Home » রাজনীতি » গণতন্ত্রই পারে বিপদের আশঙ্কা এড়াতে

গণতন্ত্রই পারে বিপদের আশঙ্কা এড়াতে

হায়দার আকবর খান রনো

Dis 1মাত্র কয়েকদিন আগেই দলের অভ্যন্তরীণ অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করার পর আবার সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম মুখ খুললেন। দলের নেতাকর্মীদের ‘খাই খাই’ ভাবকে সমালোচনা করে এটাকেই তিনি ’৭৫এর মহা বিপর্যয়ের কারণ হিসাবে উল্লেখ করেছিলেন গত ১১ আগস্ট। বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে চরম ব্যর্থতার কারণ তিনি খুজেছিলেন নিজ দলের তৎকালীন ক্রিয়াকর্ম ও ব্যর্থতার মধ্যে। এ সম্পর্কে দুই সপ্তাহ আগে আমি আমাদের বুধবারএ আলোচনা করেছিলাম। সেদিন তিনি বলেছিলেন, দ্বিতীয়বার ১৫ আগস্টের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে কি তার দল কি পারবে সেই রকম পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে? এই প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর তিনি দিতে পারেননি। নিজ দলের মধ্যে ‘খাই খাই’ ভাব, অন্তর্দ্বন্দ্ব ইত্যাদি যে পরিমাণে রয়েছে তাতে বরং তিনি দলের প্রস্তুতি সম্পর্কেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।

দু’সপ্তাহ আগের লেখা কলামে আমি বলেছিলাম, ‘নিশ্চিতভাবে আমরা কেউ চাই না দ্বিতীয়বার এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হোক। কিন্তু সৈয়দ আশরাফ যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সেটাকেও হালকাভাবে না দেখে আমরাও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠি’। আমি মনে করি ইতিহাসে একই ঘটনার ঠিক একই রকম পুনরাবৃত্তি হয় না। তবে সৈয়দ আশরাফ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। শুধু আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বা মন্ত্রী হিসেবেই নন, ব্যক্তি হিসাবেও তিনি আবেগের বশে কিছু বলে ফেলার মতো মানুষ নন। শাসক দলের বহু উচ্চ পদধারী ব্যক্তি আছেন, যারা অনেক আজে বাজে কথা বলে বেড়ান। সৈয়দ আশরাফ সেই দলে পড়েন না। তাই তার কথাকে গুরুত্ব দিয়েই বিবেচনা করতে হয়।

মাত্র সেদিন ২৬ আগস্ট তিনি আবার মুখ খুলেছেন। বলেছেন, ‘ভয়ংকর কিছু ঘটে যেতে পারে। ক্ষমতায় আছি বলেই নিরাপদ নই’। আগের কথার সাথে কিছুটা মিলও আছে। এর আগে তিনি বলেছিলেন, ‘৭৫এ তো আমাদের দলই ক্ষমতায় ছিল। আমরা কি রক্ষা করতে পেরেছিলাম’? ১১ আগস্ট তিনি প্রধানত নিজ দলের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে দায়ী করেছিলেন। ২৬ আগস্ট তিনি কিছুটা কৌশলী হয়ে খালেদা জিয়ার ঘাড়ে দোষ চাপাতে চেয়েছেন। বলেছেন, খালেদা জিয়া ষড়যন্ত্র করছেন।

আমার মনে হয়, বিএনপি বা খালেদা জিয়ার দিক থেকে খুব একটা বিপদের আশংকা এখন আর নেই। বিএনপি ২০১৫ সালের প্রথম কয়েকমাস যে অবরোধ আন্দোলন করেছিল এবং তার সাথে জামায়াতের যে সহিংসতা যুক্ত ছিল, তা শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারেনি। বরং লীগ সরকার চরম দমননীতি চালিয়ে বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে যথেষ্ট দুর্বল করতে সক্ষম হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে যেভাবে আক্রমণ করা হয়েছে, তা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সাথে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বিদ্যুৎগ্যাসের অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে সামান্য মানববন্ধন পর্যন্ত করতে দেয়া হয়নি। বিভিন্ন জায়গায় বিএনপির শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনকে পুলিশ ও আওয়ামী ক্যাডাররা বলপূর্বক ভেঙ্গে দিয়েছে।

এটা যে শুধু বিএনপির ক্ষেত্রেই হচ্ছে তা নয়। বিদ্যুৎগ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে সকল শ্রেণীর মানুষই বিক্ষুব্ধ। ঢাকা শহরের কয়েকটি জায়গাসহ বিভিন্ন জেলায় সিপিবিবাসদের পথসভার উপর চড়াও হয়েছে পুলিশ। বস্তুত এখন যা চলছে তা হলো, গণতন্ত্রহীন পুলিশি শাসন। বিরোধী দল বলে আর কাউকেই সহ্য করা হচ্ছে না। বস্তুত এই ধরনের একনায়কতন্ত্র রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি করে। হয়েছেও তাই।

