Home » আন্তর্জাতিক » তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (পঞ্চদশ পর্ব)

তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (পঞ্চদশ পর্ব)

কাতার চুক্তি :: পুলিশকে হাত করার চেষ্টা

Last 5অস্ত্র ব্যবসার সাথে তেল সম্পদের অর্থের একটি গভীর সখ্যতা রয়েছে। একটি অপরটিকে টিকিয়ে রাখে। আর পরস্পরের ঘনিষ্ঠ দুই ব্যবসার কুশীলবরা। এই ব্যবসার নেপথ্যে রয়েছে ঘুষ, অর্থ কেলেঙ্কারিসহ নানা ভয়ঙ্কর সব ঘটনাবলী। এরই একটি খণ্ডচিত্র প্রকাশ করা হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। প্রভাবশালী দ্য গার্ডিয়ানএর প্রখ্যাত দুই সাংবাদিক ডেভিড লে এবং রাব ইভানসএর প্রতিবেদন প্রকাশের পরে এ নিয়ে বিস্তর আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। এ সংখ্যায় ওই প্রতিবেদনের বাংলা অনুবাদের (পঞ্চদশ পর্ব) প্রকাশিত হলো। অনুবাদ : জগলুল ফারুক

টনি ব্লেয়ার কর্তৃক নিযুক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল লর্ড গোল্ডস্মিথ বিএই’র দুর্নীতির বিরুদ্ধে পরিচালিত পুলিশি তদন্ত জোর করেই বন্ধ করে দিয়েছিলেন। বিএই’র শক্ত রাজনৈতিক সংযোগ সত্ত্বেও ২০০০ সাল থেকেই অস্ত্র ব্যবসায়ী কোম্পানীগুলোর বিরুদ্ধে উত্থাপিত ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ প্রশ্নে পুলিশের চাপ বাড়তে শুরু করে। দি সিরিয়াস ফ্রড অফিস (এসএফও)-এর সহকারী পরিচালক হেলেন গার্লিকই প্রথম একটি ঘুষ লেনদেনের তথ্য আবিষ্কার করেন। তিনি দেখান যে, জার্সির গ্রিনল্যান্ড ব্যাংকের মাধ্যমে গোপনে কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ হামাদকে ঘুষ বাবদ ৭০ লাখ পাউন্ড অর্থ প্রদান করা হয়েছিল। এসএফও বিএই’র সদর দফতরের বিপণন বিভাগের প্রধান হাগ ডিকিনসনের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলেন। তারা বিষয়টি নিয়ে একটি তদন্ত কার্যক্রম চালানোরও চেষ্টা করে। কিন্তু দ্রুতই সেই তৎপরতা থেমে যায়। শেখ হামাদের জ্ঞাতিভাই কাতারের আমির একটি চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেন, কমিশন লেনদেনের বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন। হামাদও অর্থ ফেরতের বিনিময়ে ঝামেলামুক্ত হন। তিনি জার্সি কর্তৃপক্ষের নামে ৬০ কোটি পাউন্ডের একটি চেক লিখে দেন। জার্সি কর্তৃপক্ষও তার ব্যাপারটি তদন্ত করতে তাদের অসুবিধা থাকার কথা জানিয়ে দেয়। এভাবেই কাতার ঘটনা সম্পর্কিত তদন্তটি বাতিল হয়ে যায়।

১৯৯৬ সালে অস্ত্র বেচাকেনা সংক্রান্ত কাতার চুক্তির মূল দলিলটি সই করেছিলেন প্রতিরক্ষা সচিব মাইকেল পার্টিল্লো। চুক্তিটি লন্ডন এবং জার্সিতে বাতিল হয়ে যাওয়ার পর পরই ২০০২ সালে তাকে বিএই’র বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়।

২০০১ সালে এসএফও আরও একটি অভিযোগ পায়। এই অভিযোগে বলা হয়, বিএই সৌদিদের ঘুষ দেয়ার জন্য গোপন একটি তহবিল ব্যবহার করেছে। এসএফও’র উপপরিচালক রবার্ট ওয়ারডল এ ব্যাপারে কিছু একটা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এটি করতে গিয়ে তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব স্যার কেভিন টেবিটের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। এ প্রসঙ্গে টেবিটের মন্তব্য ছিল তিনি ‘ক্ষতিকর কোনো খরগোশকে দৌড়াতে দেবেন না’। বিএই প্রাগে ঘুষ লেনদেন করেছে মর্মে যুক্তরাষ্ট্রের আনা অভিযোগটিও টেবিট উড়িয়ে দেন। তবে শেষ পর্যন্ত ২০০৩ সালে এসে ঘটনাটি জানাজানি হয়ে যায়।

