Home » অর্থনীতি » ফুলবাড়ী দিবস :: দেশীয় সম্পদ রক্ষা

ফুলবাড়ী দিবস :: দেশীয় সম্পদ রক্ষা

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

Last 4২৬ আগষ্ট ফুলবাড়ী গণঅভ্যুত্থানের নবম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ২০০৬ সালের এইদিনে পানিসম্পদ, আবাদী জমি ও মানুষ বিনাশী ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পের বিরুদ্ধে বাঙালি আদিবাসী নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধসহ সকল মানুষের ধারাবাহিক প্রতিবাদ বিশাল আকার নিয়েছিলো। এই প্রকল্প অনুযায়ী ফুলবাড়ী সহ ছয় থানায় হাজার হাজার মানুষ উচ্ছেদ করে, আবাদী জমি, ভূগর্ভস্থ ও নদীনালার পানি বিনাশ করে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের আয়োজন করেছিলো অনভিজ্ঞ কোম্পানি এশিয়া এনার্জি। প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী মাত্র ৬ শতাংশ রয়্যালটির বিনিময়ে কোম্পানি পুরো খনির মালিকানা তারা পেয়ে যেতো এবং শতকরা ৮০ ভাগ বিদেশে রফতানির মাধ্যমে নিজেরা বিপুল মুনাফা লাভ করতো। বাংলাদেশ হারাতো আবাদী জমি, বিনষ্ট হতো অমূল্য পানি সম্পদ, লক্ষ লক্ষ মানুষ উচ্ছেদ হতেন জীবিকা ও সমাজ থেকে, আবার হারাতো কয়লা সম্পদও। এই কোম্পানিকে বহিষ্কার ও বিধ্বংসী এই প্রকল্প বাতিলের দাবিতে লক্ষ মানুষের সমাবেশে সরকারি বাহিনী টিয়ার গ্যাস ছোড়ে, গুলি চালায়। সাথে সাথে তিনজন তরুণ নিহত হন, গুলিবিদ্ধসহ আহত হন দুই শতাধিক। এরপর পুরো অঞ্চলের নারীপুরুষেরা গণঅভ্যুত্থানের এক অসাধারণ পর্ব তৈরি করেন, সারাদেশে তা ছড়িয়ে পড়ে।

ঘটনার শুরু ২১ বছর আগে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কয়লা কোম্পানি অস্ট্রেলিয়ার বিএইচপি বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে ফুলবাড়ীতে কয়লা সম্পদ অনুসন্ধানের লাইসেন্স সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করে ১৯৯৪ সালের ২০ আগষ্ট। একপর্যায়ে ফুলবাড়ীতে সমৃদ্ধ কয়লা খনির অস্তিত্ব সম্পর্কে তারা নিশ্চিত হয়। ১৯৯৭ সালে, রহস্যজনকভাবে গঠিত সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ নতুন এই কোম্পানি এশিয়া এনার্জির হাতে বিএইচপি তার লাইসেন্স হস্তান্তর করে বাংলাদেশ ত্যাগ করে। দুটো প্রশ্ন এখানে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, কেনো এরকম সমৃদ্ধ খনির অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও কয়লা খনি সম্পর্কে অভিজ্ঞ বিএইচপি বড় ব্যবসার সুযোগ থেকে নিজেদের বঞ্চিত করলো? দ্বিতীয়ত, কারা ঠিক ঐসময়েই ফুলবাড়ী কয়লা খনি লক্ষ্য করে একটি নতুন কোম্পানি খুললো? কেনো বিএইচপি তার হাতেই নিজের লাইসেন্স হস্তান্তর করলো? সরকারই বা কেনো এটা অনুমোদন করলো?

প্রথম প্রশ্নটির স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায় অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশি ভুতত্ত্ববিদ নজরুল ইসলামের কাছ থেকে, যিনি বিএইচপির কনসালট্যান্ট জিওলজিস্ট হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। বাংলাদেশে এই কোম্পানির আসার ব্যাপারে যিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করেছিলেন। ২০০৮ সালের জুন মাসে সিডনীতে তিনি বলেন, ‘উন্নয়নের কথা ভেবেই বিএইচপিকে নিয়ে গিয়েছিলাম দেশে। কিন্তু এখন এশিয়া এনার্জির প্রকল্প দেখে আমি আতংকিত। এটা যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশের সর্বনাশ হবে এবং আমি নিজেকে কোনদিন ক্ষমা করতে পারবো না’। কেনো বিএইচপি চলে গেলো সেটা তিনি খুব ভালো করেই জানেন, এনিয়ে তিনি লিখেছেনও।