শূন্যতা জিনিসটাও ভয়াবহ। রাস্তায় বা সংসদে যদি বৈধ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি না থাকতে পারে, তবে তা সুযোগ সন্ধানীদের সুযোগ নিতে সহায়তা করে। আশংকা আছে, চরম দক্ষিণপন্থী মৌলবাদী শক্তির জঙ্গী তৎপরতা বৃদ্ধি পেতে পারে। সৈয়দ আশরাফ অবশ্য আশংকার ইঙ্গিত দিলেও সব সত্য কথা বলতে পারবেন না। সরকার যে চরমভাবে জনবিচ্ছিন্ন, এ কথা নিশ্চয়ই তিনি স্বীকার করবেন না। জানি না, এই সত্যটি তিনি মনে মনে বিশ্বাস করেন কিনা। করলেও তা প্রকাশ্যে বলবেন না। বেশি কথায় যাবো না। সরকারের যদি কিছুটা জনগণের প্রতি আস্থা থাকতো, তাহলে অন্তত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে সুষ্ঠুভাবে হতে দিতো। এমন জলজ্যান্ত ভোট চুরির দরকার হতো না।

আমরা ইতিহাসে দেখেছি, চরম একনায়কত্ববাদী সরকারও একটা পর্যায় পর্যন্ত জনগণের পক্ষে রাখতে পারে। কোন না কোনোভাবে বিভ্রান্ত করতে পারে। যখনই সেই শাসকের কথায় মানুষ আর সাড়া দেয় না, তখনি তার বিপদ শুরু হয়। ২০১৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের কারণে সরকারের নৈতিক ভিত্তি প্রথম থেকেই ছিল দুর্বল। জনসমর্থন শূন্য। অবশ্য অনেক দেশে একনায়কতান্ত্রিক শাসকদের দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে দেখেছি। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। তার কারণ দুটি। প্রথমত, ওই সকল দেশে গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য নেই। অন্যদিকে বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস অনেক পুরাতন এবং অনেক উজ্জ্বল। দ্বিতীয়ত, ওই সকল দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ যথেষ্ট আর জনসংখ্যাও কম। ফলে স্বৈরাচারী শাসকরাও জনগণকে তুষ্ট করার মতো কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে পেরেছে। বাংলাদেশের বর্তমান শাসকরা উন্নয়নের ফিরিস্তি গাইলেও আসলে মুষ্টিমেয় কিছু অতিকায় ধনী বাদে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষও যে নিদারুন অর্থ কষ্টের মধ্যে বাস করছে তা খালি চোখেই দেখা যায়।

সম্প্রতি গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সকলস্তরের মানুষের অর্থনৈতিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলবে। কিন্তু গণবিচ্ছিন্ন সরকারের সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। বর্তমান সরকার যে শ্রেণীকে প্রতিনিধিত্ব করছে, সেই লুটেরা ধনীক শ্রেণীর জনগণের প্রতি দায়িত্ববোধও নেই, গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাবোধও নেই। গণতন্ত্র নির্বাসিত। বিরোধী দলকে মাঠ থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সরকারি দলের স্বেচ্ছাচারিতা, লুটপাট ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব হত্যার রাজনীতিকে উৎসাহিত করছে। নিজেরা খুনোখুনি করে মরছে। মানুষ নিরাপত্তার অভাবে সদা শঙ্কিত। এই রকম পরিস্থিতিই ষড়যন্ত্রের জন্ম দেয়। সৈয়দ আশরাফ বুদ্ধিমান ব্যক্তি বলেই সম্ভবত আগে থেকেই আচ করতে পেরেছেন। তাই তিনি কর্মীদের ভালো হতে উপদেশ দিচ্ছেন। ‘খাই খাই’ ভাব ত্যাগ করতে আহ্বান জানিয়েছেন। সংযত ও ঐক্যবদ্ধ হতে বলেছেন। কিন্তু যে দলের কর্মীদের এক বিশাল অংশ সন্ত্রাস ও লুটপাটের মধ্যদিয়ে চলছে, সেই দলের সামনে এই উপদেশ বা আহ্বান কতোটা কার্যকরি হতে পারে?

সব মিলিয়ে আমি জাতীয় বিপর্যয়ের আশংকা করছি। ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছি। সেই ষড়যন্ত্র আশা করি ’৭৫এর মতো হবে না। কেননা আমি আবারও বলছি, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয় না। তবে সৈয়দ আশরাফের মতো আমিও বিপদের আশংকা করছি এবং এই বিপদ আসবে দুটি কারণে। রাজনৈতিক শূন্যতা এবং শাসক দলের নীতিহীনতা, বিশৃঙ্খলা, লুটপাটতন্ত্র ও নৈরাজ্যের কারনে। শূন্যতা ও নৈরাজ্য বড় ভয়ংকর।

এই বিপদকে প্রতিরোধ করতে হলে যা সর্বাগ্রে দরকার তাহলো গণতন্ত্র। হ্যা, গণতন্ত্রই সমাধান। জঙ্গীবাদ, মৌলবাদকে প্রতিহত করতে, অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধন করতে এবং সমাজে সুস্থতা ফিরিয়ে আনতে গণতন্ত্রের বিকল্প নেই। শাসকগোষ্ঠী এটা যতো দ্রত উপলব্ধি করবেন, ততোই মঙ্গল, আমাদের জন্য। দেশের জন্য। এমনকি তাদের নিজেদের জন্যও।।