Home » অর্থনীতি » জিএসপি না পাওয়ার আসল কারণ

জিএসপি না পাওয়ার আসল কারণ

এম. জাকির হোসেন খান

Dis 4শর্ত পূরণ করতে না পারার কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্যের অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা (জিএসপি) পুনর্বহাল হয়নি, শ্রমমানের উন্নয়নে আমরা যেসব অঙ্গীকার করেছি তা পূরণ করতে হবে। তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমরা জিএসপি ফিরে পাব’ সম্প্রতি এ মন্তব্যটি করেছেন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী। তাজরীন ফ্যাশন এবং রানা প্লাজা ট্রাজেডিতে সহস্রাধিক শ্রমিকের নিহত হবার কারণে বাংলাদেশের পোষাক রপ্তানিখাতে শ্রমমান নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রদত্ত শুল্ক মুক্ত অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা (কোন প্রকার ভ্যাট, ট্যাক্স আরোপ না করা) যা জেনারেলাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স বা জিএসপি নামে পরিচিত, তা ২০১৩ সালের ২৭ জুন প্রত্যাহার করা হলেও সর্বশেষ ২০১৫ সালেও তা পুনর্বহাল করা হয়নি। গত ২৯ জুলাই ১২২টি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ছাড়কৃত শুল্কে পণ্য রপ্তানির সুযোগ পেলেও এ সুবিধা পায়নি শুধু বাংলাদেশ ও রাশিয়া। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা স্থগিত করার ফলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোষাক শিল্পকে ১৫ শতাংশ শুল্ক গুনতে হচ্ছে।

জিএসপি সুবিধার ফলে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ৪% বেশি পোশাক রপ্তানি হলেও সার্বিকভাবে রপ্তানিকারক দেশের শ্রম মান এবং সুশাসনের ব্যাপারে এটা এক ধরনের দিকনির্দেশনা প্রদান করে, যা ক্রেতাদের আমদানির সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। যদিও সস্তা শ্রমের কারণে এখনো রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোষাক রপ্তানির ব্যাপারে চাহিদা রয়েছে তবে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যে বলে দিয়েছে আগামী ১৮ মাসের মধ্যে শ্রম মান নিশ্চিত না করতে পারলে, তারাও জিএসপি সুবিধা বাতিল করবে। সম্প্রতি জি৭৭ বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, রপ্তানিকারী সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক দেশেই শ্রমের মান, পণ্যের মান, কার্যপরিবেশ ও জলবায়ু পরিবেশ এগুলো মানা হলো কিনা তার একটি নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

এরই প্রেক্ষিতে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধা প্রদান করেনি। আমার ধারণা জন্মেছে এ শর্তের চেয়েও বেশি কিছু করি, তারপরও তারা (যুক্তরাষ্ট্র) স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করবে না। এরপরও জিএসপি না ফিরলে, জনগণ ভাববে যুক্তরাষ্ট্র ’৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার ভূমিকা থেকে সরে আসেনি’। অথচ গত ১২ আগস্ট গাজীপুরে দুটি গার্মেন্ট কারখানা পরিদর্শন শেষে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদুত মার্শা বার্নিকাট বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের জিএসপি না পাওয়ার সঙ্গে রাজনীতির কোন সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশকে যে ১৬টি শর্ত পূরণ করতে বলা হয়েছে তা পূরণ করতে পারলে জিএসপি পুনর্বহাল হবে। ট্রেড ইউনিয়ন, অনলাইন ডাটাবেজ ও সংশোধিত শ্রম আইনের বিধিমালার পূর্ণ বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ জিএসপি ফিরে পেতে পারে’। অথচ যথাযথ পদক্ষেপ না নিয়ে নিজেদের ব্যার্থতাকেই আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

