Home » শিল্প-সংস্কৃতি » তথ্যের অবাধ গতি ও গণতন্ত্র হ্যাকিং-এর গল্প

তথ্যের অবাধ গতি ও গণতন্ত্র হ্যাকিং-এর গল্প

ফ্লোরা সরকার

Last 6মোটা দাগে পশ্চিমের সঙ্গে আমাদের মূল যে পার্থক্যটা ধরা পড়ে তা হলো সময়কে ধরতে পারা এবং না পারার সমার্থ এবং অসমার্থ চলমান সময়কে যতটা পারঙ্গমতার সঙ্গে পশ্চিমারা ধরতে পারে আমরা তার থেকে শুধু পিছিয়েই থাকিনা, অতীতকে ধরে আঁকড়ে থাকি। যদিও পশ্চিমের একটা প্রবণতা থাকে অতীতকে অস্বীকার করার, পরিবর্তিত করে ফেলার, বিশেষ করে সেসব অতীত যা তাদের বিব্রত করে, অস্বস্ততিতে ফেলে দেয়। তবু শিল্পকর্মে নিয়োজিত কেউ কেউ থাকেন যারা অতীতকে স্মরণ করেন, অতীতকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন, যাতে করে অতীতের পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেসব থেকে সাবধান হবার জন্যে। সিনেমার ক্ষেত্রে তাই দেখা যায় ’গন উইথ দা উইন্ড’, ’অল কোয়াইট ইন দা ওয়েস্টার্ন ফ্রান্ট’, ‘টুয়েল্ভ ইয়ার্স এ স্লেভ’ বা ‘সেলমা’র মতো ছবি নির্মিত হতে। টিভি সিরিয়ালে পাই ‘ওয়েস্ট মিনিস্টার’ এর মতো সাহসী ধারাবাহিক নাটক। কোনো তুলনা করার জন্যে নয়, আমাদের টিভি সিরিয়ালেও আধুনিক সময়কে ধরার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু সেটা একান্ত ভাবেই পোশাকআশাক, কথা বলার ভঙ্গি, আচারআচরণে সীমাবদ্ধ থাকে। কোনোভাবেই তা চলমান সময়কে নির্দেশ করেনা।

আমদের আধুনিকতা কেবল মাত্র বহিরাঙ্গনে সীমাবদ্ধ, অন্দরমহলে যাবার কোনো ইচ্ছা বা আগ্রহ দেখা যায়না। পুরনো মদ নতুন বোতলে ঢালার মতো, পুরনো গল্প নতুন পোশাকে পরিয়ে দেয়া হয়। আবার সেই পোশাকও এমনই দুর্বল নির্মাতাদের দ্বারা নির্মিত, যে তা দেখার ধৈর্য্য দর্শকদের থাকেনা। এই প্রসঙ্গে আমাদের নির্মাতারা হয়তো পুঁজিবাজারের সর্ববৃহৎ দালাল শ্রেণী সেই ‘বিজ্ঞাপন দাতা’দের দোষারোপ করবেন। আমাদের নির্মাতারা বলবেন, দর্শক নয়, বিজ্ঞাপনদাতাদের চাহিদা মাফিক সিরিয়ালগুলো নির্মিত করতে হয় বলেই তারা সেভাবে নির্মাণ করেন। প্রশ্ন হলো, পশ্চিমা নির্মাতারাও এসব বিজ্ঞাপন দাতাদের কবল থেকে মুক্তো নন। তাদেরকেও বিজ্ঞাপন দাতাদের দিকে তাকিয়ে সিরিয়াল নির্মাণ করতে হয়। কিন্তু তারা সেসব বিজ্ঞাপন দাতাদের দিকে চাতক পাখির মতো অথবা ভিখিরির মতো চেয়ে থাকেন না। তারা খুব ভালো করেই জানেন, কোনো পণ্যের যদি যথাযথ গুণাগুণ থাকে, তাহলে সেই পণ্য বাজারজাত হতে বাধ্য। পণ্যকে তারা শুধু নিছক পণ্য হিসেবেই গণ্য করেন না, কীভাবে তার গুণ বৃদ্ধি করা যায়, বাজারজাত করা যায়, বাজারের বিস্তার ঘটানো যায়, সেসব মাথায় রেখেই টিভি সিরিয়ালের মতো পণ্য নির্মাণ করেন। যেকোন শিল্পকর্মে সময়কে ধরতে পারাটাই সব থেকে জটিল এবং কৃতিত্বের কাজ। যারা চলমান সময়কে ধরতে পারেন না, তারা শুধু সময় থেকে পিছিয়েই থাকেননা, চলমান সময়ের গতি সমাজকে তথা বিশ্বসমাজকে কোথায়, কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে বা যেতে পারে, তার অনুমানও করতে পারেননা।

