Home » আন্তর্জাতিক » দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই :: লি কুয়ান ইউ বনাম আমাদের সরকার

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই :: লি কুয়ান ইউ বনাম আমাদের সরকার

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

Dis 2অল্পস্বল্প’ গণতন্ত্রের দেশ বাংলাদেশের শাসকশ্রেনীর একটি প্রিয় উদাহরন হচ্ছে, সিঙ্গাপুরমালয়েশিয়ার উন্নয়ন মডেল। এদেশে শাসকরা এখন আপাতত: গণতন্ত্র ও অংশগ্রহনমূলক নির্বাচন বাদ দিয়ে স্বপ্ন দেখছেন ওরকম মডেলে উন্নয়ন করার জন্য। ভেতরে যাই থাকুক ধামাচাপা দিয়ে বাংলাদেশ এখন বিশ্বব্যাংকের স্বীকৃতিতে নিম্নমধ্য আয়ের দেশ এবং বাগাড়ম্বরে ২০১৯ সালের মধ্যে পরিণত হতে চলেছে মধ্যম আয়ের দেশে। এজন্যই তারা কথায় কথায় উদাহরণ দেন সিঙ্গাপুরমালয়েশিয়ার। সিঙ্গাপুরের শাসক লি কুয়ান ইউ একদলীয় শাসনের মধ্যে দেশকে উন্নয়নের শিখরে তুলে দিয়ে মডেল হয়েছিলেন। তাঁর শাসনপদ্ধতি নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও দুর্নীতিকে উ্ন্নয়নের এক নম্বর শত্রু এবং আইনের শাসনকে পরম মিত্র করে নিয়ে রাষ্ট্রসমাজের সব স্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা নজিরবিহীন। আমাদের শাসকদের কাছে সেটুকু অনেকটাই অনুল্লেখ্য।

শাসক হিসেবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি কতটা আপোষহীন ছিলেন, যে কোন কৌতুহলী পাঠক সেটি বর্ণনা পাবেন তাঁর রচিত আত্মজৈবনিক গ্রন্থ From Third world to First:: The Singapore storyএর Keepig the Government clean অধ্যায়ে। এখানে তিনি জানাচ্ছেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপোসহীন যুদ্ধের কথা। তার নীতি ছিল বড় দুর্নীতিবাজদের প্রতি ক্ষমাহীন থাকলে ছোটগুলো জায়গা পাবে না। দুর্নীতি দমনে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন Corrupt Practice Investigation Bureau (CPIB)। এই প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কতটা শক্তিশালী ছিল, সেটি বর্ণনা দিচ্ছেন তিনি এই অধ্যায়ে।

তাঁর মন্ত্রীসভার অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য তে চেং ওয়ান ছিলেন জাতীয় উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। ১৯৮৬ সালে এই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীাতির অভিযোগে বলা হয়, প্রচলিত আইন ভেঙ্গে মন্ত্রী একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানকে অবৈধ সুবিধা দিতে ৪ লাখ সিঙ্গাপুর ডলার ঘুষ নিয়েছেন। তে চেং ওয়ান যথারীতি অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং সিপিআইবি’র তদন্ত কর্মকর্তার কাজে বাধা দেন। কেবিনেট সচিব প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউকে জানান মন্ত্রী ওয়ান তাঁর সাক্ষাৎকার চান। লি তাৎক্ষণিকভাবে জানিয়ে দেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি অভিযুক্ত মন্ত্রীকে সাক্ষাৎ দেবেন না।

তদন্ত চলাকালে সপ্তাহখানেকের মধ্যে মন্ত্রী ওয়ান আত্মহত্যা করেন ও প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে লেখা নোটে লেখেন, ‘আমি গত দুই সপ্তাহ ধরে খুবই বিষণ্ন বোধ করছিলাম। দুর্ভাগ্যজনক এ ঘটনার দায় আমি স্বীকার করছি। সম্পূর্ণ দায়ভার মাথা পেতে নিচ্ছি। প্রাচ্যদেশীয় একজন ভদ্রলোক হিসেবে মনে করছি, পাপের প্রায়শ্চিত করার এটি সবচেয়ে উত্তম উপায়’। ঘটনা এখানেই থেমে থাকেনি। দুর্নীতি ও আত্মহত্যা নিয়ে নেতিবাচক প্রচারনায় আত্মঘাতী ওয়ান এর পরিবার চিরতরে সিঙ্গাপুর ত্যাগ করেন। ঘটনাটির পর্যবেক্ষনে লি লেখেন, ‘আমরা এমন এক পরিবেশ তৈরী করেছি, যেখানে জনমত সরকারী প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতিকে বিপদজ্জনক হিসেবে গণ্য করে। এজন্যই অভিযুক্ত অসম্মান ও সামাজিক ঘৃনার চাইতে মৃত্যুকেই শ্রেয়তর মনে করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

