

Dis 1পরিস্থিতি যে উদ্বেগজনক তা স্বয়ং মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম স্বীকার করেছেন। তিনি উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন এবং এই রকম পরিস্থিতির জন্য প্রধানত নিজ দল আওয়ামী লীগকেই অভিযুক্ত করেছেন। এর আগে গত জুন মাসে কুখ্যাত হলমার্ক কেলেঙ্কারী সম্পর্কিত এক আলোচনায় সংসদ কক্ষে দাড়িয়েই অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সরল স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন যে, দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার পরও ব্যাংক কেলেঙ্কারী ও জালিয়াতির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। কেন? কারণটাও তিনি স্পষ্ট করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘নিজেদের লোক হওয়ার কারণেই ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না’। অর্থাৎ নিজ দলের লোকজন হয় সরাসরি জড়িত অথবা অপরাধীদের রক্ষা করতে তৎপর রয়েছেন।

সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম গত ১১ আগস্ট জাতীয় শোকের মাসের একটি অনুষ্ঠানে নিজ দলের লোকজনের ‘খাই খাই’ ভাব পরিত্যাগ করতে আহ্বান করেছিলেন। তার বক্তব্যটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। সে জন্য তার বক্তব্য থেকে কিছুটা দীর্ঘ অংশ উদ্ধৃত করলে তা অপ্রাসঙ্গিক হবে বলে মনে হয় না। তিনি বলেছেন – ‘১৫ আগস্টে কি আমাদের ব্যর্থতা ছিল না? বড় দল হয়েও আমরা বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে পারিনি।এই যে ঘটনা ঘটে গেল, গোয়েন্দারা জানলো না, পুলিশ জানলো না, তার দল জানলো না। এটা হতে পারে না। আমি মনে করি এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র আছে।এর পেছনে আছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তি’। তবে তিনি এটুকু বলেই থামেননি। তিনি দলীয় সভায় প্রধানত নিজ দলের দুর্বলতাকেই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা তো বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে পারিনি। দ্বিতীয়বার যদি এ ধরনের পরিস্থিতি আসে আমরা কি পারবো? আমরা কি প্রস্তুত? আমার তো মনে হয় না। দল ক্ষমতায়? ’৭৫এ তো আমাদের দলই ক্ষমতায় ছিল। আমরা কি রক্ষা করতে পেরেছি’?

নিশ্চিতভাবে আমরা কেউই চাই না দ্বিতীয়বার এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হোক। কিন্তু সৈয়দ আশরাফ যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সেটাকেও হালকাভাবে না দেখে তার সাথে আমরাও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠি।

কিন্তু মনে রাখা দরকার যে, ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত ও মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে কোন রাজনৈতিক বিরোধী দল ছিল না। এমনকি সেদিন জাসদ ও সর্বহারা পার্টি যে সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছিলেন, তারাও জড়িত ছিলেন না। ১৫ আগস্টের ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে আমাদেরকেও হতবুদ্ধি করে দিয়েছিল। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে এমন ঘটনাও যে ঘটতে পারে তা আমাদের সকল চিন্তার বাইরে ছিল। ষড়যন্ত্র ছিল। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। বিশেষ করে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র কথা প্রায়ই উঠে আসে। আর ষড়যন্ত্রের সাথে এদেশীয় যারা জড়িত ছিল তারা সরকারদলীয় লোক। খন্দকার মোশতাক আহমেদ বাইরের কেউ ছিল না।

কেন সেদিন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ তাদের এতো বড় মাপের নেতাকে রক্ষা করতে পারলো না। সেই প্রশ্নই উত্থাপন করেছেন আওয়ামী লীগেরই সাধারণ সম্পাদক এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। ওই যে ‘খাই খাই’ ভাব সেটাই ছিল কারণ। রাজনৈতিক ভাষায় আমরা যাকে বলতে পারি লুটপাটতন্ত্র। বেপরোয়া লুটপাট, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জনগণের সম্পদের লুটপাট অথবা অন্যভাবে বললে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জনগণের সম্পদ দখল, জোরজবরদস্তি করে পরের জমি দখল, নদী দখল, টেন্ডার বাক্স দখল তা অর্থনীতিতে যেমন নৈরাজ্য সৃষ্টি করে, তেমনই রাজনৈতিক কালচারকেও করে কলুষিত। প্রশাসন ও পুলিশ যে দলীয় দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে কিছু করতে পারে না, সে স্বীকারোক্তি তো অর্থমন্ত্রী করেছেন। এমনকি গত ১৩ আগস্ট পুলিশ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত ত্রৈমাসিক (এপ্রিলজুন) অপরাধ পর্যালোচনা সভায় বিভিন্ন জেলার পুলিশ সুপার অভিযোগ করেছেন যে, কোন অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ধরলেই বাধা আসে। গত ১৩ আগস্ট এক আলোচনাকালে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন যে, ‘রাজনৈতিক আশ্রয় থাকলে আইন তাকে স্পর্শ করতে পারে না’। স্মরণযোগ্য যে, ঠিক তার এক সপ্তাহ আগে তিনি অন্য এক আলোচনায় বলেছিলেন, ‘আইনের শাসনের দুর্বলতার কারণেই শিশু নির্যাতন বৃদ্ধি পাচ্ছে’।

পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। এই পরিস্থিতি নানা ধরনের ষড়যন্ত্রেরও জন্ম দেয়। তেমন ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। ষড়যন্ত্র যদি হয়, তাকে প্রতিরোধের উপায় কি? গণতান্ত্রিক পরিবেশকে নিশ্চিত করা। একমাত্র গণতন্ত্রই ষড়যন্ত্রকে রুখতে পারে। কিন্তু গণতান্ত্রিক ‘স্পেস’ সংকীর্ণ হয়ে আসছে। সেটাই দুর্ভাগ্যজনক। সেটা ভয়ের কারণও বটে।