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘মি.রোবট’ নামে টিভি ধারাবাহিক শুরু হয়েছে। প্রথম সিজন শেষ করে দ্বিতীয় সিজনে পদর্পণ করতে না করতেই তা আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। নাটকে আলোচ্য বিষয় থাকলেই তা আলোচনার কেন্দ্রে আসে। তাও সেই আলোচ্য বিষয় যদি হয়ে থাকে ‘তথ্য প্রযু্ক্তি’র মতো আলোচিত বিষয়। গত ১৭ জুলাই, ২০১৫, ব্রিটেনের ‘গার্ডিয়ান’ এ পুঁজিবাদের মৃত্যুঘন্টা আসন্নের উপর চমৎকার একটা প্রতিবেদন ছাপা হয়। বর্তমান তথ্য প্রযুক্তি খোদ ‘পুঁজিবাদী’ ব্যবস্থাকেই একটা চ্যালেঞ্জের মুখে ছুড়ে দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিকের ‘ কার্যদিবস ’ বা ‘ কর্মসময় ’ নিয়ে যে বাহাদুরি করা হতো এযাবৎকাল, তথ্য প্রযু্িক্তর সংকুচিত ‘ কর্মদিবস’ শ্রমিকের সেই কাজের সময়কে সংকোচন করে দিচ্ছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, যে দুষ্প্রাপ্যতার নীতির উপর ভিত্তি করে বাজারে পণ্য নিয়ে আসা হতো এযাবৎকাল, নব্য এই তথ্য প্রযুক্তি সেই নীতির উপর একটা চপেটাঘাত করা শুরু করেছে, কারণ তথ্য এখন অবাধ। তথ্যের অবাধ গতির কারণে, দুষ্প্রাপ্যতার অযুহাত দেখিয়ে পণ্যের একচেটিয়া প্রতিযোগীতা করার এখন আর কোনো উপায় নেই। আগের এনসাইক্লোপিডিয়ার উপর আঘাত হেনেছে উইকিপিডিয়া। কিন্তু স্যাম ইসমাইল রচিত এবং পরিচালিত ‘মি.রোবট’ আরো এক ধাপ এগিয়ে উইকিলিক্সের উপরেও চড়াও হয়েছেন।

গল্পের নায়ক একজন সাইবার সিকিউরিটি ইঞ্জিনিয়ার, এলিয়ট অ্যান্ডারসান (রামি মালেক) একটা সাইবার সিকিউরিটি কোম্পানিতে চাকরি করে। তাকে কেন্দ্রে করে কাহিনী আবর্তিত। দিনের চাকরি শেষে, সারারাত জেগে বিভিন্ন মানুষের ব্যক্তিগত কম্পিউটার হ্যাক করে সমস্ত তথ্য চুরি করা এবং নিজেকে একজন সফলহ্যাকার হিসেবে পরিচয় দিতে যিনি বেশ স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। শুরুতেই ভয়েস ওভারে এলিয়ট যেভাবে কথা বলে, তা মার্কিনি টেলিভিশানে বিরল, ‘আপনাদের যা বলতে চাচ্ছি তা অত্যন্ত টপ সিক্রেট। যে চক্রান্ত বা ষড়যন্ত্র আমাদের থেকে অনেক বড়। একদল অত্যন্ত ক্ষমতাধর মানুষ আছেন যারা গোপনে এই বিশ্বব্যবস্থাকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আমি সেসব মানুষের কথা বলছি, যাদের কথা কেউ জানেনা এবং যারা থাকেন পর্দার আড়ালে। তারা সেরের উপর সোয়া সের মানুষ। যারা কারোর অনুমোদন ছাড়াই ঈশ্বরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন’। পর্দার আড়ালে থেকে যারা বর্তমান বিশ্বে ঈশ্বরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন, তারা থাকেন হয় কোনো ব্যাংক অথবা বিভিন্ন জিনিসের মিশ্রণজাত কোনো পিণ্ডের আকারে (অর্থাৎ কর্পোরেট বিশ্ব) অথবা সরকারি গুপ্তচর বাহিনী আকারে। সিরিয়ালের নায়ক এলিয়টকে তাই শখের হ্যাকার মনে হয়না। রাত জেগে তাই সেই অদৃশ্য ঈশ্বরের সন্ধানে বের হয় এলিয়ট। যে ঈশ্বর ক্রমশ মানুষের নুন্যতম মৌলিক অধিকারগুলো আত্মসাৎ করে চলেছে। সিরিয়ালের ট্যাগলাইনে লেখা , ‘আমাদের গণতন্ত্র হ্যাক্ড হয়েছে ; তোমার টাকাকড়ির অধিকার এখন ব্যাংকের পকেটে, সামাজিক সম্পর্কগুলো এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাঝে সীমাবদ্ধ, কর্পোরেটগুলো তোমার মানসিক ও চরিত্র গড়নের নির্মাতা’। তাই সিরিয়ালের বিজ্ঞাপনের প্রতিবাদী ভাষা, F… the system, F…the street, F…the society. শুধু অদৃশ্য ঈশ্বরের সন্ধান নয়, সমাজের অভ্যন্তরে অন্ধকারে থাকা মানুষগুলোকেও খুঁজে খুঁজে বের করে এই এলিয়ট, তারপর তাদের পুলিশে ধরিয়ে দেয়। কফিশপের একজন মালিককে বের করা হয় তার কম্পিউটার হ্যাকের মধ্যে দিয়ে, যিনি কফিশপ চালানোর পাশাপাশি শিশুদের পর্ণোগ্রাফি নির্মাণ করেন। তারপর একজন মদ ব্যবসায়িকে খুঁজে বের করা হয়, যিনি কোনো অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত না থাকলেও নারীদের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক রাখে। এভাবেই একসময় তার সঙ্গে সাক্ষাত ঘটে টাইরেল ওয়ালিক, মি.রোবট, শায়লা ইত্যাদি নানা চরিত্রের সঙ্গে, সিরিয়ালের কাহিনী এগিয়ে যায়। তবে প্রশ্ন হলো, কাহিনীর সঠিক গন্তব্যে কতটুকু এই সিরিয়াল পৌঁছাতে পারবে ?