. আকবর আলি খান ২০১৩ সালেই মন্তব্য করেছিলেন, ‘জিএসপি স্থগিত দেশের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। সাময়িকভাবে এর প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে না পড়লেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব অবশ্যই পড়বে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো এবং কানাডার মতো দেশে জিএসপি অব্যহত রাখতে হলে অবশ্যই আমাদের কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে হবে’। ড. মির্জা আজিজুল ইসলাম তখন বলেছিলেন, ‘আমাদের সমস্যা হল আমরা হোঁচট খেয়ে সব কিছু করি। এখন যা করা হচ্ছে তা আগে থেকেই করা যেত। কিন্তু এসব বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মনিটরিং সেলও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে এবং মালিক পক্ষও সময় থাকতে শ্রমিক কল্যাণ, কর্মপরিবেশ উন্নয়ন কিংবা শ্রম অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে উল্লেখযোগ্য মনোযোগী ছিল না। এরই খেসারত জিএসপি বাতিলের উদ্যোগ’।

অথচ বাণিজ্যমন্ত্রীর দাবি, ‘আমাদের দেশের কিছু শ্রমিক নেতা যারা কারখানায় কাজ করে না, যারা আন্তর্জাতিক কোনো কোনো শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত, তারা আমাদের অনেক ক্ষতি করেছে। ইউএসটিআরে (মার্কিন বাণিজ্যবিষয়ক সংস্থা ইউনাইটেড স্টেট ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ) কিংবা কংগ্রেসম্যানদের চিঠি দিয়েছে। অথচ তারা কারখানার শ্রমিকই না’। ২০১৫ সালে গামেন্টস খাতে সুশাসনের অগ্রগতি বিষয়ক টিআইবি’র প্রতিবেদনের সুস্পষ্টভাবে বলা হয়, ‘শ্রম আইনের বিভিন্ন ধারার [(২৩, ২৭, ১৮৯, (৬৫)] অপব্যবহার করার মাধ্যমে শ্রমিকদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। তবে শ্রম আইনের বিধিমালা তৈরিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে কারখানাগুলোতে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা কমিটি গঠন করা সম্ভব হচ্ছে না। একইভাবে রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ না করা, শ্রম আদালতে মামলা পরিচালনায় দীর্ঘসূত্রতা এবং বিভিন্ন তদারকি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে অনীহা লক্ষণীয়’। একই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ‘গত এক বছরে কোনো কোনো কারখানায় অতিরিক্ত এক ঘন্টা কোনো প্রকার মজুরি ছাড়া কাজ করানোর অভিযোগ পাওয়া যায়। কমপ্লায়েন্স কারখানা পর্যায়ে শ্রমিকদের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৬০% পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া, হেলপার পদে আইনানুগ সুবিধা ছাড়া শ্রমিক ছাঁটাই ও ট্রেড ইউনিয়নের সাথে জড়িত শ্রমিকদের হয়রানি, মামলা বা চাকরিচ্যুত করার বিষয়ে জবাবদিহিতার ঘাটতি বিদ্যমান। প্রায় ৯০ শতাংশ সাবকন্ট্রাক্ট কারখানায় মজুরি বোর্ড কর্র্তৃক নির্ধারিত মজুরি দেওয়া হচ্ছে না। নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থতার কারণে অনেক কারখানা মালিক নারী শ্রমিকদের জন্য রাত্রিকালীন কাজ না করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিজিএমইএ কর্তৃক ফায়ার ফাইটিং গাইডলাইন বিলুপ্তিতে প্রভাব বিস্তাার করা, কারখানা পর্যায়ে অতিরিক্ত ৪ কর্মঘন্টা বৃদ্ধির পরিপত্র জারি করা এবং বিজিএমই’র ‘পকেট ট্রেড ইউনিয়ন’ বা ‘ইয়েলো’ ট্রেড ইউনিয়নের কার্যক্রম বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব ইউনিয়নের সরকারি বিভিন্ন কমিটিতে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। আবার অনিবন্ধিত ট্রেড ইউনিয়ন ও ফেডারেশনের রাজনৈতিক ও ব্যক্তি স্বার্থে কাযর্ক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে’।

