Home » অর্থনীতি » চীনের আর্থিক বিপর্যয়ের নেপথ্যে

চীনের আর্থিক বিপর্যয়ের নেপথ্যে

জন অঙ

অনুবাদ : আসিফ হাসান

Last 3সাম্প্রতিক বৈশ্বিক মুদ্রা আর স্টক মার্কেটগুলোর টালমাটাল পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্রগুলোতে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী শিরোনামে পরিবেশিত হচ্ছে। ১১ আগস্ট চীনা মুদ্রা ইউয়ানের প্রথম দফা অবমূল্যায়নের পর থেকেই এর সূচনা। তারপর সাংহাই স্টক মার্কেটে ১৭ আগস্টের দরপতনকে ‘কৃষ্ণ সোমবার’ হিসেবে অভিহিত করা হলো। বলা হতে লাগল, চীনে অর্থনৈতিক বিপর্যয় এতটাই ভয়াবহ যে, সেটা বিশ্বজুড়ে বৈদেশিক মুদ্রা আর মূলধনবাজারকে ধসিয়ে দিয়েছে।

মিডিয়ায় নানা উত্তেজনাকর ও স্পর্শকাতর শিরোনামে পরিবেশিত খবর থেকে সরে ঠাণ্ডা মাথায় এর কারণ বিশ্লেষণ করার জন্য অনেকে এই ঘটনাকে দুর্বোধ্য হিসেবে অভিহিত করেছেন। ২০০৫ সালে ডলারের বিপরীতে কার্যত একটি নির্দিষ্ট অবস্থানের অবসান ঘটানোর পর অনেক বছর ধরে ধীরে ধীরে চীনা ইউয়ানের দাম কেবল বাড়ছিলই। তাহলে ডলারের বিপরীতে প্রাথমিক মাত্র ১.৯ শতাংশ অবমূল্যায়নকে কিভাবে পাশ্চাত্যের মিডিয়া ‘তীব্র অবমূল্যায়ন’ হিসেবে অবহিত করতে পারে?

এটা আসলে ছিল সমন্বয়প্রক্রিয়া। বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত মন্থর রফতানি প্রবৃদ্ধি এবং পূঁজির ক্রমবর্ধমান হারে বিদেশে পাড়ি দেয়ার ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে এটা অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। এমনকি ইউয়ানের একই পরিমাণে (ডলারের বিপরীতে মাত্র ৩.৮ শতাংশ) দ্বিতীয় অবমূল্যায়নের পরও বিশ্বের সব প্রধান মুদ্রার বিপরীতে চীনা মুদ্রার অবস্থান ছিল অনেক শক্তিশালী : দক্ষিণ কোরিয়ার ওন ও ইউরোর বিপরীতে ১০ শতাংশের বেশি এবং ইয়েনের বিপরীতে প্রায় ২০ শতাংশ।

আর সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের প্রভাব বৈশ্বিক মূলধন বাজারগুলোতে ভয়াবহ মাত্রায় পড়েছে বলে যে ভাষ্য দেয়া হচ্ছে, সেটা আরো বেশি অতিরঞ্জিত। ধরে নেয়া হয় যে, সারা দুনিয়াতেই মূলধন বাজারগুলো ভাবাবেগ, প্রত্যাশা আর গড্ডালিকা প্রবাহে পরিচালিত হয়। কিন্তু তাই বলে সাংহাই মার্কেটের ৮.৫ শতাংশ পতনকে কেন ‘কৃষ্ণ সোমবার’ হিসেবে অভিহিত করা হবে, তা ব্যাখ্যা করা কঠিন। কারণ এই বাজার কয়েক মাস ধরেই টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।

এই ঘটনার আগে গত জানুয়ারি থেকে আরো তিনবার ৮ শতাংশের মতো বড় ধরনের পতন প্রত্যক্ষ করেছে। এই জুন পর্যন্ত এক বছরে বাজারটির মোট মূল্য হারিয়েছে ১৫০ শতাংশ। বাজারটি ছিল প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি, সর্বোচ্চ অবস্থায় গড় মূল্য/আয় অনুপাত ছিল ৩০এর বেশি। ফলে স্বাভাবিক সংশোধন ছিল অনিবার্য।

