Home » বিশেষ নিবন্ধ » ক্ষমতাসীনরা যখন বিরোধী দলের ভাষায় কথা বলে

ক্ষমতাসীনরা যখন বিরোধী দলের ভাষায় কথা বলে

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

Dis 3নানা পথ এবং পন্থায় বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড যখন চলছিল, তখন দেশে ও বিদেশে এর বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ ওঠে এবং যা এখনো চলছে। সবারই একটি কথা আইনবিরুদ্ধ বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলতে পারে না। তখন ক্ষমতাসীন দল এর বিপরীতে গিয়ে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন দিয়েই যাচ্ছে এই কারণে যে, এর মাধ্যমেই বিরোধী দল, পথ, পক্ষ ও ব্যক্তিবর্গকে বিনাশ ও নিশ্চিহ্ন করা যাবে। অনেক নেতা এখনো এই পথ ও পদ্ধতিকে সমর্থন তো দিচ্ছেনই, সাথে সাথে সভাসমাবেশে বিরোধীদের প্রতি এমন হুশিয়ারি উচ্চারণও করেছেন, ‘আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য, সহিংসতা ও নাশকতা করলে কড়া জবাব দেয়া হবে’। কড়া জবাবের প্রধানত অনুসঙ্গ ক্রসফায়ার বা কথিত বন্দুকযুদ্ধ। এছাড়া গুম, অপহরণ, কথিত গণপিটুনি, অন্যান্য উপায়ে হত্যা ও খুনের ঘটনা নানাভাবেই ঘটছে। বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার যে শুধু বিরোধী দল বা মতের মানুষ তাই নয়, অসংখ্য সাধারণ মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে। সাংবিধানিক সংস্থা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, মানবাধিকার সংগঠন অধিকার, আইন শালিস কেন্দ্রসহ অনেকেরই সরেজমিনে অনুসন্ধান, পর্যবেক্ষণে এ কথাটি বার বার উঠে এসেছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বার বার সতর্কবাণী উচ্চারণও করেছেন। শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সরকারকে এ নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ২০০৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকেও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে ঘোরতর আপত্তি উত্থাপন করা হয়। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি তখন বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করবে বলে অঙ্গীকার করেছিলেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে এ নিয়ে হরহামেশা কথা উঠছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও কয়েকবার বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের কথা বলেছিলেন।

২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে ২৯ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছিল তাতেও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করার সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয়টি হচ্ছে ক্রসফায়ার, অপহরণ, গুম, খুন, কথিত গণপিটুনিসহ কোনো কিছুই বন্ধ হয়নি, বরং দিনে দিনে এসব কারণে মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। আর এটি করা হয়েছে দায়মুক্তির সংস্কৃতির মধ্যদিয়ে, যাকে লাইন্সেসড টু কিল বলা হয় অর্থাৎ হত্যার অবাধ অধিকার। গত ১০ বছরে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে কম করে হলেও ২ হাজারের বেশী মানুষ নিহত হয়েছেন বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে। অপহরণ, গুম, কথিত গণপিটুনির ঘটনা তো ঘটছেই।

ক্ষমতাসীন দল এই পথ এবং পন্থাকেই মনে করছে ক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদী ও স্থায়ীকরণ পদ্ধতি হিসেবে। এই কারণে তাদের রাজনৈতিক ক্রিয়াকর্ম রাজনৈতিক ধারায় না গিয়ে গিয়েছে ভিন্ন পথে, ভিন্ন মুখীনতায়। একটি রাজনৈতিক দল বা পক্ষকে মোকাবেলা করার বৈধ ও একমাত্র উপায় হচ্ছে রাজনৈতিক পথ এবং পদ্ধতি। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা তাতে যতোই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে, ততোই বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ ভিন্ন পন্থার বিস্তার ঘটেছে। ক্ষমতাসীন দলের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস, যৌন সন্ত্রাসের ঘটনা প্রকাশ্যে এলে এবং প্রতিবাদের মুখে পড়লেই বল হয় এটা বিরোধী দলের নাশকতা অথবা অনুপ্রবেশকারীদের কাজ।

এই ভুল পথে যাওয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে এখন ক্ষমতাসীন দলকেই। ক্ষমতাসীন দলকেও এখন মনে রাখতে হবে, আইন ও বিচার বহির্ভূত যেকোনো কর্মকাণ্ড যে কারো জন্য বিপদের কারণ। মহান দার্শনিক এ্যরিস্টটল বলেছেন (পলিটিকস্‌ ৪:) ‘আইন যেখানে শাসন করে না সেখানে কোনো শাসন ব্যবস্থার অস্তিত্ব থাকে না’। কাজেই বেআইনি ও বিচার বহির্ভূত কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারীদের অনিবার্য কার্যক্রম এমন হয়ে যায় যে, তারা এ কাজটিকেই একমাত্র কর্তব্য ও দায়িত্ব বলে মনে করে।