চলমান সময়ের তথ্য প্রযুক্তি পৃথিবীকে এক নতুন বিশ্বের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তথ্য এখন আর গোপন রাখা যাচ্ছেনা। এমনকি রাষ্ট্রের সমস্ত গোপন তথ্যও ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। তথ্য যত উন্মুক্ত হবে মানুষ আরো সচেতন হয়ে উঠবে। তাকে ঠকানো বা ঠেকানো কোনোটাই করা যাবেনা। শিল্পসাহিত্য গড়ে তোলা হয়, অসচেতন মানুষকে সচেতন করার প্রয়োজনীয়তা থেকে। তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়ন এক নতুন ধরণের উন্নয়ের ইশারা দিচ্ছে আমাদের। ইন্টারনেট এই সময়ের সব থেকে এক বিস্ময়কর আবিষ্কার। ধারাবাহিকে ওয়ালস্ট্রিট দখল, ব্র্যাডলি ম্যানিং থেকে শুরু করে সমাজে গড়ে ওঠা অসাম্যাবস্থা, পত্রিকার শিরোনাম ইত্যাদি প্রতীকী ভাবে উপস্থাপন করে এটাই বোঝানো হয়েছে যে, যা মূল মিডিয়াতে ছাপা বা দেখানো হয়, বাস্তবের সঙ্গে তার কতটুকু সত্যতা বা অসত্যতার খোঁজ জনগণের কাছে পৌঁছায়। যে গণতন্ত্রের কথা বলা হয়, তার বাস্তবতা কতটুকু বিদ্যমান বিভিন্ন সমাজ ব্যবস্থায়। সঠিক সময়ে সঠিক ধারাবাহিক বেছে নিয়েছেন লেখকপরিচালক স্যাম ইসমাইল। ক্রিস্টিন শফেল্ট এবং ডেভিড ওয়ালশকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে ইসমাইল বলেন,‘ মিশরে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ‘আরব বসন্ত’ এই ধারাবাহিকটি লিখতে আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে। এলিয়টের চরিত্র একটা বিপ্লবী চরিত্র। যে যুবকের সঙ্গে পরিচয় আছে আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির। এসব যুবক বর্তমান অনঢ় সমাজব্যবস্থাকে নাড়া দিয়ে যেতে পারবে ইন্টারনেট ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে’। খুব যে অবাস্তব কথা ইসমাইল বলেছেন, তা বলা যায়না। ইন্টারনেটের ছোট জানালা দিয়ে বড় এই বিশ্বটা আজ মানুষের নাগালের মধ্যে চলে এসেছে। বুদ্ধিমান আর সচেতন মানুষেরাই পারবে তার সঠিক ব্যবহার করতে। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামের পুরো ফরম্যাটটাই পরিবর্তন করে দিয়েছে এই ইন্টারনেট এবং তথ্য প্রযুক্তি। এই অধিকার আদায়ের সংগ্রাম অতীতে যে পদ্ধতিতে করা হতো, তা এখন অচল। নতুন এই পদ্ধতির সঠিক ব্যবহারের উপরই নির্ভর করছে মানুষ তার অধিকার আদায়ের সংগ্রামে কতটুকু সফল হতে পারবে। নি:সন্দেহে সিরিলাটি নতুন এক আলোর দিশা খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে। তবে তা নির্ভর করছে, মি.রোবটের পরবর্তী এপিসোডগুলো কোনদিকে নিয়ে যায় তার উপর।।