Home » অর্থনীতি » বাড়ছে রিজার্ভ বাড়ছে বিপদ

বাড়ছে রিজার্ভ বাড়ছে বিপদ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

Dis 5দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি নিয়ে বেশ আনন্দউল্লাস হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে বিনিয়োগ মন্দাসহ বেশকিছু কারণ রয়েছে এই রিজার্ভ বৃদ্ধির নেপথ্যে। গ্যাসবিদ্যুৎ সমস্যা, ব্যাংক ঋণে সুদের হার চড়া হওয়ায় বিনিয়োগ ক্রমাগত কমছে। আর বিনিয়োগ না হওয়ায় মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিও কমে যাচ্ছে। এতে আমদানি খরচ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়লেও তা দেশের জন্য তেমন উপকারে আসছে না, প্রবৃদ্ধি বাড়ছে না। বৈদেশিক মুদ্রা উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার না হওয়ায় তা মূল্যস্ফীতিকেও অনেকাংশে উস্কে দিচ্ছে বলে তাদের অভিমত। নিয়ম অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার একটা বড় অংশ অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবাহ আকারে বাজারে ছাড়া হয় যা উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু দেশে যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে তা কোন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে না। আর অলসভাবে এই টাকা পড়ে থাকায় ‘টাইম ভ্যালু অব মানি’র কারণে এক সময় এ অর্থের পরিমাণ কমে যাবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এজন্য এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে এ রিজার্ভকে কিভাবে উৎপাদনশীল খাতে কাজে লাগানো যায়।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে একের পর এক নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। দেশের ইতিহাসে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ প্রথমবারের মতো ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান রিজার্ভ সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। রফতানি আয় বৃদ্ধি ও রেমিট্যান্স প্রবাহের ইতিবাচক ধারা, বিদেশ থেকে কর্পোরেট ঋণ গ্রহণ এবং আমদানি ব্যয় কম হওয়ায় রিজার্ভ বৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে। এ রিজার্ভ পাকিস্তানের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ, যা দিয়ে ৭ মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। তবে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) পরবর্তী আমদানি বিল পরিশোধের পর রিজার্ভের পরিমাণ কিছুটা কমে যেতে পারে। এর আগে, গত ২৫ জুন রিজার্ভ ২৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো প্রতি মাসে রিজার্ভের স্ফীতি ঘটলেও বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ছে না কেন?

বেসরকারি খাতের বিনিয়োগই মূল বিনিয়োগ হিসাবে ধরা হয়। কিন্তু বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২১ সালে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হয়নি। আর পঞ্চবার্ষিকী (২০১১১৪) পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রা থেকেও বিনিয়োগ অনেকখানি পিছনে রয়েছে। এরমধ্যে বিদেশি বিনিয়োগও আশানুরূপ হয়নি। এজন্য স্বয়ং অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে না পারা আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা’। বিগত এক যুগে দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ ভালো ছিল। গত বছরে এক দশমিক এক বিলিয়ন বিনিয়োগ হয়েছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এটি আশানুরূপ নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনার কারণে বিনিয়োগকারীরা অনেক ক্ষেত্রে পিছু হটছেন। তারা বলছেন, শেয়ারবাজার কারসাজি, হলমার্ক কেলেংকারি, সরকারি কাজে ব্যাংক ঋণের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে অনেক বিনিয়োগ উপযোগী মূলধন বিনিয়োগের বাইরে থেকে গেছে। বিনিয়োগের অন্যতম নিদর্শন মূলধনী যন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে, আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলার হার ক্রমেই কমছে। একই সঙ্গে যে পরিমাণ এলসি খোলা হচ্ছে তার সবগুলো নিষ্পত্তিও হচ্ছে না। এতে দেশে নিত্যপণ্যসহ মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানিও কমে যাচ্ছে। এলসি খুলতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অনাগ্রহ প্রকাশ, কিছু ক্ষেত্রে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা কম থাকা এবং সর্বোপরি বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে পরিস্থিতি এমন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাসবিদ্যুৎ সঙ্কট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির পরও ব্যবসায়ীরা কোনমতে ব্যবসা পরিচালনা করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকের উচ্চ সুদহারের সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার্বিকভাবে এসব কারণে নতুন করে বিনিয়োগের জন্য উদ্যোক্তারা উৎসাহিত হচ্ছেন না। চলতি বছরের প্রথম দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব ধরনের ব্যাংক ঋণে সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা (ক্যাপ) প্রত্যাহার করে নেয়। ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন মহলের দাবির মুখে পরে এক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সেখানে ব্যাংকের ঋণ ও আমানতে সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) নিম্নতর এক অংক তথা ৫ শতাংশীয় পয়েন্টে সীমিত রাখতে বলা হয়। কিন্তু বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সে নির্দেশনা না মেনে নানা অযুহাতে শিল্পাদ্যোক্তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত সুদ আদায় করছে।