এমনকি রানা প্লাজায় নিহত বা আহত শত শত শ্রমিকদের জন্য প্রদত্ত ১০৮ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ এখনো কেন প্রদান করা হয়নি? কথিত নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত শ্রমিক নেতা আমিনুল হত্যাকাণ্ডের বিচার কি হয়েছে? বেতন এবং ভাতার দাবিতে যখন কয়েক দিন আগে শ্রমিকরা অনশন করলো তখন কি জাতি দেখেনি আইন শৃংখলা বাহিনী কি নির্মম আচরণ করেছে নারী শ্রমিকদের ওপর? এইতো গত ঈদের আগেও শত শত শ্রমিক বেতন ও বোনাস না পেয়েও আন্দোলন করলেও তার কি সুরাহা করেছে বিজিএমইএ বা ক্ষমতাসীনরা? উল্টো আইন শৃংখরা বাহিন কর্তৃক নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পুরণে বাধা দেওয়া হচ্ছে। অথচ বানিজ্যমন্ত্রীসহ সরকারের দাবি, ‘আমাদের দেশে, এখন কারখানা পরিবেশ ভালো, শ্রমিকরা খুশি, তাদের বেতন ২১৯ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। বৈঠকে তারা (যুক্তরাষ্ট্র) বলেছে, ৩০ শতাংশ কারখানা ঠিকমত বেতন ভাতা দেয় না, আমি বলেছি এ তথ্য ঠিক না’। এটা ঠিক যে, পণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারাই অনেক ক্ষেত্রে নিজেরাই নিজেদের সাথে প্রতিযোগিতা করে সবচেয়ে কম দামে পণ্য সরবরাহের অর্ডার নেয় যার ফলে শ্রম মান সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে কমপ্লায়েয়ন্সের জন্য সবচেয়ে কম অর্থ ব্যয় করে। এক্ষেত্রে বিজিএমইএ বা সরকারের পক্ষ থেকে ন্যুনতম দাম নির্ধারণ নীতিমালা না থাকাও অন্যতম কারণ।

ক’দিন আগেও ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্সা বার্নিকাট বিজিএমইএ আয়োজিত এক সেমিনারে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের জিএসপি ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়ে চিন্তাভাবনা চলছে এবং বলেন, গার্মেন্টপণ্য রফতানির মাধ্যমে ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলার আয় লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্র সরকার সব ধরনের সহযোগিতা করবে। অথচ কোনো আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতিই কাজে আসেনি। বাস্তব পরিস্থিতির দিকে নজর না দিয়ে মন্তব্য করা হচ্ছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিএসপি ফিরে না পেলে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না। এও দাবি করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া ১৬টি শর্তই পূরণ করা হয়েছে। ওইসব শর্তের চেয়েও বেশি কিছু করা হয়েছে। অনেক দেশের চেয়ে কারখানা পরিবেশ ভালো, তারপরও জিএসপি স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়নি। জিএসপি ফিরে পাওয়ার জন্য আর কোনো উদ্যোগ নেয়া হবে না’। বাস্তবে এটা যে সত্যকে আড়াল করার প্রয়াস তা নির্দ্ধিধায় বলা যায়। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই রাজনৈতিক কারণেই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে জিএসপি সুবিধা পুনর্বহাল করেনি, তাহলে বর্তমানে জিএসপি সুবিধাপ্রাপ্ত ১২২টি দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দীর্ঘদিন ধরে চরম বৈরী রাজনৈতিক সম্পর্ক বিরাজ করছে এমন দেশ ভেনিজুয়েলা ও ইকুয়েডর কিভাবে এ সুবিধা পাচ্ছে? সুতরাং রাজনৈতিক বা অন্য কোন ইস্যুর নামে ক্ষমতাসীনদের নানামুখী বক্তব্যের মাধ্যমে শাসকরা এমনই একটি ধারণা দিচ্ছে যে, বাস্তবে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। তা না হলে, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়া অন্য দেশগুলো কিভাবে এ সুবিধা পাচ্ছে? নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, আফগানিন্তানের চেয়েও কি বাংলাদেশের শ্রম পরিবেশ এবং নিরাপত্তা ও অধিকার সম্পর্কিত মান খারাপ?