নজরুল ইসলামের বক্তব্যের সারকথা হল, ‘উন্মুক্ত খনি বিএইচপির জন্য নিশ্চয়ই অনেক লাভজনক হতো। কিন্তু তার জন্য যে গভীরতায় কয়লা স্তর থাকা দরকার ফুলবাড়ীর কয়লা তার চাইতে অনেক গভীরে, ১৫০ থেকে ২৬০ মিটার। বিএইচপি খুব ভালো করেই জানতো, এরকম গভীরতায় উন্মুক্ত খনি করতে গেলে ভূতাত্ত্বিক ও কারিগরী সমস্যা মোকাবিলা ছাড়াও বহুমাত্রিক দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। অসংখ্য নদীনালা খালবিল, মৌসুমী ভারী বৃষ্টি, বন্যাপ্রবণ এই অঞ্চলে অস্ট্রেলীয় মান তো দূরের কথা যেকোন দেশের বিধি রক্ষা করে উন্মুক্ত খনি পরিচালনা সম্ভব হবে না। তাছাড়া বিএইচপি চায়নি পাপুয়া নিউগিনির ওকটেডি কপার খনির মতো আরেকটি ভয়াবহ বিপর্যয়ের দায় নিতে, যেখানে খনির বিষাক্ত পানি নিকটবর্তী নদীতে ভয়াবহ দূষণের সৃষ্টি করেছিল এবং নীচের বিশাল অঞ্চল ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। বিএইচপিকে অল্পদিন পরেই প্রকল্প বাতিল করে ফিরে আসতে হয়েছিল এবং বিপুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছিল। বাংলাদেশের পানির আধার ও অন্যসব কিছু মিলে পরিস্থিতি আরও অনেক জটিল।’ বিএইচপি তাই বুঝেশুনে আগেভাগেই বাংলাদেশ ত্যাগ করেছিল।

তবে দ্বিতীয় প্রশ্ন ও রহস্যের কিনারা আজও হয়নি। বিএইচপির মতো অভিজ্ঞ সংস্থা যা সাহস করেনি, তা করবার কথা বলে নতুন একটি কোম্পানি কীভাবে লাইসেন্স পেয়ে গেলো? পরিবেশগত সমীক্ষা করবার আগেই তারা ছাড়পত্রও পেল! পরে তাদের করা সমীক্ষা আর পুনর্বাসন পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন স্বাধীন আন্তর্জাতিক খনি বিশেষজ্ঞ রজার মুডি ও পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞ জেনিফার কেলাফাত। অসঙ্গতি, অস্বচ্ছতা আর প্রতারণার দৃষ্টান্ত তাঁরা হাজির করেছেন পাতায় পাতায় (২০০৮)। এর আগে এশিয়া এনার্জি জমাকৃত ‘খনি উন্নয়ন পরিকল্পনা’ পরীক্ষা করে মতামত দেবার জন্য সরকার বুয়েটের অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলামকে প্রধান করে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেন। কমিটি তাঁদের রিপোর্টে এই প্রকল্প অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও আইনগত বিবেচনায় অগ্রহণযোগ্য বলে সিদ্ধান্ত দেন (বিশেষজ্ঞ কমিটির রিপোর্ট, সেপ্টেম্বর ২০০৬)। পরবর্তী সময়ে পাটোয়ারী কমিটি (২০০৭) ও মোশাররফ কমিটি (২০১১১২)ও এই প্রকল্পের বিরুদ্ধেই মত দিয়েছে। কিন্তু কোনো সরকারই এবিষয়ে আর কোন সিদ্ধান্ত জানায়নি। অন্যদিকে নানারকম গোপন, অস্বচ্ছ ও দুর্নীতিমূলক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

ঘটনাবলী যেভাবে অগ্রসর হচ্ছিলো তাতে জনগণ যদি নিষ্ক্রিয় থাকতেন, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়ে ফুলবাড়ী ও বড়পুকুরিয়া দুক্ষেত্রেই উন্মুক্ত খনি হতো। এমনিতেই উত্তরবঙ্গের বহুস্থানে এখন পানির সংকট, এতদিনে তা হাহাকার পর্যায়ে যেতো। বহু নদীনালা খালবিলের দশা বুড়িগঙ্গার চাইতে ভয়াবহ হতো। খনি ও পাশ্ববর্তী অঞ্চলের আবাদী জমি নষ্ট ও অনাবাদী হবার কারণে খাদ্য উৎপাদনে ভয়াবহ নিম্নগতি সৃষ্টি হতো। জীবিকা ও ঘরবাড়ি হারিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ নতুন করে ঢাকার রাস্তায় আশ্রয় নিতেন।