দি গার্ডিয়ান পত্রিকা বিএই’র বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের ফিরিস্তি ধারাবাহিকভাবে ছাপতে শুরু করে। সেখানে বলা হয়, বিএই সৌদিদের বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও বিভিন্ন রকম সুযোগসুবিধাদি প্রদানের জন্য বহির্বিশ্বে অবস্থিত তার অঙ্গ সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করছে। বিএই’র কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠে, তারা সংস্থার গোপন তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন এবং একই সাথে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তাকে বিনামূল্যে অবকাশ যাপনের সুযোগ করে দিয়েছেন।

পিটার গার্ডিনার নামের একজন প্রত্যক্ষদর্শী এ সংক্রান্ত কিছু ভুয়া চালানের প্রমাণপত্র সরবরাহ করেন। গার্ডিয়ান পত্রিকা কর্তৃপক্ষ এসব প্রমাণাদি আবার এসএফও’র কাছে হস্তান্তর করে। ওয়ারডল তখন সংস্থাটির পরিচালক এবং এবার আর কেউ তাকে বাধা দিতে পারে না। তিনি ১৮ সদস্যের একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দল গঠন করেন। এ দলে ছিলেন ব্যারিস্টার হেলেন গার্লিক (সিলভি ও বার্লেসকুনির বিরুদ্ধে সংগঠিত তদন্তেও তিনি যুক্ত ছিলেন) এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জালিয়াতি বিরোধী পুলিশ স্কোয়াড প্রধান রব এলানের মতো ব্যক্তিরা। দলটি টিম ল্যাংডেলের কাছ থেকে আইনি পরামর্শ গ্রহণ করে। ল্যাংডেল ব্রিটেনের নামকরা জালিয়াতি বিশ্লেষক। তত্ত্বগতভাবে ওয়ারডল স্বাধীনই ছিলেন। তবে তাকে অ্যার্টনি জেনারেল লর্ড গোল্ডস্মিথের তত্ত্বাবধানেই কাজ করতে হতো। গোল্ডস্মিথ ছিলেন রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া একজন ব্যক্তি।

তদন্ত দলটি ভয়াবহ কিছু জিনিস উদঘাটন করল। এসএফও’র দলটি প্রথমেই লয়েড ব্যাংককে তাদের নথিপত্র প্রদর্শন করতে বলল। এগুলো ছিল বিরাট আকারের এক ভান্ডার। নথিপত্র যাচাই করে তদন্ত দল দেখতে পেল বিএই ৬ কোটি পাউন্ডের একটি ‘যুক্তরাজ্য ঘুষ তহবিলই’ কেবল চালু রাখেনি, কোম্পানীটি বিশ্বজুড়ে তাদের দালালদের গোপনে অর্থ প্রদান করে আসছিল। এসব অর্থের অধিকাংশই সুইস ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেনামি কোম্পানীর নামে পাচার হতো।

এসএফও তদন্ত দলটি এরপরই যায় বিএই কর্তৃপক্ষের কাছে। তারা তাদের আইনি ক্ষমতা বলেই বিএই’র কাছে তাদের দালালদের পরিচয় সংবলিত নথিগুলো দাবি করে। বিএই সরাসরি এ আইনি নির্দেশ পালনে অসম্মতি জানায়। বিএই’র যেসব নির্বাহীকে ইতোমধ্যেই গ্রেফতার এবং জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল তাদেরও আশ্বস্ত করা হয়, বিএই’র রাজনৈতিক সংযোগ বেশ জোরালো। আইনি সূত্রগুলো জানায়, বিএই’র আইন পরামর্শক এলেন অ্যান্ড ওভারি এমন একজন ব্যারিস্টার নিয়োগ দেন, যার সাথে অ্যার্টনি জেনারেলের ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে এবং তিনি বাড়িতেও তাকে টেলিফোন করতে পারবেন। তবে গোল্ডস্মিথ বলেন, তিনি এ জাতীয় ব্যক্তিগত ও গোপন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

বিএই’র আইনি পরিচালক মাইকেল লেস্টার পরে এ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বলেন, আইনের প্রতি অনুগত থাকতে গেলে আল ইয়ামামাহ চুক্তির পরবর্তী কাজটি ব্রিটেন হারাবে। বিএই সে সময় টাইফুন জঙ্গি বিমান বিক্রয়ের চেষ্টা করছিল।

বিএই যে তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত তদন্ত কার্যক্রমটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছিল তাতে সায় ছিল স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীরই। সে সাথে যোগ দেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন রিড এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাক স্ট্র। এটি ছিল শীর্ষ পর্যায়ে ব্যতিক্রমধর্মী এক অপতৎপরতার ঘটনা।।

(চলবে…)