মাত্র কিছুদিন আগে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী সংসদে বলেছিলেন, বেসিক ব্যাংকে হরিলুট হয়েছে। এর পেছনে রয়েছেন ব্যাংকের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বাচ্চু। গত ৮ জুলাই সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, যত শক্তিশালী হোক না কেন বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বাচ্চুকে আইনের আওতায় আনা হবে। অর্থমন্ত্রীর এই হুঙ্কার বাস্তবে হাওয়ায় ভেসে আছে। বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যানকে সমস্ত অপকর্মের দায় থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন দায়মুক্তি দিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকও এই গুরুতর অপরাধের কোন ব্যবস্থা নেয়নি বরং ছেড়ে দিয়েছে দুদকের ওপর। বরাবরের মত ক্ষমতাশালীরা যেভাবে সাড়া পেয়ে যায় আব্দুল হাই বাচ্চুও এখন সেভাবেই দায়মুক্ত।

অর্থমন্ত্রী সম্ভবত: একটি মিথ জানেন না, বেসিক ব্যাংকের এই সাবেক চেয়ারম্যানটি ওপরমহলের কতটা আর্শিবাদপুষ্ট। যতটা হলে কেউ তার কিচ্ছুটি করতে পারবে না। তিনি খোদ প্রধানমন্ত্রী ছাড়া অন্যদের থোড়াই পরোয়া করেন এবং তা প্রমানও করেছেন। ব্যাংকিং সেক্টর ও শেয়ার বাজার লুট, হলমার্কডেসটিনিবিসমিল্লাহসহ প্রতিষ্ঠানগুলির আত্মসাতের ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোন শক্তদৃঢ় অবস্থান নেয়নি। বরং লুটেরা জালিয়াতদের দুদক যখন একের পর এক দায়মুক্তি দিচ্ছে তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্ণর আত্মপ্রসাদের সাথে বলছেন, ব্যাংক জালিয়াতির সব দরজা বন্ধ, অনিয়ম করলে কোন ব্যাংককে ছাড় নয়, ইত্যাদি।

বাংলাদেশের রাজনীতি কখনই সমঝোতার চেহারা না পেলেও আর্থিক দুর্নীতিআত্মসাতের ক্ষেত্রে একটি অলিখিত সমঝোতা সবসময়ই বিদ্যমান। ব্যাংকিং সেক্টরে বিশাল সব দুর্নীতি সমঝোতার মধ্য দিয়েই এগুচ্ছে এবং দায়মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে। এসব দুর্নীতির সাথে জড়িতদের কোন আইন বা প্রতিষ্ঠান আটকাতে পারছে না। এর সবচেয়ে বড় উদাহরন হচ্ছে, হলমার্ক কেলেঙ্কারীর সাথে প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন একজন উপদেষ্টার যুক্ততা আলোচিত হলেও তদন্তের এক পর্যায়ে তাকে দায়মুক্ত ঘোষণা করা হয়। বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যানের দুর্নীতি নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা, আইনের আওতায় নিয়ে আসার ঘোষণাকোনটাই কাজে আসেনি। দুর্নীতি নিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দুমুখো নীতির কারনে এইসব হেভিওয়েট দুর্নীতিবাজরা অবলীলায় দায়মুক্ত হয়ে যাচ্ছেন।

অবশ্য অর্থ মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় কমিটি বেসিক ব্যাংক দুর্নীতিতে দায়মুক্তির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। কমিটি সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ব্যাংকের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাত বিষয়ে দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদন তারা বিশ্বাস করছেন না। তারা এও বলেছেন, সাবেক চেয়ারম্যানকে অব্যাহতি দিয়ে দুদকের প্রতিবেদন তারা গ্রাহ্য করবেন না। সংসদীয় কমিটির সভায় অর্থমন্ত্রীও বেসিক ব্যাংক নিয়ে দুদকের কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, এতেও কি শেষ রক্ষা হবে?

দুর্নীতির দায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিচার এখন দেশের অন্যতম আলোচিত বিষয়। এতিমখানার অর্থ নিয়ে অনিয়মআত্মসাত করার দায়ে দুদক তাকে অভিযুক্ত করেছে। অর্থ পাচারের দায়ে আদালতে দন্ডিত তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র মারা গেছে বিদেশে। এই দেশে সরকার প্রধান বা রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাগুলি ক্ষমতা পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত। আগামীতে ক্ষমতায় আসলে রাজনৈতিক বা আইনী প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়া সব মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়ে যাবেন, যেমনটি পেয়েছেন তাঁর কাউন্টার পার্ট শেখ হাসিনা। বেসিক ব্যাংক, হলমার্ক, ডেসটিনি ও শেয়ার বাজার লুটেরাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে না। মূল কারনটি হচ্ছে, রাজনীতিকদের সাথে সমঝোতার মাধ্যমেই এসব ঘটনা ঘটে, প্রকাশ হলে তদন্তের নামে প্রহসন হয়, কখনও কখনও মামলাও হয়। কিন্তু তা আখেরে তা বিচারের মুখোমুখি হয় না।।