অধিকন্তু, সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ এখনো তুলনামূলক ছোট বাজার (বিশ্বে এর অবস্থান পঞ্চম)। এটা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্তও নয়। ফলে এটা বোধগম্য নয়, কিভাবে সাংহাইয়ের মাত্র এক দিনের বাজার সংশোধন ডো জোনসের ১,০০০ পয়েন্ট হারানোর কারণ হবে! এটা কি চীনা অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বাজে ধারণা ছড়ানোর প্রয়াস নয় কি? মনে রাখতে হবে, ১৯৯৭ সালের এশিয়ার আর্থিক সঙ্কটের সময় অঞ্চলটির স্টক মার্কেটগুলো ডুবে গিয়েছিল, কিন্তু ওয়াল স্ট্রিট তার অবস্থান সমুন্নত রাখতে পেরেছিল। আর এটাই পরিণতিতে বৈশ্বিক অর্থ বাজারগুলোকে স্থিতিশীল করেছিল।

এবার তেমনটা হলো না কেন? তবে কি যুক্তরাষ্ট্র তার সাবেক অর্থনৈতিক আধিপত্য হারিয়ে ফেলেছে? নাকি আমরা উদীয়মান ইউয়ানকে অত্যাধিক মূল্য দিয়েছি? চীনের যখন ঠাণ্ডা লাগে, তখন কি যুক্তরাষ্ট্র হাঁচি দেয়? এইসব আতঙ্ক ও হতাশার পেছনে রয়েছে চীনা অর্থনীতির স্বাস্থ্য সম্পর্কে উদ্বেগকে বাড়িয়ে দেখানো এবং এর পতন আসন্ন বলে প্রচার করা! চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। বৈশ্বিক জিডিপিতে তার অবদান ১৩.৪ শতাংশ (ক্রয় ক্ষমতার আলোকে ১৬ শতাংশ), আর যুক্তরাষ্ট্রের ২২.৫ শতাংশ। ফলে চীনা অর্থনীতির উত্থানপতন বিশ্বজুড়ে অনুভূতি হবে এটাই স্বাভাবিক।

২০০৯ সাল থেকে চীন পরিণত হয়েছে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ইঞ্জিনে। ৭৫টি দেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারও সে। অস্ট্রেলিয়া (এর একতৃতীয়াংশ রফতানি হয় চীনে) থেকে ব্রাজিল পর্যন্ত বিস্তৃত দেশগুলো তাদের কাঁচামাল রফতানির জন্য ব্যাপকভাবে চীনা বাজারের ওপর নির্ভরশীল। আবার দক্ষিণ কোরিয়া (তাদের রফতানির একচতুর্থাংশ) থেকে জাপান ও জার্মানির মতো শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের পণ্য রফতানির জন্য চীনের ওপর নির্ভর করে থাকে। ফলে চীনা প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের মন্থরতা মানেই সম্ভাব্য বৈশ্বিক স্থবিরতা।

অর্থনীতিবিদেরা দীর্ঘ দিন ধরেই প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং স্টক মার্কেটের কর্মদক্ষতার দুর্বল সম্পর্কের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করে আসছিলেন। তাদের মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেখানে বছরভিত্তিক কিংবা তিন মাস পরপর হিসাব করা করা হয়, সেখানে অর্থবাজারগুলো কাজ করে স্বল্পমেয়াদি, দৈনন্দিন কিংবা তাৎক্ষণিকভিত্তিতে।

কিন্তু এটা সাংবাদিক ও অর্থ বিশেষজ্ঞদের বাজারকে আন্দোলিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ‘ভাবাবেগ’ সৃষ্টির নির্দিষ্ট সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকে ব্যবহার থেকে বিরত রাখে না।

আর এবার আসল দোষী হলো চীনা অর্থনৈতিক ‘মন্থরতা’। চীনের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণেই এবার অর্থবাজারগুলোতে ঝড় বয়ে যাচ্ছে বলে ধারণা দেয়া হচ্ছে। দুর্ভাজ্যজনকভাবে চীনের অর্থনৈতিক মন্থরতার বিষয়টি ব্যাপকভাবে অতিরঞ্জন করা হয়েছে, এর মন্থরতার প্রকৃতি সম্পর্কে মারাত্মক ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়েছে।

উচ্চ প্রবৃদ্ধির অবসান, প্রবৃদ্ধিতে ধস নয় : ১৯৭৯২০১৩ সময়কালে চীনা অর্থনীতি বিস্ময়কর ৯.৮ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এর প্রথম হ্রাস ঘটে ২০১২ সালে, তখন তা নেমে দাঁড়ায় ৭.৮ শতাংশ, তারপর ২০১৩ সালে ৭.৭ শতাংশ। গত বছর আরো নাটকীয় পতন ঘটে, প্রবৃদ্ধি হয় মাত্র ৭.৪ শতাংশ, যা ছিল দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। চলতি বছর প্রবৃদ্ধি আরো নেমে ৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে, আর আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) মাত্র ৬.৮ শতাংশ হবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছে।

