Home » বিশেষ নিবন্ধ » এতো উন্নয়ন হলে কেন জীবনবিনাশী পথে বিদেশ যাত্রা

এতো উন্নয়ন হলে কেন জীবনবিনাশী পথে বিদেশ যাত্রা

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

বাংলাদেশের আজকের অর্থনৈতিক অগ্রগতিপ্রবৃদ্ধি যাদের হাত ধরে এসেছে তারা কীভাবে বিদেশে পাড়ি দিয়েছে, তাদের সে অভিজ্ঞতা কখনোই আমরা জানতে চাইনি। সাম্প্রতিক সময়ে সাগরে একের পর এক নৌকা ডুবিতে বাংলাদেশী নিহত ও ইন্দোনেশিয়ামালয়েশিয়ার জঙ্গলে একাধিক কবর স্থানের সন্ধানের পর অভিবাসীদের কষ্টের কিছু গল্প আমরা জানতে পারছি, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এটি হিমশৈলের চূড়া মাত্র। বেশি অর্থের আশায় বাংলাদেশ ছাড়ছেন গরিব ও নিম্নবিত্ত জনগণ। ধনীরাও বিদেশ যাচ্ছেন তবে তা অবৈধ অর্থকে বৈধ করার জন্য। এক্ষেত্রে দরিদ্র্যদের অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন। একদিকে বৈধ পথে বিদেশ যাত্রা সম্ভব হচ্ছে না, অন্যদিকে দেশে চাকুরি নেই। ফলে বেঁচে থাকতেই তাদের বেছে নিতে হচ্ছে অবৈধ পথ। আর এতেই হারাতে হচ্ছে প্রাণ। দেখার কেউ নেই। সরকার শুধু মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি আর উন্নয়নের গল্প শুনিয়েই চলেছে। লক্ষ কোটি টাকার বাজেটও অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়া মানুষের গতি রোধ করতে পারছে না। প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কী এ উন্নয়ন শুধু ফাঁকা বুলি?

আসলে কি উন্নয়ন হয়নি? হয়েছে। এখন আমাদের মাথাপিছু গড় আয় ১১৫০ ডলার। আমাদের এ উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে রেমিট্যান্স এবং গার্মেন্ট শ্রমিকরা। কিন্তু এই উন্নয়নের সিংহ ভাগ যায় অল্পকিছু মানুষের পকেটে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে ২০১০ সালে ছিল ২৩ হাজার ২১২ জন কোটিপতি আর ২০১৪ সালে তা দাঁড়িয়েছিল ৫০ হাজারের বেশি। ২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী বিআরটিএতে নিবন্ধিত কোটি টাকার বা তার চেয়েও বেশি দামের গাড়ির সংখ্যা ৪৯ হাজার। কে বলবে যে বাংলাদেশ উন্নয়ন করেনি? অথচ আইএলওর হিসাব মতে, তিন কোটির বেশি মানুষ বেকার। ২০১৪ সালের হিসাব মতে দারিদ্র্যের হার ২৫.৬ শতাংশ। এটা অবশ্য সরকারী সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর রিপোর্ট।

সমুদ্রপথে এই যাত্রা হচ্ছে মরণ যাত্রা। সমুদ্রপথে নৌকায় যাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ তো বটেই, তার চেয়েও বড় বিপদ আসে দালাল চক্রের কাছ থেকে। প্রথমে ১০১৫ হাজার টাকায় মালয়েশিয়ায় গিয়ে চাকরি পাওয়া যাবে, এমন লোভ দেখিয়ে দালালরা চাকরি সন্ধানী ভাগ্যাহত মানুষদের নৌকায় তোলে। তারপর চাপ দিতে থাকে আরও টাকা দাও। বিভিন্ন পর্যায়ে টাকা দিতে দিতে পরিমাণটা কয়েক লাখে পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ায়। যারা টাকা দিতে পারে না, তাদের ওপর নির্যাতন চলে। কাউকে কাউকে সমুদ্রে ছুড়ে ফেলা হয়। কেউবা থাইল্যান্ডের জঙ্গলে বন্দীশিবিরে মৃত্যু বরণ করেন। এরা কয়েক হাটে কয়েক ঘাটে বিক্রি হয়। শেষ পর্যন্ত যারা বেঁচে থাকেন, তারা ক্রীতদাসের জীবনযাপন করতে বাধ্য হন।

