Home » অর্থনীতি » চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ২৪)

চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ২৪)

দুর্ভিক্ষ : প্রচারণা ও পর্যালোচনা

আনু মুহাম্মদ

Last 3গত পর্বেই বলেছি উল্লম্ফনের সময় জটিলতা হয়েছিলো, ব্যবস্থাপনার সমস্যা ছিলো, কিছু এলাকায় খাদ্য ঘাটতি হয়ে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়েছিলো। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগও ছিলো। মাও সেতুং নিজেও এই সময়ে ত্রুটিবিচ্যুতির কথা স্বীকার করেছেন। কিন্তু দুর্ভিক্ষ নিয়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে মনগড়া পরিসংখ্যান দিয়ে যেভাবে প্রচার চালানো হয় তাতে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না। এসব প্রচারণা অনেক সময় এই পর্যন্ত যায় যে, মাও সেতুং নিজেই এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিলেন! তিনি চেয়েছিলেন এভাবে মানুষ মরুক, তাহলে উন্নয়নের সুবিধা হবে!!

মাও সেতুংএর বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে সমালোচনা ও কুৎসার বড় ক্ষেত্র দুটি। এর মধ্যে একটি হলো Great Leap Forward বা উল্লম্ফন এবং আরেকটি হলো সাংস্কৃতিক বিপ্লব। বস্তুত মাওউত্তর চীনে, ১৯৭৮ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির তৃতীয় প্লেনারী মিটিং এর পর থেকে মাও বিরোধী রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। এর সাথে যোগ হয় আন্তর্জাতিক প্রচারণা।

উল্লম্ফন বা ১৯৫৮৬২ সময়কালে গৃহিত কর্মসূচির কারণে দুর্ভিক্ষ এবং তাতে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বহু লেখা, গবেষণা এবং প্রচারণা হয়েছে। বিশেষ করে ৮০র দশক থেকে এই বিষয়ে প্রচারণা আরও বৃদ্ধি পায়। চীনে মাও পরবর্তী সরকারগুলোও তাতে যোগ দেয়। সরকারের প্রকাশনা ছাপিয়ে দুর্ভিক্ষে মৃতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকে। মৃতের সংখ্যা বিষয়ে বিভিন্ন গালগল্প ছাড়াও গবেষণার সূত্র উল্লেখ করা হয়। এগুলো হলো : ১৯৮২ ও ১৯৮৭ সালে উত্তর আমেরিকার দুজন জনসংখ্যাতত্ত্ববিদের দুটি গবেষণা। পরে অমর্ত্য সেনের মাধ্যমে এটি অনেক বেশি প্রচার পায়। সেন এর ওপর ভিত্তি করে তত্ত্বও দাঁড় করান।

এসব গবেষণার পদ্ধতি ছিলো বিভিন্ন বছরে মৃত্যুহার তুলনা করা। এই তুলনামূলক গবেষণা শুরু হয় ১৯৮২ থেকে, তারপর তা পেছনের বছরগুলোতে যায়। চীনে ১৯৮২ সালের আদমশুমারীকালে ১০ লাখ মানুষের মধ্যে একটি জরিপ চালানো হয়। জরিপে তাদের ১৯৫০ দশক ও তার পরবর্তী সময়ে জন্ম ও মৃত্যু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়। এই জরিপের ফল থেকেই জানানো হয় যে, ১৯৫৩ ও ১৯৬৪ এই দুই শুমারী বর্ষের গণনার চাইতে আরও বেশি জন্ম হয়েছিলো। ১৯৫৩ সালের জরিপে আরও বড় নমুনা সংখ্যা থেকে জন্মহার পাওয়া গিয়েছিলো হাজারে ৩৭ জন, তা উপেক্ষা করে ১৯৮২র জরিপ থেকে ৫০ দশকের জন্য জন্মহার হিসাব করা হয় হাজারে ৪৩৪৪। এর ফলে ১৯৫৩ ও ১৯৬৪র মধ্যে অতিরিক্ত জন্ম দেখা যায় প্রায় ৫ কোটি জনের।

তবে ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২ সালের মৃত্যুহার তুলনা করতে অস্বাভাবিকতা ঠিকই নজরে আসে। ১৯৫৮ সালে মৃত্যুহার ছিলো ১২, ১৯৫৯ সালে তা বেড়ে হয় ১৪., ১৯৬০ সালে তা অনেক বেড়ে হয় ২৫.৪ এবং পরের বছর তা আবার নেমে ১৪., এবং ১৯৬২ সালে তা আবার ১০এ পৌঁছায়। ১৯৬০ সালে এই মৃত্যুহার অস্বাভাাবিক, কোনো সন্দেহ নেই। তবে ভারতের প্রখ্যাত গবেষক উষা পাটনায়েক জানিয়েছেন, এই একই বছর ভারতে এই হার ছিলো ২৪., তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন কেউ তোলেনি।