রেমিট্যান্স প্রবাহে এখন নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি চলছে। এসব দিক বিচেনায় বলা যায়, শুধুমাত্র এ দুটি কারণেই রিজার্ভ বাড়েনি। এর পেছনে অনেকগুল নেতিবাচক কারণ রয়েছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। এর মধ্যে প্রধান কারণ হলো বিনিয়োগ কমে যাওয়া। গত কয়েক মাসে দেশিবিদেশি বিনিয়োগ কমে গেছে। এর ফলে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি কমেছে। বিনিয়োগ কমার পেছনে রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি ব্যাংক ব্যবস্থার জটিলতা, অবকাঠামো উন্নয়ন না হওয়া, গ্যাসবিদ্যুতের পর্যাপ্ততার অভাবকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, দেশে সাময়িক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসলেও একটি এক তরফা নির্বাচনের পরে এ স্থিতিশীলতাকে দীর্ঘমেয়াদি ভাবতে পারছেন না উদ্যোক্তারা। ফলে তারা এখনো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে ভরসা পাচ্ছেন না। এছাড়া হলমার্কসহ নানা ব্যাংক কেলেঙ্কারির কারণে এখনো উদ্যোক্তাদের ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছেন না ব্যাংকাররা। ফলে ব্যাংক থেকে ঋণ পাচ্ছেন না অনেক উদ্যোক্তা। আবার অনেক বড় উদ্যোক্তাকে বিদেশি ব্যাংক থেকে কম সুদে ঋণ নেয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। এতে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবেশ বাড়ছে। ব্যাংকের উচ্চ সুদের কারণে নতুন উদ্যোক্তাও কম তৈরি হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অলস অর্থ ফেলে রেখে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলা কোন বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এক্ষেত্রে নতুন উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে উৎপাদন বাড়াতে দৃষ্টি দিতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা সরকার। এছাড়া নতুন নতুন প্রযুক্তি আমদানি বাড়ানো, দক্ষ জনবল তৈরি করা, দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন, তেলগ্যাস ও কয়লা উত্তোলনের জন্য দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরকার বিনিয়োগ করতে পারে। পাশাপাশি দেশিবিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। এতে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের দ্বিধাগ্রস্থতা কেটে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশে আমদানি বাড়ানোর তুলনায় রফতানি প্রবৃদ্ধি কম হওয়ার কারণে বাণিজ্য ঘাটতি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমদানিচাহিদা নিয়ন্ত্রণের জন্য বাজার থেকে তুলে নিচ্ছে টাকা। মূল্যস্ফীতির চাপ ঠেকাতে টাকা তুলে নেয়ার যুক্তি দেখানো হলেও আসলে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমানোর জন্যই এ পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে মনে হয়। এ কারণে বিদ্যমান দুর্বল চাহিদা ও দুর্বল বিনিয়োগপরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটতে পারে। একই সাথে শিল্পায়ন ও নতুন কর্মসংস্থানের উন্নতির পরিবর্তে অবনতি ঘটবে। সার্বিকভাবে অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে দেখা যায়, সমাপ্ত অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় এক হাজার কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। ২০১৪১৫ অর্থবছরে পণ্যবাণিজ্যে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৯২ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৪৬ ভাগ বেশি। বিগত অর্থবছরে আমদানি বেড়েছে আগের বছরের চেয়ে ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ বেশি। এর বিপরীতে রফতানি বেড়েছে আগের অর্থবছরের চেয়ে ৩ দশমিক ৩৩ ভাগ বেশি। সেবা ও পণ্যবাণিজ্যের ঘাটতির কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যেও ১৬৫ কোটি ডলারের বড় ঘাটতি নিয়ে ২০১৪১৫ অর্থবছর শেষ হয়েছে। অথচ ২০১৩১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান এ সূচকে ১৪০ কোটি ২০ লাখ ডলার উদ্ধৃত্ত ছিল।

বাণিজ্যঘাটতি বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সার্বিক লেনদেনের ভারসাম্যেও ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক বিনিময় হার নিয়ে এত দিন যে স্থিতাবস্থা ছিল, তা পাল্টে যেতে পারে। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিলাসী পণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রা সঙ্কোচননীতি অবলম্বন করছে। এর অংশ হিসেবে তিন মাস যাবৎ একটানা বাজার থেকে উদ্বৃত্ত তহবিল তুলে নেয়া হচ্ছে। আট হাজার কোটি টাকা থেকে শুরু করে গত জুন মাস পর্যন্ত তা ১৪ হাজার কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। গত জুলাই মাসে তা আরো বাড়ানো হয়। গত জুলাই মাসে সর্বোচ্চ পরিমাণ টাকা তুলে নেয়া হয়। ১২ আগস্টে নেয়া হয় ১৪ হাজার ১০৭ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর অলস টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে নিয়ে আসতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোয়া ৫ শতাংশ হারে ব্যয় করে আসছে। গড়ে প্রতিদিন ২৫ লাখ টাকার সুদ গুনছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যয় বাড়ছে।

বাজারে টাকার সরবরাহ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো বিনিয়োগ স্থবিরতা। বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে বাজারে টাকার চাহিদা কমে যায়। আর টাকার চাহিদা কমে গেলে ব্যাংকগুলোর হাতে উদ্বৃত্ত তহবিল বা অলস অর্থ বেশি থাকে। এ কারণে ব্যাংকগুলো অনুৎপাদনশীল খাতে বিশেষ করে ভোক্তা ঋণ বেশি হারে বিতরণ করে। এর প্রভাব আমদানি বৃদ্ধির চিত্রে দেখা যায়।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনীতির মূল ভিত্তিকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে সূচকগুলোকে জোড়াতালি দিয়ে ঠিক রাখার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে, কিন্তু কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগ হচ্ছে না। গ্যাসবিদ্যুৎ সরবরাহ কখনো বন্ধ, কখনো নিয়ন্ত্রণ করার ফলে নতুন শিল্পায়নে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। চাঁদাবাজি আর রাজনৈতিক অস্থিরতা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটিয়েছে। দেশের অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য এই সার্বিক অবস্থার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থনীতির স্বাভাবিক চেহারা মলিন ও ম্লান হয়ে গেলে মেকআপ দিয়ে সেটাকে দীর্ঘ সময় আড়াল করার চেষ্টা করে কোনই লাভ হয় না।।