Home » অর্থনীতি » চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ২৫)

চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ২৫)

পিকিংমস্কো বিরোধ শুরু

আনু মুহাম্মদ

Last 4যখন চীন একদিকে দ্রুতগতিতে উন্নয়নের পথ খুঁজছে, অন্যদিকে ভেতর বাইরে মতাদর্শিক লড়াই চালাচ্ছে, সর্বোপরি যখন প্রতিমুহূর্তে সাম্রাজ্যবাদী অন্তর্ঘাত ও আক্রমণের আশংকা বাড়ছে তখনই চীনের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্কে ফাটল ধরে। প্রথমদিকে মতাদর্শিক বিতর্কের মধ্যে বিরোধ সীমাবদ্ধ থাকলেও ৬০ দশকের মাঝামাঝি সম্পর্ক বৈরী পর্যায়ে চলে যায়। দেশে দেশে তার প্রভাব বিশ্বজুড়ে বিপ্লবী আন্দোলনকেই বিপর্যয়ের মধ্যে নিক্ষেপ করে।

বিরোধের শুরু ৫০ দশকের শেষ থেকে। সোভিয়েত পাটির মধ্যে মতাদর্শিক পরিবর্তন থেকেই এর সূত্রপাত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারকে পরাজিত করে ধ্বংসস্তুপ থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নকে পুনর্গঠনের শেষ পর্যায়ে ১৯৫৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতা জোসেফ স্ট্যালিন মৃত্যুবরণ করেন। ৫ মার্চ তাঁর মৃত্যুর পরপরই পার্টিতে ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। এই দ্বন্দ্বের এক পর্যায়ে সামরিক আমলাতন্ত্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বিজয়ী হন এক পর্যায়ে স্ট্যালিনের সবচাইতে বড় তোয়াজকারী হিসেবে পরিচিত ক্রুশ্চেভ। এই সময়ের ঘটনাবলীর একটি চিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদীলেনিনবাদী)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাসদস্য, মার্কসের গ্রুনডিসি অনুবাদক ও গবেষক মার্টিন নিকোলাসএর গ্রন্থ থেকে পাওয়া যায়।

মার্টিন নিকোলাস লিখেছেন, “৬ মার্চ সকাল হবার আগেই এল. বেরিয়ার নেতৃত্বাধীন প্যরামিলিটারী স্টেট সিকিউরিটি পুলিশ মস্কোর আর্মি ইউনিটকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। বেরিয়ার অনুসারীরা মস্কো ও ক্রেমলিনের ওপর সর্বাত্মক নিযন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। একইরাতে স্ট্যালিনের ব্যক্তিগত সচিব জেনারেল পস্ক্রেবিশেভ রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যান। তিনিই পার্টির পরবর্তী নেতৃত্ব বিষয়ে স্ট্যালিনের মতামত সম্পর্কে অবগত ছিলেন।দিন শেষ হবার আগেই পার্টি সেক্রেটারিয়েটের ১০ জন সদস্যের ৫ জন এবং কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচিত প্রেসিডিয়ামের ৩৬ জন সদস্য এবং প্রার্থীদের ২২ জনকে পদচ্যুত করা হয়। ৫২টি সরকারি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ২৭টি বাতিল করা হয়। প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে অধিষ্ঠিত হন বেরিয়া নিজে, সর্বোচ্চ পদে অর্থাৎ প্রথম সচিব হিসেবে নিয়োজিত হন জি এম মেলানকভ। এরপরই ছিলেন ক্রুশ্চেভ। মার্শাল জি ঝুকভকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়।.. ঘটনাবলীর ধাপগুলো হচ্ছে বেরিয়া পুচ (১৯৫৩), ক্রুশ্চেভ ও মেলানকভ (১৯৫৩৫৫), ২০তম কংগ্রেস, ১৯৫৬, এবং ক্রুশ্চেভঝুকভ নেতৃত্বাধীন ক্যু, ১৯৫৭”। অর্থাৎ ক্ষমতার পরিবর্তনের পেছনে খুব গোছানো, সহিংস, দীর্ঘমেয়াদী কার্যক্রম ছিলো।