এর সাথে যুক্ত হয়েছে আরেকটি মহাবিপদ। তাহলো জঙ্গীবাদের উত্থান। পবিত্র ধর্মের নামে সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ। উদীচির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, পহেলা বৈশাখের সকালে রমনা বটমূলে গানের অনুষ্ঠানে, সিপিবি’র জনসভায়, সিনেমা হলে ইত্যাদি বোমাবাজির ঘটনা আমরা দেখেছি। সম্প্রতি শুরু হয়েছে ব্লগার হত্যা। মুক্তবুদ্ধির চর্চা যারা করছেন তাদেরকে নাস্তিক আখ্যা দিয়ে একের পর এক হত্যাকাণ্ড সংগঠিত করছে ধর্মের নামে জঙ্গী ঘাতকের দল। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটি বড় স্তম্ভ সমাজতন্ত্রের কথা তো তারা এখন ভুলেও উচ্চারণ করে না। এমনকি ধর্ম নিরপেক্ষ ভাবাদর্শের ক্ষেত্রেও তারা আপোস করে আসছে।

আবহমান কাল থেকে যে পহেলা বৈশাখ ধনীদরিদ্র নির্বিশেষে বাঙ্গালি উৎসব হিসাবে পালন করে এসেছে, তাকে মৌলবাদীরা ইসলাম বিরোধী বলে ঘোষণা করে এবং অবশ্যই সম্পূর্ণ ভুলভাবে। সেই জন্যই পহেলা বৈশাখের গানের অনুষ্ঠানে তারা বোমা ফাটিয়ে মানুষ মারে। এখন দেখি আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ওলামা লীগও পহেলা বৈশাখ পালনকে ইসলাম বিরোধী বলে ঘোষণা করেছে। এমনকি তারা মুক্তবুদ্ধি চর্চাকারী ব্লগারদের নাস্তিক বলে ঘোষণা দিয়ে শাস্তি দাবি করেছে। তাদের এই বিবৃতি কোন সময় এসেছে? ঠিক তখনই যখন মুক্ত চিন্তার অধিকারী ব্লগে লেখকদের একের পর এক হত্যা করা হচ্ছে। আমরা দেখেছি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যথার্থই বলেছেন যে, ধর্মের নামে সন্ত্রাস চলতে পারে না। তিনি বলেছেন, ‘ইসলাম পবিত্র ধর্ম। যারা ধর্মকে কলুষিত করছে, তারা ধর্মে বিশ্বাস করতে পারে না। তারা নিজেদের মুসলমান হিসাবে কিভাবে ঘোষণা দেবে? ধর্মের নামে কোনো ধরনের সন্ত্রাস চলতে দেয়া হবে না’।

কিন্তু তার প্রশাসন কি ভূমিকা গ্রহণ করেছে? পুলিশ প্রধান শহীদুল হক ব্লগারদের সংযত হয়ে লিখতে উপদেশ দিয়েছেন। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে এমন লেখা লিখতে নিষেধ করেছেন। পুলিশ যেন রাজনৈতিক নেতার ভূমিকা পালন করছে! ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করলে তার জন্য শাস্তির বিধান আছে। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী এই রকম এক অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন। কিছুদিন জেলও খেটেছেন। কিন্তু যখন স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য ব্লগারদের চাপাতি দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে, তখন পুলিশের কাজ উপদেশ দেয়া নয় অথবা লেখালেখির সীমা নির্ধারণ করা নয়। পুলিশের প্রধানের কাজ ছিল হত্যাকারীদের গ্রেফতার করা। আশিকুর রহমান বাবুর হত্যাকারীকে হাতেনাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন দুজন সাহসী মানুষ যাদেরকে তৃতীয় লিঙ্গের বলে তাচ্ছিল্য করা হয়। ঘাতকরা স্বীকার করেছিল যে, তারা হুজুরের নির্দেশে খুন করেছে। তারপরও পুলিশ হুকুমদাতাকে ধরতে পারেনি। পুলিশের এই ভূমিকাকে সমালোচনা করে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান যথার্থই বলেছেন, ‘পুলিশের পক্ষ থেকে ব্লগারদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে লেখালেখি বন্ধ করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পুলিশের এই বার্তা সঠিক। তবে তারা সঠিক সময়ে এই বার্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। এখন সময় ব্লগার হত্যার সাথে জড়িতদের খুজে বের করে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা’।

হাবেভাবে মনে হয়, সরকার বোধহয় নিজেকে বাচানোর জন্য মৌলবাদী ভাবাদর্শের কাছে আত্মসমর্পণ করছে। লুটপাট, দুর্নীতি ও গণতন্ত্রহীনতার কারণে তারা যতো বেশি গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, ততোবেশি জঙ্গীবাদের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। আর ততোই বেশি করে সরকার সেই ভাবাদর্শের কাছে নতিস্বীকার করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই পেছনে ঠেলে দিচ্ছে। এ এক বিষময় চক্র। এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসার এবং যে কোনো ধরনের বিপদের আশঙ্কা থেকে সরকার নিজেকে ও দেশবাসীকে রক্ষা করতে পারে গণতন্ত্রকে প্রসারিত করেই। না হলে সৈয়দ আশরাফ যে অশনি সংকেত দিয়েছেন, তাতে তিনি একাই নন, আমরাও ভীত না হয়ে পারি না।।