এসব ধ্বংসযজ্ঞের কথা জেনেও অনেকে বাগবিস্তার করতে পারেন, ‘আমরা তো কয়লা পাচ্ছিলাম, আমাদের বিদ্যুৎ দরকার!!’ না, পরিকল্পনা যা ছিল তাতে কয়লা সম্পদও পাওয়া যেতো না। কারণ বাংলাদেশ শুধু ৬ ভাগ রয়ালটি পেতো, তাও রেলওয়ে উন্নয়ন করে এই কয়লা রফতানির ব্যবস্থা করতে সেখান থেকেই ব্যয় করতে হতো। কয়লা রফতানির আয় পুরোটাই, মালিকানা ও শর্তের কারণে, কোম্পানির বিদেশি কোন একাউন্টে জমা হতো। শতকরা ৮০ ভাগ রফতানির পর বাকিটা আন্তর্জাতিক দামে কিনতে হতো। আবাদী জমি, মাটির ওপরের ও নীচের পানি সম্পদ, বসতভিটা সবকিছু ধ্বংস করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে উদ্বাস্তু করে, উত্তরবঙ্গকে অনুর্বর বিরানভূমিতে পরিণত করে, দেশের কয়লা সম্পদ দ্রুত বিদেশে পাচারের এই প্রকল্পই ‘উন্নয়ন’ নামে চালু করবার চেষ্টা হয়েছিল। আমাদের ভয়াবহ সর্বনাশের হাত থেকে রক্ষা করেছেন মানুষ, তাদের জীবন দিয়ে।

এরই এক পর্যায়ে ৩০ আগষ্ট ২০০৬ চারদলীয় জোট সরকার জনগণের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। সারাদেশে উন্মুক্ত খনি নিষিদ্ধ ও এশিয়া এনার্জি বহিষ্কারের ধারাসহ এই চুক্তি ‘ফুলবাড়ী চুক্তি’ হিসেবে খ্যাত। ৪ সেপ্টেম্বর ২০০৬ ফুলবাড়ীসহ ৬ থানার মানুষদের অভিনন্দন জানিয়ে ফুলবাড়ী চুক্তির প্রতি পূর্ণ সংহতি জানান তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ক্ষমতায় গেলে এই চুক্তি বাস্তবায়ন করার অঙ্গীকার করেছিলেনও। চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিএনপি এবং প্রকাশ্য অঙ্গীকারের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ এই চুক্তি বাস্তবায়নে দায়বদ্ধ। সেই ফুলবাড়ী চুক্তি বাস্তবায়ন এখন তাই রাষ্ট্রের দায়। এর অন্যথা করার কোনো পথ নাই।

কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের দুই মেয়াদে সাত বছর পার হলেও এখনও সেই চুক্তির মূলধারাগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। কোন বৈধ অনুমোদন না পেলেও ফুলবাড়ীর কয়লা খনির ওপর লন্ডনে এখনও বেআইনীভাবে শেয়ার ব্যবসা করছে এশিয়া এনার্জি (জিসিএম)। শেয়ার ব্যবসার মুনাফার একাংশ ছড়িয়ে দেশে নানা ধরনের দালাল তৈরি করা হয়েছে। বড়পুকুরিয়ায় উন্মুক্ত খনি নিয়ে অতিতৎপরতা, পত্রপত্রিকা ও টিভিতে এর সপক্ষে মিথ্যাচার ও অপপ্রচার এই জালেরই অংশ। চক্রান্ত চলছে, কিন্তু জনপ্রতিরোধও জারি আছে। এবারের ফুলবাড়ী দিবসের মূল শ্লোগান তাই, ‘শহীদের খুনে রাঙা পথে দালাল বেঈমানের ঠাঁই নাই।’

জাতীয় সম্পদের ওপর শতভাগ জাতীয় মালিকানা, খনিজসম্পদ রফতানি নিষিদ্ধ করে শতভাগ দেশের কাজে লাগানো এবং জাতীয় সক্ষমতা বিকাশের জন্য সামগ্রিক উদ্যোগই কেবল জনস্বার্থে দেশের সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে। ফুলবাড়ী চুক্তি বাস্তবায়ন করে দেশি বিদেশি লুটেরা ও দালার প্রতিহত করে জনস্বার্থে উন্নয়নের পক্ষে জনগণের শক্তি জোরদার এই পথে অগ্রসর হতে হবে।।