১৯৫৬ সালে অনুষ্ঠিত ২০তম কংগ্রেস ছিলো সোভিয়েত পার্টির মতাদর্শিক অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টার আনুষ্ঠানিক পর্ব। এর পূর্ব পর্যন্ত ক্রুশ্চেভ স্ট্যালিন ও তাঁর অবস্থানকে সমর্থন করেছেন। নিজের অবস্থান কিছুটা সংহত করবার পর ২০তম কংগ্রেসে শুরু হয় স্ট্যালিন বিরোধী কুৎসা, অপপ্রচার এবং সেইসঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক মতাদর্শিক পরিবর্তন। স্ট্যালিন বিরোধী কুৎসায় পার্টির মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয় এবং ক্রুশ্চেভ বাধ্য হয়ে এসব বক্তব্য থেকে সরে আসেন। ১৯৫৭ সালে পার্টি তাঁর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ভোট দেয়। কিন্তু তিনি মার্শাল ঝুকভের নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর সমর্থনে ক্রুশ্চেভ ক্ষমতায় টিকে যান। বিরোধীদেরই বরং আক্রমণের সম্মুখীন হতে হয়।

১৯৫৭ সালে মস্কোতে সারাবিশ্বের ৮১টি পার্টির সম্মেলনে যে ঘোষণা গৃহীত হয় তাতে চীনের সম্মতি ছিলো। ১৯৬০ সালে প্রচারিত এক যুক্ত বিবৃতিও তৈরি হয় পিকিং ও মস্কোসহ সকলের সম্মতিক্রমেই। কিন্তু এরপর থেকে, চীনের বক্তব্য অনুসারে, সোভিয়েত পার্টি এই ঘোষণা ও বিবৃতিকে অমান্য করে সংশোধনবাদী পথে যাত্রা শুরু করে। চীনা পার্টির দৃষ্টিতে সোভিয়েত পার্টি দেশের ভেতর নব্য বুর্জোয়ার পথ তৈরি করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে সাম্রাজ্যবাদের সাথে ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান’, ‘শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা’, এবং বুর্জোয়াদের সাথে নিয়ে ‘শান্তিপূর্ণ পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ’ নীতিমালার মধ্য দিয়ে বিপ্লববিরোধী অবস্থানে অধপতিত হয়। মতাদর্শিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক প্রথমে দুই পার্টির মধ্যে চিঠি ও প্রতিনিধি বিনিময়ে সীমাবদ্ধ থাকলেও ক্রমশ দূরত্ব বাড়তে থাকায় তা ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বিপ্লবের পর থেকেই চীনের উন্নয়ন অভিযাত্রায় সোভিয়েত সমর্থন ছিলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তিগত সমর্থন এবং বিভিন্ন খাতে বিশেষজ্ঞদের আন্তরিক ও মূল্যবান অবস্থান চীনের অগ্রগতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করছিলো তখন। কিন্তু বিতর্কের এক পর্যায়ে সোভিয়েত সরকার এইসব সমর্থন প্রত্যাহার করায় বিরোধ প্রকাশ্য হয়ে পড়ে।

১৯৬৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর চীনের ‘পিপলস ডেইলি’ ও ‘রেড ফ্ল্যাগ’ পত্রিকায় পার্টির অবস্থানের ব্যাখ্যা প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, “আমরা নিজেদেরকে প্রশ্ন করেছি: আমাদের কি সোভিয়েত ইউনিয়ন কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিএসইউ) নেতৃত্বকে অনুসরণ করা এবং তাদের কাজের সঙ্গে নিজেদের ইচ্ছেকে সঙ্গতিপূর্ণ করে তোলা উচিত? সেক্ষেত্রে সিপিএসইউ নেতৃত্ব অবশ্যই আনন্দিত হতেন, কিন্তু আমরাই সংশোধনবাদী হয়ে পড়তাম। আমরা নিজেদেরকে এ প্রশ্নও করেছি: আমাদের পক্ষে কি সিপিএসইউ নেতৃত্বের ভুলগুলি সম্পর্কে নীরব থাকাই উচিত কাজ হবে? আমরা বিশ্বাস করেছি যে, সিপিএসইউ নেতৃত্বের ভুলগুলি আকস্মিক, ব্যক্তিগত বা সামান্য ভুলমাত্র নয়। বরং সেগুলি সবই নীতির ভুল, যা সমগ্র সমাজতান্ত্রিক শিবির ও আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনকেই বিপদের পথে ঠেলে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম অংশ হিসেবে কিভাবে আমরা এই ভুলগুলি সম্পর্কে নির্লিপ্ত ও নীরব থাকি? তা করলে আমরা কি মার্কসবাদলেনিনবাদ ও সর্বহারা আন্তর্জাতিকতা রক্ষার কর্তব্য থেকেই বিচ্যুত হতাম না?”

(চলবে…)

তথ্যসূত্র

১। Martin Nicolus: Restoration of Capitalism in the USSR, 1975

২। আন্তর্জাতিক মতাদর্শগত মহাবিতর্ক ১ম খন্ড (সোভিয়েত ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মতাদর্শগত মহাবিতর্কের দলিল সংকলন), পিপলস বুক সোসাইটি, কলকাতা।