Home » অর্থনীতি » তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (চতুর্দশ পর্ব)

তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (চতুর্দশ পর্ব)

কমিশনের অর্থের কৃষ্ণগহ্বর

অস্ত্র ব্যবসার সাথে তেল সম্পদের অর্থের একটি গভীর সখ্যতা রয়েছে। একটি অপরটিকে টিকিয়ে রাখে। আর পরস্পরের ঘনিষ্ঠ দুই ব্যবসার কুশীলবরা। এই ব্যবসার নেপথ্যে রয়েছে ঘুষ, অর্থ কেলেঙ্কারিসহ নানা ভয়ঙ্কর সব ঘটনাবলী। এরই একটি খণ্ডচিত্র প্রকাশ করা হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। প্রভাবশালী দ্য গার্ডিয়ানএর প্রখ্যাত দুই সাংবাদিক ডেভিড লে এবং রাব ইভানসএর প্রতিবেদন প্রকাশের পরে এ নিয়ে বিস্তর আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। এ সংখ্যায় ওই প্রতিবেদনের বাংলা অনুবাদের (চতুর্দশ পর্ব) প্রকাশিত হলো। অনুবাদ : জগলুল ফারুক

চুক্তিটি যখন ১৯৯৯ সালে কার্যকর হলো তখন বিএই নতুন এক গোপনীয়তার আশ্রয় নেয়া শুরু করলো। যুক্তরাজ্যে রেজিস্ট্রিকৃত সংস্থাটির নভেলমাইট শাখা আনুষ্ঠানিকভাবেই বন্ধ করে দেয়া হলো। কিন্তু বিদেশী কোম্পানী হিসেবে গোপনে এটিকে আবারও রেজিস্ট্রি দেয়া হয় এবং এটি ক্যারিবীয় অঞ্চলের বৃটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে একটি আর্থিক ‘কৃষ্ণগহ্বর’ হিসেবে কাজ করতে থাকে। এখানে গোপনে অনেকের অর্থই গচ্ছিত রাখার ব্যবস্থা ছিল। ফলে এরপর থেকে কাগজেকলমে বিএই এবং নভেলমাইটের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আবিষ্কারের আর সুযোগ থাকলো না।

কোম্পানীটির চুক্তি সংক্রান্ত যাবতীয় কাগজপত্র সুইস আইনজীবী রেনেমার্কট এবং সিরিল এবেকাসিস দেখাশোনা করতেন। আইনজীবীরা বিদেশেও এর অনুরূপ কিছু কোম্পানী খুলেছিলেন যাতে সেগুলোর মাধ্যমে কোম্পানীর এজেন্টরা তাদের পাওনা অর্থ পেতে পারে। কখনো কখনো সুইস কোনো একাউন্টেও তাদের অর্থ জমা হতো। চুক্তিপত্র স্বাক্ষর কিংবা নবায়নের জন্য প্রস্তুত হলে ডিকসন কিংবা এলড্রিজ জেনেভায় উড়ে আসেন এবং চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য রুট দ্যু একেসিয়ামের অফিসটিও খুলে দেন। চুক্তিপত্রটি জেনেভাতেই রক্ষিত ছিল এবং সেটি পরিদর্শন করতে হলে সেখানেই যেতে হতো।

এমন একটি পেচানো প্রক্রিয়ার আশ্রয় নেয়ার উদ্দেশ্য ছিল সবাইকে বুঝিয়ে দেয়া যে, যুক্তরাজ্যের আইনি কাঠামোর আওতার মধ্যে এজেন্ট নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে ওই সব এজেন্টদের কাছে নগদ অর্থ পৌছে দেয়ার জন্য বিএইকে আবারও একটি গোপন লেনদেন পদ্ধতির আশ্রয় নিতে হলো। বিএই বিদেশে স্থাপিত। কোম্পানীগুলোকে আবারও কাজে লাগাতে শুরু করলে। ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে রেড ডায়মন্ড ট্রেডিং লিমিটেডকে বেনামে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে সচল করা হলো। এটি লন্ডন, সুইজারল্যান্ড এবং নিউইয়র্কস্থ রেড ডায়মন্ড একাউন্টসমূহের মাধ্যমে সারাবিশ্বে কমিশনের অর্থ লেনদেন করতে থাকলো। প্রতিবেদকরা দক্ষিণ আমেরিকা, তাঞ্জানিয়া, রুমানিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকাা, কাতার, চিলি এবং চেক প্রজাতন্ত্রে গোপন লেনদেনের সন্ধান পান।