আমাদের সরকারের কাছেই বা দালালের খপ্পরে পড়ে পাচার হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর জীবনের দাম কতটুকু? যখন মানব পাচারের ব্যাপারটি পৃথিবীব্যাপী জানাজানি হয়ে গেল, যখন শোনা গেল আট হাজার নরনারীশিশু সাগরে ভাসছে, কোন দেশ কূলে ভিড়তে দিচ্ছে না, তখন আমাদের সরকারের নির্বিকার চেহারা, কালক্ষেপণ ও ঢিলামি ছিল রীতিমতো অপরাধের মতো। বরং আমরা শুনলাম প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি। তিনি বললেন, পাচারকারী দালালদের সঙ্গে সঙ্গে অবৈধভাবে সমুদ্রপথে যাত্রাকারীদেরও শাস্তি দেয়া হবে। অবৈধভাবে যাওয়া অপরাধ তো বটে। সে জন্য শাস্তি যদি হয় তো হোক। কিন্তু এখন তো দরকার সবার আগে দ্রুততম গতিতে সাগরে ভাসমান এ মানুষগুলোকে উদ্ধার করা। এ পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া অভিবাসীদের কাছ থেকে যেসব করুণ ও নির্মম মানব বিপর্যয়ের কাহিনী শোনা গেছে, তাতে তো যে কোনো দায়িত্বশীল সরকারের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যাওয়ার কথা। বরং মনে হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার বেশ বিব্রত ও বিরক্ত। উন্নয়নের, সাফল্যের যে গল্প সারা দুনিয়াকে এবং দেশের জনগণকে শোনানো হচ্ছিল, তা যেন হঠাৎ করেই ফাঁকা প্রমাণ হলো।

আসলে কি দেশে কর্মসংস্থানের ও আয়রোজগারের সুযোগের অভাব নেই? সরকার ঘোষিত গার্মেন্ট খাতে নিম্নতম মজুরি মাসিক পাঁচ হাজার টাকার মতো। তাও বহু কারখানায় এই মজুরি দেওয়া হয় না। আসল কথা হলো বেকারত্ব আছে ভয়াবহ আকারে। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরোর রিপোর্ট অনুযায়ী শ্রমশক্তির মাত্র ১২.৫ শতাংশের মতো (অর্থাৎ এক কোটি ৩০ লাখ মানুষ) নির্দিষ্ট বেতনে কাজ করে। চার কোটি ৭৩ লাখ মানুষের কোনো নির্দিষ্ট আয় নেই। এর ৪০ শতাংশ পারিবারিক শ্রমে জড়িত। আইএলওর হিসাব মতে, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা অনেক বেশি।

বাংলাদেশের জাতীয় আয় বেড়েছে। সেটা প্রধানত মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত পরিশ্রম করা বাঙালি শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স ও অত্যন্ত কম মজুরিতে অমানুষিক পরিশ্রম করা গার্মেন্ট শ্রমিকদের দ্বারা অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার কারণে। এখন মাথাপিছু গড় আয় হচ্ছে বছরে এক হাজার ১৫০ ডলার। তবে এর দ্বারা কোনো পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যাবে না। এটা হলো গড় হিসাব। বাংলাদেশের যে আয় বেড়েছে তার প্রায় সবটাই ভোগ করে ওপরের ধনীরা। ধনীদরিদ্রের বৈষম্য বেড়েছে দারুণভাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভই বলে দিচ্ছে দেশে বিনিয়োগ হচ্ছে না, ফলে কর্মসংস্থানও হচ্ছে না।