গত কয়েকদিনে ক্ষমতাসীন দলীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ৪ জন স্থানীয় নেতাকে ক্রসফায়ারে নিহত করা হয়। একজনকে অপহরণ করা হয়েছে বলেও তার পরিবারের দাবি। আর এর পরেই নড়েচড়ে বসেছে ক্ষমতাসীন দলের একাংশ। বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে বড় ধরনের একটি বিভক্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকারের একাংশ ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার ঘটনাকে বৈধ কর্মকাণ্ড ও এ্যকশন শুরু বলে মনে করছে। তাদের অভিমত সম্ভবত এমন যে, এর মাধ্যমে তারা তাদের হারানো ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে পারবে। আবার অন্যদিকের অংশ বলছে, এটা ঠিক হচ্ছে না। তাদের এই ঠিক হচ্ছে না’র যুক্তিটির পেছনে কারণ হচ্ছে যেহেতু ক্রসফায়ারের শিকার এখন তারাই হচ্ছে যা তাদের কল্পনার মধ্যেও ছিল না।

বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সমর্থনকারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, সন্ত্রাসী যে দলেরই হোক না কেন, কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ১৮ আগস্ট বলেছিলেন, সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এ্যকশন শুরু হয়ে গেছে। অন্য কয়েকজন মন্ত্রী এই বক্তব্যের সাথে সহমত পোষণ করেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, আইনি প্রক্রিয়ায় ও রাজনৈতিকভাবে এর সমাধান করতে হবে। ক্রসফায়ারের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। সরকার দলীয় প্রভাবশালী সংসদ সদস্য ফজলে নূর তাপস বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে এখন বেশ সোচ্চার বলেই মনে হচ্ছে। তিনি ক্রসফায়ারকে তথাকথিত গৎবাধা গল্প বলে উল্লেখ করে এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। গত ২২ আগস্ট এই একই সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদে বলেছেন, বিএনপি জামায়াতের তৈরি র‌্যাব দিয়ে এই সরকার চলতে পারে না।

তবে আইনমন্ত্রীর কথাটিই উত্তম বলে মনে হয়। তিনি এখন বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি করেছেন। অথচ এই দাবি দীর্ঘদিন ধরে করা হচ্ছিল বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনসহ নানা দেশ ও সংস্থার পক্ষ থেকে। তখন সরকারের সবাই চুপচাপ ছিলেন, আইনমন্ত্রীসহ। আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়া জরুরি। বিচার বিভাগীয় তদন্ত হবে কি শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন দলভুক্ত যারা ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছেন তাদের, না এ পর্যন্ত যারা বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তাদেরও? আশা করি শেষেরটি কার্যকর হবে।

ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবিসহ বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে নেতিবাচক বক্তব্যে অনেকে অবাক হলেও বাস্তবে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ ক্ষমতাসীনদের ধারণা ছিল, এই পদ্ধতিটি এতোদিনকার মতো শুধু মাত্র বিরোধী পক্ষ দমনেই ব্যবহৃত হবে। কিন্তু যখন নিজেদের দিকে দ্রুত বেগে ধাবমান তখন হয়তো তাদের কেউ কেউ বুঝতে পারছেন আইন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি সবার জন্যই বিপজ্জনক। আশা করি তারা এটাও বুঝতে সক্ষম হবেন যে, গণতন্ত্র অনুপস্থিত থাকলে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিনাশ ও বিপর্যস্ত করা হলে পুরো রাজনৈতিক কাঠামোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘকালের গণতন্ত্রহীনতার কারণে আইনের শাসন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি আগে অন্যান্য দংশন করেছে এবং এখন সামগ্রিকভাবে তা শুরু হয়েছে।

যে শংকা ও ভীতির সংস্কৃতি সর্বত্র সৃষ্টি করা হয়েছে, সে কারণে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে ক্ষমতাসীনদেরও বিরোধী দলের ভাষায় কথা বলতে হয়, প্রতিক্রিয়া দেখাতে হয়। এটাই অনিবার্য। এটা অবশ্যই মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্রহীনতার কারণে আইনের শাসন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে তাদের এই প্রতিক্রিয়া আরও জোরালোভাবে দেখাতে হবে।।