উষা পাটনায়েক ১৯৮২ থেকে পেছনে গিয়ে স্মৃতিশক্তি নির্ভর উপাত্তের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত টানার বিরোধিতা করে কাণ্ডজ্ঞানের একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেন এইভাবে, ‘যখন বৃটেনের উপনিবেশ আয়ারল্যান্ডে ১৮৪৬৪৭ সালে দুর্ভিক্ষে ১০ লক্ষ মানুষ মারা গেলেন পুরো দুনিয়া তা জানতো, যখন ১৯৪৩৪৪ সালে বাংলার দুর্ভিক্ষে ৩০ লাখ মানুষ নিহত হন তখনও এই খবর সবার জানা ছিলো। কিন্তু চীনে দুর্ভিক্ষে ৩ কোটি মানুস নিহত হবার কথা বলা হয় অথচ তা সেইসময়ে কেউ জানলো না, এমনকি চীনে তখন অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিক, বিভিন্ন ব্যক্তিসাংবাদিকসংস্থা যারা চীনের দিকে সর্বক্ষণ নজর রাখতো নানা ভুলত্রুটি ধরবার জন্য তারা কেউ জানলো না তা কি করে হয়? যারা এগুলো বলেন তারা বেশ চালাক কিন্তু তারা আসলে নিজেদের নির্বোধ আকারেই হাজির করছেন।’

জোসেফ বেল এই বিষয়ে আরও অনুসন্ধান করেছেন। তিনি কয়েকটি গবেষণাপ্রচারণার উল্লেখ করে দেখিযেছেন কীভাবে সেগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয় উপেক্ষা করে যুক্তি ছাড়া শুধু নিহতের সংখ্যা বাড়িয়ে দেখিয়েছে। পাশাপাশি তাদের গবেষণাতেই ধরা পড়েছে ১৯৪৯১৯৭৫ সময়কালে কী দ্রুত হারে মৃত্যুহার কমেছে। ১৯৪৯ সালে যেখানে আয়ুসীমা ছিলো ৩৫ সেখানে ১৯৭৫ সালে তা দাঁড়িযেছে ৬৫। চীনা ইতিহাস বিশেষজ্ঞ কার্ল রিসকিন বলেছেন, ‘চীনে সেসময় দুর্ভিক্ষ হয়েছিলো ঠিকই কিন্তু সেটা ব্যাপক আকার নিতে পারেনি। চীনের বিপ্লবপূর্ব কালের সাথেও তার তুলনা করা যায় না।’ জোসেফ বেল বহু উদ্ধৃত দ্য চায়না কোয়ার্টারলির কথা উল্লেখ করেছেন, যার প্রকাশনায় সিআইএ অর্থ যোগান দিতো বলে সম্পাদকও এক পর্যায়ে স্বীকার করেছেন।

দংপিং হান ৫০ দশকের শেষ দিক থেকে গ্রামাঞ্চলে তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ননা করে লিখেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘ভুমি সংস্কারের মধ্য দিয়ে গ্রামাঞ্চলের শতকরা ৬০ ভাগ গরীব ভূমিহীন মানুষ জমি, কৃষি যন্ত্রপাতি এবং অধিকার পেয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় উল্লম্ফনকালে অলস ও ঢিলা মৌসুমকে উদ্যোগ, ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি দিয়ে ব্যস্ত ও কর্মচঞ্চল মৌসুমে পরিনত করা হয়েছে। ১৯৫৮, ৫৯ ও ৬০ সালে গ্রামের মানুষ বহুরকম কাজে যুক্ত হযেছেন, জলাধার, পানির কুপ, নদী ও খালখনন, সেচনালা তৈরি ইত্যাদি। এগুলো জাতীয় থেকে একেবারে গ্রাম পর্যায়ের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সমাধা হচ্ছিলো।’

অধিক আলোচিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: বেইজিংএ সিসাংলিং জলাধার, উত্তর চীনের প্রধান পাঁচটি নদী সংযুক্ত করতে হাই নদী প্রকল্প, হুনানে ইয়েলো রিভার স্যানমেনজিয়া প্রজেক্ট, লিন কাউন্টিতে রেড ফ্ল্যাগ ইরিগেশন চ্যানেল সহ অনেক প্রকল্প। বহু অঞ্চলে ছোটবড় জলাধার নির্মাণ এবং সেচব্যবস্থার তৎপরতা ছিলো উল্লেখযোগ্য। তবে এতোসব নির্মাণযজ্ঞে ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা ছিলো, সমন্বয়ের সমস্যা ছিলো।।

তথ্যসূত্র

১। Utsa Patnaik: Revisiting Alleged 30 Million Famine Deaths during China’s Great Leap

২। Joseph Ball: “Did Mao Really Kill Millions in the Great Leap Forward?” September 21, 2006

৩। Dongping Han: Farmers, Mao, and Discontent in China: From the Great Leap Forward to the Present, 2011