নিচের তলান মানুষ দিশাহারা হয়েই বিদেশে চাকরির সন্ধানে ছুটে যায়। দালালরা প্রথমে বলে যে মাত্র ১০১৫ হাজার টাকায় মালয়েশিয়ায় চাকরি পাওয়া যাবে। পরে নৌকায় চড়িয়ে মাঝসাগরে এনে অথবা জঙ্গলে বন্দিশিবিরে রেখে অত্যাচার করে কয়েক লাখ টাকা আদায় করে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে এ কাজ হয়। এর জন্য কে দায়ী? প্রধানত দায়ী সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যা মানুষকে বেকার ও দরিদ্র করেছে; যা সেই মানুষগুলোকে অজানা অন্ধকারের পথে ঠেলে দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, দায়ী সেই দুর্বৃত্ত পাচারকারীরা, যারা নিশ্চিতভাবে প্রশাসনের কোনো না কোনো অংশের সহায়তা পেয়ে আসছে। কেন এ পরিস্থিতিরি সৃষ্টি হলো? প্রথমত. বলা যায় দেশে বৈধ কর্মসংস্থানের অভাব। দ্বিতীয়ত. বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সরকারের ভুলনীতি ও দুর্নীতি। তৃতীয়ত. দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির অভাব। চতুর্থ. সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তার অভাব। সরকার চাচ্ছে জিটুজি পদ্ধতিতে মানবসম্পদ রফতানি করতে। এতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতির কারণে মানবসম্পদ রফতানির কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পরে আছে। এটা বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সরকারের ভুলনীতি বলেও প্রতিয়মান হচ্ছে। তাছাড়া বলতে গেলে বাংলাদেশ এখনো বিশ্বের কোথাও দক্ষ মানবসম্পদ রফতানি করতে সক্ষম হয়নি। এ জন্য সরকারের সঠিক পরিকল্পনারও অভাব রয়েছে।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মারসারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টিতে পেছনের সারিতে রয়েছে। গত ১৩ মে প্রকাশিত ‘দ্য হিউম্যান ক্যাপিটাল রিপোর্ট ২০১৫’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টিতে ১শ’ ২৪ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৯তম। এছাড়া এশিয়াপ্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ২২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৭তম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলঙ্কা ও ভুটানের পরে রয়েছে বাংলাদেশর অবস্থান।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সূত্র ধরে বেসরকারি গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা অন্বেষণর শ্রম জরিপের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০০ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশে বার্ষিক বেকারত্ব বৃদ্ধির গড় হার ৫ দশমিক ২৯ শতাংশ। ২০০০ সালে দেশের বেকার মানুষের সংখ্যা ছিল ১৭ লাখ এবং ২০১০ সালে তা দাঁড়ায় ২৬ লাখে। একই হারে বেকারত্ব বৃদ্ধি পেলে চলতি বছর তথা ২০১৫ সালে তা ৩৩ লাখে উপনীত হতে পারে বলে সংস্থাটি জানায়। দেশে যে হারে বেকারত্ব রয়েছে সে তুলনায় অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থান যেমন বাড়ছে না, তেমনি বিদেশী শ্রমবাজারও গত কয়েক বছর ধরে সমপ্রসারিত হচ্ছে না। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ার মতো বাংলাদেশের বড় বিদেশী শ্রমবাজার ২০০৯ সাল থেকেই এক প্রকার বন্ধ। প্রায় চার বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৩ সাল থেকে সরকারিভাবে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো শুরু হলেও এ হার অতি নগণ্য। মালয়েশিয়ায় যেতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ডাটাবেজে ১৪ লাখ মানুষ রেজিস্ট্রেশন করলেও গত দুই বছরের বেশী সময়ে জি টু জি পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় গেছে মাত্র সাড়ে ৭ হাজারের মতো লোক। যদিও ওই সময় প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছিলেন, জি টু জি পদ্ধতিতে এক লাখ কর্মী মালয়েশিয়ায় যাবে। বাকী লাখ লাখ মানুষ মালয়েশিয়া বা অন্য কোনো দেশে যাওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে উদগ্রীব হয়ে আছেন। কিন্তু বৈধপথে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ তৈরী না হওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরপথে বিদেশে যাওয়ার হার বেড়েছে।

স্বাভাবিক, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ভালো মজুরির নিশ্চয়তাসহ বৈধ পন্থায় জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে আমাদের কোনো সরকারের সাফল্যের তেমন কোনো রেকর্ড নেই। বেসরকারি জনশক্তি রপ্তানি খাতে রয়েছে নানা রকমের অন্যায্য, প্রতারণামূলক প্রবণতা, যেটা নিয়ন্ত্রণের সামর্থ্যও কোনো সরকার দেখাতে পারেনি। কিন্তু এই ছোট্ট ভূখণ্ডের দেশটিতে জনসংখ্যার চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েই চলেছে। আমাদের সরকার সম্ভবত সেই চাপ অনুভব করতে পারে না, অতিরিক্ত জনসংখ্যাকে সরকার বোঝা মনে করে না, মনে করে সম্পদ, মূল্যবান ‘মানবসম্পদ’। কিন্তু এই মানবসম্পদের এই চাপ এমন অপ্রতিরোধ্য যে কর্মসংস্থানের খোঁজে মানুষের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা সম্ভবত কোনোভাবেই রোধ করা সম্ভব নয়। সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে শত শত মারা পড়া কিংবা গণকবর থেকে শত শত কংকাল উদ্ধার হওয়ার রোমহর্ষক খবরগুলোও সম্ভবত এ দেশের বেকার তরুণযুবকদের বিদেশে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা দমাতে পারবে না। কিন্তু তারা যেন স্বাভাবিক ও নিরাপদ পন্থায় যেতে পারে, সেই চেষ্টা করা সরকারের দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে সরকার এ পর্যন্ত মর্মান্তিকভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।।