কোনো অর্থনীতিই নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হওয়া ছাড়া দুই অঙ্কের হার বজায় রাখতে পারে না। চীনের তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে অতিপ্রবৃদ্ধি ঐতিহাসিকভাবে নজিরবিহীন। এটা জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, হংকং ও সিঙ্গাপুরের ইতোপূর্বেকার প্রবৃদ্ধি স্বর্ণযুগের চেয়ে বেশি স্থায়ী হয়েছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানে সেটা স্থায়ী হয়েছিল দুই দশকের কিছু বেশি, হংকং ও সিঙ্গাপুরে এর চেয়ে অনেক কম।

চীন দীর্ঘ সময় এত বেশি প্রবৃদ্ধি হার পাওয়ার কারণ হলো তার বিশাল শ্রমবাজারসহ বিভিন্ন সুবিধা। এখন সেইসব উৎস হ্রাস পাওয়ার কারণেই উচ্চ প্রবৃদ্ধি হার কমে যাচ্ছে। উচ্চ প্রবৃদ্ধির যুগ শেষ হয়ে গেছে, তা নিশ্চিত। তবে মনে রাখতে হবে, চীনের ‘নিম্নতর’ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কেবল চীনা প্রেক্ষাপটে ‘নিম্ন’। কারণ দেশটির ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এখনো অনেক বেশি। মনে রাখতে হবে, গত বছর বৈশ্বিক গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২.৮ শতাংশ। আবার চীনের অর্থনৈতিক অবয়বটির কথা বিবেচনা করুন। কোনো এক বছরে ১০.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের জিডিপির ‘মাত্র’ ৭ শতাংশ ইন্দোনেশিয়ার মোট জিডিপির ৮০ শতাংশ, ভারতের একতৃতীয়াংশের সমান।

চীনের মন্থর প্রবৃদ্ধি ছিল একেবারেই স্বাভাবিক : এখন ব্যাখ্যা করা দরকার, চীনের বর্তমান অর্থনৈতিক মন্থরতা কেন চীনা নেতৃত্বকে তেমন একটা উদ্বিগ্ন করছে না। এর কারণ হলো তারা এটাকে ‘নতুন স্বাভাবিক’ বিষয় হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছেন। চীনা প্রেসিডেন্ট জি জিনপিঙ ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধিকে ভীতিকর কিছু নয় বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, ২০১৩ সালের ৭.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি তার দেশের ১৯৯৪ সালের পুরো জিডিপির সমান।

চীনা নেতৃত্ব এখন বিনিয়োগ ও রফতানির ওপর কম নির্ভরশীল হয়ে অভ্যন্তরীণ ভোগের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। তারা এখন উচ্চতর উৎপাদনশীলতাভিত্তিক আরো কার্যকর প্রবৃদ্ধি কাঠামোর দিকে নজর দিচ্ছেন। তাদের অর্থনৈতিক মন্থরতা কেবল প্রবৃদ্ধির মাত্রায় পরিবর্তন নয়, বরং প্রবৃদ্ধির প্রকৃতিতে পরিবর্তন। বছরের পর বছর অতিপ্রবৃদ্ধির ফলে অতিউৎপাদনশীলতা ও অতিসামর্থ্যরে পরিভাষায় অনেক কিছু ‘মাত্রাতিরিক্ত’ মাত্রায় ফেলে রাখা হয়েছিল। এ কারণে যে শিল্প খাত দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হার ছিল, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে তা মাত্র ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

চীনের কাছে বর্তমানে বিপুল পরিমাণে কাঁচামাল ও খনিজসম্পদ রয়েছে। এ কারণে তাদের এখন কাঁচামাল উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে আমদানি কমে গেছে। বোঝা যাচ্ছে, চীন তার শিল্পের অতিসামর্থ্য হজম করার পন্থা হিসেবে ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এত বেশি সক্রিয়।

চীনা অর্থনীতির এমন অবস্থার দিকে যে যাবে, তা আগেই বলা হয়েছিল, এটা অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। এখনকার সঙ্কটের কারণ হিসেবে ইউয়ানের দাম এবং স্টক মার্কেটগুলোকে দায়ী করে যে ভুল ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে তা ঠিক নয়। এখন বরং অতিমূল্যায়িত ইউয়ানের মান যথার্থ পর্যায়ে নিয়ে আসা হচ্ছে। এর মানে এই নয়, চীনা অর্থনীতি ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে।।

(লেখক : ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের ইস্ট এশিয়ান ইনস্টিটিউটের প্রফেশনাল ফেলো)