যুক্তরাজ্যের যেসব লোক বিএই’র পরামর্শক হিসেবে কাজ করছিলেন তাদের পাওনাও রেড ডায়মন্ডের মাধ্যমেই পরিশোধ করা হতো। এসব পরামর্শকের একজন ছিলেন ডেভিড হার্ট। তিনি আশির দশকে কয়লা খনিতে ধর্মঘট চলাকালে থ্যাচারকে বুদ্ধি পরামর্শ দিয়েছিলেন। বিএই’র প্রকাশিত কোম্পানী অ্যাকাউন্টে রেড ডায়মন্ডের অস্তিত্ব কখনো প্রদর্শন করেনি এবং এমন একটি প্রতিষ্ঠান কেন চালু করা হয়েছিল সে সংক্রান্ত কোনো ব্যাখ্যাও কোনোদিন হাজির করেনি। বিএই’র ব্রিটিশ ব্যাংক লয়েড টিএসবি মুদ্রা পাচারে বড় একটি ভূমিকা পালন করছিল। তবে আবারও বলছিল, এ কাজটি বেআইনি না হলেও বিস্ময়কর। লয়েডের অনলাইন সফটওয়্যারের সাহায্যে এমন একটি পদ্ধতি স্থাপন করা হয়েছিল যা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই রেড ডায়মন্ডের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিএই’র নগদ অর্থ চূড়ান্ত গন্তব্যসমূহে পৌছে দিত।

পরের বছর বিএই কেবল সৌদি আল ইয়ামামাহ চুক্তির কমিশনের অর্থ লেনদেনের জন্যই নতুন আরেকটি কোম্পানী খোলে। পজিডন ট্রেডিং ইভেস্টমেন্টস লিমিটেড নামে এই কোম্পানীটি ১৯৯৯ সালের ২৫ জুন তারিখ থেকে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে যাত্রা শুরু করে। কোম্পানীটির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, এর অ্যাকাউন্টসমূহের মাধ্যমে লয়েডস টিএসবি সৌদি এজেন্টদের কাছে ১০০ কোটি পাউন্ডেরও অধিক অর্থ প্রেরণ করে। যে সব সৌদি কর্মকর্তা অবকাশ যাপনের জন্য ইউরোপ কিংবা যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে যেতেন তাদের পেছনে ব্যয়িত অবৈধ অর্থ লুকিয়ে রাখার জন্য ভিন্ন একটি পথও অনুসরণ করা হতো। এসব অর্থ বিএই’র থোক তহবিল জমা থাকতো।

সৌদি বিমান বাহিনী প্রধান যুবরাজ তুর্কি বিন নাসের যখন তার আত্মীয়স্বজন ও সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে ভ্রমণে বের হতেন তখন বিএই তাদের সীমাহীন কেনাকাটার জন্য অঢেল অর্থের বরাদ্দ রাখতো। তাছাড়া তাদের জন্য বিমানের টিকেট এবং বিনামূল্যে অবকাশ যাপনেরও ব্যবস্থা করা হতো। বছরের পর বছর ধরে তারা দেদারসে খরচ করে যেতেন যার পরিমাণ দাড়িয়েছিল ৬০ মিলিয়ন পাউন্ড। তবে বিএই নিজে সরাসরি কোনো বিলের অর্থ পরিশোধ করতো না। তারা বিল পরিশোধে দুটি ট্র্যাভেল কোম্পানীকে তাদের এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার করতো। কোম্পানী দুটি হলো রবার্ট লি ইন্টারন্যাশনাল এবং ট্র্যাভেলার্স ওয়ার্ল্ড।

ট্র্যাভেলার্স ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পিটার গার্ডিনার দেখিয়েছেন বিএই’র নির্বাহীরা কীভাবে অস্বচ্ছ ইনভয়েস দেখাত। এটি তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবেই করতো। বিলের মধ্যে তারা কেবল ‘থাকা ও আনুষঙ্গিক সেবা’ কথাটি লিখে দিত। বিএই’র অর্থ পাচার কেবল অল্প সময়ের জন্যই ফুলেফেপে উঠেছিল। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্র নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংস করে দেয় এ সময় যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থ লেনদেনের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু করে দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপে যুক্তরাজ্যও মুদ্রা পাচারের ওপর বিধিনিষেধের কড়াকড়ি আরোপ করতে বাধ্য হয়।

২০০২ সালে প্রণীত এমনই একটি আইনের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য বিদেশে ঘুষ প্রদানকে অপরাধী কর্মকাণ্ড হিসেবে ঘোষণা দেয়। বিদেশে সংঘটিত দুর্নীতির ঘটনাকেও এই আইনের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের কর্তৃত্বাধীনে নিয়ে আসা হয়। এ ঘটনার পর বিএইকে নতুন সংকট মোকাবেলা করতে হয়। তবে নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর আস্থাশীল কোম্পানীটি শেষ পর্যন্ত পুলিশের সাথে বেশ সফলভাবেই একটি দফারফায় পৌছতে সক্ষম হয়।।

(চলবে…)